বিশ্বায়নের এই যুগে অর্থনীতির প্রকৃত প্রাণরস প্রবাহিত হয় এক অদৃশ্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই নেটওয়ার্কটি সমুদ্রের তলদেশে বিছিয়ে রাখা ফাইবার অপটিক সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে গঠিত। এগুলোই আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদান এবং ব্যাংকিং লেনদেনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ব্যাংক, বিনিয়োগ সংস্থা, ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক ডেটা ট্রান্সমিশন সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং হরমুজ প্রণালি এই চেইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হরমুজ প্রণালি মূলত পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সংকীর্ণ এই প্রণালি সমুদ্রের তলায় বিছানো ফাইবার-অপটিক তারের এক বিশাল জালের ঠিক ওপরে অবস্থিত যা ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ডেটা পরিবহন করে। যদি কোনো কারণে যুদ্ধ, মাইন বিস্ফোরণ, ড্রোন হামলা বা ইচ্ছাকৃত নাশকতায় এই ক্যাবলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে যে প্রভাবটি দেখা দেবে তা হলো, ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া বা আংশিক ডেটা ব্ল্যাকআউট। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এটি হয়তো ধীরগতির ইন্টারনেট বা কিছু ওয়েবসাইটে প্রবেশে সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের জন্য এটি হতে পারে এক গভীর সংকটের সূচনা। ফোরেক্স মার্কেট, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারেও প্রভাব পড়বে। বিশেষত মার্কিন ডলার এবং ইউরোপীয় মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীলতা হারাতে পারে এবং আন্তর্জাতিক করপোরেট হেজিং কৌশল ব্যাহত হতে পারে।
এছাড়াও ব্যাংকিং ক্লাউড সার্ভিসেস, যেমন ক্লাউড-ভিত্তিক কোর ব্যাংকিং, ই-কমার্স লেনদেন, সংযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে ব্যর্থ হবে। ফলে ব্যাংকগুলো লেনদেন তথ্যের তাৎক্ষণিক আপডেট সরবরাহ করতে পারবে না এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা দেখা দিতে পারে। যেমনটি আমরা দেখেছি ২০০৮ সাল ও ২০১৩ সালে ভূমধ্যসাগরে সাবমেরিন ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ইন্টারনেট এবং ব্যাংকিং সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। যার ফলে লেনদেনে বিলম্ব, এটিএম সেবায় ব্যাঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল।
অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন তথ্য প্রবাহ ব্যাহত হয় তখন বাজার দক্ষতা কমে যায় এবং লেনদেন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। হরমুজ প্রণালির সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ ঘটনাই ঘটবে যেখানে তথ্যের বিলম্ব বা অনুপস্থিতি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে এবং বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াবে।
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি বড় অংশ নির্ভর করে রিয়েল-টাইম ডেটা ট্রান্সমিশনের ওপর। আন্তঃদেশীয় লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়, স্টক মার্কেট ট্রেডিং, ক্রেডিট কার্ড লেনদেন সবকিছুই দ্রুত এবং নিরবচ্ছিন্ন ডেটা প্রবাহের ওপর নির্ভর করে। সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই লেনদেনে বিলম্ব, ব্যর্থতা বা ভুল তথ্য প্রেরণের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে এই ধরনের ব্যাঘাত বড় ধরনের আর্থিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। যখন বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারবেন, আন্তর্জাতিক ডেটা ট্রান্সমিশন ঝুঁকির মুখে, তখন তারা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে সরে এসে নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকবেন। এর ফলে স্টক মার্কেটে পতন, মুদ্রার অস্থিরতা এবং পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ডেটা আমাদের অর্থনীতি চালায়। এই ডেটার প্রবাহ যদি থেমে যায়, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল ধীরগতি হবে না, যেকোনো সময় অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তাই, আন্তর্জাতিক আইন ও সমুদ্র নিরাপত্তা কাঠামোকে আধুনিকায়ন করা জরুরি।
বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব কম নয়। দেশের ব্যাংকিং খাত ক্রমশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে, রেমিট্যান্স সিস্টেম সবকিছুই আন্তর্জাতিক ডেটা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বিঘ্নিত হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও এলসি খোলা, যাচাই-বাছাই এবং নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হয়ে সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করবে। ফলে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাইবার নিরাপত্তা। যখন কোনো অঞ্চলে ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ডেটা ট্রাফিক বিকল্প রুটে পুনঃনির্দেশিত হয়। এই পুনঃনির্দেশনার সময় সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কারণ, হ্যাকাররা এই ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে পারে। ফলে ব্যাংকিং খাতে তথ্য চুরি, জালিয়াতি বা সিস্টেম হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
এই সংকট মোকাবিলার কিছু উপায় আছে। অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিকল্প রুট, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং মাল্টি-ক্যাবল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ফলে একটি ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না। তবে সমস্যা হলো, এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলো সবসময় একই মাত্রার গতি দিতে পারে না। ফলে সংকট পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয় বরং এর প্রভাব কমানোই মূল লক্ষ্য হতে পারে।
এক্ষেত্রে ব্যাংক, বিনিয়োগ সংস্থা, সরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আন্তর্জাতিক লেনদেন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ না হয়। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বিকল্প রুট, ব্যাকআপ সার্ভার এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে এই প্রস্তুতির জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নীতি প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি যেমন ডেটা ব্যাকআপ, রিডানড্যান্সি রুট, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এবং স্থানীয় সার্ভার ব্যবহারের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ সাবমেরিন ক্যাবল এবং ব্যাংকিং লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই বৈশ্বিক ঝুঁকি পর্যালোচনা এবং জরুরি পরিকল্পনা নিয়ে নিয়মিত রিয়েল-টাইম সিমুলেশন করতে হবে। আঞ্চলিক ডেটা সেন্টার এবং বিকেন্দ্রীকৃত ব্যাংকিং অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন যাতে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমে যায়।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাবমেরিন ক্যাবল একটি বৈশ্বিক সম্পদ এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুপাক্ষিক চুক্তি ও যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিয়মিত স্ট্রেস টেস্ট এবং সিমুলেশন পরিচালনা করতে হবে যাতে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের সময় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো যায় এবং ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব হয়।
ডেটা আমাদের অর্থনীতি চালায়। এই ডেটার প্রবাহ যদি থেমে যায়, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল ধীরগতি হবে না, যেকোনো সময় অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তাই, আন্তর্জাতিক আইন ও সমুদ্র নিরাপত্তা কাঠামোকে আধুনিকায়ন করা জরুরি। বর্তমান আইনগুলো মূলত জাহাজ চলাচল ও সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষার ওপর কিন্তু ডেটা অবকাঠামোর নিরাপত্তা এখনও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।
সাবমেরিন ক্যাবলগুলো সাধারণত একাধিক দেশের যৌথ বিনিয়োগে তৈরি এবং এগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সামরিক উত্তেজনার সময় এই অবকাঠামোকে ‘নন-টার্গেট’ হিসেবে বিবেচনা করার জন্য আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি শক্তিশালী করা জরুরি। কারণ, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো দৃশ্যমান ধ্বংসের মাধ্যমে নয়, বরং অদৃশ্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে এবং সেই যুদ্ধের প্রথম আঘাতই পড়বে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর যা পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
অঞ্জন কুমার রায়: ব্যাংক কর্মকর্তা