মহাবিস্মৃতি
আনুশেহ আনাদিল

বর্তমান সময়ের ভয়াবহ ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো—মানুষে মানুষে বিভাজন। আমরা এই বিভাজনে এতই ডুবে আছি যে, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার শব্দও টের পাচ্ছি না। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক পরিচয় আর মতাদর্শ নিয়ে আমরা সারাক্ষণ দ্বন্দ্বে মেতে আছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্তহীন তর্কে আমরা ভীষণ ব্যস্ত। অথচ আমাদের চোখের সামনেই নদীগুলো মরে যাচ্ছে, বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। ফসলের বীজ চলে যাচ্ছে বড় বড় কোম্পানির দখলে। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির ওপর তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশের মতো দেশে এই সংকট খুব স্পষ্ট। এখানে মানুষ প্রতিদিন তর্ক করছে—কে সাচ্চা মুসলমান, কে দেশপ্রেমিক, কে আধুনিক আর কে প্রগতিশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বিভেদকে আরও উসকে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিভাজন এখন একধরনের বিনোদনে পরিণত হয়েছে। আর ধর্মীয় সংঘাত রূপ নিয়েছে সস্তা জনমোহন নাটকে। অথচ আমাদের সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। নদীদূষণ, বন ধ্বংস বা আদিবাসীদের জমি হারানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। কৃষির ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে বিষ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তার এবং মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হারানোর মতো ভয়াবহ সমস্যাগুলো চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।
আধুনিক মানুষ ক্রমশ এমন এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে, যেখানে তাকে জোর করে ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত রাখা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত একজনকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্যজনের বিরুদ্ধে। মানুষের মধ্যে এই বিভাজন যত বাড়ছে, আড়ালে থাকা ক্ষমতার কাঠামো তত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে।
এটি অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। উপনিবেশবাদ সব সময়ই ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত বিভাজনকে প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত করেছিল। জনগণকে নিজেদের ভেতর বিভক্ত করে রাখা ছিল শাসনের সহজ উপায়। স্বাধীনতার বহু দশক পরেও সেই মানসিক কাঠামো আজও রয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক আমলের ভয়, সন্দেহ, বিভাজন আর প্রশাসনিক সংস্কৃতি এখনো আমাদের রাজনৈতিক চিন্তায় গভীরভাবে গেঁথে আছে।
আজকের ডিজিটাল যুগে সেই পুরোনো বিভাজন আরও নতুন রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তির অ্যালগরিদম এখন মানুষের রাগকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে, কারণ রাগ খুব দ্রুত ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের ক্ষোভ, ভয় ও উগ্রতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
অথচ আমাদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হলো পরিবেশের সংকট।
নদী কোনো রোমান্টিক প্রতীক নয়; নদী মানেই জীবন। বন কোনো বিলাসিতা নয়; বন হলো আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত। বীজ কেবল ব্যবসার পণ্য নয়; বীজ হলো সভ্যতার ধারাবাহিকতা। একইভাবে, মাটি কেবল একটি সম্পত্তি নয়; মাটি মানেই আমাদের অস্তিত্ব।
আমাদের বাংলার সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুন্দরবন, হাওর, বিল বা বর্ষাকাল—এগুলো শুধু ভূগোলের বিষয় নয়। এগুলো আমাদের সংস্কৃতির আত্মা। বাংলার গান, কবিতা, কৃষি, খাদ্য, লোকজ জ্ঞান কিংবা আধ্যাত্মিকতা—সবকিছুই এই প্রকৃতির বুক থেকে জন্ম নিয়েছে। তাই নদী মরলে শুধু পানি শুকিয়ে যায় না। এর সঙ্গে মানুষের স্মৃতি মরে যায়, সংস্কৃতি মরে যায়। এমনকি ভাষার সুরও বদলে যায়।
