সরদার ফরিদ আহমদ

জুলাই বর্ষা বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনতার প্রত্যাশা। মানুষ ভেবেছিল, শুধু সরকার বদলাবে না; বদলাবে রাষ্ট্রের চরিত্রও। বদলাবে প্রশাসনের সংস্কৃতি। বদলাবে ক্ষমতার ব্যবহার। বিশেষ করে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে মানুষের যে ক্ষোভ ছিল, সেটির একটি জবাব আসবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে সরকারের অনীহা এখন আর গোপন কিছু নয়। বরং এটি ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারের নানা পদক্ষেপে সেই সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। আর এটা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। কারণ জুলাই সনদ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দলিল নয়। এটি গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি। এটি সেই প্রতিশ্রুতি, যার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। ফলে এই সনদকে উপেক্ষা মানে শুধু একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার ভঙ্গ করা নয়; বরং গণঅভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
সরকার হয়তো মনে করছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে। মানুষ ভুলে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইতোমধ্যে ১১ দলীয় জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে মাঠে নেমেছে। বিভিন্ন স্থানে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। আর যখন কোনো গণআকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক রূপ নেয়, তখন সেটি আর সহজে তামাদি হয় না। বরং ধীরে ধীরে সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে পুলিশ পদক বিতর্ক তাৎপর্যপূর্ণ। এবারের পুলিশ সপ্তাহে যেসব কর্মকর্তার নাম পদকের জন্য প্রাথমিকভাবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল, তাদের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা একাধিক কর্মকর্তার নাম ছিল। অভিযোগ আছে, কেউ অতীতে বিরোধী মত দমনে সক্রিয় ছিলেন। কেউ কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযানে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রেখেছেন। কেউ রাজনৈতিক আনুগত্যের সুবিধাভোগী ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও কয়েকজনের নাম জড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই তালিকা তৈরি হলো কীভাবে? জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বেশি সমালোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ছিল পুলিশ। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিরোধী মত দমন, গুম, নির্যাতন, ভয়ভীতি– এসব অভিযোগের বড় অংশই পুলিশের বিরুদ্ধে এসেছে। ফলে গণঅভ্যুত্থানের পর জনতার ক্ষোভের বড় অংশও ছিল এই বাহিনীকে ঘিরে। এমন সময়ও এসেছে, যখন অনেক পুলিশ সদস্য থানায় যেতে ভয় পেয়েছেন। জনআস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে পুলিশকে ফিরিয়ে আনতে নতুন সরকারকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সতর্ক থাকার কথা ছিল। জনগণও সেটি আশা করেছিল। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো প্রবণতা। যেসব কর্মকর্তার অতীত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে, তাদেরই আবার পুরস্কৃত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। সমালোচনার মুখে শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়েছে। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন বা বিদেশ সফরের কারণে অনুষ্ঠান হয়নি। পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিতর্কিত নাম সামনে চলে আসাতেই অনুষ্ঠান থামাতে হয়েছে।
এখানেই মূল সংকট। সরকার কি রাষ্ট্রের পুরোনো সংস্কৃতি বদলাতে চায়? নাকি শুধু নতুন রাজনৈতিক ব্যানারের নিচে পুরোনো কাঠামোই চালিয়ে যেতে চায়? কারণ রাষ্ট্রের আচরণে এখনো পুরোনো মানসিকতার ছাপ স্পষ্ট। প্রশাসনের ভেতরে জবাবদিহির বদলে এখনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুরক্ষা সংস্কৃতি কাজ করছে। ক্ষমতার প্রতি আনুগত্য এখনো পুরস্কৃত হচ্ছে। অতীতের বিতর্কিত ভূমিকার কোনো কার্যকর মূল্যায়ন দেখা যাচ্ছে না।
এটি শুধু নৈতিক ব্যর্থতা নয়। রাজনৈতিক আত্মঘাতিতাও। কারণ জুলাই আন্দোলনের শক্তি ছিল তরুণ সমাজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমনির্ভর নতুন রাজনৈতিক প্রজন্ম। তারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয়। তথ্য অনুসরণ করে। তারা রাষ্ট্রের দ্বিচারিতা খুব দ্রুত ধরতে পারে। ফলে পুরোনো কৌশলে এখন আর সংকট সামাল দেওয়া সহজ নয়। পুলিশ পদক বিতর্ক সেটিই প্রমাণ করেছে।
