ড্রোনের যুগে যুদ্ধবিগ্রহের বিবর্তন
সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

গত মাসের মাঝামাঝি সময়ের দিকের কোনো একটি ভোর। রাশিয়ার রাজধানী মস্কো এবং এর আশপাশের অঞ্চলে এযাবৎকালের অন্যতম বৃহৎ দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। এই হামলা একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুদ্ধের ধরন সম্পর্কে আমাদের সামনে নতুন এক গভীর বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এখনকার যুদ্ধ কেবল ট্যাংক, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন বা মিসাইল হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত—উভয় দিক থেকেই এটি খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহের এক অভূতপূর্ব লড়াই, যেখানে প্রতিটি পক্ষই নিজেদের বয়ান বা ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠায় লড়ে যায়।
সামরিক দিক থেকে এই হামলায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব খুব একটা সামনে আসেনি। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এর কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সবার জন্যই অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের উত্তেজনা নিরসরে দরকষাকষি চলছে। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চতুর্থ বছরে গড়িয়েছে। ইউক্রেন তার পরাশক্তি প্রতিবেশীর তুলনায় সামরিক দিক থেকে দুর্বল এবং মূলত পশ্চিমা দেশ ও ন্যাটো জোটের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই সময়েও তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে যে অসম যুদ্ধকৌশল দেখিয়েছে, তা আমাদের দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞদেরও গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
জানা গেছে, এই হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো ছিল মাঝারি আকারের এবং হালকা। এগুলোর বিস্ফোরক বহন করার ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য রাশিয়ার সামরিক শক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে দুর্বল করা ছিল না। বরং ধারণা করা যায়, রাষ্ট্র রাশিয়া, এর জনগণ এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে কিছু রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বার্তা দেওয়াই ছিল এর আসল লক্ষ্য।
প্রথম বার্তাটি হতে পারে রাজনৈতিক ও মানসিক স্থিতিশীলতা নিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো এবং শহরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে এই হামলা বাড়ানো হয়, যাতে ইউক্রেনের মানুষের মনোবল ভেঙে পড়ে। কিন্তু মস্কোতে এই ড্রোন হামলার মাধ্যমে কিয়েভ বোঝাতে চেয়েছে যে, এই অসম যুদ্ধে তারা এখনো টিকে আছে। তাদের মনোবল ও প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে পড়েনি। তারা এখন আর শুধু আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পাল্টা আঘাত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং নিজেদের যুদ্ধকৌশলেও পরিবর্তন এনেছে।
দ্বিতীয় বার্তাটি হলো তাদের প্রযুক্তিগত ও শিল্পগত সক্ষমতা। ইউক্রেন হয়তো দেখাতে চেয়েছে, রাশিয়ার টানা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরও তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। বরং তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিপুলসংখ্যক সস্তা অথচ কার্যকর ড্রোন তৈরি করতে পারছে। এসব ড্রোন শত শত কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এই বার্তাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক যুদ্ধে জয়-পরাজয় শুধু দামি যুদ্ধবিমান বা ভারী অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না। বরং কম খরচের প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্রও যুদ্ধের হিসাবনিকাশ বদলে দিতে পারে। এই ড্রোনগুলো 'ন্যাটোর তৈরি' ছিল না, এগুলো ছিল সম্পূর্ণ 'কিয়েভের তৈরি'। অর্থাৎ, পশ্চিমা অস্ত্র পেলেও ইউক্রেন যে পুরোপুরি পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরশীল নয়—এই কথাটি তারা রাশিয়া এবং পুরো বিশ্বকে জানাতে চেয়েছে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গভীর বার্তাটি বেশ প্রতীকী। তা হলো—ইউক্রেন যুদ্ধ এখন খোদ মস্কোর ঘরের দরজায় পৌঁছে গেছে। যুদ্ধের শুরু থেকে সংঘাত মূলত ইউক্রেনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেনকে বলে আসছিল, তারা যেন রাশিয়ার ভেতরে পশ্চিমা অস্ত্র দিয়ে হামলা না চালায়। কিন্তু এখন যুদ্ধের ভৌগোলিক সীমানা ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে এর কিছুটা তুলনা করা যায়। ইউক্রেন খুব সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের তৈরি অস্ত্র ব্যবহার করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা এখন রাশিয়ার ভেতরেও যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মস্কো ও এর আশপাশের সাধারণ নাগরিকদের ধারণকৃত হামলার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের আসল শক্তিটা লুকিয়ে আছে ঠিক এখানেই। কারণ, সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারে যে 'দূরের যুদ্ধ আর দূরে নেই, বরং নিজেদের ঘরের কাছে চলে এসেছে', তখনই যুদ্ধের গতি ও মাত্রা সম্পূর্ণ বদলে যায়।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা। আমাদের নিরাপত্তা ও সামরিক পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো বা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত তো বটেই, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধও প্রমাণ করেছে যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে বহুমাত্রিক বা 'হাইব্রিড', প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক এবং মনস্তাত্ত্বিক। সস্তা ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার হামলা, ইলেকট্রনিক জ্যামিং, স্যাটেলাইট তথ্য এবং তথ্যযুদ্ধ—এসবের মাধ্যমে ছোট বা মাঝারি দেশগুলোও বড় শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
