তাপদাহে আতঙ্ক নয়, চাই সতর্কতা

লেখা:
লেখা:
এ কে এম নাজমুল হক

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৩৩
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

গত কয়েকদিন এবং আজও দেশের ওপর দিয়ে একটি তাপপ্রবাহ বয়ে চলেছে। এই তাপদাহ হঠাৎ বা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। এপ্রিল মাস বাংলাদেশের উষ্ণতম মাস। সূর্যের অবস্থানগত কারণেই এ সময়ে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় দুই থেকে তিন দিন ধরে তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি থাকলে, সেটিকে আমরা তাপপ্রবাহ বলে থাকি।

আজ ২২ তারিখ; আমাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী এই তাপপ্রবাহ আগামী ২৪ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত চলতে পারে। এরপর তাপমাত্রা হ্রাস পেয়ে তাপপ্রবাহ অনেকটাই প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গত ১০-১২ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে তাপপ্রবাহের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সার্বিকভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি আমাদের সকলেরই জানা। পাশাপাশি, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলেও তাপমাত্রায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

নগরায়ণের সাথে সাথে জনসংখ্যার আধিক্যের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উদাহরণস্বরূপ, একসময় ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ছিল ৫০-৬০ লাখ, যা বর্তমানে বেড়ে আড়াই থেকে তিন কোটিতে দাঁড়িয়েছে। বিপুল এই জনসংখ্যার বসবাস ও আরাম-আয়েশের জন্য যানবাহনের ব্যবহার বেড়েছে, পুড়ছে জীবাশ্ম জ্বালানি এবং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসির ব্যবহার। এসব বহুমাত্রিক কারণে স্বাভাবিক আবহাওয়ার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কৃত্রিম এসব মানবসৃষ্ট কারণে শহরে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের 'হিট জোন' বা তীব্র তাপদাহের অঞ্চল, যা সামগ্রিক তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বহুমাত্রিক কারণে স্বাভাবিক আবহাওয়ার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কৃত্রিম এসব মানবসৃষ্ট কারণে শহরে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের 'হিট জোন' বা তীব্র তাপদাহের অঞ্চল, যা সামগ্রিক তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিগত বছরগুলোতে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র ছিল। হিটওয়েভের কারণে ক্লাসরুমে ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকের মৃত্যু বা মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে শিশুর মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও আমরা দেখেছি। ২০১৯ সালে একটানা ২৬ দিন এবং ২০২৩ সালেও প্রায় ১৮-১৯ দিন টানা তাপপ্রবাহ ছিল। ওই দুটি বছরই ছিল রেকর্ড পরিমাণ উষ্ণ। ২০২৩ সালে তো সারা বিশ্বেই দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গরম অনুভূত হয়েছে। সে তুলনায় চলতি বছর সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে আমরা তুলনামূলক সুখকর অবস্থায় আছি এবং তাপমাত্রা এখনো অনেকটা স্বাভাবিক পর্যায়েই রয়েছে।

গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যান্য বছর এ সময়ে তাপমাত্রা সাধারণত ৪১, ৪২ বা ৪৩ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়। সেই হিসেবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি অনুকূলেই বলা যায়। আমরা আশা করছি, ২৬ তারিখের পর থেকে তাপমাত্রা অনেকটাই কমে আসবে।

তীব্র গরম মানুষের জনজীবনে চরম অস্বস্তি তৈরি করে, যার প্রাথমিক প্রভাব পড়ে সরাসরি স্বাস্থ্যের ওপর। এ সময়ে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর প্রাথমিক উপায়গুলো আমাদের সবারই জানা। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩-৪টা পর্যন্ত প্রখর রোদ এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করার মাধ্যমে অনেকাংশেই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নির্দেশনাগুলো মেনে চললে এই গরমে সুস্থ থাকা সহজ হবে।

কৃষির ক্ষেত্রে টানা গরমের ফলে মাটিতে শুষ্কতা দেখা দেয়, যা ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এই ক্ষতি এড়াতে কৃষকদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া পরামর্শ ও নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। এছাড়া, যারা এই সময়ে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের উচিত ভ্রমণের আগেই আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস জেনে নেওয়া। সর্বপরি, এই তাপপ্রবাহের সময়ে যেকোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সবারই পর্যাপ্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

এ কে এম নাজমুল হক: আবহাওয়াবিদ; দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর

সম্পর্কিত