কিন্তু আধুনিক উন্নয়নব্যবস্থা প্রকৃতিকে কোনো জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখে না। প্রকৃতিকে এখন কেবল ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখা হয়—যা শুধু তুলে আনা যায়, বিক্রি করা যায় এবং ভোগ করা যায়।
আজ বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক কর্পোরেট কাঠামো আমাদের খাদ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। একফসলি কৃষি, রাসায়নিক নির্ভরতা, জেনেটিকভাবে নিয়ন্ত্রিত বীজ, কীটনাশক নির্ভর উৎপাদন এবং দূরবর্তী কর্পোরেট সরবরাহব্যবস্থা স্থানীয় কৃষিকে ধ্বংস করছে। কৃষক তার নিজের বীজ হারাচ্ছে। গ্রাম হারাচ্ছে তার স্বনির্ভরতা। লোকজ চিকিৎসা, মাটির জ্ঞান, মৌসুমি চাষাবাদ, স্থানীয় বৈচিত্র্য—সবকিছু ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে।
এই সংকট কেবল অর্থনীতির নয়; এটি গভীরভাবে আমাদের সংস্কৃতি ও আত্মিক বিষয়ের সঙ্গেও জড়িত।
মানুষ যখন মাটির সঙ্গে সম্পর্ক হারায়, তখন সে নিজের সঙ্গেও সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে। সে আর কিছু উৎপাদন করে না, কেবলই ভোক্তায় পরিণত হয়। মানুষ তখন প্রকৃতির সন্তান না থেকে বাজারের পণ্যে পরিণত হয়। ফলে গ্রামগুলো খালি হয়ে যায়। লোকসংগীত হারিয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের অর্জন করা জ্ঞানও ধীরে ধীরে মুছে যায়।
এর পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে প্রযুক্তির নজরদারি। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, দৈনন্দিন অভ্যাস, চলাফেরা আর যোগাযোগ—সবকিছুই এখন তথ্যভান্ডারে জমা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অ্যালগরিদম, ডিজিটাল পরিচয়পত্র এবং কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ফলে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
ইতিহাস বলে, মানুষ যখন ভয় পায়, তখন সে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিনিময়ে হলেও নিরাপত্তা পেতে চায়। অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, সন্ত্রাস, মহামারি কিংবা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা—এসবের মধ্য দিয়ে মানুষকে সহজেই আরও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া যায়।
তবে এখানেই লুকিয়ে আছে আরেকটি বড় বিপদ। বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় জটিল বিষয়গুলোকে খুব সহজ হিসেবে ধরে নেয়। তারা পৃথিবীকে শুধু ‘ভালো বনাম মন্দ’—এই দুই ভাগে ভাগ করে ফেলে। তখন পুরো একটি জাতি, ধর্ম বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে একমাত্র শত্রু হিসেবে দেখা শুরু হয়। কিন্তু আমাদের বাস্তব পৃথিবী এত সরল নয়।
শোষণ কেবল একটি রাষ্ট্র, একটি জাতি বা একটি ধর্মের মাধ্যমে হয় না। কর্পোরেট লোভ, সামরিক আধিপত্য, উগ্রবাদ, দুর্নীতি, নজরদারি পুঁজিবাদ, স্বৈরতন্ত্র এবং পরিবেশ ধ্বংস—এগুলো বিভিন্ন রূপে বিশ্বের নানা জায়গায় কাজ করে যাচ্ছে।
ঠিক এ কারণেই সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং সংহতি এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বহুত্ববাদ। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, আদিবাসী, সুফি, বাউল, শাক্ত, বৈষ্ণব, লোকজ ও আধ্যাত্মিক নানা ধারার মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেছে। এই অঞ্চল তার শ্রেষ্ঠ অবস্থায় ছিল তখনই, যখন এখানে নানা মত ও পথের মানুষ মিলেমিশে একসঙ্গে থেকেছে।
কিন্তু আধুনিক রাজনীতি এই বৈচিত্র্যকে রক্ষা করার বদলে তাকে বিভেদ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
একবার ভেবে দেখুন তো—
মানুষ যদি ধর্মীয় ঘৃণার পেছনে না ছুটে নদী রক্ষার জন্য একজোট হতো?
যদি বন রক্ষা রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতো?
যদি বীজ সংরক্ষণ সামাজিক মাধ্যমের তর্কের চেয়ে বেশি জরুরি মনে হতো?
আমরা যদি নেতাদের এভাবে বিচার করতাম—তিনি কতগুলো নদী পরিষ্কার করেছেন, কতটা বন ফিরিয়ে এনেছেন, কতজন কৃষককে স্বনির্ভর করেছেন বা কতটা দুর্নীতি কমিয়েছেন?
ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সম্ভবত শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে লড়াই হবে না। সেই লড়াই হবে পরিবেশের বিপর্যয় থেকে টিকে থাকার লড়াই। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও পানির সংকট, অতিরিক্ত গরম, জলবায়ু উদ্বাস্তু এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো বিষয়গুলোই আগামী শতকের রাজনীতি কেমন হবে, তা ঠিক করে দেবে।
এত কিছুর পরও আশার জায়গা আছে।
বাংলা এখনো পৃথিবীর অন্যতম উর্বর একটি ভূখণ্ড। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে এখনো নিজস্ব কৃষিজ্ঞান, লোকসংস্কৃতি, চিকিৎসাজ্ঞান, সংগীত, ভাষা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক জীবনের ঐতিহ্য রয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন পরিবেশ, টেকসই কৃষি, স্থানীয় উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে।
আমাদের ভবিষ্যৎ এখনো নির্দিষ্ট হয়ে যায়নি। কিন্তু তা সুন্দর করার জন্য প্রয়োজন সাহস—
ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার সাহস, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস, নদী ও বন বাঁচানোর সাহস, বহুজাতিক শোষণের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বনির্ভরতার সাহস এবং সবচেয়ে বড় কথা—মানুষকে আবার কেবলই ‘মানুষ’ হিসেবে দেখার সাহস।
দিন শেষে, ভবিষ্যতের সংগ্রাম হয়তো সভ্যতার বিরুদ্ধে সভ্যতার যুদ্ধ নয়। এই লড়াই হয়তো হবে সেই সব শক্তির বিরুদ্ধে, যারা এই পৃথিবীকে কেবল একটি ‘বাজার’ হিসেবে দেখে। আর এই লড়াইটি লড়বে সেই সব মানুষ, যারা এখনো বিশ্বাস করে—পৃথিবী বিক্রির কোনো পণ্য নয়, পৃথিবী আমাদের সবার বেঁচে থাকার একটি জীবন্ত ঘর।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও লেখক

বর্তমান সময়ের ভয়াবহ ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো—মানুষে মানুষে বিভাজন। আমরা এই বিভাজনে এতই ডুবে আছি যে, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার শব্দও টের পাচ্ছি না। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক পরিচয় আর মতাদর্শ নিয়ে আমরা সারাক্ষণ দ্বন্দ্বে মেতে আছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্তহীন তর্কে আমরা ভীষণ ব্যস্ত। অথচ আমাদের চোখের সামনেই নদীগুলো মরে যাচ্ছে, বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। ফসলের বীজ চলে যাচ্ছে বড় বড় কোম্পানির দখলে। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির ওপর তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশের মতো দেশে এই সংকট খুব স্পষ্ট। এখানে মানুষ প্রতিদিন তর্ক করছে—কে সাচ্চা মুসলমান, কে দেশপ্রেমিক, কে আধুনিক আর কে প্রগতিশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বিভেদকে আরও উসকে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিভাজন এখন একধরনের বিনোদনে পরিণত হয়েছে। আর ধর্মীয় সংঘাত রূপ নিয়েছে সস্তা জনমোহন নাটকে। অথচ আমাদের সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। নদীদূষণ, বন ধ্বংস বা আদিবাসীদের জমি হারানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। কৃষির ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে বিষ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তার এবং মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হারানোর মতো ভয়াবহ সমস্যাগুলো চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।
আধুনিক মানুষ ক্রমশ এমন এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে, যেখানে তাকে জোর করে ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত রাখা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত একজনকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্যজনের বিরুদ্ধে। মানুষের মধ্যে এই বিভাজন যত বাড়ছে, আড়ালে থাকা ক্ষমতার কাঠামো তত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে।
এটি অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। উপনিবেশবাদ সব সময়ই ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত বিভাজনকে প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত করেছিল। জনগণকে নিজেদের ভেতর বিভক্ত করে রাখা ছিল শাসনের সহজ উপায়। স্বাধীনতার বহু দশক পরেও সেই মানসিক কাঠামো আজও রয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক আমলের ভয়, সন্দেহ, বিভাজন আর প্রশাসনিক সংস্কৃতি এখনো আমাদের রাজনৈতিক চিন্তায় গভীরভাবে গেঁথে আছে।
আজকের ডিজিটাল যুগে সেই পুরোনো বিভাজন আরও নতুন রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তির অ্যালগরিদম এখন মানুষের রাগকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে, কারণ রাগ খুব দ্রুত ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের ক্ষোভ, ভয় ও উগ্রতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