তাই বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান, স্বাধীন ও সামুদ্রিক রাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির ধারণাকেও নতুনভাবে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। শুধু প্রচলিত অস্ত্র কেনা নয়; বরং কিছু বিষয়ে আমাদের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন: দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উন্নয়ন, ড্রোন এবং ড্রোন ঠেকানোর (অ্যান্টি-ড্রোন) সক্ষমতা অর্জন, সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, বর্ডার-উপকূলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরালকরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সামরিক বাহিনী সমুহের মধ্যে প্রযুক্তিগত সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সমুদ্রে নজরদারি, চালকবিহীন যান এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা কৌশল খুবই জরুরি হয়ে উঠবে। কারণ, ভবিষ্যতের সংঘাত সবসময় সরাসরি যুদ্ধ হিসেবে নাও আসতে পারে। বরং এটি আসতে পারে সমুদ্রপথ অবরোধ, সাইবার হামলা, তথ্যযুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, ড্রোনের অনুপ্রবেশ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় চোরাগোপ্তা বা অসম আঘাত হিসেবে।
সুতরাং, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক মস্কো হামলার সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি শুধু সামরিক নয়, বরং কৌশলগত। এই হামলা প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক যুদ্ধের মূল ভিত্তি হলো একটি রাষ্ট্রের দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, প্রযুক্তির উদ্ভাবন, মানসিক শক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সহনশীলতা।
ভবিষ্যতের অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই রাষ্ট্রই স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকবে, যারা এই বাস্তবতা দ্রুত শিখতে ও বিষয়গুলো কাজে লাগাতে পারবে। যারা প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে এবং নিজস্ব প্রযুক্তিতে নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে, তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষের এটি শুধু প্রত্যাশা নয়, বরং প্রাণের দাবি।
কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

গত মাসের মাঝামাঝি সময়ের দিকের কোনো একটি ভোর। রাশিয়ার রাজধানী মস্কো এবং এর আশপাশের অঞ্চলে এযাবৎকালের অন্যতম বৃহৎ দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। এই হামলা একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুদ্ধের ধরন সম্পর্কে আমাদের সামনে নতুন এক গভীর বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এখনকার যুদ্ধ কেবল ট্যাংক, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন বা মিসাইল হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত—উভয় দিক থেকেই এটি খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহের এক অভূতপূর্ব লড়াই, যেখানে প্রতিটি পক্ষই নিজেদের বয়ান বা ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠায় লড়ে যায়।
সামরিক দিক থেকে এই হামলায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব খুব একটা সামনে আসেনি। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এর কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সবার জন্যই অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের উত্তেজনা নিরসরে দরকষাকষি চলছে। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চতুর্থ বছরে গড়িয়েছে। ইউক্রেন তার পরাশক্তি প্রতিবেশীর তুলনায় সামরিক দিক থেকে দুর্বল এবং মূলত পশ্চিমা দেশ ও ন্যাটো জোটের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই সময়েও তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে যে অসম যুদ্ধকৌশল দেখিয়েছে, তা আমাদের দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞদেরও গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
জানা গেছে, এই হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো ছিল মাঝারি আকারের এবং হালকা। এগুলোর বিস্ফোরক বহন করার ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য রাশিয়ার সামরিক শক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে দুর্বল করা ছিল না। বরং ধারণা করা যায়, রাষ্ট্র রাশিয়া, এর জনগণ এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে কিছু রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বার্তা দেওয়াই ছিল এর আসল লক্ষ্য।
প্রথম বার্তাটি হতে পারে রাজনৈতিক ও মানসিক স্থিতিশীলতা নিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো এবং শহরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে এই হামলা বাড়ানো হয়, যাতে ইউক্রেনের মানুষের মনোবল ভেঙে পড়ে। কিন্তু মস্কোতে এই ড্রোন হামলার মাধ্যমে কিয়েভ বোঝাতে চেয়েছে যে, এই অসম যুদ্ধে তারা এখনো টিকে আছে। তাদের মনোবল ও প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে পড়েনি। তারা এখন আর শুধু আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পাল্টা আঘাত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং নিজেদের যুদ্ধকৌশলেও পরিবর্তন এনেছে।
