ইরান যুদ্ধে আমাদের নিরাপত্তাহীনতা

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ২১: ২৩
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় শান্তি প্রক্রিয়া বিপন্ন হয়ে পড়ল কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জানাজা সম্পন্নের পরপরই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য হরমুজ প্রণালিতে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা দায়ী বলেই মনে হচ্ছে।

বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে, এতে মোটামুটি সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন বলছেন, সেই সমঝোতার মেয়াদ ফুরিয়েছে। ওমান সংলগ্ন হরমুজের একাংশ দিয়ে ‘বিকল্প নৌরুট’ চালুতে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় হলে ইরান তা বানচালে যা করার করেছে। আক্রান্ত দেশটি তার এ ‘কৌশলগত হাতিয়ার’ ছাড়তে নারাজ। হরমুজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্নিহিত অপর দেশ ওমানের সঙ্গে আলোচনা করতেও দেখা যাচ্ছে ইরানকে।

সমস্যার দিক হলো, হামলা-পাল্টা হামলায় হরমুজ পুনরায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব থাকবে বিশেষত জ্বালানি তেলের বাজারে। রাসায়নিক সারের উল্লেখযোগ্য অংশও হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হয়। আর এ দুই ক্ষেত্রেই আমরা বিপুলভাবে আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হওয়ায় ডিজেলসহ জ্বালানির দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এর প্রভাবে নতুন করে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনাও কিছুটা এলোমেলো হয়েছে। আশা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা এলে আমাদের অর্থনীতিতেও এর সুপ্রভাব পড়বে।

ইরানের ওপর হামলার জেরে যেসব দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি আক্রান্ত হচ্ছে, সেসব দেশেই আবার রয়েছে বহু বাংলাদেশি। তাদের নিরাপত্তা ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শংকা উপেক্ষণীয় নয়। ওইসব দেশে নতুন জনশক্তি রপ্তানি ব্যাহত বলেও আমরা আশা করছিলাম, যে সমীকরণেই হোক—যুদ্ধের দ্রুত অবসান হোক। দুর্ভাগ্যবশত, সেই প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হলেও তা টেকসই হতে দেখা যাচ্ছে না।

ইরান যুদ্ধে কোন পক্ষ জয়ী, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ যুগের যুদ্ধে জয়-পরাজয় ভিন্নভাবেও নির্ধারিত হয়ে থাকে। কোনো কোনো অঞ্চলে সংঘটিত যুদ্ধের প্রভাব দুনিয়াজুড়ে বিস্তৃত হতেও দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সিংহভাগ দেশ তেলসমৃদ্ধ বলে সেখানে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রভাব থাকে এর আমদানিকারক দেশগুলোয়। ইরানের সঙ্গে তেমন বাণিজ্য না থাকলেও তার পাল্টা হামলার শিকার দেশগুলো থেকে আমরা বিপুল জ্বালানি ও সার আমদানি করে আসছি। ওইসব দেশে পণ্যসামগ্রী রপ্তানি উল্লেখযোগ্য না হলেও আমাদের জনশক্তি রপ্তানি বিরাট। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে অর্থনৈতিক উন্নয়নে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে এমন সম্পর্ক আরও বেশ কিছু দেশের রয়েছে। এইসব দেশের মানুষ একযোগে চাইছে ইরান যুদ্ধের আশু অবসান এবং সেখানে স্থায়ী শান্তি।

হালে খবর মিলেছিল, কাতার এনার্জি বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুত এলএনজির বড়জোর অর্ধেক জোগাতে পারবে। কেননা যুদ্ধে তাদের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত। হরমুজ বন্ধ থাকার সময়ও অন্যান্য উৎস থেকে এলএনজিসহ জ্বালানি আমদানি বাড়াতে হয়েছিল আর সেটা অনেক বেশি মূল্যে। খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সার আমদানিও করতে হয়েছে অধিক দামে। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ দিয়ে ক্রুড আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের একমাত্র রিফাইনারিও বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

এ অবস্থায় বাংলাদেশকে জোর দিতে হচ্ছে জ্বালানি আমদানির উৎসগুলোকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করার কাজে। তবে দ্রুত সেটি নিশ্চিত করা কঠিন। প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে কোনো দেশই আবার চায় না এর চলমান সুবিধাজনক ব্যবস্থাপনা ছাড়তে। জনশক্তি রপ্তানিকেও বৈচিত্র্যপূর্ণ করার দাবি রয়েছে। দ্রুত সে লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন। এ অবস্থায় আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, ইরান যুদ্ধ অবসানে চলমান দূতিয়ালি নতুন ধাপে উন্নীত হোক এবং আসুক টেকসই সাফল্য।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত