২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটে শিক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ দেশের শিক্ষাখাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলামের মতে, শুধু অঙ্কের হিসাবে বরাদ্দ বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষার কাঠামোগত ও গুণগত সংস্কার। মেগা-প্রকল্প ও দালান নির্মাণের বদলে মৌলিক গবেষণায় সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং শিক্ষাঙ্গণকে দলীয় রাজনীতিমুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন লেখক। একটি বৈষম্যহীন, জ্ঞানভিত্তিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষাবাজেটের শতভাগ স্বচ্ছ ব্যবহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে শিল্পের সমন্বয়ের যে কৌশলগত রূপরেখা প্রয়োজন, তা-ই এই প্রবন্ধের মূল উপজীব্য। লেখাটির প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো-
ড. তোফাজ্জল ইসলাম

২০২৪ সালের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পার করেছি আমরা। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে এক নতুন যাত্রা শুরু করেছে। দেশের মানুষের পাহাড়সম প্রত্যাশা কাঁধে নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি জোট। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাম্যের এক যুগান্তকারী দর্শন সামনে এনেছেন। তাঁর একটি সাহসী ও যুগোপযোগী ঘোষণা নাগরিকদের মনে এক নতুন আশা জাগিয়েছে। তিনি বলেছেন—‘আপনি বিএনপিকে ভোট দিন, আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিন, অথবা ভোট দেওয়াই থেকে বিরত থাকুন—নাগরিক হিসেবে আপনার অধিকার সবার সমান।’ এর মধ্য দিয়ে একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে মানুষ।
এই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রদর্শনের মূল লক্ষ্য হলো একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। আর এর চালিকাশক্তি হবে দক্ষ জনসম্পদ। এমন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই জাতীয় সংসদে নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট (২০২৬-২৭ অর্থবছর) পেশ করা হয়েছে। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার কাছে এই বাজেটের সবচেয়ে প্রশংসিত দিকটি হলো শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি। নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ইশতেহারে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এবারের বাজেটে তা ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। গত অর্থবছরের আটকে থাকা মাত্র ১ দশমিক ৩৯ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে শিক্ষায় প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার এই বরাদ্দ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তবে একজন শিক্ষাবিদ ও গবেষক হিসেবে আমি মনে করি, এই বৃদ্ধিকে শুধু একটি ‘সুন্দর টাকার অঙ্ক’ বা স্লোগান হিসেবে দেখলে তা মারাত্মক ভুল হবে। মূল প্রশ্ন হলো, এই বরাদ্দ কি শুধু কিছু খাতের রদবদল, নাকি এটি শিক্ষাখাতে একটি গুণগত ও কাঠামোগত সংস্কারের চাবিকাঠি? আমলাতান্ত্রিক অপচয় ও দুর্নীতি এড়িয়ে এই ২ শতাংশ বরাদ্দ কীভাবে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজে লাগানো যায়, তার একটি সঠিক রূপরেখা আজ সময়ের দাবি। একইসঙ্গে একে ধাপে ধাপে ইশতেহারের ৫ শতাংশে কীভাবে নেওয়া হবে, তার পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
গত বছরের ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে শিক্ষাবাজেট ২ শতাংশে উন্নীত হওয়াকে প্রথম দেখায় একটি বৈপ্লবিক লাফ মনে হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বৈশ্বিক সূচকের দিকে তাকালে এই উজ্জ্বল অঙ্কের পেছনের রূঢ় বাস্তবতা ধরা পড়ে। ইউনেস্কোর দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় বলা আছে, একটি জাতির টেকসই ও গুণগত উন্নয়নের জন্য জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বা জাতীয় বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া উচিত। অথচ চরম বাস্তবতা হলো, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের শিক্ষাবাজেট জিডিপির ১ দশমিক ৩ থেকে ১দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যেই আটকে ছিল। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সর্বনিম্ন বরাদ্দ। এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা সবসময় পিছিয়ে পড়েছে।
জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া এশিয়ার অন্যান্য উদীয়মান শক্তিগুলোর দিকে তাকালে আমাদের এই পিছিয়ে পড়ার কষ্ট আরও প্রকট হয়। এটি শুধু কিছু নীরস পরিসংখ্যানের খেলা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার গল্প। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে দক্ষিণ কোরিয়ার আধিপত্যের পেছনের রহস্য লুকিয়ে আছে তাদের বাজেটে। তারা শুধু গবেষণা ও উন্নয়নের জন্যই মোট জিডিপির প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ খরচ করে। অন্যদিকে, এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক পরাশক্তি চীন প্রতি বছর উচ্চপর্যায়ের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জিডিপির ২ দশমিক ৪ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত শিক্ষায় জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ খরচ করে আসছে। তাদের নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির অধীনে এই বরাদ্দ ৬ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষণাকে ত্বরান্বিত করতে ভারত কোটি কোটি ডলারের নতুন তহবিল দিয়ে 'ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন' গঠন করেছে। এমনকি নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীরাও ঐতিহাসিকভাবে তাদের জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ শিক্ষার জন্য সংরক্ষিত রাখে। এই আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশকে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকেই আমাদের নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের ২ শতাংশ বরাদ্দকে মূল্যায়ন করতে হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রগতিশীল ও প্রশংসনীয় শুরু, যা দীর্ঘদিনের স্থবিরতাকে ভেঙেছে। তবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সাইবার-ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এবং এশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক স্রোতে সম্মানজনকভাবে যুক্ত হতে হলে, আমাদের এই গতিতে আত্মতুষ্ট হলে চলবে না। ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই বরাদ্দকে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার জন্য আমাদের দ্রুত একটি কৌশলগত রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। তবে এখানে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আমাদের সম্পদ হয়তো সীমিত, কিন্তু আমাদের সদিচ্ছা যদি অসীম হয়, তবে এই ২ শতাংশ বরাদ্দের শতভাগ সঠিক, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহার শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনে একটি শক্ত ভিত্তি গড়তে পারে।
বর্তমান বাজেটের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত ত্রুটি হলো, শিক্ষায় সামগ্রিক বরাদ্দ বাড়লেও 'গবেষণা ও উদ্ভাবন' খাতের জন্য অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় সুনির্দিষ্ট কোনো আর্থিক রূপরেখা ছিল না। মৌলিক গবেষণা ছাড়া 'জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি' কেবল কথার কথা হয়েই থাকে। তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ১৭৮তম পূর্ণাঙ্গ কমিশন সভায় উচ্চশিক্ষার এই আর্থিক কাঠামোর কিছুটা চিত্র পরিষ্কার হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ইউজিসি দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কমিশনের নিজস্ব ব্যয়ের জন্য মোট ১২ হাজার ৩০০ কোটি ৪ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ১২ হাজার ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং ইউজিসির জন্য ২৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও বিদেশি বৃত্তির জন্য এবার মোট ২৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা গত অর্থবছরের মূল বরাদ্দের (২২৯ কোটি) চেয়ে মাত্র ৯ কোটি টাকা বেশি। শিক্ষাবাজেট জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার প্রেক্ষাপটে, গবেষণায় এই সামান্য বৃদ্ধি চরম হতাশাজনক। ৫৮টি প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিশাল শিক্ষক ও গবেষকদের কাছ থেকে এই সামান্য ৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা আশা করা সম্পূর্ণ অবাস্তব।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা বলে, উন্নয়ন ব্যয়ের সিংহভাগই চলে যায় ইট-পাথরের মেগা-প্রকল্পে বড় বড় দালানকোঠা বানাতে। ঠিকাদার সিন্ডিকেট আর আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির কারণে ভবন নির্মাণের প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হয়। কিন্তু সেই চার দেয়ালের ভেতরের শিক্ষার আসল পরিবেশ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও গবেষণার যন্ত্রপাতি সবসময় অন্ধকারেই রয়ে যায়। নতুন বাজেটের এই ২ শতাংশ বরাদ্দের বড় অংশ যদি আবারও সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি কেনা আর ইটের দেয়াল তোলায় অপচয় হয়, তবে উচ্চশিক্ষার এই গভীর দৈন্যদশা কখনোই কাটবে না।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ বর্তমানে গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশের কাছাকাছি খরচ করে। এটি শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্নই নয়, এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অনুন্নত আফ্রিকান দেশ উগান্ডার বরাদ্দের সমান! এই শোচনীয় অবস্থায় গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট কোনো আর্থিক কাঠামো বা 'থোক বরাদ্দ' না রাখা মানে উচ্চশিক্ষার ভাগ্যকে আবারও আমলাদের দয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া। তাই নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমার জোর দাবি: এই ২ শতাংশ শিক্ষাবাজেটের অন্তত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা ১ শতাংশ শুধু মৌলিক ও ফলিত গবেষণার জন্য আইনিভাবে নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। কেবল