লেখা:

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তিন বছর গড়াতে চলেছে। এর প্রভাব শুধু গাজাতেই সীমাবদ্ধ নেই, দখলকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, সিরিয়া ও লেবাননেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলকে থামাতে আরব দেশগুলোর সরকার এবং আরব লীগ কেন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না এ প্রশ্নে অনেক আরব নাগরিক বিস্মিত ও হতাশ।
এই পরিস্থিতি বদলাতে পারে এমন দুটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ রয়েছে। একদিকে পশ্চিমা ও অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তি। অন্যদিকে, আরব দেশগুলোর সরকার। কিন্তু বাস্তবে তারা মূলত উদ্বেগ প্রকাশ, প্রতীকী ত্রাণ সহায়তা পাঠানো এবং জাতিসংঘে বৈঠকের আহ্বান জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত তাদের সম্মিলিত নিষ্ক্রিয়তাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
বিশেষ করে আরব লীগ, যারা নিজেদের আরব বিশ্বের একই স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বলে দাবি করে, এই সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অনেকের মতে, সংস্থাটি শুধু বিবৃতি দেওয়া ও আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর পেছনে তিনটি পরস্পর-সম্পর্কিত কারণ থাকতে পারে।
প্রথম কারণটি হলো আরব রাষ্ট্রগুলোর ঔপনিবেশিক-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র এমনভাবে গঠিত হয়েছিল, যাতে বিদেশি শক্তির স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে নিজ দেশের জনগণের পরিচয়, অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে এসব দেশ কখনোই ঔপনিবেশিক প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এ কারণেই ইরান বা তুরস্কের মতো দেশগুলোর তুলনায় অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, জনশক্তি ও ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি। তারা এখনো প্রভাবশালী বিদেশি শক্তির প্রভাব ও চাপের বাইরে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। গাজা সংকট সেই সীমাবদ্ধতাকেই আবারও সামনে এনে দিয়েছে।
এ ছাড়া অধিকাংশ আরব দেশ, এমনকি জ্বালানি-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে আর্থিক, সামরিক, প্রযুক্তিগতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অ-আরব শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। এই গভীর নির্ভরশীলতা তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করেছে এবং স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও সীমিত করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মতো শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য এতটাই বেশি যে, অধিকাংশ আরব সরকার সেই ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক।
আরব বিশ্বের ভঙ্গুর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলো ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও সুদানের দিকে তাকালেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব দেশ আরব নেতাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা শক্তি ও ইসরায়েলের মতো প্রভাবশালী শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
১৯৫০-এর দশক থেকে আরব রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন অ-আরব শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়া। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইরান, ইসরায়েল ও তুরস্কও। অনেক ক্ষেত্রেই এসব দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি বাইরের শক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল, আরব দেশ ও মার্কিন স্বার্থকে ঘিরে পানি, খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন, আর্থিক সহায়তা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও সামরিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত সম্পর্কের একটি জাল গড়ে তুলেছে। এই প্রভাবের বড় অংশ পরিচালিত হয় বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, ন্যাটো, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর বৈশ্বিক ব্যাংকিং ও অর্থপ্রদানের ব্যবস্থার মাধ্যমে। ফলে কোনো আরব রাষ্ট্র যদি শুধু বিবৃতি দেওয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়, তাহলে তাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ বা অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি তাদের স্থিতিশীলতা, এমনকি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরব দেশগুলোর নীরবতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নীতিগত দূরত্ব। অভ্যন্তরীণ নীতির পাশাপাশি ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, ইরান, প্রতিরোধ আন্দোলন কিংবা রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নেও এই ব্যবধান স্পষ্ট।
এই পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘কর্তৃত্ববাদী সমঝোতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এ ব্যবস্থায় সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা ও সম্পদ বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেয়, আর নাগরিকরা পানি, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক প্রয়োজনের জন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
তবে ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, সুদান, সোমালিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবাননের মতো যেসব দেশ পর্যাপ্ত সম্পদ জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত, পানি ও বিদ্যুতের সংকটসহ নানা সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। এসব সংকট বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
গত ছয় দশক ধরে আরব বিশ্বে বসবাস ও সাংবাদিকতা করার অভিজ্ঞতার আলোকে আরব সরকার, রাজনৈতিক অভিজাত ও সাধারণ মানুষ সবারই ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও কল্যাণের প্রতি আন্তরিক সমর্থন রয়েছে। তারা কার্যকরভাবে ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়াতে চান। কিন্তু গাজায় চলমান গণহত্যা এবং পরে লেবানন ও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েলের হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের অগ্রাধিকার এক নয়।
