লেখা:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। জনগণের কাছে এবারের নির্বাচনটি কেবল একটি ভোট প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি প্রকৃত উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশের মানুষ গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছে। সেগুলোতে তারা অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। এবারের নির্বাচন একটি ভিন্ন আমেজ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করছ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও আক্রমণাত্মক মনোভাব বিরাজমান ছিল। এবার তা অনেকাংশেই অনুপস্থিত। এবার দলগুলোর মধ্যে সিরিয়াস কোনো নেতিবাচক অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। প্রতিটি দলই তাদের নিজস্ব অবস্থান, দলীয় নীতি, আদর্শ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ব্যক্তিগত রেষারেষির বদলে পলিসি বা নীতি নিয়ে কথা বলার এই যে প্রবণতা, তা একটি গঠনমূলক প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি শুভলক্ষণ।
নির্বাচনের দিন অর্থাৎ আগামী ১২ তারিখ পর্যন্ত এই পরিবেশ বজায় থাকবে বলে আশা করা যায়। দেশের সকল নাগরিক—তা সে যে মত বা পথের অনুসারীই হোক না কেন—যেন নির্বিঘ্নে, নিরাপদে এবং কোনো প্রকার ভীতি ও চাপ ছাড়াই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেটিই এখনকার মূল দাবি। অতীতের ভয়ের সংস্কৃতি কাটিয়ে মানুষ যেন নিজের পছন্দমতো প্রতিনিধি বেছে নিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের অন্যতম প্রধান ও পুরোনো রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ বা নৈতিক অবস্থানও বর্তমানে নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সরকার তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ১৯৯৬ সাল বা তার পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় থাকা এই বড় রাজনৈতিক দলটি এবার নির্বাচনী মাঠে নেই, যা এবারের নির্বাচনের সমীকরণকে নতুন রূপ দিয়েছে।
তবে একটি বড় দল মাঠে নেই বলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হচ্ছে—এমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই। যারা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে, তারা সবাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশীদার। এই রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ এবং কর্মসূচির মধ্যে বেশ মিল থাকলেও ভোটের মাঠে তারা কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট এবং বিএনপির মধ্যে একটি তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি দলই এই নির্বাচনকে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা প্রমাণের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা জনগণের দ্বারে দ্বারে গেছে, ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছে এবং নিজেদের নীতি ও আদর্শ তুলে ধরেছে।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনে নেই, তাহলে কি এই নির্বাচন ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে? এর উত্তর বলতে হবে, অবশ্যই এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। কোনো বিশেষ দল থাকা না থাকার চেয়ে বড় বিষয় হলো জনগণের অংশগ্রহণ। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে দেশের আপামর জনগণ যেভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করছে, তা প্রমাণ করে যে তারা এই নির্বাচনের সঙ্গে একাত্ম। শান্তিপূর্ণ ও ভীতিহীন পরিবেশই প্রমাণ করে যে, জনগণ এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে।
এত সব ইতিবাচক দিকের পরেও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বড় সংকট হলো—দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব। বর্তমান নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মূল আদর্শ ও কর্মসূচি কাছাকাছি। তারা একই আন্দোলনের ফসল। তবুও তাদের মধ্যে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা প্রবল। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার, গত ১৬ বছরের গুম-খুনের বিচার এবং প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্কের ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ও সন্দেহ রয়েছে। তারা মনে করছে, ‘অমুক দল ক্ষমতায় আসলে বিচার হবে না’ বা ‘তমুক দল আসলে দেশের স্বার্থ রক্ষা হবে না’। বর্তমানের এই নির্বাচনী পরিবেশ যদি অব্যাহত থাকে, তবে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি এবং তৎপরতা এবার চোখে পড়ার মতো। নির্বাচনের আগে আমাদের অনেকের মনেই আশঙ্কা ছিল যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়তো অতীতে বা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেভাবে নিষ্ক্রিয় বা ঢিলেঢালা ভূমিকা পালন করেছিল, নির্বাচনেও তেমনটি করবে। কিন্তু সেই আশঙ্কা এখন আর নেই। তারা নিরাপত্তার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে।
