মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা বলয়ে ভারত ও পাকিস্তানের প্রবেশ কেন

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৫: ৫১
পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের সামরিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি কেবল জ্বালানি তেল বা ধর্মীয় আবেগের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বৈশ্বিক শক্তির মহড়া ও আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের এক জটিল দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে পাকিস্তানের যে একক সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব ছিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক ‘ভারত কার্ড’ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত মিত্রতা তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’র মাধ্যমে আবুধাবি ও তেলআবিবের মধ্যে যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সূচনা হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের চিরচেনা ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে ভারত, ইসরায়েল, আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত ‘I2U2’ জোটের উদয় আরব্য মরুভূমিতে এক নতুন প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে, যেখানে ইসরায়েলের উন্নত প্রযুক্তি, ভারতের বিশাল জনশক্তি এবং আমিরাতের পুঁজি একীভূত হচ্ছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এখন কেবল সীমান্ত রেখায় সীমাবদ্ধ না থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যৌথ সামরিক মহড়া ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের লড়াইয়ে আছড়ে পড়ছে।

একদিকে সৌদি-পাকিস্তান প্রথাগত সামরিক সংহতি এবং অন্যদিকে আমিরাত-ভারত-ইসরায়েল অক্ষের এই মেরুকরণ মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন ছায়াযুদ্ধের রণক্ষেত্রে রূপান্তরিত করেছে। ইসলামাবাদের কূটনৈতিক মধ্যস্থতা বনাম আমিরাতের অর্থনৈতিক চাপের এই দ্বৈরথ প্রমাণ করে যে, উপমহাদেশের শত্রুতা এখন ‘আরব সংস্করণে’ এক জটিল ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’র মাধ্যমে আবুধাবি ও তেলআবিবের মধ্যে যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সূচনা হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের চিরচেনা ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিয়েছে।

রিয়াদ-ইসলামাবাদ অক্ষ বনাম আবুধাবি-নয়াদিল্লি সমীকরণ

পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের সামরিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৬৭, ১৯৭৩ এবং ১৯৮২ সালে সৌদি আরবের ভূখণ্ড রক্ষায় পাকিস্তানি বাহিনীর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সাম্প্রতিক চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তানের সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন ইসলামাবাদের ‘প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতি’র ধারাবাহিকতা মাত্র।

বর্তমানে সৌদি আরবে আনুমানিক ৭০,০০০ থেকে ৮০,০০০ পাকিস্তানি সামরিক সদস্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা মিশনে নিয়োজিত। ২০২৪-২৫ সালের নতুন চুক্তি অনুযায়ী, অত্যাধুনিক জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-৩ যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণও এই সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত।

অন্যদিকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চুক্তিতে সই করেছে। এর মাধ্যমে আমিরাত তৃতীয় আরব দেশ হিসেবে ইসরায়েলকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে তেল আবিবে আমিরাতের এবং আবুধাবিতে ইসরায়েলের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস ও রাষ্ট্রদূত নিয়োজিত রয়েছে।

সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত তার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির প্রয়োজনে ভারতকে প্রধান মিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। ভারতের সঙ্গেও ইসরায়েলের ঐতিহাসিক সামরিক যোগাযোগ তাদের এই সমীকরণকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের দিমোনা এলাকায় ‘লিটল ইন্ডিয়া’র অস্তিত্ব—যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে মাইগ্রেশন করা ইহুদিরা বাস করে—এই সম্পর্কের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দিক উন্মোচন করে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আমেরিকা-ইসরায়েল কর্তৃক ইরান আক্রমণের কিছুদিন আগেও নরেন্দ্র মোদির তেলআবিব সফর এবং তাদের মধ্যকার বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে একটি নতুন ‘প্রতিরক্ষা বলয়’ তৈরি হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত যেভাবে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের মেলবন্ধন ঘটিয়ে উপমহাদেশীয় দ্বৈরথকে মধ্যপ্রাচ্যের আঙিনায় টেনে এনেছে, তা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

আমিরাতের ‘ভারত কার্ড’ এবং উপমহাদেশের শত্রুতার স্থানান্তর

সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মধ্যে আঞ্চলিক নেতৃত্ব নিয়ে বিদ্যমান সূক্ষ্ম প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন প্রতিরক্ষা কূটনীতির নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে। আবুধাবি এখন আর ভারতকে কেবল সস্তা শ্রমবাজার বা প্রথাগত সামরিক সহযোগী হিসেবে দেখছে না; বরং তারা নয়াদিল্লিকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী ‘কৌশলগত কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

এই পরিবর্তনের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ এবং পরবর্তী সময়ে ভারত-ইসরায়েল-আমিরাত-যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত ‘I2U2’ জোট। বর্তমানে ভারত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের একক বৃহত্তম ক্রেতা (৪২%), আর এই ত্রিপক্ষীয় অক্ষের মাধ্যমে ইসরায়েলি সামরিক প্রযুক্তি, আমিরাতের বিশাল পুঁজি এবং ভারতের দক্ষ জনবল একত্রিত হচ্ছে।

