জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মোদি-জয়শঙ্কর জুটি ও এক ‘বন্ধু দেশ’ হারানোর গল্প

লেখা:
লেখা:
মণি শঙ্কর আইয়ার

ছবি: সংগৃহীত

নরেন্দ্র মোদি যখন পাহাড়ে ধ্যান করছিলেন, এস জয়শঙ্কর তখন স্কুলে পড়ছিলেন, আর বাংলাদেশ তখন স্বাধীন দেশ হিসেবে জন্ম নিচ্ছিল। আমি সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। ১৯৭১ সালের সেই দিনটিতে যখন জেনারেল অরোরা ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণের দলিলে সই করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির সচিব নিযুক্ত করা হয়।

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সুখময় চক্রবর্তী এবং অশোক মিত্রের (যিনি পরে জ্যোতি বসুর অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন) নেতৃত্বে গঠিত সেই কমিটির কাজ ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ত্রাণ পাঠানো এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া ১ কোটি শরণার্থীকে সসম্মানে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা।

এক দুর্দান্ত প্রতিনিধি দল

সেই মিশনে ছিলেন ভারতের ইতিহাসের সবচাইতে মেধাবী কিছু কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ছিলেন ভবিষ্যতের পররাষ্ট্র সচিব ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মণি দীক্ষিত, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ চন্দ্রশেখর দাশগুপ্ত, পাকিস্তান বিশেষজ্ঞ সতিন্দর লাম্বাহ, পারমাণবিক নীতি বিশেষজ্ঞ অরুন্ধতী ঘোষ এবং ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অর্জুন সেনগুপ্ত। আজ তারা কেউ বেঁচে নেই, কেবল আমিই রয়েছি সেই স্মৃতির ছায়া হয়ে।

১৯৭২ সালে আমার কাজ আমাকে বারবার বাংলাদেশে নিয়ে গেছে। যেদিকেই গিয়েছি, দেখেছি ভারতের প্রতি অকুন্ঠ ভালোবাসা।

বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা

নিউ ইয়র্ক টাইমসের সিডনি শ্যানবার্গ আমাকে একটি কথা শিখিয়েছিলেন যা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা সবাই এই দাবি করে ভুল করছ যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। এর মাধ্যমে তোমরা মুক্তিযোদ্ধাদের (মুক্তি বাহিনী) অবদানকে ছোট করছ। এর মাশুল তোমাদের দিতে হবে।’

আমি সবসময় এই বিষয়টি মাথায় রাখতাম যাতে বাংলাদেশিদের আত্মমর্যাদায় আঘাত না লাগে। অথচ আজ মোদি-জয়শঙ্কর জুটি সেই বন্ধু দেশটিকে পাকিস্তানের মতো এক শত্রুতে পরিণত করেছেন। বর্তমান ভারত সরকারের মনোযোগ এখন কেবল বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর, অথচ তারা ভারতের অভ্যন্তরে মুসলিম বা খ্রিস্টানদের ওপর চলা হিন্দুত্ববাদী নির্যাতনের বেলায় চোখ বন্ধ করে থাকে।

‘বড় ভাই’ সুলভ আচরণ

কীভাবে এমনটা ঘটলো? একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে করদ রাজ্যের মতো বিবেচনা করা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘বড় ভাই’ সেজে হস্তক্ষেপ করার ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মোদি সরকার যেভাবে শেখ হাসিনাকে একতরফা সমর্থন দিয়ে গেছে, তাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। তারা মনে করে, হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার পেছনে ভারতের ‘বিদেশি হাত’ কাজ করেছে, যা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে।

ফলস্বরূপ, হাসিনার প্রতি যে ক্ষোভ ছিল, তা এখন ভারতের দিকে ঘুরে গেছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, যে জামায়াতে ইসলামীকে মানুষ একসময় প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা এখন ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখছে। মোদি সরকার যদি হাসিনাকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে উৎসাহিত করত, তবে ১৯৭১ সালের সেই সুসম্পর্ক আজও বজায় থাকত।

সুসম্পর্ক নষ্টের খতিয়ান

শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া আমাদের দায়িত্ব হতে পারে, কিন্তু সাধারণ বাংলাদেশিদের দূরে ঠেলে দেওয়া হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এক মস্ত ভুল। বর্তমানে ভারতের নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশ এখন তার পুরনো শোষক পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে। এতে ভারতের কী লাভ হলো?

অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা ছিল আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। কিন্তু মোদি-জয়শঙ্কর জুটি ট্রাম্পের মতো ‘লেনদেনের কূটনীতি’ শুরু করেছেন। অথচ সেই সামর্থ্য ভারতের নেই। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত আজ এক কোণঠাসা শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

  • মণি শঙ্কর আইয়ার: ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফ্রন্টলাইন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সার্জিল

Ad 300x250

সম্পর্কিত