তবে এত প্রস্তুতির মধ্যেও নির্বাচন কমিশনের একটি জায়গায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। সেটি হলো গণভোটের বিষয়বস্তু। নির্বাচনের পাশাপাশি যে গণভোট হবে, সে সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে যথেষ্ট সচেতন করা হয়নি। গণভোটের বিষয়বস্তু কী, সংস্কারের বিধানগুলোতে কী আছে—এগুলো জনগণের কাছে আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল। যদি জনগণকে এ বিষয়ে আরও বেশি অবহিত করা যেত, তবে তারা বুঝে-শুনে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে পারতেন। এই সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও জোরালো ও দৃশ্যমান হওয়া উচিত ছিল।
নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের কিছু অভিযোগ বিভিন্ন জায়গা থেকে শোনা গেছে, যা নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুব অস্বাভাবিক নয়। প্রতিপক্ষ দলগুলো অনেক সময় নির্বাচন কমিশনকে চাপে রাখার জন্যও এমন অভিযোগ করে থাকে। তবে বড় ধরনের কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা অহরহ ঘটছে না। নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন এবং তারা এবার একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। নির্বাচনের দিন এবং আগের দিনের জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে তারা একটি ‘ভিজিলেন্স টিম’ গঠন করেছে। এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কোথাও আচরণবিধি লঙ্ঘন বা সহিংসতা হলে এই টিম ভোট বন্ধ করে দেওয়া বা তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় রক্ষাকবচ।
অন্যদিকে, আমাদের দেশে নির্বাচনের আগে টাকা দিয়ে ভোট কেনার একটি অসুস্থ ও অনৈতিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কালো টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার এই সংস্কৃতি রোধ করার জন্য নির্বাচন কমিশন এবং সরকার এবার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যক্তিগত টাকা লেনদেনের ব্যাংকিং চ্যানেল এবং মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেম (যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট) সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের সাময়িক অসুবিধা হলেও কমিশন বাধ্য হয়েই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে কালো টাকার ব্যবহার এবং ভোট কেনাবেচা বন্ধ করা যায়। এই পদক্ষেপটি কতটুকু সফল হলো, তা আমরা নির্বাচনের দিন মাঠ পর্যায়ের চিত্র দেখলেই বুঝতে পারব।
আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বহু বিদেশি পর্যবেক্ষক ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে এসেছেন। পশ্চিমা দেশগুলো এবং গবেষকরা বারবার বলতেন যে বাংলাদেশে এক ধরনের নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র চলছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি গত দেড় দশকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক বিশ্ব দেখছে বাংলাদেশে গণতন্ত্রে ফেরার একটি সুযোগ হিসেবে। তারা এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের উপস্থিতির মূল বার্তা হলো—তারা চায় বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হোক।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তা অভূতপূর্ব। সর্বস্তরের জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ব্যাকুল। যে যেখানেই থাকুক না কেন, সবাই চেষ্টা করছে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট দেওয়ার। এই উৎসাহ, এই উদ্দীপনা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ—সব মিলিয়ে আশা করা যায়, এবারের নির্বাচনটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম উৎসবমুখর এবং সুষ্ঠু নির্বাচন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। জনগণের কাছে এবারের নির্বাচনটি কেবল একটি ভোট প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি প্রকৃত উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশের মানুষ গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছে। সেগুলোতে তারা অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। এবারের নির্বাচন একটি ভিন্ন আমেজ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করছ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও আক্রমণাত্মক মনোভাব বিরাজমান ছিল। এবার তা অনেকাংশেই অনুপস্থিত। এবার দলগুলোর মধ্যে সিরিয়াস কোনো নেতিবাচক অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। প্রতিটি দলই তাদের নিজস্ব অবস্থান, দলীয় নীতি, আদর্শ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ব্যক্তিগত রেষারেষির বদলে পলিসি বা নীতি নিয়ে কথা বলার এই যে প্রবণতা, তা একটি গঠনমূলক প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি শুভলক্ষণ।
