আমদানিনির্ভর কৃষি: বাংলাদেশের জন্য সতর্ক-সংকেত

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৮: ০০
স্ট্রিম গ্রাফিক

আমি চাকরি করি। তার পাশাপাশি ছাদে বাগান করি। ছোট এক জায়গায় মাটি, সার, পানি আর রোদের হিসাব মেলাতে মেলাতে একদিন বুঝতে পেরেছিলাম, কৃষি আসলে কতটা নাজুক একটি শিল্প।

একটি গাছের পাতা হলদে হয়ে যায় যখন নাইট্রোজেনের অভাব হয়। ফল ঝরে পড়ে যখন ফসফরাস নেই। ডাল শুকিয়ে আসে পটাশিয়াম না পেলে। এই তিনটি উপাদান ছাড়া গাছ বাঁচে না, ফসল হয় না। আর এই তিনটি উপাদানের মূল বাহক হলো রাসায়নিক সার।

আমার ছাদের সীমানায় এটা একটা ছোট সমস্যা। কিন্তু আঠারো কোটি মানুষের বাংলাদেশে, যেখানে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল, সেখানে সারের সংকট মানে কেবল ফসল না হওয়া নয়, সেটা মানে একটা জাতির বেঁচে থাকার সংগ্রামে নতুন বাধা।

মধ্যপ্রাচ্যে এখন যে আগুন জ্বলছে, সেই আগুনের তাপ পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিটি ফসলের মাঠে। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তায় বিশ্ববাজারে সারের দাম কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে টনপ্রতি ৪৮০ ডলার থেকে ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে। শতাংশের হিসেবে বৃদ্ধি ২৫ এর বেশি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালে যে ধাক্কা খেয়েছিল বাংলাদেশ, সেই স্মৃতি এখনও তাজা। সেই বছর বাংলাদেশকে সার আমদানিতে গুনতে হয়েছিল প্রায় ২৩৯ কোটি মার্কিন ডলার। শুধু জানুয়ারি মাসেই আমদানি ব্যয় পৌঁছেছিল ছয় হাজার কোটি টাকার ঘরে। তখনও বলা হয়েছিল, এবার শিক্ষা নিতে হবে। কিন্তু শিক্ষা কি নেওয়া হয়েছে?

প্রশ্নটা জরুরি, কারণ পরিস্থিতি এখন আরও জটিল। বাংলাদেশে বছরে ৬৮ থেকে ৬৯ লাখ টন রাসায়নিক সারের চাহিদা। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ টন, ডিএপি ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন। মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই আসে আমদানি থেকে।

এই আমদানিনির্ভরতা এখন রীতিমতো একটি জাতীয় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। তার ওপর আছে গ্যাস সংকটের মার। দেশে ছয়টি ইউরিয়া কারখানা আছে, কিন্তু গ্যাস সরবরাহ না থাকায় পাঁচটিই এখন সাময়িকভাবে বন্ধ। দেশের ভেতরে উৎপাদনের পথ রুদ্ধ, বাইরের বাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখী। এই দুটি সংকট একসঙ্গে এলে কী হয়, সেটা আর কল্পনার বিষয় নয়।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মোট ২৬ লাখ ৩৫ হাজার টন সার আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিএপি ১১ লাখ ৭৬ হাজার টন, এমওপি ৮ লাখ ৫৯ হাজার টন এবং টিএসপি সাড়ে ছয় লাখ টন। সৌদি আরবের সঙ্গে বছরে ছয় লাখ টন ডিএপি আমদানির চুক্তি থাকলেও হরমুজ প্রণালির কারণে সেই সরবরাহ এখন অনিশ্চিত।

চলতি মাসে ৪০ হাজার টনের একটি লট আনার কথা ছিল, সেটিও স্থগিত করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এখন দেশে মোট মজুত আছে ১৬ লাখ ৮৪ হাজার টন। এই মজুত মে থেকে জুন পর্যন্ত চলবে বলে সরকার আশাবাদী। কিন্তু জুনের পর আমন মৌসুম।

বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে আমন থেকে। সেই মৌসুমের জন্য সার আসবে কোথা থেকে, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়।

সরকার বসে নেই, এটা স্বীকার করতে হবে। পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে তিন লাখ টন আসবে সরকার থেকে সরকার পদ্ধতিতে, বাকি দুই লাখ টন উন্মুক্ত দরপত্রে। মিশর তিন লাখ টন করে ডিএপি ও টিএসপি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত দিতে চাইছে দুই লাখ টন করে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি।

চীনের সঙ্গে ডিএপি আমদানির চুক্তি নবায়ন হচ্ছে এবং বার্ষিক পরিমাণ ২ লাখ ৮০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ২০ হাজার টনে নেওয়ার কাজ চলছে। একটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসার কথা ছিল, সেটি যুদ্ধের কারণে আটকে আছে। মিসরের সঙ্গে নতুন চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনাও আছে শিগগিরই।

