লেখা:

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর অতর্কিত হামলা শুরু করে। জাতিসংঘের কোনো পূর্বানুমতি বা সতর্কতা ছাড়াই চালানো এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর ঠিক দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়; যেখানে তাকে ফেডারেল আদালতে ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এই দুটি সহিংস হামলার নির্দেশনা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে জাতিসংঘের ৩১টি অঙ্গসংস্থাসহ মোট ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন তিনি। ট্রাম্প তার নিজের সভাপতিত্বে ‘বোর্ড অব পিস’ নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন এবং ইঙ্গিত দেন যে এটি জাতিসংঘের বিকল্প হতে পারে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা স্পষ্ট প্রমাণ করে—১৯৪৫ সালে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়তে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করেছিল, তা এখন আর তাদের নিজেদের স্বার্থই রক্ষা করছে না।
গত আট দশক ধরে আমেরিকার অর্থ, কূটনীতি ও সামরিক শক্তি এই বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছিল। এই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে তা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু তাদের এই প্রতিশ্রুতির মাত্রা ছিল অভাবনীয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা বাধ্য হয়ে নয়, বরং স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব নিয়েছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের পৃথিবীর সঙ্গে ১৯৪৫ সালের কোনো মিল নেই। ইউরোপ এখন স্বাবলম্বী। চীনের উত্থান ঘটেছে। কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলো আজ ধনী। পাশাপাশি ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর দ্রুত বিকাশ ঘটছে।
আজকের দিনে আমরা যেসব হুমকির সম্মুখীন তা হলো—জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি বা সন্ত্রাসবাদ। জাতিসংঘের সনদ তৈরির সময় এগুলো কল্পনারও বাইরে ছিল। তাই মার্কিনিরা যদি আজ প্রশ্ন তোলে যে, পুরোনো এক বিশ্বব্যবস্থার জন্য তারা কেন এত বেশি দায়ভার নেবে, তবে তা খুব একটা অযৌক্তিক নয়।
এতকাল ‘বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা’ ছিল এমন এক ব্যাপার, যার জোগান দিত যুক্তরাষ্ট্র আর বাকি বিশ্ব তা ভোগ করত। ইউরোপ আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার নিচে নিরাপদে থেকে উল্টো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো আমেরিকার টাকায় চলে সংস্কার দাবি করেছে। আর ক্যারিবিয়ানদের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও, তা বাস্তবায়নে খুব সামান্যই অবদান রেখেছে।
যদি সত্যিই এই বিশ্বব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করতে হয়, তবে শুধু কথায় নয়, অর্থ ও সম্পদ দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে।
এর প্রথম আর শক্তিশালী পদক্ষেপ হতে পারে নিউইয়র্ক থেকে জাতিসংঘের সদর দপ্তর সরিয়ে নেওয়া। এটি হবে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার এক বড় স্বীকৃতি। যে দেশ জাতিসংঘ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে এবং বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ছে, সেখানে জাতিসংঘের সদর দপ্তর রাখার কোনো মানে হয় না।
সদর দপ্তর স্থানান্তর প্রমাণ করবে যে, আমেরিকার অংশগ্রহণ থাকুক বা না থাকুক, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর এবং এর খরচ বহন করতেও তারা প্রস্তুত। সদর দপ্তরের জন্য বিকল্প জায়গার অভাব নেই। জেনেভা বা ভিয়েনায় এটি সরিয়ে নিলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে। নাইরোবি বা রিও ডি জেনিরোতে স্থানান্তরিত করলে তা গ্লোবাল সাউথকে (উন্নয়নশীল বিশ্ব) কেন্দ্রে নিয়ে আসবে। এমনকি অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, বার্বাডোজ বা জ্যামাইকার মতো কোনো দ্বীপরাষ্ট্রেও এটি স্থাপন করা যেতে পারে, যা প্রমাণ করবে—এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল ক্ষমতাবানদের নয়, বরং দুর্বলদেরও। বিশ্ব যদি যুদ্ধ আর অর্থনৈতিক প্রণোদনার জন্য ট্রিলিয়ন ডলার জোগাড় করতে পারে, তবে সদর দপ্তর সরানোর খরচও তারা মেটাতে পারবে।