প্রথমে তালিকা তৈরি হলো। পরে সমালোচনা উঠলো। তারপর অনুষ্ঠান স্থগিত। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেই গুরুতর অসংবেদনশীলতা ছিল। এটি দেখায়, রাষ্ট্রের ভেতরে এখনো পুরোনো শক্তিগুলো সক্রিয়। তারা পরিস্থিতির রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে পারছে না। অথবা বুঝেও উপেক্ষা করছে।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সপ্তাহে বাহিনীর সদস্যরা যেসব দাবি তুলেছেন, তার অনেকগুলোই যৌক্তিক। আবাসন সংকট, ঝুঁকি ভাতা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, হাসপাতাল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা– এসব বাস্তব সমস্যা। একটি পেশাদার পুলিশ বাহিনীর জন্য এগুলো প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র যদি পুলিশকে রাজনৈতিক বাহিনী নয়, পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর করতে চায়, তাহলে এসব দাবি বিবেচনা করতেই হবে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। পেশাদারিত্ব শুধু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসে না। প্রয়োজন জবাবদিহি। প্রয়োজন নৈতিক সংস্কার। প্রয়োজন অতীত অপব্যবহারের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। সেই জায়গাটিই অনুপস্থিত। রাষ্ট্র যদি শুধু বাহিনীর সুবিধা বাড়ায়, কিন্তু অতীতের দায় এড়িয়ে যায়, তাহলে জনগণের আস্থা ফিরবে না। বরং মানুষ মনে করবে, শুধু ক্ষমতার রং বদলেছে; রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায়নি। এটি সরকারের জন্য সতর্ক সংকেত। কারণ গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণ সবচেয়ে বেশি যে পরিবর্তন চেয়েছিল, সেটি ছিল রাষ্ট্রীয় আচরণের পরিবর্তন। তারা প্রতিশোধ নয়, জবাবদিহি চেয়েছিল। দলীয় আনুগত্য নয়, নিরপেক্ষতা চেয়েছিল। ভয়ভীতির রাষ্ট্র নয়, নাগরিক রাষ্ট্র চেয়েছিল। কিন্তু এখন যদি সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়, তাহলে রাজনৈতিক হতাশা তৈরি হবে। আর এটা খুব দ্রুত নতুন অস্থিরতার জন্ম দেয়।
ইতোমধ্যে জুলাই সনদ প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। সরকার যদি এটিকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে বিরোধী শক্তিগুলো এটিকে বড় আন্দোলনের ইস্যু বানাবে। কারণ এটি শুধু রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়; নৈতিক বৈধতার প্রশ্ন। সরকার ক্ষমতায় এসেছে কোন প্রতিশ্রুতিতে? জনগণ কী আশা করেছিল? এই প্রশ্নগুলো সামনে চলে আসবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ইতিহাস বলে– গণঅভ্যুত্থানের শক্তি শুধু সরকার পতনে নয়; বরং পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের সক্ষমতায়। সেখানে যদি পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসে, তাহলে মানুষের মধ্যে প্রতারণাবোধ জন্ম নেয়। তখন আন্দোলনের স্মৃতি নতুন ক্ষোভে পরিণত হয়। বাংলাদেশ এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সরকারের সামনে এখনো সুযোগ আছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে স্পষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে স্বচ্ছ অবস্থান নিতে হবে। পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু প্রতীকী ভাষণ নয়; পরিবর্তনের প্রমাণ দেখাতে হবে। অন্যথায় জুলাইয়ের প্রশ্ন থামবে না। বরং সেটিই আগামী রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
জুলাই বর্ষা বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছিল, সেটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো বদলানো। সেই লক্ষ্য থেকেই তৈরি হয়েছিল জুলাই জাতীয় সনদ। গঠিত হয়েছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন। পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। গণভোটও হয়েছে। জনগণও বিপুলভাবে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো– ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়ে গেছে, অথচ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। যে পরিষদের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কারের কথা ছিল, সেটিই এখন অনিশ্চয়তায়।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। বিএনপি কি সত্যিই রাষ্ট্র সংস্কার চায়? নাকি তারা শুধু ক্ষমতার পালাবদল চেয়েছিল? কারণ এখন পর্যন্ত তাদের আচরণ দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকেই শক্তিশালী করছে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে এখন বিএনপি বলছে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল’। প্রশ্ন হলো, এই আদেশ জারির পর বিএনপি কি সেটি প্রত্যাখ্যান করেছিল? না। গণভোটে অংশ নেয়নি? নিয়েছে। জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানায়নি? জানিয়েছে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়নি? জানিয়েছে। তাহলে এখন হঠাৎ এই অবস্থান বদল কেন? এর উত্তর রাজনৈতিক। বিএনপি এখন ক্ষমতায়। আর ক্ষমতায় গিয়েই তারা বুঝেছে, কাঠামোগত সংস্কার মানে আসলে নিজের ক্ষমতার সীমাটি নির্ধারণ করা। এখানেই তাদের অস্বস্তি।
সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ একটি দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। সংবিধান সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভাঙা। নির্বাচন কমিশন, দুদক, বিচার বিভাগ, সরকারি কর্মকমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে একক দলীয় আধিপত্য কমানো। অর্থাৎ মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ভাঙা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রায় সব দলই এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার সুবিধা নিতে চায়। বিএনপিও সেই রাজনৈতিক বৃত্তে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে। এ কারণেই সংস্কার প্রশ্নে তারা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আলী রীয়াজ স্পষ্ট বলেছেন– ঐকমত্য কমিশন কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে চায়নি। বরং ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্যে অনেক প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির আপত্তির মুখে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নারী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নেও কমিশনের মূল অবস্থান থেকে সরে আসা হয়েছে। অর্থাৎ প্রক্রিয়াটি ছিল সমঝোতার। তবুও বিএনপির অভিযোগ– সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
বরং মনে হচ্ছে, নির্বাচনের আগে সংস্কারের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির জন্য। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আলী রীয়াজ বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ছিল কাঠামোগত সংস্কার। অর্থাৎ এটি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি। ফলে এখন যদি সরকার সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, তাহলে সেটি শুধু রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন নয়; বরং গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করা।
এ কারণেই জুলাই সনদের প্রশ্ন শেষ হয়ে যাবে না। বরং এটি বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। কারণ এই প্রশ্ন এখন শুধু একটি আইনি বিতর্ক নয়। এটি জনগণের প্রত্যাশার প্রশ্ন। মানুষ কি শুধু সরকার বদল চেয়েছিল, নাকি রাষ্ট্র বদলও চেয়েছিল? এই প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আলী রীয়াজ সরাসরি সতর্ক করেছেন– কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কারও সম্ভব নয়। এই কথার গভীর রাজনৈতিক অর্থ আছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট শুধু অর্থনীতির সংকট নয়। এটি রাজনৈতিক কাঠামোর সংকটও। দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা, জবাবদিহির অভাব– এসবের সঙ্গে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো গভীরভাবে যুক্ত। ফলে রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও টেকসই হবে না।
বিএনপির বর্তমান অবস্থান বলছে, তারা সম্ভবত ‘সংস্কার’ নয়; ‘সংশোধন’ চায়। অর্থাৎ কাঠামো অক্ষত রেখে কিছু পরিবর্তন। এটি বাংলাদেশের পুরোনো রাজনৈতিক রোগ। প্রতিটি দল বিরোধী দলে থাকলে সংস্কারের কথা বলে। ক্ষমতায় গেলে স্থিতাবস্থার সুবিধাভোগী হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
এবার পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন। কারণ জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল সামাজিক ও প্রজন্মগত বিস্ফোরণ। নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রের জবাবদিহি চেয়েছে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা চেয়েছে। এখন যদি তারা দেখে, পুরোনো রাজনীতিই নতুন ব্যানারে ফিরে এসেছে, তাহলে হতাশা বাড়বে। সেটা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষোভে রূপ নেবে। ইতোমধ্যে সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী এটিকে সামনে আনছে। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন সেই প্রতিশ্রুতির মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে। পুলিশ পদক বিতর্ক থেকে প্রশাসনিক নিয়োগ– সবকিছুতেই প্রশ্ন উঠছে, ‘তাহলে পরিবর্তন কোথায়?’