এগুলো ভালো খবর, নিঃসন্দেহে। কিন্তু প্রতিটি সংকটে এভাবে দৌড়ে বিকল্প খোঁজার প্রবণতা নিজেই একটি সমস্যার লক্ষণ। এই সংকটের শেষ প্রভাব কি কেবল কৃষকের ঘরে পড়বে? মোটেই না।

কৃষি অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সার সংকটের প্রভাব তেলের দামের মতো তাৎক্ষণিক নয়। কিন্তু কয়েক মাস পরে যখন ফলন কমে, তখন বাজারে চাল, আলু, পেঁয়াজ, সবজির দাম বাড়তে থাকে এবং সেই চাপ সবচেয়ে বেশি সহ্য করতে হয় সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষকে।

২০২৪ সালের আগস্টে বন্যায় প্রায় দুই লাখ হেক্টর আমন ধান নষ্ট হয়েছিল। তার প্রভাবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোটা চালের গড় খুচরা দাম বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। শুধু বন্যার প্রভাবেই এতটা। এর ওপর যদি সার সংকট আসে, ফলন কমে, তাহলে চালের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেই হিসাব করলে রাতে ঘুম আসে না।

এখানেই ছাদবাগানী আমি একটা কথা বলতে চাই। দেশের কৃষিজ উন্নতির জন্য জৈব সারের গুরুত্ব অপরিসীম, এটা কেবল বইয়ে পড়িনি, নিজের হাতে অনুভব করেছি। কম্পোস্ট আর ভার্মিকম্পোস্ট দিয়ে যখন গাছের গোড়া সতেজ হয়ে ওঠে, পাতায় গাঢ় সবুজ রং ফেরে, তখন বোঝা যায় মাটি আসলে জীবন্ত একটি সত্তা।

রাসায়নিক সার সেই মাটিকে তাৎক্ষণিক ফলন দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার জৈব পদার্থ কমিয়ে দেয়, মাটির প্রাণশক্তি নষ্ট করে দেয়। বাংলাদেশে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ গত কয়েক দশকে উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। একসময় দেশের মাটিতে জৈব পদার্থের গড় পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, এখন তা নেমে এসেছে গড়ে ১ দশমিক ৭ শতাংশেরও নিচে। এই ক্ষয় ঠেকাতে হলে জৈব সারের কোনো বিকল্প নেই। গ্রামে গ্রামে গোবর, কচুরিপানা, ফসলের অবশিষ্টাংশ পড়ে থাকে অকাজে। এগুলো থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার জৈব সার তৈরি করা সম্ভব, অথচ সেই সম্পদ আজও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।

তাহলে নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রশ্ন হলো, সংকট আসার পরে সমাধান খোঁজা কি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হতে পারে? উত্তর হওয়া উচিত না।

এই মুহূর্তে অন্তত পাঁচটি কাজ জরুরি ভিত্তিতে করা দরকার। প্রথমত, সার আমদানির উৎস বহুমুখী করতে হবে এবং সেটা কেবল সংকটের সময় নয়, একটি স্থায়ী নীতি হিসেবে। একটি বা দুটি দেশের উপর এতটা নির্ভরশীল থাকা যে কতটা বিপজ্জনক, তা এই সংকট আবারও প্রমাণ করল।

দ্বিতীয়ত, গ্যাস সংকট সমাধান করে সার কারখানাগুলো সচল রাখতে হবে। পাঁচটি কারখানা বন্ধ থাকার মানে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে যা দেশেই উৎপাদন করা যেত।

তৃতীয়ত, জৈব সারের উৎপাদন ও বিতরণকে জাতীয় কার্যক্রম হিসেবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে নিতে হবে। বোরো ও আমনে যে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহার হয়, তার একটি অংশও যদি জৈব বিকল্পে সরানো যায়, আমদানির চাপ কমবে এবং মাটির স্বাস্থ্য বাঁচবে।

চতুর্থত, কৃষকদের সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করতে হবে, কারণ অতিরিক্ত সার ব্যবহারে ফলন বাড়ে না, বরং মাটি ও পরিবেশের ক্ষতি হয়।

পঞ্চমত, জরুরি মজুত ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে যাতে বৈশ্বিক সংকটে ছয় মাস নয়, কমপক্ষে এক বছরের মজুত সবসময় মজুদ থাকে।

খাদ্য নিরাপত্তা কেবল কৃষকের সমস্যা নয়, এটা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সতর্কবার্তা হলো, সার সংকট এই সংখ্যাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ধান উৎপাদন হয়েছে প্রায় তিন কোটি ৯২ লাখ টন। ঘাটতি নেই বললেই চলে। কিন্তু এই উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতেই হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কবে থামবে, হরমুজ প্রণালি কবে আবার নিরাপদ হবে, সেটা কেউ জানে না। কিন্তু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা যদি এই সংকটকে কেবল একটি সাময়িক ঝামেলা মনে করেন, তাহলে ভুল হবে। আগামী বছরের আমন মৌসুমে কোনো কৃষক যদি শূন্য হাতে মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন, সেই দায়ের ভার বহন করতে হবে আজকের সিদ্ধান্তগ্রহীতাদেরই।

সম্পর্কিত