পাশাপাশি, জাতিসংঘের অর্থায়নের মডেলেও পরিবর্তন আনা জরুরি। এতদিন যুক্তরাষ্ট্র একাই মূল বাজেটের ২২ শতাংশ এবং শান্তিরক্ষা মিশনে বড় অর্থায়ন করত। এই নির্ভরতা ওয়াশিংটনকে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাছে জিম্মি করে রেখেছে।
যদি আমরা বহুপাক্ষিকতা ধরে রাখতে চাই, তবে এই শূন্যস্থান আমাদেরই পূরণ করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখতে হবে। তহবিলের উৎসে বৈচিত্র্য এলে তা জাতিসংঘের টিকে থাকা নিশ্চিত করবে এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক করবে।
এই সংস্কারগুলো এখন সময়ের দাবি। ইরানের ওপর হামলার কারণে গোটা অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিগুলোকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের ঘটনা লাতিন আমেরিকাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং এমন এক নজির স্থাপন করেছে যে, কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানই একতরফা বলপ্রয়োগের বাইরে নন।
এর পাশাপাশি গাজা ও সুদানের যুদ্ধ চলছেই, কঙ্গো সংঘাতে বিপর্যস্ত। এসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ভেটো ক্ষমতার কারণে ক্ষমতাবানরা পার পেয়ে যাচ্ছে, আর দুর্বলরা ভুগছে।
একটি সংস্কারকৃত, একাধিক দেশের অর্থায়নে পরিচালিত এবং একক কোনো প্রভুর ওপর নির্ভরশীল না থাকা জাতিসংঘ হয়তো রাতারাতি এসব সংকটের সমাধান করবে না। তবে এটি অনেক বেশি বৈধতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কাজ করতে পারবে। তখন কোনো শক্তিশালী দেশের স্বার্থের ভয়ে মানবিক সহায়তা আটকে থাকবে না।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কাঠামো নিয়েও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। জাতিসংঘের জলবায়ু কাঠামো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই জলবায়ু তহবিল গঠনের পথ খুঁজতে হবে। ইউরোপকে সম্পদের মাধ্যমে তাদের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। আর চীনকে নিতে হবে নৈতিক নেতৃত্বের দায়ভার।
ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি এক বড় সুযোগ। দেশগুলোর উচিত সদর দপ্তর স্থানান্তর ও অর্থায়ন সংস্কারের প্রস্তাব তোলা এবং সমমনা দেশগুলোকে একজোট করা। ছোট দ্বীপরাষ্ট্র, আফ্রিকা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যান্য অংশ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেওয়া সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও শক্তিশালী সামরিক শক্তি। তাদের ফিরে আসার দরজা সবসময় খোলা রাখা উচিত। কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কবে ঠিক হবে, তার জন্য বিশ্বের বাকি দেশগুলো অনন্তকাল অপেক্ষা করতে পারে না। আগামীর জন্য এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ছাড়াও চলতে পারে।
১৯৪৫ সালে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অথচ উদার আমেরিকা বিশ্বকে গড়ে তোলার পথ বেছে নিয়েছিল। আর ২০২৬ সালে এক ভিন্ন আমেরিকা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। আমাদের উচিত কোনো রাগ বা আক্ষেপ ছাড়াই এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া। বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার যে বুলি আমরা আওড়াই, এখন সময় এসেছে সেই বিশ্বব্যবস্থার মালিকানা ও দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়ার।
লেখক: সি জাস্টিন রবিনসন, ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর
(লেখাটি আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর অতর্কিত হামলা শুরু করে। জাতিসংঘের কোনো পূর্বানুমতি বা সতর্কতা ছাড়াই চালানো এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর ঠিক দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়; যেখানে তাকে ফেডারেল আদালতে ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এই দুটি সহিংস হামলার নির্দেশনা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে জাতিসংঘের ৩১টি অঙ্গসংস্থাসহ মোট ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন তিনি। ট্রাম্প তার নিজের সভাপতিত্বে ‘বোর্ড অব পিস’ নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন এবং ইঙ্গিত দেন যে এটি জাতিসংঘের বিকল্প হতে পারে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা স্পষ্ট প্রমাণ করে—১৯৪৫ সালে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়তে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করেছিল, তা এখন আর তাদের নিজেদের স্বার্থই রক্ষা করছে না।
