জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

অর্ধেক নারী ভোটারের দেশে ৪% নারী প্রার্থী: এই গণতন্ত্র কি টেকসই হবে

ইখতিয়ার মাহমুদ
ইখতিয়ার মাহমুদ

ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে এক চরম ও অস্বস্তিকর বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে। একদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা একটি নতুন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সংস্কারমুখী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, অন্যদিকে দেশের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপ—সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ নেমে এসেছে হতাশাজনক পর্যায়ে। ২০২৪-এর সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে টিয়ারশেল আর বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে যাঁরা সম্মুখসারিতে থেকে নতুন দিনের পথ দেখিয়েছিলেন, আজ ২০২৬-এর নির্বাচনী ময়দানে সেই নারীদের অনুপস্থিতি আমাদের এক রূঢ় ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ৩০টি দলই কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। যেখানে দেশের মোট ভোটারের অর্ধেকই নারী, সেখানে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪ শতাংশের ঘরে থাকা কি আমাদের সংস্কারমুখী গণতন্ত্রের লক্ষণের সাথে সাংঘর্ষিক নয়? এই সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিতি কিংবা প্রক্রিয়াগতভাবে দূরে রাখা কি গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে না?

বিবিসি বাংলা এবং ডয়চে ভেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনেও নারী প্রার্থীর হার ছিল ৫.১৫ শতাংশ, যা এবার কমে ৪.২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দুই বড় দলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী’র জোটগত নারীপ্রার্থী থাকলেও নিজ দলে নেই একক কোনো নারী প্রার্থী। বড় দল হিসেবে বিএনপি ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিলেও তা তাদের মোট মনোনয়নের মাত্র ৩.৪ শতাংশ। অথচ ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকার ছিল। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান।

এবারের নির্বাচনে যে কয়েকজন নারী প্রার্থী লড়াই করছেন, তাদের ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর) এবং ৬৭ শতাংশই কর্মজীবী। চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা—মেধা ও যোগ্যতায় তারা অনন্য। ঢাকা-২০ আসনের নাবিলা তাসনিদ বা বরিশাল-৫ আসনের মনীষা চক্রবর্ত্তীর মতো প্রার্থীরা প্রমাণ করেছেন যে, ভোটাররা নারী প্রার্থীদের প্রতি ইতিবাচক এবং আগ্রহী। তবুও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নারীরা কেন এখনো ‘জয়ের জন্য অনিরাপদ’ বা ‘জেতার অনুপযুক্ত’ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন?

এবারের নির্বাচনে যেসব নারী প্রার্থী নমিনেশন পেয়েছেন তাদের এক-তৃতীয়াংশই এসেছেন পারিবারিক সূত্রে। অর্থাৎ, মাঠের ত্যাগী ও যোগ্য নারী কর্মীর চেয়ে দলগুলো এখনো প্রভাবশালী পুরুষ নেতার স্ত্রী, কন্যা বা বোনদের ওপরই বেশি ভরসা করছে। এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চরম পুরুষতান্ত্রিক বহিঃপ্রকাশ। দলগুলো মনে করছে সহিংস রাজনীতি, পেশিশক্তি ও নির্বাচনী ব্যয়ের চাপ সামলানোর ক্ষমতা কেবল পুরুষেরই আছে। কিন্তু অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে একটি রাষ্ট্র কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে!

নির্বাচনী হলফনামা বিশ্লেষণ বলছে, দলীয়ভাবে অংশ গ্রহণেচ্ছু নারী প্রার্থীরা উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী। যাদের অধিকাংশ চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক থেকে শুরু করে সফল উদ্যোক্তা। যারা সফলভাবে পেশাদার জীবন সামলাচ্ছেন, দলগুলো তাদের কেন ‘উইনেবল’ বা জেতার উপযুক্ত মনে করছে না? এটি কি সক্ষমতার অভাব, নাকি সুযোগের অভাব?

মূলত দলগুলো এখনো নারীদের সক্ষমতাকে আনইউনেভবল ভয় পায় না, বরং তারা তাদের দীর্ঘদিনের ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ এবং পুরুষতান্ত্রিক সিন্ডিকেট ভাঙতে চায় না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক আলোচনায় উঠে এসেছে যে, সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন পেতেও কখনো কখনো কয়েক কোটি টাকার লেনদেন ঘটে, যা রাজনীতিতে ত্যাগী নারীদের পথ রুদ্ধ করে দেয়।

যে নারীরা রাজনৈতিক মিছিলে সংখ্যা বাড়াতে পারেন এবং অর্থনীতি সচল রাখতে পারেন, তারা কেন সংসদে আইন প্রণয়ন করতে পারবেন না? ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য শুধু ‘সংরক্ষিত আসনের’ খাঁচায় বন্দি না রেখে, সরাসরি নির্বাচনের ময়দানে যোগ্য নারীদের জায়গা করে দিতে হবে।

বিশ্বের সফল দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা এক ভিন্ন চিত্র দেখি। রুয়ান্ডা আজ বিশ্বের কাছে নারী নেতৃত্বের মডেল; সেখানে পার্লামেন্টের ৬১ শতাংশ আসন নারীর দখলে। প্রতিবেশী ভারতে স্থানীয় সরকারে নারীদের শক্তিশালী ভূমিকার ফলে দেখা গেছে, নারী শাসিত এলাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন পুরুষশাসিত এলাকার চেয়ে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। অথচ বাংলাদেশে যারা পোশাক শিল্প (৮০% নারী) এবং স্বাস্থ্য খাতের (৭০% নারী) মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, নীতিনির্ধারণী টেবিলে তাদের কণ্ঠস্বর আজ ৪ শতাংশের শিকলে বন্দি।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভৌগোলিক বিপর্যয়ের প্রভাবে নারীরাই সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। যখন নীতিনির্ধারণী টেবিলে নারীদের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে আসে, তখন নারী ও শিশু সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুরুত্ব হারায়। বিশ্বজুড়ে এটি আজ প্রমাণিত যে, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়লে জিডিপি বৃদ্ধি পায়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, নারী নেতৃত্ব বাড়লে সামাজিক সুরক্ষা এবং শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পায়, যা টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

২০৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কোটা বা আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলে এই লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ত্যাগ করে নারী নেতৃত্বকে ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে নয়, বরং ‘অধিকার’ হিসেবে দেখতে হবে।

যে নারীরা রাজনৈতিক মিছিলে সংখ্যা বাড়াতে পারেন এবং অর্থনীতি সচল রাখতে পারেন, তারা কেন সংসদে আইন প্রণয়ন করতে পারবেন না? ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য শুধু ‘সংরক্ষিত আসনের’ খাঁচায় বন্দি না রেখে, সরাসরি নির্বাচনের ময়দানে যোগ্য নারীদের জায়গা করে দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট তখনই সার্থক হবে, যখন ব্যালট পেপার আর সংসদেও নারীর সমমর্যাদা নিশ্চিত হবে। অর্ধেক জনসংখ্যাকে নীতিনির্ধারণী কক্ষের বাইরে রেখে কোনো রাষ্ট্রই ‘টেকসই গণতন্ত্রের’ মুখ দেখতে পারে না।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ad 300x250

সম্পর্কিত