জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

তারুণ্যের ওপরই ভরসা করে আছি

প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৭: ২৪
এআই জেনারেটেড ছবি

সব প্রজন্মেই এটা দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের প্রজন্মে দেখেছি, আমার কন্যাদের সময়েও সেটা ঘটেছে; বর্তমান সময়েও তা দেখছি। সমাজ ও দেশভেদেও এর পরিবর্তন হয়নি। সব দেশে, সব প্রজন্মেই বয়স্করা বলেছেন, তরুণরা অস্থিরমতি, হঠকারী এবং প্রগলভ। তারা শুধু সবকিছু ভাঙ্গতে চায়, বদলাতে চায় সামাজিক বিধি-বিধান, রীতি-নীতি, ফ্যাশন, দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস, স্থিতিশীলতা। তারা দমকা হাওয়ার মতো– সবকিছু উড়িয়ে নিতে চায়।

অন্যদিকে তরুণরা বলে, বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। সমাজ কাঠামো, সামাজিক রীতি-নীতি, বদলাচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ। ভাষা, আচার-ব্যবহারও বদলে যাচ্ছে। এই বদলে যাওয়া পৃথিবীর জন্য পুরনো ঘুণে ধরা ব্যবস্থা আর কাজ করছে ন। তাই প্রথাগত কাঠামোর খোল-নলচে বদলাতে হবে। তরুণদের ভাষ্য মতে, বিবর্তনের মাধ্যমে এ পরিবর্তন আসবে না; এর জন্য লাগবে বিপ্লব। প্রথাগত ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতা দেখতে পায় বলেই কাঠামো বদলের জন্য তরুণদের এমন আকুলতা।

সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় তরুণরা প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে কয়েকটি বিশেষ কারণে। প্রথমত, তাদের প্রাণশক্তি। সমাজ পরিবর্তনে যে জীবনীশক্তি প্রয়োজন, তার প্রধান উৎস হচ্ছে তরুণ সমাজ। দ্বিতীয়ত, তরুণদের উদ্দামতা ও প্রাণ-উন্মাদনা। সতর্ক হিসেব-নিকেশ করে সব সময় সমাজে পরিবর্তন আনা যায় না। অনেক সময় সেখানে প্রয়োজন হয় বেহিসাবি ঝাঁপিয়ে পড়া। কোন পরিবর্তনই ঝুঁকিমুক্ত হয় না। সেখানে তরুণদেরই ঝুঁকি নেওয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে। তৃতীয়ত, প্রথাগত চিন্তা-চেতনার বাইরে গিয়ে নতুন ও অপ্রথাগতভাবে চিন্তা করার বিরল ক্ষমতা তরুণদের আছে। এখান থেকেই আসে তাদের সৃজনশীলতা– সমাজ পরিবর্তনের জন্য যা অপরিহার্য। চতুর্থত, তরুণদের সাহস ও মনোবল। যে কোনো সমাজ পরিবর্তনে সাহস ও মনোবল জরুরি। তরুণরা হচ্ছে সেই কাঙ্ক্ষিত সাহস ও মনোবলের মূল আধার। পঞ্চমত, তরুণ সমাজ অতি দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করতে পারে, যা সব রকম পরিবর্তনের জন্য অপরিহার্য।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তরুণদের শক্তি কী করে সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবী বদলে দিয়েছে যুগে যুগে, দেশে দেশে। না, ইতিহাসের দ্বারস্থ হচ্ছি না এর উত্তরের জন্য। আমি বরং আমার পড়া, আমার শোনা এবং আমার দেখা ঘটনার উল্লেখ করি আমার যুক্তির সপক্ষে।

ছোটবেলায় ভারতের মুক্তিসংগ্রামে তরুণদের আত্মাহুতি দেওয়ার অনেক গল্প পড়েছিলাম– ক্ষুদিরাম ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে গিয়েছিলেন; সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি ঘোষ কুমিল্লায় ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে হত্যা করেছিলেন; সত্যেন বসু ও কানাইলাল দত্ত সম্পৃক্ত ছিলেন আলীপুর বোমা মামলায়। এইসব তরুণই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক বিশাল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্র পরিবর্তনের সংগ্রামে তরুণদের শক্তির সঙ্গে কিশোর আমার সেই প্রথম পরিচয়। বুঝেছিলাম, তরুণের সাহস, মনোবল ও শক্তির কাছে ক্ষমতাধর প্রতিপক্ষও দাঁড়াতে পারে না।