আমিরাত এখন তার আকাশসীমায় ইরান বা হুথি ড্রোন মোকাবিলায় ইসরায়েলের তৈরি ‘বারাক’ মিসাইল সিস্টেম ও রাডার ব্যবহার করছে, যেখানে ভারতের সঙ্গে তাদের ৩ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। এই সমীকরণে ভারত-পাকিস্তানের চিরশত্রুতা এখন আর কেবল কাশ্মীর সীমান্ত বা হিমালয়ের পাদদেশে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা আরব্য মরুভূমির প্রতিরক্ষা বলয়ে আছড়ে পড়ছে।

আবুধাবির এই ‘ভারতবান্ধব’ নীতি মূলত ইসলামাবাদকে কৌশলগতভাবে কোণঠাসা করার একটি প্রয়াস, যা উপমহাদেশের ঐতিহাসিক সংঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক ভয়ংকর ‘আরব সংস্করণে’ রূপ দিচ্ছে। ফলে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যকার সামরিক গভীরতা এখন আমিরাতের নিরাপত্তার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানকে তার দীর্ঘদিনের প্রভাব বলয় থেকে বিচ্যুত করছে। এই ক্ষমতার স্থানান্তর কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যকেও এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ইরান-আমেরিকা সংলাপ এবং পাকিস্তানের ওপর বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চাপ

২০২৬ সালের এপ্রিলে ইসলামাবাদে আয়োজিত ঐতিহাসিক ইরান-আমেরিকা সংলাপ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এই কূটনৈতিক সেতুবন্ধনকে আবুধাবি তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাকিস্তানের ওপর।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আমেরিকা-ইসরায়েল কর্তৃক ইরান আক্রমণের কিছুদিন আগেও নরেন্দ্র মোদির তেলআবিব সফর এবং তাদের মধ্যকার বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে একটি নতুন ‘প্রতিরক্ষা বলয়’ তৈরি হচ্ছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় আমিরাত থেকে প্রায় ১৭ লাখ পাকিস্তানি নাগরিককে বের করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি ইসলামাবাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য এক ‘মহাবিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে; কারণ দেশটির মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ২৫%-৩০% (মাসে ৫০০-৬০০ মিলিয়ন ডলার) আসে এই মরুদেশ থেকেই। তবে এই সংকটময় মুহূর্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধের চাপে থাকা পাকিস্তানকে উদ্ধারে আবারও ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সৌদি আরব।

রিয়াদ সম্প্রতি ইসলামাবাদকে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক প্যাকেজ এবং বিদ্যমান ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়েছে, যা পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে এক গভীর পতন থেকে রক্ষা করেছে।

আমিরাতের এই অর্থনৈতিক চাপ ইসলামাবাদকে ইরানের প্রভাব বলয় থেকে দূরে রাখার একটি ‘কূটনৈতিক অস্ত্র’, যেখানে সৌদি আরবের সমর্থন পাকিস্তানের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে কিছুটা অক্সিজেন দিচ্ছে। তবে আমিরাত-ভারত-ইসরায়েল অক্ষের বিপরীতে এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানের জন্য এখন মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত যেভাবে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের মেলবন্ধন ঘটিয়ে উপমহাদেশীয় দ্বৈরথকে মধ্যপ্রাচ্যের আঙিনায় টেনে এনেছে, তা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একদিকে রিয়াদ-ইসলামাবাদ সামরিক অক্ষ, অন্যদিকে আবুধাবি-নয়াদিল্লি-তেল আবিব (I2U2) কৌশলগত জোট—এই দুই মেরুকরণ মধ্যপ্রাচ্যকে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য এক নতুন ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

আমিরাত এখন কেবল তার নিরাপত্তার জন্যই ভারতের জনবল ও ইসরায়েলের ‘বারাক’ বা ‘পেগাসাস’-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে না, বরং এর মাধ্যমে তারা পাকিস্তানকে আঞ্চলিক প্রভাব বলয় থেকে সুকৌশলে বিচ্যুত করছে। এই ক্ষমতার লড়াই প্রমাণ করে যে, ভূরাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণ বদলে এখন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পুঁজিই প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামাবাদে ইরান-আমেরিকা সংলাপের মতো ঘটনা যখন আমিরাতকে বিচলিত করে, তখন পাকিস্তানের ওপর নেমে আসা অর্থনৈতিক খড়গ এই দ্বৈরথকে আরও তিক্ত করে তোলে। যদিও সৌদি আরবের আর্থিক আশ্বাস পাকিস্তানকে সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ভারত-ইসরায়েল-আমিরাত অক্ষের এই উত্থান দক্ষিণ এশীয় চিরশত্রুতার বিষবাষ্পকে আরব্য মরুভূমিতে স্থায়ীভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সম্পর্কিত