অথচ আমাদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হলো পরিবেশের সংকট।
নদী কোনো রোমান্টিক প্রতীক নয়; নদী মানেই জীবন। বন কোনো বিলাসিতা নয়; বন হলো আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত। বীজ কেবল ব্যবসার পণ্য নয়; বীজ হলো সভ্যতার ধারাবাহিকতা। একইভাবে, মাটি কেবল একটি সম্পত্তি নয়; মাটি মানেই আমাদের অস্তিত্ব।
আমাদের বাংলার সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুন্দরবন, হাওর, বিল বা বর্ষাকাল—এগুলো শুধু ভূগোলের বিষয় নয়। এগুলো আমাদের সংস্কৃতির আত্মা। বাংলার গান, কবিতা, কৃষি, খাদ্য, লোকজ জ্ঞান কিংবা আধ্যাত্মিকতা—সবকিছুই এই প্রকৃতির বুক থেকে জন্ম নিয়েছে। তাই নদী মরলে শুধু পানি শুকিয়ে যায় না। এর সঙ্গে মানুষের স্মৃতি মরে যায়, সংস্কৃতি মরে যায়। এমনকি ভাষার সুরও বদলে যায়।
কিন্তু আধুনিক উন্নয়নব্যবস্থা প্রকৃতিকে কোনো জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখে না। প্রকৃতিকে এখন কেবল ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখা হয়—যা শুধু তুলে আনা যায়, বিক্রি করা যায় এবং ভোগ করা যায়।
আজ বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক কর্পোরেট কাঠামো আমাদের খাদ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। একফসলি কৃষি, রাসায়নিক নির্ভরতা, জেনেটিকভাবে নিয়ন্ত্রিত বীজ, কীটনাশক নির্ভর উৎপাদন এবং দূরবর্তী কর্পোরেট সরবরাহব্যবস্থা স্থানীয় কৃষিকে ধ্বংস করছে। কৃষক তার নিজের বীজ হারাচ্ছে। গ্রাম হারাচ্ছে তার স্বনির্ভরতা। লোকজ চিকিৎসা, মাটির জ্ঞান, মৌসুমি চাষাবাদ, স্থানীয় বৈচিত্র্য—সবকিছু ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে।
এই সংকট কেবল অর্থনীতির নয়; এটি গভীরভাবে আমাদের সংস্কৃতি ও আত্মিক বিষয়ের সঙ্গেও জড়িত।
মানুষ যখন মাটির সঙ্গে সম্পর্ক হারায়, তখন সে নিজের সঙ্গেও সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে। সে আর কিছু উৎপাদন করে না, কেবলই ভোক্তায় পরিণত হয়। মানুষ তখন প্রকৃতির সন্তান না থেকে বাজারের পণ্যে পরিণত হয়। ফলে গ্রামগুলো খালি হয়ে যায়। লোকসংগীত হারিয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের অর্জন করা জ্ঞানও ধীরে ধীরে মুছে যায়।
এর পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে প্রযুক্তির নজরদারি। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, দৈনন্দিন অভ্যাস, চলাফেরা আর যোগাযোগ—সবকিছুই এখন তথ্যভান্ডারে জমা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অ্যালগরিদম, ডিজিটাল পরিচয়পত্র এবং কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ফলে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
ইতিহাস বলে, মানুষ যখন ভয় পায়, তখন সে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিনিময়ে হলেও নিরাপত্তা পেতে চায়। অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, সন্ত্রাস, মহামারি কিংবা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা—এসবের মধ্য দিয়ে মানুষকে সহজেই আরও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া যায়।
তবে এখানেই লুকিয়ে আছে আরেকটি বড় বিপদ। বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় জটিল বিষয়গুলোকে খুব সহজ হিসেবে ধরে নেয়। তারা পৃথিবীকে শুধু ‘ভালো বনাম মন্দ’—এই দুই ভাগে ভাগ করে ফেলে। তখন পুরো একটি জাতি, ধর্ম বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে একমাত্র শত্রু হিসেবে দেখা শুরু হয়। কিন্তু আমাদের বাস্তব পৃথিবী এত সরল নয়।
শোষণ কেবল একটি রাষ্ট্র, একটি জাতি বা একটি ধর্মের মাধ্যমে হয় না। কর্পোরেট লোভ, সামরিক আধিপত্য, উগ্রবাদ, দুর্নীতি, নজরদারি পুঁজিবাদ, স্বৈরতন্ত্র এবং পরিবেশ ধ্বংস—এগুলো বিভিন্ন রূপে বিশ্বের নানা জায়গায় কাজ করে যাচ্ছে।
ঠিক এ কারণেই সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং সংহতি এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বহুত্ববাদ। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, আদিবাসী, সুফি, বাউল, শাক্ত, বৈষ্ণব, লোকজ ও আধ্যাত্মিক নানা ধারার মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেছে। এই অঞ্চল তার শ্রেষ্ঠ অবস্থায় ছিল তখনই, যখন এখানে নানা মত ও পথের মানুষ মিলেমিশে একসঙ্গে থেকেছে।
কিন্তু আধুনিক রাজনীতি এই বৈচিত্র্যকে রক্ষা করার বদলে তাকে বিভেদ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
একবার ভেবে দেখুন তো—
মানুষ যদি ধর্মীয় ঘৃণার পেছনে না ছুটে নদী রক্ষার জন্য একজোট হতো?
যদি বন রক্ষা রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতো?