বাস্তবতা হলো, ফিলিস্তিনকে সমর্থন করা এবং নিজেদের ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষার মধ্যে যখন বেছে নেওয়ার প্রশ্ন আসে, তখন অধিকাংশ আরব শাসকগোষ্ঠী নিজেদের টিকে থাকাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। যে অ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা মূলত এক ধরনের নব্যঔপনিবেশিক (নিও-কলোনিয়াল) সম্পর্কের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ব্যবস্থায় ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, আর আরব রাষ্ট্র ও জনগণের অধিকারকে অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ হিসেবে দেখা হয়।
বর্তমান এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের বিরোধিতা করতে চাইলে আরব দেশগুলো বিবৃতি দিতে পারে, আঞ্চলিক বৈঠক করতে পারে, বিক্ষোভ-সমাবেশ আয়োজন করতে পারে, ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা পাঠাতে পারে, ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করতে পারে, ফিলিস্তিনি কেফিয়াহ পরতে পারে, ফিলিস্তিনের পতাকা উড়াতে পারে কিংবা জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারে। কিন্তু সামরিক, অর্থনৈতিক বা অন্য কোনো কার্যকর প্রতিরোধের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বোমা হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা চরম ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়তে হয়।
আরব লীগের ভূমিকা এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। কারণ, সংস্থাটি আরব রাষ্ট্রগুলোর সরকারি অবস্থানের বাইরে যেতে পারে না। তাছাড়া আরব লীগ কার্যত সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ডাকমাশুল বা বিমানভাড়ার মতো তুলনামূলক সহজ বিষয় ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এদিকে গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংকটও আরব বিশ্বের সম্মিলিত উদ্যোগকে আরও দুর্বল করেছে। ১৯৭৯ সালের পর থেকে অধিকাংশ আরব সরকার ইরানকে একটি বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে। তাই তারা ইরানঘনিষ্ঠ অ-রাষ্ট্রীয় সংগঠন যেমন হিজবুল্লাহ, হামাস, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি) এবং অন্যান্য প্রতিরোধ গোষ্ঠীর শক্তি আরও বৃদ্ধি পাক, তা চায় না।
সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাত আরব দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল নিরাপত্তা বলয়ের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই যুদ্ধের প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আরব সরকারগুলোর নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। এর ফলে প্রকৃত নিরাপত্তা, পূর্ণ সার্বভৌমত্ব এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বে নিজেদের অবস্থান আরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার পাশাপাশি পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথ নিয়েও তাদের নতুন হিসাব-নিকাশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
(আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তিন বছর গড়াতে চলেছে। এর প্রভাব শুধু গাজাতেই সীমাবদ্ধ নেই, দখলকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, সিরিয়া ও লেবাননেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলকে থামাতে আরব দেশগুলোর সরকার এবং আরব লীগ কেন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না এ প্রশ্নে অনেক আরব নাগরিক বিস্মিত ও হতাশ।
এই পরিস্থিতি বদলাতে পারে এমন দুটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ রয়েছে। একদিকে পশ্চিমা ও অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তি। অন্যদিকে, আরব দেশগুলোর সরকার। কিন্তু বাস্তবে তারা মূলত উদ্বেগ প্রকাশ, প্রতীকী ত্রাণ সহায়তা পাঠানো এবং জাতিসংঘে বৈঠকের আহ্বান জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত তাদের সম্মিলিত নিষ্ক্রিয়তাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
বিশেষ করে আরব লীগ, যারা নিজেদের আরব বিশ্বের একই স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বলে দাবি করে, এই সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অনেকের মতে, সংস্থাটি শুধু বিবৃতি দেওয়া ও আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর পেছনে তিনটি পরস্পর-সম্পর্কিত কারণ থাকতে পারে।
প্রথম কারণটি হলো আরব রাষ্ট্রগুলোর ঔপনিবেশিক-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র এমনভাবে গঠিত হয়েছিল, যাতে বিদেশি শক্তির স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে নিজ দেশের জনগণের পরিচয়, অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে এসব দেশ কখনোই ঔপনিবেশিক প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এ কারণেই ইরান বা তুরস্কের মতো দেশগুলোর তুলনায় অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, জনশক্তি ও ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি। তারা এখনো প্রভাবশালী বিদেশি শক্তির প্রভাব ও চাপের বাইরে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। গাজা সংকট সেই সীমাবদ্ধতাকেই আবারও সামনে এনে দিয়েছে।
এ ছাড়া অধিকাংশ আরব দেশ, এমনকি জ্বালানি-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে আর্থিক, সামরিক, প্রযুক্তিগতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অ-আরব শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। এই গভীর নির্ভরশীলতা তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করেছে এবং স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও সীমিত করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মতো শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য এতটাই বেশি যে, অধিকাংশ আরব সরকার সেই ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক।
আরব বিশ্বের ভঙ্গুর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলো ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও সুদানের দিকে তাকালেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব দেশ আরব নেতাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা শক্তি ও ইসরায়েলের মতো প্রভাবশালী শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