এই প্রশ্ন বিপজ্জনক। কারণ রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা কেবল নির্বাচনে আসে না। প্রতিশ্রুতি রক্ষার মধ্য দিয়েও আসে। আলী রীয়াজ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলেছেন। গণভোটে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। অর্থাৎ এই প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিতর্ক নয়; এটি জনগণের প্রত্যাশার বিষয়। সরকার যদি এটিকে উপেক্ষা করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বৈধতার সংকট তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, বিএনপির বর্তমান অবস্থানের মধ্যে একটি দ্বৈততা স্পষ্ট। একদিকে তারা গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে এর রাজনৈতিক সুবিধাও নিয়েছে। একদিকে বলছে, বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ। অন্যদিকে সেই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে। এই দ্বৈত অবস্থান দীর্ঘদিন টিকবে না। কারণ জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি অবস্থান, প্রতিটি বৈপরীত্য দ্রুত সামনে চলে আসে।
এখানে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, সংস্কারের প্রশ্নকে যদি তারা শুধু রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখে, তাহলে ভবিষ্যতে এটি তাদের জন্যই বড় সংকটে পরিণত হবে। কারণ যে প্রত্যাশা একবার তৈরি হয়, সেটি সহজে মরে না।
বাংলাদেশের মানুষ গত পাঁচ দশকে বারবার একই বৃত্তে ঘুরেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দলীয় প্রশাসন– এই চক্র বারবার ফিরে এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই বৃত্ত ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। এখন প্রশ্ন, সেই সম্ভাবনা কি আবারও নষ্ট হতে যাচ্ছে?
যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত না হয়, কাঠামোগত সংস্কার অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে থাকে, যদি গণভোটের রায় কার্যত উপেক্ষিত হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে একটি বার্তা যাবে : ক্ষমতা বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্র বদলায়নি। আর সেটি হবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কারণ তখন জুলাইয়ের স্মৃতি আর আশার প্রতীক হয়ে থাকবে না। সেটি পরিণত হবে অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির প্রতীকে। এবং ইতিহাস বলে, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এক সময় রাজনৈতিক বিস্ফোরণের জন্ম দেয়।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

জুলাই বর্ষা বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনতার প্রত্যাশা। মানুষ ভেবেছিল, শুধু সরকার বদলাবে না; বদলাবে রাষ্ট্রের চরিত্রও। বদলাবে প্রশাসনের সংস্কৃতি। বদলাবে ক্ষমতার ব্যবহার। বিশেষ করে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে মানুষের যে ক্ষোভ ছিল, সেটির একটি জবাব আসবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে সরকারের অনীহা এখন আর গোপন কিছু নয়। বরং এটি ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারের নানা পদক্ষেপে সেই সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। আর এটা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। কারণ জুলাই সনদ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দলিল নয়। এটি গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি। এটি সেই প্রতিশ্রুতি, যার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। ফলে এই সনদকে উপেক্ষা মানে শুধু একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার ভঙ্গ করা নয়; বরং গণঅভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