গত আট দশক ধরে আমেরিকার অর্থ, কূটনীতি ও সামরিক শক্তি এই বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছিল। এই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে তা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু তাদের এই প্রতিশ্রুতির মাত্রা ছিল অভাবনীয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা বাধ্য হয়ে নয়, বরং স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব নিয়েছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের পৃথিবীর সঙ্গে ১৯৪৫ সালের কোনো মিল নেই। ইউরোপ এখন স্বাবলম্বী। চীনের উত্থান ঘটেছে। কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলো আজ ধনী। পাশাপাশি ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর দ্রুত বিকাশ ঘটছে।
আজকের দিনে আমরা যেসব হুমকির সম্মুখীন তা হলো—জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি বা সন্ত্রাসবাদ। জাতিসংঘের সনদ তৈরির সময় এগুলো কল্পনারও বাইরে ছিল। তাই মার্কিনিরা যদি আজ প্রশ্ন তোলে যে, পুরোনো এক বিশ্বব্যবস্থার জন্য তারা কেন এত বেশি দায়ভার নেবে, তবে তা খুব একটা অযৌক্তিক নয়।
এতকাল ‘বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা’ ছিল এমন এক ব্যাপার, যার জোগান দিত যুক্তরাষ্ট্র আর বাকি বিশ্ব তা ভোগ করত। ইউরোপ আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার নিচে নিরাপদে থেকে উল্টো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো আমেরিকার টাকায় চলে সংস্কার দাবি করেছে। আর ক্যারিবিয়ানদের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও, তা বাস্তবায়নে খুব সামান্যই অবদান রেখেছে।
যদি সত্যিই এই বিশ্বব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করতে হয়, তবে শুধু কথায় নয়, অর্থ ও সম্পদ দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে।
এর প্রথম আর শক্তিশালী পদক্ষেপ হতে পারে নিউইয়র্ক থেকে জাতিসংঘের সদর দপ্তর সরিয়ে নেওয়া। এটি হবে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার এক বড় স্বীকৃতি। যে দেশ জাতিসংঘ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে এবং বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ছে, সেখানে জাতিসংঘের সদর দপ্তর রাখার কোনো মানে হয় না।
সদর দপ্তর স্থানান্তর প্রমাণ করবে যে, আমেরিকার অংশগ্রহণ থাকুক বা না থাকুক, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর এবং এর খরচ বহন করতেও তারা প্রস্তুত। সদর দপ্তরের জন্য বিকল্প জায়গার অভাব নেই। জেনেভা বা ভিয়েনায় এটি সরিয়ে নিলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে। নাইরোবি বা রিও ডি জেনিরোতে স্থানান্তরিত করলে তা গ্লোবাল সাউথকে (উন্নয়নশীল বিশ্ব) কেন্দ্রে নিয়ে আসবে। এমনকি অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, বার্বাডোজ বা জ্যামাইকার মতো কোনো দ্বীপরাষ্ট্রেও এটি স্থাপন করা যেতে পারে, যা প্রমাণ করবে—এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল ক্ষমতাবানদের নয়, বরং দুর্বলদেরও। বিশ্ব যদি যুদ্ধ আর অর্থনৈতিক প্রণোদনার জন্য ট্রিলিয়ন ডলার জোগাড় করতে পারে, তবে সদর দপ্তর সরানোর খরচও তারা মেটাতে পারবে।
পাশাপাশি, জাতিসংঘের অর্থায়নের মডেলেও পরিবর্তন আনা জরুরি। এতদিন যুক্তরাষ্ট্র একাই মূল বাজেটের ২২ শতাংশ এবং শান্তিরক্ষা মিশনে বড় অর্থায়ন করত। এই নির্ভরতা ওয়াশিংটনকে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাছে জিম্মি করে রেখেছে।
যদি আমরা বহুপাক্ষিকতা ধরে রাখতে চাই, তবে এই শূন্যস্থান আমাদেরই পূরণ করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখতে হবে। তহবিলের উৎসে বৈচিত্র্য এলে তা জাতিসংঘের টিকে থাকা নিশ্চিত করবে এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক করবে।