তখনই আমাদের প্রচলিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুখস্থবিদ্যার খোলস ছেড়ে প্রকৃত 'রিসার্চ ইউনিভার্সিটি' হয়ে ওঠার সক্ষমতা পাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উন্নত গবেষণা ও উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করতে সরকারকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় গবেষণার যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সামগ্রী ও রিএজেন্ট আমদানিতে শুল্ক ও কর পুরোপুরি বাতিল করতে হবে। শীর্ষ গবেষকদের পুরস্কৃত করতে আলাদা তহবিলের ব্যবস্থা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা ও পেটেন্ট ফাইলিংয়ের খরচ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হবে। গবেষকরা যাতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্ত থাকতে পারেন, সেজন্য বছরে অন্তত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের ব্যয় সরকারকে বহন করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো 'ব্রেইন গেইন' বা মেধার সঞ্চালন (সরকার যাকে 'ব্রেইন সার্কুলেশন' বলছে)। উন্নত বিশ্বে কর্মরত অত্যন্ত দক্ষ প্রবাসী শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের দেশে যুক্ত করতে অ্যাডজাংক্ট বা ভিজিটিং প্রফেসরশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। এছাড়াও, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ কাজের দরজা খোলা রাখতে হবে।
সিঙ্গাপুরের বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মূল মন্ত্র ছিল 'মেরিটোক্রেসি' বা মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন। এর সাথে ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি। আমাদের ২০২৪ সালের রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মূল দাবিও ছিল একটি মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে বৈষম্যহীনতা ও মেধার এই দুই জাতীয় মন্ত্রকে রাষ্ট্রের শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা, কোটা বা বিশেষ সুবিধার আড়ালে এতকাল যে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক তোষামোদ চলে আসছে, তা স্থায়ীভাবে নির্মূল করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চপর্যায়ের সব নিয়োগ শতভাগ স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করতে পারলেই বাংলাদেশ একটি সত্যিকারের মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষক ও গবেষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতির একমাত্র মাপকাঠি হতে হবে আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে মানসম্পন্ন গবেষণা প্রকাশনা, এইচ-ইনডেক্স এবং সাইটেশন। রাজনৈতিক বিবেচনাকে এখানে পুরোপুরি বাতিল করতে হবে।
আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে আমাদের দেশের মেধাবীরা এখন শিক্ষকতায় আসতে চান না। সেরা মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের জন্য একটি 'স্বতন্ত্র বেতন স্কেল' চালু করা এখন সময়ের দাবি। একজন দক্ষ ও সৎ শিক্ষকের পেছনে বিনিয়োগ করা মানে হাজার হাজার দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রধান হাতিয়ার। সরকার যদি নিয়োগপ্রক্রিয়া থেকে দুর্নীতি ও দলীয় তোষামোদ পুরোপুরি দূর করতে পারে, তবেই শিক্ষাবাজেটের আসল সুফল মিলবে। আমরা যদি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকারের যোগ্য, সৎ ও দক্ষ বিশ্ব নাগরিক তৈরির সূতিকাগার বানাতে চাই, তবে ক্যাম্পাসগুলোকে অবশ্যই বিষাক্ত দলীয় ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির কবল থেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে হবে।
গত দেড়-দুই দশকে আমরা দেখেছি কীভাবে দলীয় রাজনীতির আধিপত্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষার পরিবেশ ও একাডেমিক মর্যাদাকে ধ্বংস করেছে। নতুন বাংলাদেশে মেধা, মুক্তচিন্তা এবং ছাত্রবান্ধব পরিবেশ বিকাশের জন্য ক্যাম্পাসগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে প্রকৃত জ্ঞানচর্চার তীর্থস্থান হিসেবে নতুন করে গড়তে হবে। শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রধান মনোযোগ ও সাধনা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান সৃষ্টি, কৃষি ও শিল্পখাতের জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণে অবদান রাখা। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পেশিশক্তি বা সুবিধাভোগী হিসেবে কাজ করা নয়। শুধু স্লোগান দিয়ে শিক্ষার পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়; গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা—মেধার মূল্যায়ন ও বৈষম্যহীনতা রক্ষার মাধ্যমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞান সৃষ্টি, চর্চা ও প্রসারের প্রকৃত কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। (চলবে)