সরকার হয়তো মনে করছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে। মানুষ ভুলে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইতোমধ্যে ১১ দলীয় জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে মাঠে নেমেছে। বিভিন্ন স্থানে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। আর যখন কোনো গণআকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক রূপ নেয়, তখন সেটি আর সহজে তামাদি হয় না। বরং ধীরে ধীরে সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে পুলিশ পদক বিতর্ক তাৎপর্যপূর্ণ। এবারের পুলিশ সপ্তাহে যেসব কর্মকর্তার নাম পদকের জন্য প্রাথমিকভাবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল, তাদের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা একাধিক কর্মকর্তার নাম ছিল। অভিযোগ আছে, কেউ অতীতে বিরোধী মত দমনে সক্রিয় ছিলেন। কেউ কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযানে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রেখেছেন। কেউ রাজনৈতিক আনুগত্যের সুবিধাভোগী ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও কয়েকজনের নাম জড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই তালিকা তৈরি হলো কীভাবে? জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বেশি সমালোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ছিল পুলিশ। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিরোধী মত দমন, গুম, নির্যাতন, ভয়ভীতি– এসব অভিযোগের বড় অংশই পুলিশের বিরুদ্ধে এসেছে। ফলে গণঅভ্যুত্থানের পর জনতার ক্ষোভের বড় অংশও ছিল এই বাহিনীকে ঘিরে। এমন সময়ও এসেছে, যখন অনেক পুলিশ সদস্য থানায় যেতে ভয় পেয়েছেন। জনআস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে পুলিশকে ফিরিয়ে আনতে নতুন সরকারকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সতর্ক থাকার কথা ছিল। জনগণও সেটি আশা করেছিল। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো প্রবণতা। যেসব কর্মকর্তার অতীত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে, তাদেরই আবার পুরস্কৃত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। সমালোচনার মুখে শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়েছে। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন বা বিদেশ সফরের কারণে অনুষ্ঠান হয়নি। পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিতর্কিত নাম সামনে চলে আসাতেই অনুষ্ঠান থামাতে হয়েছে।
এখানেই মূল সংকট। সরকার কি রাষ্ট্রের পুরোনো সংস্কৃতি বদলাতে চায়? নাকি শুধু নতুন রাজনৈতিক ব্যানারের নিচে পুরোনো কাঠামোই চালিয়ে যেতে চায়? কারণ রাষ্ট্রের আচরণে এখনো পুরোনো মানসিকতার ছাপ স্পষ্ট। প্রশাসনের ভেতরে জবাবদিহির বদলে এখনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুরক্ষা সংস্কৃতি কাজ করছে। ক্ষমতার প্রতি আনুগত্য এখনো পুরস্কৃত হচ্ছে। অতীতের বিতর্কিত ভূমিকার কোনো কার্যকর মূল্যায়ন দেখা যাচ্ছে না।
এটি শুধু নৈতিক ব্যর্থতা নয়। রাজনৈতিক আত্মঘাতিতাও। কারণ জুলাই আন্দোলনের শক্তি ছিল তরুণ সমাজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমনির্ভর নতুন রাজনৈতিক প্রজন্ম। তারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয়। তথ্য অনুসরণ করে। তারা রাষ্ট্রের দ্বিচারিতা খুব দ্রুত ধরতে পারে। ফলে পুরোনো কৌশলে এখন আর সংকট সামাল দেওয়া সহজ নয়। পুলিশ পদক বিতর্ক সেটিই প্রমাণ করেছে।
প্রথমে তালিকা তৈরি হলো। পরে সমালোচনা উঠলো। তারপর অনুষ্ঠান স্থগিত। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেই গুরুতর অসংবেদনশীলতা ছিল। এটি দেখায়, রাষ্ট্রের ভেতরে এখনো পুরোনো শক্তিগুলো সক্রিয়। তারা পরিস্থিতির রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে পারছে না। অথবা বুঝেও উপেক্ষা করছে।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সপ্তাহে বাহিনীর সদস্যরা যেসব দাবি তুলেছেন, তার অনেকগুলোই যৌক্তিক। আবাসন সংকট, ঝুঁকি ভাতা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, হাসপাতাল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা– এসব বাস্তব সমস্যা। একটি পেশাদার পুলিশ বাহিনীর জন্য এগুলো প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র যদি পুলিশকে রাজনৈতিক বাহিনী নয়, পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর করতে চায়, তাহলে এসব দাবি বিবেচনা করতেই