এই সংস্কারগুলো এখন সময়ের দাবি। ইরানের ওপর হামলার কারণে গোটা অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিগুলোকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের ঘটনা লাতিন আমেরিকাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং এমন এক নজির স্থাপন করেছে যে, কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানই একতরফা বলপ্রয়োগের বাইরে নন।
এর পাশাপাশি গাজা ও সুদানের যুদ্ধ চলছেই, কঙ্গো সংঘাতে বিপর্যস্ত। এসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ভেটো ক্ষমতার কারণে ক্ষমতাবানরা পার পেয়ে যাচ্ছে, আর দুর্বলরা ভুগছে।
একটি সংস্কারকৃত, একাধিক দেশের অর্থায়নে পরিচালিত এবং একক কোনো প্রভুর ওপর নির্ভরশীল না থাকা জাতিসংঘ হয়তো রাতারাতি এসব সংকটের সমাধান করবে না। তবে এটি অনেক বেশি বৈধতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কাজ করতে পারবে। তখন কোনো শক্তিশালী দেশের স্বার্থের ভয়ে মানবিক সহায়তা আটকে থাকবে না।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কাঠামো নিয়েও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। জাতিসংঘের জলবায়ু কাঠামো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই জলবায়ু তহবিল গঠনের পথ খুঁজতে হবে। ইউরোপকে সম্পদের মাধ্যমে তাদের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। আর চীনকে নিতে হবে নৈতিক নেতৃত্বের দায়ভার।
ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি এক বড় সুযোগ। দেশগুলোর উচিত সদর দপ্তর স্থানান্তর ও অর্থায়ন সংস্কারের প্রস্তাব তোলা এবং সমমনা দেশগুলোকে একজোট করা। ছোট দ্বীপরাষ্ট্র, আফ্রিকা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যান্য অংশ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেওয়া সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও শক্তিশালী সামরিক শক্তি। তাদের ফিরে আসার দরজা সবসময় খোলা রাখা উচিত। কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কবে ঠিক হবে, তার জন্য বিশ্বের বাকি দেশগুলো অনন্তকাল অপেক্ষা করতে পারে না। আগামীর জন্য এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ছাড়াও চলতে পারে।
১৯৪৫ সালে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অথচ উদার আমেরিকা বিশ্বকে গড়ে তোলার পথ বেছে নিয়েছিল। আর ২০২৬ সালে এক ভিন্ন আমেরিকা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। আমাদের উচিত কোনো রাগ বা আক্ষেপ ছাড়াই এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া। বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার যে বুলি আমরা আওড়াই, এখন সময় এসেছে সেই বিশ্বব্যবস্থার মালিকানা ও দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়ার।
লেখক: সি জাস্টিন রবিনসন, ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর
(লেখাটি আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। রাতের আঁধার তখনো পুরোপুরি কাটেনি। আমেরিকা আর ইসরাইলের যুদ্ধবিমান একসঙ্গে ঢুকে পড়ে ইরানের আকাশে। অপারেশন 'এপিক ফিউরি'। মিসাইল আর বোমার আঘাত হতে থাকে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে। বোমা পড়ে স্কুলে। নিহত হয় শত শত শিশু। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিও নিহত হন। পরদিন সকালে বিশ্বের মানুষ চোখ
১ ঘণ্টা আগে
গত বছরের ২৮ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অভিযোগ— তাঁরা অনুষ্ঠানে দেশকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অস
২১ ঘণ্টা আগে
রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামে আমরা এত বছর পার করলাম, তার ভিত্তি হওয়া উচিত ছিল সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা এবং তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক কেমন হবে, তা নির্ধারণ করা। কিন্তু আমরা সেসব না করে কেবল কথার ফুলঝুরি ছুটিয়েছি, যার পরিণতি ভবিষ্যতে আমরা আরও বেশি দেখতে পাব।
১ দিন আগে
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেই আসামের রাজনীতিতে বাংলাদেশ একটি ‘হুমকি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। অভিবাসন, জনমিতি পরিবর্তনের আতঙ্ক এবং সীমান্ত নিরাপত্তার ধোয়া তুলে সেখানে চরম ভারত-বাংলাদেশ মেরুকরণ শুরু হয়।
২ দিন আগে