যদি বীজ সংরক্ষণ সামাজিক মাধ্যমের তর্কের চেয়ে বেশি জরুরি মনে হতো?
আমরা যদি নেতাদের এভাবে বিচার করতাম—তিনি কতগুলো নদী পরিষ্কার করেছেন, কতটা বন ফিরিয়ে এনেছেন, কতজন কৃষককে স্বনির্ভর করেছেন বা কতটা দুর্নীতি কমিয়েছেন?
ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সম্ভবত শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে লড়াই হবে না। সেই লড়াই হবে পরিবেশের বিপর্যয় থেকে টিকে থাকার লড়াই। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও পানির সংকট, অতিরিক্ত গরম, জলবায়ু উদ্বাস্তু এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো বিষয়গুলোই আগামী শতকের রাজনীতি কেমন হবে, তা ঠিক করে দেবে।
এত কিছুর পরও আশার জায়গা আছে।
বাংলা এখনো পৃথিবীর অন্যতম উর্বর একটি ভূখণ্ড। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে এখনো নিজস্ব কৃষিজ্ঞান, লোকসংস্কৃতি, চিকিৎসাজ্ঞান, সংগীত, ভাষা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক জীবনের ঐতিহ্য রয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন পরিবেশ, টেকসই কৃষি, স্থানীয় উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে।
আমাদের ভবিষ্যৎ এখনো নির্দিষ্ট হয়ে যায়নি। কিন্তু তা সুন্দর করার জন্য প্রয়োজন সাহস—
ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার সাহস, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস, নদী ও বন বাঁচানোর সাহস, বহুজাতিক শোষণের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বনির্ভরতার সাহস এবং সবচেয়ে বড় কথা—মানুষকে আবার কেবলই ‘মানুষ’ হিসেবে দেখার সাহস।
দিন শেষে, ভবিষ্যতের সংগ্রাম হয়তো সভ্যতার বিরুদ্ধে সভ্যতার যুদ্ধ নয়। এই লড়াই হয়তো হবে সেই সব শক্তির বিরুদ্ধে, যারা এই পৃথিবীকে কেবল একটি ‘বাজার’ হিসেবে দেখে। আর এই লড়াইটি লড়বে সেই সব মানুষ, যারা এখনো বিশ্বাস করে—পৃথিবী বিক্রির কোনো পণ্য নয়, পৃথিবী আমাদের সবার বেঁচে থাকার একটি জীবন্ত ঘর।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও লেখক

মিশেল দ্য সের্তো বলেছিলেন, ক্ষমতাহীন মানুষের প্রধান অস্ত্র হলো দৈনন্দিন জীবনের ভিতর ছোট ছোট প্রতিরোধ। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) সেই প্রতিরোধেরই এক ডিজিটাল রূপ। এখানে যুবসমাজ বলছে— তোমরা আমাদের অপমান করবে, আমরা সেই অপমানকেই আত্মপরিচয়ে পরিণত করব। কিন্তু এই প্রতিবাদের স্থায়িত্ব মানুষের রাজনৈতিক সংগঠ
১৯ ঘণ্টা আগে
গত কয়েক মাসে ঢাকার নানা সেমিনার আর আলোচনায় একটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে—শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর দাবি। বিষয়টি অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার আগে একই দাবি ওঠে, আলোচনা হয়, স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এরপর বাজেট আসে, টাকার অঙ্ক কিছুটা বাড়ে ঠিকই, কিন্তু জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ আবার কমে যা
১৯ ঘণ্টা আগে
বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে দেখলাম, জনাপাঁচেক মানুষ একটা স্মার্টফোনের ওপর ঝুঁকে আছে। সবার চোখে এক ধরনের আদিম উত্তেজনা। ফোনের স্ক্রিনে একটা ভিডিও চলছে—কোনো এক জায়গায় শিশু ধর্ষণের খবর। জটলার ভেতরের ছাইরঙা টি-শার্ট পরা লোকটা দাঁত কিড়মিড় করে বলল, ‘মামা, এডিরে ধইরা মাঝরাস্তায় পিটায়া মারা দরকার। লাইভ করা
২০ ঘণ্টা আগে
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের মূল চালিকাশক্তি এখন আর খনিজ তেল বা কোনো ভূখণ্ড নয়, বরং চোখের আড়ালে থাকা এক ক্ষুদ্র অণুপ্রযুক্তি—সেমিকনডাক্টর বা মাইক্রোচিপ। আর এই বৈশ্বিক চিপ বিপ্লবের স্নায়ুকেন্দ্র হলো তাইওয়ান, যার একক একাধিপত্যকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে মার্কিন-চীন ভূরাজনৈতিক
১ দিন আগে