হবে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। পেশাদারিত্ব শুধু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসে না। প্রয়োজন জবাবদিহি। প্রয়োজন নৈতিক সংস্কার। প্রয়োজন অতীত অপব্যবহারের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। সেই জায়গাটিই অনুপস্থিত। রাষ্ট্র যদি শুধু বাহিনীর সুবিধা বাড়ায়, কিন্তু অতীতের দায় এড়িয়ে যায়, তাহলে জনগণের আস্থা ফিরবে না। বরং মানুষ মনে করবে, শুধু ক্ষমতার রং বদলেছে; রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায়নি। এটি সরকারের জন্য সতর্ক সংকেত। কারণ গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণ সবচেয়ে বেশি যে পরিবর্তন চেয়েছিল, সেটি ছিল রাষ্ট্রীয় আচরণের পরিবর্তন। তারা প্রতিশোধ নয়, জবাবদিহি চেয়েছিল। দলীয় আনুগত্য নয়, নিরপেক্ষতা চেয়েছিল। ভয়ভীতির রাষ্ট্র নয়, নাগরিক রাষ্ট্র চেয়েছিল। কিন্তু এখন যদি সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়, তাহলে রাজনৈতিক হতাশা তৈরি হবে। আর এটা খুব দ্রুত নতুন অস্থিরতার জন্ম দেয়।
ইতোমধ্যে জুলাই সনদ প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। সরকার যদি এটিকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে বিরোধী শক্তিগুলো এটিকে বড় আন্দোলনের ইস্যু বানাবে। কারণ এটি শুধু রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়; নৈতিক বৈধতার প্রশ্ন। সরকার ক্ষমতায় এসেছে কোন প্রতিশ্রুতিতে? জনগণ কী আশা করেছিল? এই প্রশ্নগুলো সামনে চলে আসবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ইতিহাস বলে– গণঅভ্যুত্থানের শক্তি শুধু সরকার পতনে নয়; বরং পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের সক্ষমতায়। সেখানে যদি পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসে, তাহলে মানুষের মধ্যে প্রতারণাবোধ জন্ম নেয়। তখন আন্দোলনের স্মৃতি নতুন ক্ষোভে পরিণত হয়। বাংলাদেশ এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সরকারের সামনে এখনো সুযোগ আছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে স্পষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে স্বচ্ছ অবস্থান নিতে হবে। পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু প্রতীকী ভাষণ নয়; পরিবর্তনের প্রমাণ দেখাতে হবে। অন্যথায় জুলাইয়ের প্রশ্ন থামবে না। বরং সেটিই আগামী রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
জুলাই বর্ষা বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছিল, সেটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো বদলানো। সেই লক্ষ্য থেকেই তৈরি হয়েছিল জুলাই জাতীয় সনদ। গঠিত হয়েছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন। পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। গণভোটও হয়েছে। জনগণও বিপুলভাবে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো– ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়ে গেছে, অথচ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। যে পরিষদের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কারের কথা ছিল, সেটিই এখন অনিশ্চয়তায়।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। বিএনপি কি সত্যিই রাষ্ট্র সংস্কার চায়? নাকি তারা শুধু ক্ষমতার পালাবদল চেয়েছিল? কারণ এখন পর্যন্ত তাদের আচরণ দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকেই শক্তিশালী করছে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে এখন বিএনপি বলছে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল’। প্রশ্ন হলো, এই আদেশ জারির পর বিএনপি কি সেটি প্রত্যাখ্যান করেছিল? না। গণভোটে অংশ নেয়নি? নিয়েছে। জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানায়নি? জানিয়েছে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়নি? জানিয়েছে। তাহলে এখন হঠাৎ এই অবস্থান বদল কেন? এর উত্তর রাজনৈতিক। বিএনপি এখন ক্ষমতায়। আর ক্ষমতায় গিয়েই তারা বুঝেছে, কাঠামোগত সংস্কার মানে আসলে নিজের ক্ষমতার সীমাটি নির্ধারণ করা। এখানেই তাদের অস্বস্তি।
সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ একটি দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। সংবিধান সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভাঙা। নির্বাচন কমিশন, দুদক, বিচার বিভাগ, সরকারি কর্মকমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে একক দলীয় আধিপত্য কমানো। অর্থাৎ মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ভাঙা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রায় সব দলই এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার সুবিধা নিতে চায়। বিএনপিও সেই রাজনৈতিক বৃত্তে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে। এ কারণেই সংস্কার প্রশ্নে তারা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আলী রীয়াজ স্পষ্ট বলেছেন– ঐকমত্য কমিশন কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে চায়নি। বরং ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্যে অনেক প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির আপত্তির মুখে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নারী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নেও কমিশনের মূল অবস্থান থেকে সরে আসা হয়েছে। অর্থাৎ প্রক্রিয়াটি ছিল সমঝোতার। তবুও বিএনপির অভিযোগ– সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
বরং মনে হচ্ছে, নির্বাচনের আগে সংস্কারের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির জন্য। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আলী রীয়াজ বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ছিল কাঠামোগত সংস্কার। অর্থাৎ এটি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি। ফলে এখন যদি সরকার সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, তাহলে সেটি শুধু রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন নয়; বরং গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করা।
এ কারণেই জুলাই সনদের প্রশ্ন শেষ হয়ে যাবে না। বরং এটি বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। কারণ এই প্রশ্ন এখন শুধু একটি আইনি বিতর্ক নয়। এটি জনগণের প্রত্যাশার প্রশ্ন। মানুষ কি শুধু সরকার বদল চেয়েছিল, নাকি রাষ্ট্র বদলও চেয়েছিল? এই প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আলী রীয়াজ সরাসরি সতর্ক করেছেন– কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কারও সম্ভব নয়। এই কথার গভীর রাজনৈতিক অর্থ আছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট শুধু অর্থনীতির সংকট নয়। এটি রাজনৈতিক কাঠামোর সংকটও। দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা, জবাবদিহির অভাব– এসবের সঙ্গে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো গভীরভাবে যুক্ত। ফলে রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও টেকসই হবে না।
বিএনপির বর্তমান অবস্থান বলছে, তারা সম্ভবত ‘সংস্কার’ নয়; ‘সংশোধন’ চায়। অর্থাৎ কাঠামো অক্ষত রেখে কিছু পরিবর্তন। এটি বাংলাদেশের পুরোনো রাজনৈতিক রোগ। প্রতিটি দল বিরোধী দলে থাকলে সংস্কারের কথা বলে। ক্ষমতায় গেলে স্থিতাবস্থার সুবিধাভোগী হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
এবার পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন। কারণ জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল সামাজিক ও প্রজন্মগত বিস্ফোরণ। নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রের জবাবদিহি চেয়েছে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা চেয়েছে। এখন যদি তারা দেখে, পুরোনো রাজনীতিই নতুন ব্যানারে ফিরে এসেছে, তাহলে হতাশা বাড়বে। সেটা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষোভে রূপ নেবে। ইতোমধ্যে সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী এটিকে সামনে আনছে। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন সেই প্রতিশ্রুতির মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে। পুলিশ পদক বিতর্ক থেকে প্রশাসনিক নিয়োগ– সবকিছুতেই প্রশ্ন উঠছে, ‘তাহলে পরিবর্তন কোথায়?’
