আমেরিকায় ‘গণতন্ত্রের পরীক্ষা’ কি এখনো চলছে

লেখা:
লেখা:
জোনাথন এস্তে

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ১৮: ৫৮
ছবি: সংগৃহীত

১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই তৎকালীন ১৩টি আমেরিকান উপনিবেশের প্রতিনিধিরা ফিলাডেলফিয়ায় একত্রিত হয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের।

তবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার আগেই ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সেই যুদ্ধ স্বাধীনতার ঘোষণার পর আরও সাত বছর অব্যাহত ছিল।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে আদর্শ ও চিন্তার প্রতিফলন ঘটে, সেগুলো একেবারে নতুন নয়। ব্রিটিশ রাজতন্ত্র ও আমেরিকার উপনিবেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক উত্তেজনা লেগেই ছিল। একই সময়ে স্বাধীনতা, জনগণের অধিকার এবং শাসকের ক্ষমতার সীমা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ফ্রান্স ও ব্রিটেনেও দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ ঘটতে শুরু করে।

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কিন ইতিহাসের অধ্যাপক টম কাটারহ্যামের মতে, আমেরিকার বিপ্লবী নেতাদের যে ভাবনাগুলো অনুপ্রাণিত করেছিল, ব্রিটেনেও সেসব ধারণা ছিল। যেমন দুর্নীতি, অলিগার্কি (স্বল্পসংখ্যক গোষ্ঠীর শাসন) এবং নির্বাহী ক্ষমতার স্বৈরাচার ইত্যাদি।

কাটারহ্যাম উল্লেখ করেন, থমাস পেইন, জন উইলকস, গ্রানভিল শার্প এবং ক্যাথারিন ম্যাকলের মতো ব্রিটিশ চিন্তাবিদরা সে সময় ব্রিটিশ স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।

ক্যাথারিন ম্যাকলে যুক্তি দিয়েছিলেন, কোনো রাজার বা শাসকের ক্ষমতার বৈধতা শাসক ও জনগণের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তির ওপর নির্ভর করে। যদি শাসক সেই চুক্তি ভঙ্গ করেন, তবে তাঁর শাসনের বৈধতাও শেষ হয়ে যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ধারণাই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রণয়নে বেনজামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল।

টম কাটারহ্যাম তাঁর গবেষণায় সেইসব ব্রিটিশ ব্যক্তিত্বের কাহিনি তুলে ধরেছেন, যারা আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন এবং ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস (৪ জুলাই) উদযাপন এমন এক সময়ে উদযাপন করল, যখন দেশটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ উপলক্ষ্যে এবার দুটি পৃথক সংগঠন আলাদা কর্মসূচি পালন করেছে।

এর একটি ‘আমেরিকা২৫০’ যা ২০১৬ সালে মার্কিন কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করে এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আইনে স্বাক্ষর করেন। অন্যটি ‘ফ্রিডম২৫০’ যা ২০২৫ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত হয়। প্রথম সংগঠনটি দ্বিদলীয় (বাইপার্টিজান) উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও, দ্বিতীয়টি ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র-ভাবনার রাজনৈতিক প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে প্রায়ই ‘একটি চলমান পরীক্ষা’ বা ‘এখনও চলমান প্রকল্প’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অনেকের কাছে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ঘটনা এই গণতন্ত্র কতটা নাজুক, তার একটি বড় উদাহরণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস নিয়েও বর্তমানে যে তীব্র বিতর্ক চলছে, এই পরিস্থিতি তারই প্রতিচ্ছবি বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের বোর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়া লাক্স জারম্যান।

জারম্যানের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘রিস্টোরিং ট্রুথ অ্যান্ড স্যানিটি টু আমেরিকা হিসট্রি’ শীর্ষক একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এর লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক ভাষায় তথাকথিত ‘ওক ইতিহাসের’ প্রভাব কমানো।