১৯৫০-এর দশক থেকে আরব রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন অ-আরব শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়া। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইরান, ইসরায়েল ও তুরস্কও। অনেক ক্ষেত্রেই এসব দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি বাইরের শক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল, আরব দেশ ও মার্কিন স্বার্থকে ঘিরে পানি, খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন, আর্থিক সহায়তা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও সামরিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত সম্পর্কের একটি জাল গড়ে তুলেছে। এই প্রভাবের বড় অংশ পরিচালিত হয় বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, ন্যাটো, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর বৈশ্বিক ব্যাংকিং ও অর্থপ্রদানের ব্যবস্থার মাধ্যমে। ফলে কোনো আরব রাষ্ট্র যদি শুধু বিবৃতি দেওয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়, তাহলে তাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ বা অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি তাদের স্থিতিশীলতা, এমনকি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরব দেশগুলোর নীরবতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নীতিগত দূরত্ব। অভ্যন্তরীণ নীতির পাশাপাশি ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, ইরান, প্রতিরোধ আন্দোলন কিংবা রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নেও এই ব্যবধান স্পষ্ট।
এই পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘কর্তৃত্ববাদী সমঝোতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এ ব্যবস্থায় সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা ও সম্পদ বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেয়, আর নাগরিকরা পানি, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক প্রয়োজনের জন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
তবে ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, সুদান, সোমালিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবাননের মতো যেসব দেশ পর্যাপ্ত সম্পদ জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত, পানি ও বিদ্যুতের সংকটসহ নানা সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। এসব সংকট বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
গত ছয় দশক ধরে আরব বিশ্বে বসবাস ও সাংবাদিকতা করার অভিজ্ঞতার আলোকে আরব সরকার, রাজনৈতিক অভিজাত ও সাধারণ মানুষ সবারই ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও কল্যাণের প্রতি আন্তরিক সমর্থন রয়েছে। তারা কার্যকরভাবে ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়াতে চান। কিন্তু গাজায় চলমান গণহত্যা এবং পরে লেবানন ও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েলের হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের অগ্রাধিকার এক নয়।
বাস্তবতা হলো, ফিলিস্তিনকে সমর্থন করা এবং নিজেদের ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষার মধ্যে যখন বেছে নেওয়ার প্রশ্ন আসে, তখন অধিকাংশ আরব শাসকগোষ্ঠী নিজেদের টিকে থাকাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। যে অ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা মূলত এক ধরনের নব্যঔপনিবেশিক (নিও-কলোনিয়াল) সম্পর্কের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ব্যবস্থায় ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, আর আরব রাষ্ট্র ও জনগণের অধিকারকে অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ হিসেবে দেখা হয়।
বর্তমান এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের বিরোধিতা করতে চাইলে আরব দেশগুলো বিবৃতি দিতে পারে, আঞ্চলিক বৈঠক করতে পারে, বিক্ষোভ-সমাবেশ আয়োজন করতে পারে, ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা পাঠাতে পারে, ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করতে পারে, ফিলিস্তিনি কেফিয়াহ পরতে পারে, ফিলিস্তিনের পতাকা উড়াতে পারে কিংবা জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারে। কিন্তু সামরিক, অর্থনৈতিক বা অন্য কোনো কার্যকর প্রতিরোধের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বোমা হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা চরম ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়তে হয়।
আরব লীগের ভূমিকা এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। কারণ, সংস্থাটি আরব রাষ্ট্রগুলোর সরকারি অবস্থানের বাইরে যেতে পারে না। তাছাড়া আরব লীগ কার্যত সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ডাকমাশুল বা বিমানভাড়ার মতো তুলনামূলক সহজ বিষয় ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এদিকে গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংকটও আরব বিশ্বের সম্মিলিত উদ্যোগকে আরও দুর্বল করেছে। ১৯৭৯ সালের পর থেকে অধিকাংশ আরব সরকার ইরানকে একটি বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে। তাই তারা ইরানঘনিষ্ঠ অ-রাষ্ট্রীয় সংগঠন যেমন হিজবুল্লাহ, হামাস, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি) এবং অন্যান্য প্রতিরোধ গোষ্ঠীর শক্তি আরও বৃদ্ধি পাক, তা চায় না।
সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাত আরব দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল নিরাপত্তা বলয়ের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই যুদ্ধের প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আরব সরকারগুলোর নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। এর ফলে প্রকৃত নিরাপত্তা, পূর্ণ সার্বভৌমত্ব এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বে নিজেদের অবস্থান আরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার পাশাপাশি পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথ নিয়েও তাদের নতুন হিসাব-নিকাশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
(আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)
.png)

সরকারের সামনে যে বাংলাদেশ, তা জিয়াউর রহমানের সময়ের বাংলাদেশ নয়, খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময়ের বাংলাদেশও নয়। আজকের বাংলাদেশ জনসংখ্যা, অর্থনীতি, শিল্প, নগরায়ণ, প্রযুক্তি, রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের দিক থেকে অনেক বড়। একই সঙ্গে সংকটও বহুমাত্রিক।
২ ঘণ্টা আগে
একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে।
১৫ আগস্ট ২০২৬
দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। উন্নত জাতের ফসল, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই সাফল্যের পেছনের মূল কারণ।
১৩ আগস্ট ২০২৬