নির্বাচনের দিন অর্থাৎ আগামী ১২ তারিখ পর্যন্ত এই পরিবেশ বজায় থাকবে বলে আশা করা যায়। দেশের সকল নাগরিক—তা সে যে মত বা পথের অনুসারীই হোক না কেন—যেন নির্বিঘ্নে, নিরাপদে এবং কোনো প্রকার ভীতি ও চাপ ছাড়াই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেটিই এখনকার মূল দাবি। অতীতের ভয়ের সংস্কৃতি কাটিয়ে মানুষ যেন নিজের পছন্দমতো প্রতিনিধি বেছে নিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের অন্যতম প্রধান ও পুরোনো রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ বা নৈতিক অবস্থানও বর্তমানে নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সরকার তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ১৯৯৬ সাল বা তার পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় থাকা এই বড় রাজনৈতিক দলটি এবার নির্বাচনী মাঠে নেই, যা এবারের নির্বাচনের সমীকরণকে নতুন রূপ দিয়েছে।
তবে একটি বড় দল মাঠে নেই বলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হচ্ছে—এমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই। যারা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে, তারা সবাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশীদার। এই রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ এবং কর্মসূচির মধ্যে বেশ মিল থাকলেও ভোটের মাঠে তারা কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট এবং বিএনপির মধ্যে একটি তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি দলই এই নির্বাচনকে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা প্রমাণের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা জনগণের দ্বারে দ্বারে গেছে, ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছে এবং নিজেদের নীতি ও আদর্শ তুলে ধরেছে।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনে নেই, তাহলে কি এই নির্বাচন ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে? এর উত্তর বলতে হবে, অবশ্যই এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। কোনো বিশেষ দল থাকা না থাকার চেয়ে বড় বিষয় হলো জনগণের অংশগ্রহণ। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে দেশের আপামর জনগণ যেভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করছে, তা প্রমাণ করে যে তারা এই নির্বাচনের সঙ্গে একাত্ম। শান্তিপূর্ণ ও ভীতিহীন পরিবেশই প্রমাণ করে যে, জনগণ এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে।
এত সব ইতিবাচক দিকের পরেও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বড় সংকট হলো—দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব। বর্তমান নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মূল আদর্শ ও কর্মসূচি কাছাকাছি। তারা একই আন্দোলনের ফসল। তবুও তাদের মধ্যে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা প্রবল। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার, গত ১৬ বছরের গুম-খুনের বিচার এবং প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্কের ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ও সন্দেহ রয়েছে। তারা মনে করছে, ‘অমুক দল ক্ষমতায় আসলে বিচার হবে না’ বা ‘তমুক দল আসলে দেশের স্বার্থ রক্ষা হবে না’। বর্তমানের এই নির্বাচনী পরিবেশ যদি অব্যাহত থাকে, তবে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি এবং তৎপরতা এবার চোখে পড়ার মতো। নির্বাচনের আগে আমাদের অনেকের মনেই আশঙ্কা ছিল যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়তো অতীতে বা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেভাবে নিষ্ক্রিয় বা ঢিলেঢালা ভূমিকা পালন করেছিল, নির্বাচনেও তেমনটি করবে। কিন্তু সেই আশঙ্কা এখন আর নেই। তারা নিরাপত্তার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে।
তবে এত প্রস্তুতির মধ্যেও নির্বাচন কমিশনের একটি জায়গায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। সেটি হলো গণভোটের বিষয়বস্তু। নির্বাচনের পাশাপাশি যে গণভোট হবে, সে সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে যথেষ্ট সচেতন করা হয়নি। গণভোটের বিষয়বস্তু কী, সংস্কারের বিধানগুলোতে কী আছে—এগুলো জনগণের কাছে আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল। যদি জনগণকে এ বিষয়ে আরও বেশি অবহিত করা যেত, তবে তারা বুঝে-শুনে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে পারতেন। এই সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও জোরালো ও দৃশ্যমান হওয়া উচিত ছিল।
নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের কিছু অভিযোগ বিভিন্ন জায়গা থেকে শোনা গেছে, যা নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুব অস্বাভাবিক নয়। প্রতিপক্ষ দলগুলো অনেক সময় নির্বাচন কমিশনকে চাপে রাখার জন্যও এমন অভিযোগ করে থাকে। তবে বড় ধরনের কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা অহরহ ঘটছে না। নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন এবং তারা এবার একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। নির্বাচনের দিন এবং আগের দিনের জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে তারা একটি ‘ভিজিলেন্স টিম’ গঠন করেছে। এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কোথাও আচরণবিধি লঙ্ঘন বা সহিংসতা হলে এই টিম ভোট বন্ধ করে দেওয়া বা তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় রক্ষাকবচ।
অন্যদিকে, আমাদের দেশে নির্বাচনের আগে টাকা দিয়ে ভোট কেনার একটি অসুস্থ ও অনৈতিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কালো টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার এই সংস্কৃতি রোধ করার জন্য নির্বাচন কমিশন এবং সরকার এবার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যক্তিগত টাকা লেনদেনের ব্যাংকিং চ্যানেল এবং মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেম (যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট) সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের সাময়িক অসুবিধা হলেও কমিশন বাধ্য হয়েই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে কালো টাকার ব্যবহার এবং ভোট কেনাবেচা বন্ধ করা যায়। এই পদক্ষেপটি কতটুকু সফল হলো, তা আমরা নির্বাচনের দিন মাঠ পর্যায়ের চিত্র দেখলেই বুঝতে পারব।
আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বহু বিদেশি পর্যবেক্ষক ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে এসেছেন। পশ্চিমা দেশগুলো এবং গবেষকরা বারবার বলতেন যে বাংলাদেশে এক ধরনের নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র চলছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি গত দেড় দশকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক বিশ্ব দেখছে বাংলাদেশে গণতন্ত্রে ফেরার একটি সুযোগ হিসেবে। তারা এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের উপস্থিতির মূল বার্তা হলো—তারা চায় বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হোক।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তা অভূতপূর্ব। সর্বস্তরের জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ব্যাকুল। যে যেখানেই থাকুক না কেন, সবাই চেষ্টা করছে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট দেওয়ার। এই উৎসাহ, এই উদ্দীপনা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ—সব মিলিয়ে আশা করা যায়, এবারের নির্বাচনটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম উৎসবমুখর এবং সুষ্ঠু নির্বাচন।

নরেন্দ্র মোদি যখন পাহাড়ে ধ্যান করছিলেন, এস জয়শঙ্কর তখন স্কুলে পড়ছিলেন, আর বাংলাদেশ তখন স্বাধীন দেশ হিসেবে জন্ম নিচ্ছিল। আমি সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। ১৯৭১ সালের সেই দিনটিতে যখন জেনারেল অরোরা ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণের দলিলে সই করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাকে একটি উচ্চপর্যায়ের
২ ঘণ্টা আগে
১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। এটি কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বা ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।
৪ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের কত শতাংশ মানুষ রাজনৈতিক সচেতনা থেকে ভোট দেন—সেটি গবেষণার বিষয়। গবেষণায়ও সঠিক চিত্র উঠে আসবে কি না সন্দেহ আছে। এই বিষয়ে জরিপ চালালে সবাই ঠিক উত্তর নাও দিতে পারেন। বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ কয়েকটি বিবেচনা কাজ করে। সেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা অনেক সময়ই গৌন হয়ে যায়।
১ দিন আগে
যে নারীরা রাজনৈতিক মিছিলে সংখ্যা বাড়াতে পারেন এবং অর্থনীতি সচল রাখতে পারেন, তারা কেন সংসদে আইন প্রণয়ন করতে পারবেন না? ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য শুধু ‘সংরক্ষিত আসনের’ খাঁচায় বন্দি না রেখে, সরাসরি নির্বাচনের ময়দানে যোগ্য নারীদের জায়গা করে দিতে হবে।
১ দিন আগে