সময়টা ১৯৭০। ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। বিশ্বের তরুণ সমাজ তখন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত। নানান দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা আন্দোলন করছে, পতাকা পোড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্রসমাজও সোচ্চার ভিয়েতনামে তাদের সরকারের অংশগ্রহণ ও গৃহীত নীতির বিরুদ্ধে। দিনটি মে ৪। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়। শ্লোগানমুখর সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় ভিয়েতনাম যুদ্ধকে ক্যাম্বোডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার মার্কিনি হীন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচণ্ড উত্তেজনা– ন্যাশনাল গার্ডদের নিয়ে আসা হয়েছে অবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্যে। হঠাৎ গুলির শব্দ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল জেফরি মিলার। তার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল জেফরির বন্ধু মেরি অ্যান ভেক্কিও। দু’হাত মেলে কী এক আর্ত, অসহায় কিন্তু দ্রোহের ভঙ্গি তার! সেই ছবি প্রতীকী হয়ে উঠল পৃথিবীর ইতিহাসে তারুণ্যের প্রতিবাদের। সেই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ভিয়েতনাম প্রশ্নে অবস্থানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কলাম্বিয়া বা বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তরুণরা ভিয়েতনামে মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে। দু’বছরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম থেকে বেরিয়ে আসে।

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের ছাত্রসমাজের এই যে লড়াই ও বিজয়, তা তারুণ্যের বিশাল শক্তিরই পরিচায়ক। এ শক্তি শুধু আন্দোলনের শক্তি ছিল না; নিজেদের দলবদ্ধ করার শক্তি ছিল না। এ ছিল বিশাল এক নৈতিক শক্তি ও নৈতিক বিজয়। তারুণ্যের এই বিজয় দুটো সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল– এক, পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় অন্যায় দেখলে তরুণরা তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেবে এবং দুই, তারুণ্যের শক্তির কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তিও মাথা নোয়াতে বাধ্য।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে তারুণ্যের শক্তির পরিচয় আমরা পেয়েছি। মুক্তিসংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছে আমাদের ছাত্রসমাজ। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিসংগ্রামে আমাদের ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য– তাঁরা এগিয়ে নিয়ে গেছে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে। তাঁরা প্রমাণ করেছে, ‘বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ যা ভাবে, বাংলাদেশ তা ভাবে আগামীকাল’। একটি অঙ্গীকার নিয়ে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আর উন্মাদনা নিয়ে ৭১-এ তরুণ সমাজ ঘর ছেড়ে যুদ্ধে গিয়েছিল। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রই তৈরি করে ফেলল। বাংলাদেশ তরুণদের স্বপ্নের, আকাঙ্ক্ষার ফসল। সে পথযাত্রায় আমার প্রজন্ম এবং আমিও ছিলাম।

সে পথযাত্রার মূল কথা ছিল শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়; জনগণের মুক্তিও। সে মুক্তি আকাঙ্ক্ষার ব্যাপ্তি ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। স্বাধীনতার প্রায় আড়াই দশক পর অবশ্য দেখা গেল, সময় বয়ে গেছে; কিন্তু জনগণের মুক্তি আসেনি। আবার ছাত্রদের নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে আন্দোলন। তাদের দমনের জন্যে তাদের ওপর ট্রাক তুলে দেয় শাসককুল। গুলিতে মারা যায় কত তাজা প্রাণ। জন্ম নেয় সেই অবিস্মরণীয় শব্দগুচ্ছে– ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য তরুণ সমাজ গড়ে তোলে এক গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি। ১৯৯০ সালের সেই গণঅভ্যুত্থানে ঘটে ক্ষমতার পট পরিবর্তন।

সেই গণঅভ্যুত্থানেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল তরুণ সমাজের– পরিবর্তনের দাবিতে, জনগণের মুক্তির দাবিতে। পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষেত্রে তাদের শক্তির পরিচয় এতে আবারও পরিস্ফুট হয়ে উঠেছিল সবার কাছে। তারপর অনেক সময় পেরিয়ে গেছে; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। আসেনি জনগণের মুক্তি, গণতন্ত্রের মুক্তি। বরং অন্যায়, অবিচার, স্বেচ্ছাচারিতা জেঁকে বসে পুরো কাঠামোতে– যেখানে জনগণ অধিকার হারিয়েছে, সুবিচার পায়নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের সুবাদে একটি সুবিধাভাগী গোষ্ঠী শুধু সম্পদের পাহাড়ই গড়ে তোলেনি; সেই সম্পদ নিরাপদে পাচার করেছে বাইরে। জনঅসন্তোষ, জনউৎপীড়ন জন্ম দিয়েছে একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ আকাঙ্ক্ষার, যার জন্য ছাত্র-জনতা আবার নেমেছিল সংগ্রামে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সংগ্রামের পরম্পরা ধরেই এসেছে। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনে আবারও তারুণ্যের শক্তি উদ্ভাসিত হয়েছে। তারুণ্য আজ শুধু পরিবর্তনের সংগ্রামে রত নয়; পরিবর্তন ঘটানোর সক্ষমতায় স্থিত। আজ তাই তারুণ্যের শক্তি নবতর মাত্রিকতা লাভ করেছে। আমরা সবাই চেয়ে আছি– কোন পথে সে যায়।

  • সেলিম জাহান: অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, লেখক

সম্পর্কিত