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিভিন্ন জাদুঘরের তথ্যফলক সরিয়ে ফেলা বা নতুন করে লেখার কাজ চলছে। নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, এমন কোনো তথ্য প্রদর্শন করা যাবে না যা ‘অতীত বা বর্তমানের আমেরিকানদের, এমনকি ঔপনিবেশিক যুগের ব্যক্তিদেরও, অযথা হেয় প্রতিপন্ন করে।’ এর পরিবর্তে শিক্ষামূলক তথ্যগুলোতে ‘আমেরিকান জনগণের অর্জন, অগ্রগতি ও মহত্ত্বের’ ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সমালোচকদের মতে, দাসপ্রথার নির্মম ইতিহাস তুলে ধরা জাদুঘরের প্রদর্শনীগুলোও ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ওক ইতিহাস’ বিরোধী পদক্ষেপের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। জারম্যানের ধারণা, এ নিয়ে আইনি বিরোধ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসবিদ এবং নটিংহ্যাম ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেনি উডলি লিখেছেন, স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনে যেন আফ্রিকান-আমেরিকানদের অসামান্য অবদান আড়ালে না পড়ে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও স্বাধীনতার আদর্শ গঠনে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি উল্লেখ করেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত নেতারা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আদর্শ গড়ে তুলেছিলেন, তখনই ১৭৭২ সালে দাসত্বে আবদ্ধ আফ্রিকান-আমেরিকান কবি ফিলিস হুইটলি একটি কবিতা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি নিজের দাসত্বের অভিজ্ঞতাকে এমন এক ‘লোহার শিকলের’ সঙ্গে তুলনা করেন, যা উচ্ছৃঙ্খল স্বৈরাচার অন্যায়ভাবে মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল এবং পুরো দেশকেই দাসত্বে আবদ্ধ করতে চেয়েছিল।

প্রায় দুই শতাব্দী পরে, ১৯৬৩ সালে ঐতিহাসিক ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ ভাষণে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ছিল এমন একটি ‘প্রতিশ্রুতিপত্র’, যা প্রত্যেক মানুষের অবিচ্ছেদ্য অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিল। তাঁর মতে, ‘ন্যায়বিচারের ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়নি’; তাই সময় এসেছে সব আমেরিকানের সেই প্রতিশ্রুত অধিকার বাস্তবে আদায় করে নেওয়ার অর্থাৎ ‘এই চেক নগদায়ন করার’।

ইতিহাসবিদ জেনি উডলি লিখেছেন, সমতা ও ন্যায়বিচারের যে প্রতিশ্রুতি দেশটি একসময় দিয়েছিল, সেই ‘ন্যায়বিচারের ব্যাংকের’ ভাণ্ডার এখন ক্রমেই শূন্য হয়ে আসছে। তাঁর মতে, এই উদযাপন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা সব আমেরিকানের জন্য সমানভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ভাষায়, ‘উই দ্য পিপল’ (আমরা জনগণ) সবার উদযাপন হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে প্রায়ই ‘একটি চলমান পরীক্ষা’ বা ‘এখনও চলমান প্রকল্প’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অনেকের কাছে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ঘটনা এই গণতন্ত্র কতটা নাজুক, তার একটি বড় উদাহরণ। সেদিন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের একটি দল ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল কংগ্রেসে অনুমোদন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিল ভবনে হামলা চালায়। ট্রাম্প এখনও দাবি করে আসছেন, ওই নির্বাচন তাঁর কাছ থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

সেদিন শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র টিকে যায়। তবে গত ২৫০ বছরের ইতিহাসে এমন কিছু সময় এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ রাজনৈতিক বিভাজনের মুখে পড়েছিল এবং দেশটির গণতন্ত্রই হুমকির মুখে রয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল।

  • জোনাথন এস্তে: জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সম্পাদক, দ্য কনভারসেশন

(দ্য কনভারসেশন থেকে নেওয়া। ঈষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

Ad 300x250

সম্পর্কিত