২০২৪ সালের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পার করেছি আমরা। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে এক নতুন যাত্রা শুরু করেছে। দেশের মানুষের পাহাড়সম প্রত্যাশা কাঁধে নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি জোট। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাম্যের এক যুগান্তকারী দর্শন সামনে এনেছেন। তাঁর একটি সাহসী ও যুগোপযোগী ঘোষণা নাগরিকদের মনে এক নতুন আশা জাগিয়েছে। তিনি বলেছেন—‘আপনি বিএনপিকে ভোট দিন, আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিন, অথবা ভোট দেওয়াই থেকে বিরত থাকুন—নাগরিক হিসেবে আপনার অধিকার সবার সমান।’ এর মধ্য দিয়ে একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে মানুষ।
এই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রদর্শনের মূল লক্ষ্য হলো একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। আর এর চালিকাশক্তি হবে দক্ষ জনসম্পদ। এমন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই জাতীয় সংসদে নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট (২০২৬-২৭ অর্থবছর) পেশ করা হয়েছে। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার কাছে এই বাজেটের সবচেয়ে প্রশংসিত দিকটি হলো শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি। নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ইশতেহারে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এবারের বাজেটে তা ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। গত অর্থবছরের আটকে থাকা মাত্র ১ দশমিক ৩৯ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে শিক্ষায় প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার এই বরাদ্দ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তবে একজন শিক্ষাবিদ ও গবেষক হিসেবে আমি মনে করি, এই বৃদ্ধিকে শুধু একটি ‘সুন্দর টাকার অঙ্ক’ বা স্লোগান হিসেবে দেখলে তা মারাত্মক ভুল হবে। মূল প্রশ্ন হলো, এই বরাদ্দ কি শুধু কিছু খাতের রদবদল, নাকি এটি শিক্ষাখাতে একটি গুণগত ও কাঠামোগত সংস্কারের চাবিকাঠি? আমলাতান্ত্রিক অপচয় ও দুর্নীতি এড়িয়ে এই ২ শতাংশ বরাদ্দ কীভাবে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজে লাগানো যায়, তার একটি সঠিক রূপরেখা আজ সময়ের দাবি। একইসঙ্গে একে ধাপে ধাপে ইশতেহারের ৫ শতাংশে কীভাবে নেওয়া হবে, তার পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
গত বছরের ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে শিক্ষাবাজেট ২ শতাংশে উন্নীত হওয়াকে প্রথম দেখায় একটি বৈপ্লবিক লাফ মনে হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বৈশ্বিক সূচকের দিকে তাকালে এই উজ্জ্বল অঙ্কের পেছনের রূঢ় বাস্তবতা ধরা পড়ে। ইউনেস্কোর দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় বলা আছে, একটি জাতির টেকসই ও গুণগত উন্নয়নের জন্য জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বা জাতীয় বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া উচিত। অথচ চরম বাস্তবতা হলো, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের শিক্ষাবাজেট জিডিপির ১ দশমিক ৩ থেকে ১দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যেই আটকে ছিল। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সর্বনিম্ন বরাদ্দ। এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা সবসময় পিছিয়ে পড়েছে।
জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া এশিয়ার অন্যান্য উদীয়মান শক্তিগুলোর দিকে তাকালে আমাদের এই পিছিয়ে পড়ার কষ্ট আরও প্রকট হয়। এটি শুধু কিছু নীরস পরিসংখ্যানের খেলা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার গল্প। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে দক্ষিণ কোরিয়ার আধিপত্যের পেছনের রহস্য লুকিয়ে আছে তাদের বাজেটে। তারা শুধু গবেষণা ও উন্নয়নের জন্যই মোট জিডিপির প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ খরচ করে। অন্যদিকে, এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক পরাশক্তি চীন প্রতি বছর উচ্চপর্যায়ের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জিডিপির ২ দশমিক ৪ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত শিক্ষায় জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ খরচ করে আসছে। তাদের নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির অধীনে এই বরাদ্দ ৬ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষণাকে ত্বরান্বিত করতে ভারত কোটি কোটি ডলারের নতুন তহবিল দিয়ে 'ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন' গঠন করেছে। এমনকি নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীরাও ঐতিহাসিকভাবে তাদের জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ শিক্ষার জন্য সংরক্ষিত রাখে। এই আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশকে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকেই আমাদের নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের ২ শতাংশ বরাদ্দকে মূল্যায়ন করতে হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রগতিশীল ও প্রশংসনীয় শুরু, যা দীর্ঘদিনের স্থবিরতাকে ভেঙেছে। তবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সাইবার-ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এবং এশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক স্রোতে সম্মানজনকভাবে যুক্ত হতে হলে, আমাদের এই গতিতে আত্মতুষ্ট হলে চলবে না। ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই বরাদ্দকে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার জন্য আমাদের দ্রুত একটি কৌশলগত রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। তবে এখানে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আমাদের সম্পদ হয়তো সীমিত, কিন্তু আমাদের সদিচ্ছা যদি অসীম হয়, তবে এই ২ শতাংশ বরাদ্দের শতভাগ সঠিক, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহার শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনে একটি শক্ত ভিত্তি গড়তে পারে।
বর্তমান বাজেটের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত ত্রুটি হলো, শিক্ষায় সামগ্রিক বরাদ্দ বাড়লেও 'গবেষণা ও উদ্ভাবন' খাতের জন্য অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় সুনির্দিষ্ট কোনো আর্থিক রূপরেখা ছিল না। মৌলিক গবেষণা ছাড়া 'জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি' কেবল কথার কথা হয়েই থাকে। তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ১৭৮তম পূর্ণাঙ্গ কমিশন সভায় উচ্চশিক্ষার এই আর্থিক কাঠামোর কিছুটা চিত্র পরিষ্কার হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ইউজিসি দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কমিশনের নিজস্ব ব্যয়ের জন্য মোট ১২ হাজার ৩০০ কোটি ৪ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ১২ হাজার ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং ইউজিসির জন্য ২৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও বিদেশি বৃত্তির জন্য এবার মোট ২৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা গত অর্থবছরের মূল বরাদ্দের (২২৯ কোটি) চেয়ে মাত্র ৯ কোটি টাকা বেশি। শিক্ষাবাজেট জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার প্রেক্ষাপটে, গবেষণায় এই সামান্য বৃদ্ধি চরম হতাশাজনক। ৫৮টি প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিশাল শিক্ষক ও গবেষকদের কাছ থেকে এই সামান্য ৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা আশা করা সম্পূর্ণ অবাস্তব।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা বলে, উন্নয়ন ব্যয়ের সিংহভাগই চলে যায় ইট-পাথরের মেগা-প্রকল্পে বড় বড় দালানকোঠা বানাতে। ঠিকাদার সিন্ডিকেট আর আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির কারণে ভবন নির্মাণের প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হয়। কিন্তু সেই চার দেয়ালের ভেতরের শিক্ষার আসল পরিবেশ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও গবেষণার যন্ত্রপাতি সবসময় অন্ধকারেই রয়ে যায়। নতুন বাজেটের এই ২ শতাংশ বরাদ্দের বড় অংশ যদি আবারও সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি কেনা আর ইটের দেয়াল তোলায় অপচয় হয়, তবে উচ্চশিক্ষার এই গভীর দৈন্যদশা কখনোই কাটবে না।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ বর্তমানে গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশের কাছাকাছি খরচ করে। এটি শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্নই নয়, এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অনুন্নত আফ্রিকান দেশ উগান্ডার বরাদ্দের সমান! এই শোচনীয় অবস্থায় গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট কোনো আর্থিক কাঠামো বা 'থোক বরাদ্দ' না রাখা মানে উচ্চশিক্ষার ভাগ্যকে আবারও আমলাদের দয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া। তাই নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমার জোর দাবি: এই ২ শতাংশ শিক্ষাবাজেটের অন্তত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা ১ শতাংশ শুধু মৌলিক ও ফলিত গবেষণার জন্য আইনিভাবে নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। কেবল তখনই আমাদের প্রচলিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুখস্থবিদ্যার খোলস ছেড়ে প্রকৃত 'রিসার্চ ইউনিভার্সিটি' হয়ে ওঠার সক্ষমতা পাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উন্নত গবেষণা ও উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করতে সরকারকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় গবেষণার যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সামগ্রী ও রিএজেন্ট আমদানিতে শুল্ক ও কর পুরোপুরি বাতিল করতে হবে। শীর্ষ গবেষকদের পুরস্কৃত করতে আলাদা তহবিলের ব্যবস্থা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা ও পেটেন্ট ফাইলিংয়ের খরচ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হবে। গবেষকরা যাতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্ত থাকতে পারেন, সেজন্য বছরে অন্তত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের ব্যয় সরকারকে বহন করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো 'ব্রেইন গেইন' বা মেধার সঞ্চালন (সরকার যাকে 'ব্রেইন সার্কুলেশন' বলছে)। উন্নত বিশ্বে কর্মরত অত্যন্ত দক্ষ প্রবাসী শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের দেশে যুক্ত করতে অ্যাডজাংক্ট বা ভিজিটিং প্রফেসরশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। এছাড়াও, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ কাজের দরজা খোলা রাখতে হবে।
