কোটি টাকার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ভিড়ে না নৌযান

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ভোলা

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ০৮: ২৫
সামনের নদীতে চর পড়ায় ভোলা সদরের কাঠিরমাথা এলাকার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ভিড়তে পারে না জেলেদের নৌকা। স্ট্রিম ছবি

ভোলায় মেঘনা তীরে প্রায় ১৩ কোটি টাকায় নির্মিত দুটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র চালুর আগেই কার্যকারিতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হলেও এখন একটিতে নৌযানই ভিড়তে পারছে না। আরেকটি করা হয়েছে অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন এলাকায়। রক্ষণাবেক্ষণেও দেওয়া হয়নি জনবল। ফলে বিশ্বব্যাংকের ঋণের অর্থে নির্মিত স্থাপনাগুলো কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠিরমাথায় এবং লালমোহন উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের বুড়িরদোন এলাকায় এই অবতরণ কেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা হয়েছে।

স্থানীয় জেলে, ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, প্রকল্পটির পদে পদে রয়েছে পরিকল্পনাহীনতা ও অনিয়মের ছাপ। নির্মাণস্থল নির্বাচন থেকে শুরু করে অবকাঠামোর মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেন তাঁরা।

প্রকল্পটি নকশা, ব্যয় কিংবা সরঞ্জামের বিষয়ে জানতে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান স্ট্রিম প্রতিবেদক। তবে সেখানে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরে সরেজমিনে দেখা যায়, নদী তীরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় ভবন। নেই জেলেদের আনাগোনা। অধিকাংশ কক্ষ তালাবদ্ধ। কোনো কার্যক্রমই দেখা যায়নি।

চর জেগে বন্ধ নৌচলাচল

ভোলা সদরের কাঠিরমাথা এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটির সামনে নদীতে জেগেছে বিশাল চর। এতে কেন্দ্রটিতে বড় নৌযান বা ট্রলার ভিড়তে পারছে না। স্থানীয় জেলেদের দাবি, মাছ খালাস বা বেচাকেনার জন্য এই ঘাট কার্যত অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় জেলে রহিম মাঝি বলেন, এ ঘাটে ছোট ছোট ৩০-৪০টি নৌকা আসবে। এসব নৌকায় যে পরিমাণ মাছ ধরা পড়ে, তার জন্য এত বড় ভবনের দরকার নেই। উল্টো এখানে মাছ বিক্রি করতে গেলে টোল দিতে হবে। তাই জেলেরা নদীর পাড়েই মাছ বিক্রি করবে।

ঘাটের আড়তদার মাকসুদ ব্যাপারী বলেন, মাছ বেচাকেনার যে প্রচলিত ব্যবস্থা আছে, তা এখানে নেই। এটি ব্যবসায়ী বা জেলেদের কোনো উপকারেই আসবে না।

জসিম উদ্দিন নামে আরেক জেলের অভিযোগ, ভবন চালুর আগেই বিভিন্ন স্থানে টাইলস উঠে যাচ্ছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় এ অবস্থা হয়েছে।

জনমানবহীন এলাকায় অবতরণ কেন্দ্র

লালমোহনের বুড়িরদোন এলাকায় নির্মিত অবতরণ কেন্দ্রটি করা হয়েছে বেড়িবাঁধের বাইরে নির্জন স্থানে। সেখানে যাওয়ার কোনো ভালো রাস্তা নেই। নদীর ঢেউ ভবনের দেয়ালে আছড়ে পড়ে। ভবনের গেটে ঝুলছিল বড় বড় তালা।

স্থানীয় জেলে সফিজল মাঝি বলেন, সরকার কী উদ্দেশ্যে ভবন করেছে, তা জানি না। এটি জেলেদের কী কাজে লাগবে, সেটাও কেউ বলেনি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ও জমিদাতা মনির খান বলেন, চুক্তি অনুযায়ী জেনারেটর, মিনি হিমাগার, ডিজিটাল স্কেল, বরফ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল। কিন্তু কিছুই দেওয়া হয়নি। ভবনের বিভিন্ন অংশেও ত্রুটি রয়েছে।

প্রকল্পের তথ্য নেই জেলা অফিসে

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প’র আওতায় দেশের ১০টি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মধ্যে দুটি নির্মাণ করা হয়েছে ভোলায়। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল উপকূলীয় অঞ্চলে মাছের বাজারব্যবস্থা উন্নয়ন, অপচয় কমানো ও জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন।

অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। সেখানে প্রকল্প দুটি শেষ হয়েছে দেখানো হলেও ব্যয় ও বরাদ্দসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। পরে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে প্রকল্পের ব্যয়, নকশা বা সরঞ্জামের তালিকা সংক্রান্ত তথ্য চাইলেও দিতে পারেননি কর্মকর্তারা।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গত ১২ মার্চ স্থাপনাগুলো বুঝে নিয়েছি। কিন্তু কাজের নকশা বা সরঞ্জামের তালিকা আমাদের দেওয়া হয়নি। পুরো কাজ তদারকি করেছে মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দপ্তর।

তিনি আরও বলেন, ভবনগুলোর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখনো জনবল দেওয়া হয়নি। এ কারণে মালপত্র চুরি বা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার ঠিকাদারের

স্থানীয়রা চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সুবিধা না দিয়েই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল তোলার অভিযোগ করলেও তা অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার শহিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বরাদ্দ অনুযায়ী যা যা ছিল, সবই দেওয়া হয়েছে। বরং দুই প্রকল্পে অতিরিক্ত প্রায় চার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সেই অর্থ সমন্বয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।

চালু করা সম্ভব দাবি

প্রকল্পের উপপরিচালক আজহারুল ইসলাম বলেন, অবতরণ কেন্দ্রগুলোর উদ্দেশ্য হলো জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন। এগুলো জেলেদের মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়ার কথা।

স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে টেকসই অবস্থা ও জমির বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। এখন যেহেতু অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, তাই সবার সহযোগিতায় এগুলো চালু করা সম্ভব।

সম্পর্কিত