এই প্রশ্ন বিপজ্জনক। কারণ রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা কেবল নির্বাচনে আসে না। প্রতিশ্রুতি রক্ষার মধ্য দিয়েও আসে। আলী রীয়াজ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলেছেন। গণভোটে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। অর্থাৎ এই প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিতর্ক নয়; এটি জনগণের প্রত্যাশার বিষয়। সরকার যদি এটিকে উপেক্ষা করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বৈধতার সংকট তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, বিএনপির বর্তমান অবস্থানের মধ্যে একটি দ্বৈততা স্পষ্ট। একদিকে তারা গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে এর রাজনৈতিক সুবিধাও নিয়েছে। একদিকে বলছে, বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ। অন্যদিকে সেই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে। এই দ্বৈত অবস্থান দীর্ঘদিন টিকবে না। কারণ জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি অবস্থান, প্রতিটি বৈপরীত্য দ্রুত সামনে চলে আসে।
এখানে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, সংস্কারের প্রশ্নকে যদি তারা শুধু রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখে, তাহলে ভবিষ্যতে এটি তাদের জন্যই বড় সংকটে পরিণত হবে। কারণ যে প্রত্যাশা একবার তৈরি হয়, সেটি সহজে মরে না।
বাংলাদেশের মানুষ গত পাঁচ দশকে বারবার একই বৃত্তে ঘুরেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দলীয় প্রশাসন– এই চক্র বারবার ফিরে এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই বৃত্ত ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। এখন প্রশ্ন, সেই সম্ভাবনা কি আবারও নষ্ট হতে যাচ্ছে?
যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত না হয়, কাঠামোগত সংস্কার অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে থাকে, যদি গণভোটের রায় কার্যত উপেক্ষিত হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে একটি বার্তা যাবে : ক্ষমতা বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্র বদলায়নি। আর সেটি হবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কারণ তখন জুলাইয়ের স্মৃতি আর আশার প্রতীক হয়ে থাকবে না। সেটি পরিণত হবে অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির প্রতীকে। এবং ইতিহাস বলে, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এক সময় রাজনৈতিক বিস্ফোরণের জন্ম দেয়।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তির প্রধান মাপকাঠি ছিল ভারী ট্যাঙ্ক, শক্তিশালী বিমানবাহিনী এবং বিশাল পদাতিক বাহিনী। কিন্তু ২০২৬ সালের যুদ্ধক্ষেত্র আমাদের দেখাচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতা, যেখানে প্রথাগত শক্তির দাপট ম্লান হয়ে আসছে। সিগন্যাল জ্যামিং এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের দাপটে যখন প্রচলিত রেডিও-নিয়ন্ত
১ ঘণ্টা আগে
গতকাল এক সহকর্মীর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কথা হচ্ছিল আজকের মা দিবসে পত্রিকায় কী কাজ হবে, নিজেরা কী করব— এসব নিয়েই। হঠাৎ তিনি বলে বসলেন, ‘মায়েরা আসলে মাকড়সা’।
২ ঘণ্টা আগে
দক্ষিণ এশিয়ায় আজ পরিচয়কে সরলীকরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ তার হিন্দু অতীতকে আড়াল করছে। ভারত তার মুসলিম ইতিহাসকে মুছে ফেলছে। এর মাধ্যমে ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয় না—বিকৃতি করা হয়।
৩ ঘণ্টা আগে
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে খুব দ্রুত ভালো কোনো পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে এমনটা ভাবার কারণ নেই। বরং, ভারত যদি না বুঝে খুব কঠোর ও একগুঁয়ে কোনো নীতি গ্রহণ করে, তবে ঢাকা আরও দূরে সরে যেতে পারে। এতে করে সম্পর্ক উন্নয়নের বর্তমান যে সম্ভাবনাটুকু আছে, সেটাও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
৪ ঘণ্টা আগে