দ্বিতীয় বার্তাটি হলো তাদের প্রযুক্তিগত ও শিল্পগত সক্ষমতা। ইউক্রেন হয়তো দেখাতে চেয়েছে, রাশিয়ার টানা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরও তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। বরং তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিপুলসংখ্যক সস্তা অথচ কার্যকর ড্রোন তৈরি করতে পারছে। এসব ড্রোন শত শত কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এই বার্তাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক যুদ্ধে জয়-পরাজয় শুধু দামি যুদ্ধবিমান বা ভারী অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না। বরং কম খরচের প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্রও যুদ্ধের হিসাবনিকাশ বদলে দিতে পারে। এই ড্রোনগুলো 'ন্যাটোর তৈরি' ছিল না, এগুলো ছিল সম্পূর্ণ 'কিয়েভের তৈরি'। অর্থাৎ, পশ্চিমা অস্ত্র পেলেও ইউক্রেন যে পুরোপুরি পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরশীল নয়—এই কথাটি তারা রাশিয়া এবং পুরো বিশ্বকে জানাতে চেয়েছে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গভীর বার্তাটি বেশ প্রতীকী। তা হলো—ইউক্রেন যুদ্ধ এখন খোদ মস্কোর ঘরের দরজায় পৌঁছে গেছে। যুদ্ধের শুরু থেকে সংঘাত মূলত ইউক্রেনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেনকে বলে আসছিল, তারা যেন রাশিয়ার ভেতরে পশ্চিমা অস্ত্র দিয়ে হামলা না চালায়। কিন্তু এখন যুদ্ধের ভৌগোলিক সীমানা ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে এর কিছুটা তুলনা করা যায়। ইউক্রেন খুব সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের তৈরি অস্ত্র ব্যবহার করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা এখন রাশিয়ার ভেতরেও যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মস্কো ও এর আশপাশের সাধারণ নাগরিকদের ধারণকৃত হামলার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের আসল শক্তিটা লুকিয়ে আছে ঠিক এখানেই। কারণ, সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারে যে 'দূরের যুদ্ধ আর দূরে নেই, বরং নিজেদের ঘরের কাছে চলে এসেছে', তখনই যুদ্ধের গতি ও মাত্রা সম্পূর্ণ বদলে যায়।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা। আমাদের নিরাপত্তা ও সামরিক পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো বা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত তো বটেই, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধও প্রমাণ করেছে যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে বহুমাত্রিক বা 'হাইব্রিড', প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক এবং মনস্তাত্ত্বিক। সস্তা ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার হামলা, ইলেকট্রনিক জ্যামিং, স্যাটেলাইট তথ্য এবং তথ্যযুদ্ধ—এসবের মাধ্যমে ছোট বা মাঝারি দেশগুলোও বড় শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
তাই বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান, স্বাধীন ও সামুদ্রিক রাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির ধারণাকেও নতুনভাবে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। শুধু প্রচলিত অস্ত্র কেনা নয়; বরং কিছু বিষয়ে আমাদের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন: দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উন্নয়ন, ড্রোন এবং ড্রোন ঠেকানোর (অ্যান্টি-ড্রোন) সক্ষমতা অর্জন, সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, বর্ডার-উপকূলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরালকরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সামরিক বাহিনী সমুহের মধ্যে প্রযুক্তিগত সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সমুদ্রে নজরদারি, চালকবিহীন যান এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা কৌশল খুবই জরুরি হয়ে উঠবে। কারণ, ভবিষ্যতের সংঘাত সবসময় সরাসরি যুদ্ধ হিসেবে নাও আসতে পারে। বরং এটি আসতে পারে সমুদ্রপথ অবরোধ, সাইবার হামলা, তথ্যযুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, ড্রোনের অনুপ্রবেশ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় চোরাগোপ্তা বা অসম আঘাত হিসেবে।
সুতরাং, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক মস্কো হামলার সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি শুধু সামরিক নয়, বরং কৌশলগত। এই হামলা প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক যুদ্ধের মূল ভিত্তি হলো একটি রাষ্ট্রের দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, প্রযুক্তির উদ্ভাবন, মানসিক শক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সহনশীলতা।
ভবিষ্যতের অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই রাষ্ট্রই স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকবে, যারা এই বাস্তবতা দ্রুত শিখতে ও বিষয়গুলো কাজে লাগাতে পারবে। যারা প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে এবং নিজস্ব প্রযুক্তিতে নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে, তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষের এটি শুধু প্রত্যাশা নয়, বরং প্রাণের দাবি।
কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

বর্তমান সরকারের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কূটনৈতিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নতুন ঢাকা-আঙ্কারা অক্ষ কোনো একক পরাশক্তির ওপর অতি-নির্ভরতা কমিয়ে ঢাকার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে সুদৃঢ় করছে। সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারত্বের এই মেলবন্ধন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে...
৩ ঘণ্টা আগে
রাজনীতিতে ইতিহাস কখনো কখনো নির্মম রসিকতা করে। যে শক্তিকে ব্যবহার করে কেউ ক্ষমতায় ওঠে, একদিন সেই শক্তিই তার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকট সেই বাস্তবতারই আরেক উদাহরণ।
৪ ঘণ্টা আগে
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে পরাজিত করে এক বছরের জন্য এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেছেন।
৬ ঘণ্টা আগে
আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে সীমান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হয়। সীমানার মধ্য দিয়ে দুটি রাষ্ট্রের সীমানাই কেবল নির্ধারিত হয় না, বরং রাষ্ট্রের নাগরিকদের অবাধ চলাচলের সীমারেখা ও নিয়ন্ত্রণের যৌক্তিকতাও নির্ধারিত হয়।
২০ ঘণ্টা আগে