জ্বালানি সংকট সমাধানে চাই জাতীয় সক্ষমতা ও সম্পদে জনগণের মালিকানা

স্ট্রিম গ্রাফিক

বর্তমানে সারা দেশে জ্বালানি খাতে চরম অস্থিরতা ও নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমাদের অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়েছিল। সে সময় সেই সংকট সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারার কারণে দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়, এমনকি দুর্ভিক্ষ পর্যন্ত নেমে এসেছিল। ইতিহাসের সেই চরম শিক্ষা আজ আমাদের সামনে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

নতুন নির্বাচিত সরকারের এক মাস পার হওয়ার পর, এই সংকট মোকাবিলায় দুটি দিকে নজর দেওয়া জরুরি—প্রথমত, দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র দীর্ঘদিনের দাবি, গবেষণা, লেখালেখি, আন্দোলনে আমরা সব সময় প্রধান তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছি।

প্রথমত, বাংলাদেশের জাতীয় খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত রাখতে হবে। কোনোভাবেই বহুজাতিক বা বিদেশি কোম্পানির হাতে এর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া যাবে না।

দ্বিতীয়ত, আমাদের সম্পদ সীমিত হওয়ায় তা বিদেশে রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে হবে, যাতে এর শতভাগ দেশের মানুষের কাজে ব্যবহার সম্ভব হয়।

তৃতীয়ত, নিজস্ব তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৯৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই এই তিন দাবি বাস্তবায়নে কাজ করেনি। বরং সব সরকারই উল্টো পথে গেছে—বিদেশি কোম্পানি, বিদেশি ঋণ ও আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রাণ-প্রকৃতি বিনাশী নানা চুক্তি ও নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। হাসিনা সরকারের দেড় দশকে এর চরম রূপ আমরা দেখেছি। অথচ যদি শুরু থেকেই জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া হতো, তবে আজ আমাদের এই ভয়াবহ আমদানিনির্ভরতা বা বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকটে পড়তে হতো না।

গণঅভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছিল, তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল তারা এই আত্মঘাতী পথ থেকে সরে আসবে এবং আগের প্রাণবিনাশী চুক্তিগুলো প্রকাশ ও বাতিল করবে। কিন্তু তারা তা না করে পূর্বের ‘দায়মুক্তি আইন’-এর অধীনে প্রকল্পগুলো বহাল রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে এমন কিছু চুক্তি করে, যা আমাদের জ্বালানি খাদ্য ও অর্থনেতিক নিরাপত্তাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে।

আমাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় কাদের নিয়ন্ত্রণে? আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘ইকোনমিক হিটম্যান’ বা ‘কর্পোরেট লবিস্ট’ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। এদের কাজ হলো কোনো দেশে গিয়ে নানা প্রতারণা লোভ ও প্রচারণার পথে সেই দেশের জ্বালানি খাতকে কবজা করে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও উপদেষ্টা বা সহযোগীর আড়ালে এমন লবিস্টদের তৎপরতা আমরা দেখেছি। এরাই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেছে দশকের পর দশক।

যখনই আমরা জাতীয় সক্ষমতার কথা বলি, তখনই একটি গোষ্ঠী প্রচার করে যে ‘আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা পারবো না।’ অথচ দেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং অসংখ্য প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজই হলো দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা।

এত এত বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরও যদি বলা হয় আমাদের পক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ সম্ভব নয়, তবে এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ কী? আসলে সেই সুযোগই দেয়া হচ্ছে না আমাদের প্রতিষ্ঠান ও মানুষদের। মূলত একটি ‘জাতীয় হীনম্মন্যতা’ তৈরি করে দেশি-বিদেশি করপোরেট লবিস্টরা আমাদের অর্থনীতিসহ সমগ্র দেশের আত্মনির্ভর শক্তিশালী বিকাশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে।

এই জাতীয় হীনমন্যতার দেয়াল ভেঙে ‘আমাদের পক্ষেও সম্ভব’—এটি প্রমাণ করাই সরকারের জন্য একটি পরীক্ষা। এই কাজ জনপন্থী সকল মহলেরই বড় দায়িত্ব। যারা করপোরেট লবিস্ট বা ইকোনমিক হিটম্যান হিসেবে কাজ করে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে সর্বনাশা চুক্তিগুলো করেছে, সেই ‘জ্বালানি অপরাধী’দের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনাটাও প্রয়োজনীয় অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য।

বর্তমান সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত—জাতীয় সক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো, খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ করা এবং দেশের সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা। এই সম্পদ যেন শতভাগ দেশের কাজেই লাগে, তা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ঘটানোর কোনো বিকল্প নাই। বর্তমান সরকার, বিদ্বৎসমাজ, গণমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট সকলে এদিকে যথাযথ মনোযোগ দেবেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন—এটাই আজকের দিনের প্রধান দাবি।

লেখক: আনু মুহাম্মদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

সম্পর্কিত