সিঙ্গাপুরের বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মূল মন্ত্র ছিল 'মেরিটোক্রেসি' বা মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন। এর সাথে ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি। আমাদের ২০২৪ সালের রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মূল দাবিও ছিল একটি মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে বৈষম্যহীনতা ও মেধার এই দুই জাতীয় মন্ত্রকে রাষ্ট্রের শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা, কোটা বা বিশেষ সুবিধার আড়ালে এতকাল যে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক তোষামোদ চলে আসছে, তা স্থায়ীভাবে নির্মূল করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চপর্যায়ের সব নিয়োগ শতভাগ স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করতে পারলেই বাংলাদেশ একটি সত্যিকারের মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষক ও গবেষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতির একমাত্র মাপকাঠি হতে হবে আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে মানসম্পন্ন গবেষণা প্রকাশনা, এইচ-ইনডেক্স এবং সাইটেশন। রাজনৈতিক বিবেচনাকে এখানে পুরোপুরি বাতিল করতে হবে।
আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে আমাদের দেশের মেধাবীরা এখন শিক্ষকতায় আসতে চান না। সেরা মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের জন্য একটি 'স্বতন্ত্র বেতন স্কেল' চালু করা এখন সময়ের দাবি। একজন দক্ষ ও সৎ শিক্ষকের পেছনে বিনিয়োগ করা মানে হাজার হাজার দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রধান হাতিয়ার। সরকার যদি নিয়োগপ্রক্রিয়া থেকে দুর্নীতি ও দলীয় তোষামোদ পুরোপুরি দূর করতে পারে, তবেই শিক্ষাবাজেটের আসল সুফল মিলবে। আমরা যদি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকারের যোগ্য, সৎ ও দক্ষ বিশ্ব নাগরিক তৈরির সূতিকাগার বানাতে চাই, তবে ক্যাম্পাসগুলোকে অবশ্যই বিষাক্ত দলীয় ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির কবল থেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে হবে।
গত দেড়-দুই দশকে আমরা দেখেছি কীভাবে দলীয় রাজনীতির আধিপত্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষার পরিবেশ ও একাডেমিক মর্যাদাকে ধ্বংস করেছে। নতুন বাংলাদেশে মেধা, মুক্তচিন্তা এবং ছাত্রবান্ধব পরিবেশ বিকাশের জন্য ক্যাম্পাসগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে প্রকৃত জ্ঞানচর্চার তীর্থস্থান হিসেবে নতুন করে গড়তে হবে। শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রধান মনোযোগ ও সাধনা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান সৃষ্টি, কৃষি ও শিল্পখাতের জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণে অবদান রাখা। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পেশিশক্তি বা সুবিধাভোগী হিসেবে কাজ করা নয়। শুধু স্লোগান দিয়ে শিক্ষার পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়; গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা—মেধার মূল্যায়ন ও বৈষম্যহীনতা রক্ষার মাধ্যমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞান সৃষ্টি, চর্চা ও প্রসারের প্রকৃত কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। (চলবে)

দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সরকারের উচিত যথাযথ অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ভারতের কাছে এর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাবি করা।
২ ঘণ্টা আগে
জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে শক্তিশালী বিনিয়োগের বিকল্প নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই দেশে বিনিয়োগে খরা চলছে। এটা হঠাৎ শুরু হয়েছে, তা নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালেই বিনিয়োগে নাজুক পরিস্থিতি ছিল। তখন যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখানো হতো, সেটির সঙ্গে বিনিয়োগ পরিস্থিতির সংযোগ ছিল না বলেও অর্থনীতিবিদদের ধারণা।
১৯ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের ঘরে, আঙিনায়, রাস্তায় এখন আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা উড়ছে। গলিতে গলিতে বড় পর্দায় রাত জেগে খেলা দেখার আয়োজন। চায়ের দোকানে মেসি, নেইমার, ভিনিসিউসকে নিয়ে আলোচনার ঝড়। এ সবকিছুর মধ্যে আমার মাথায় একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরে আসে—এই ভিড়ে নারীরা কতটা আছেন? আর যদি না-ই থাকেন, তাহলে কেন নেই?
১ দিন আগে
বাংলাদেশের মিয়ানমারনীতি নিয়ে কথা উঠলে সাধারণত রোহিঙ্গা সংকটের কথাই সামনে আসে। তবে রোহিঙ্গা সংকট ছাড়াও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। এখন শুধু রোহিঙ্গা নয়, সীমান্তসংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখেও পড়ছেন বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরা।
১ দিন আগে