বাবা দিবস

আধুনিক সমাজে পিতৃসত্তার সংকট, উদযাপন ও আমাদের দায়

স্ট্রিম গ্রাফিক

‘বাবা হলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের ভেতরের সবটুকু ঝড় গোপন রেখে সন্তানের আকাশটাকে শান্ত ও মেঘমুক্ত রাখতে চান।’ — গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বাবা দিবস’। দিবসটি এলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে মা-বাবার সঙ্গে ছবির বন্যা বয়ে যায়, ব্র্যান্ডগুলো নানা অফার ছাড়ে, আর আমরাও হয়তো বাবাকে একটা পাঞ্জাবি বা হাতঘড়ি উপহার দিয়ে দায়িত্বের ইতি টানি। কিন্তু আধুনিক এই যান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী সমাজে বাবা দিবসের তাৎপর্য কি কেবলই ২৪ ঘণ্টার একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপনে সীমাবদ্ধ? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে পিতৃসত্তার মনস্তাত্ত্বিক সংকট, পারিবারিক কাঠামোর রূপান্তর এবং প্রবীণ বয়সে পিতার সুরক্ষার মতো এক নির্মম সামাজিক বাস্তবতার আখ্যান? আজকের বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাবা দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য, পিতার অবদান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়কে গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি।

বাবা দিবসের গোড়াপত্তন: একটি ঐতিহাসিক ও মানবিক প্রেক্ষাপট

ইতিহাসের পাতা ও বিভিন্ন সমাজবৈজ্ঞানিক জার্নাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মা দিবসের ধারণার অনেক পরে বাবা দিবসের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক তরুণীর হাত ধরে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই দিবসের সূচনা হয়। ডডের মা যখন সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা যান, তখন তাঁর বাবা উইলিয়াম স্মার্ট, যিনি একজন গৃহযুদ্ধের বীর সেনা ছিলেন, একাই সোনোরাসহ তাঁর আরও পাঁচ ভাইকে পরম মমতায় বড়ো করে তোলেন। ডড অনুভব করেছিলেন, একজন মা যেমন সন্তানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তেমনি একজন বাবাও মায়ের অনুপস্থিতিতে বা মায়ের পাশাপাশি সমভাবে জীবন উৎসর্গ করতে পারেন। তাঁরই একক প্রচেষ্টায় ১৯১০ সালের ১৯ জুন প্রথম ওয়াশিংটনে বাবা দিবস পালিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন।

তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে পিতার যে একটি নরম, স্নেহশীল ও সুরক্ষাদাতা রূপ রয়েছে—তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানের একটি গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, শিল্প বিপ্লবের পর যখন পুরুষেরা ঘরের বাইরে দীর্ঘ সময় কাজ করতে শুরু করে, তখন পরিবারে পিতার ভূমিকা কেবলই ‘অর্থ উপার্জনকারী’ হিসেবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। বাবা দিবস মূলত সেই হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক সংযোগকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার একটি প্রতীকী প্রয়াস।

বাঙালি সমাজে পিতৃসত্তার রূপান্তর: ‘বজ্রাদপি কঠোরাণি’ থেকে বন্ধুত্বের হাতছানি

বাঙালি সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বে বাবার রূপটি ঐতিহ্যগতভাবেই কিছুটা গম্ভীর, দূরত্ব বজায় রাখা এবং শাসনকর্তার। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সমাজ গবেষকদের লেখায় বারবার উঠে এসেছে, বাঙালি পরিবারে মা হলেন আবেগের আশ্রয়, আর বাবা হলেন নিয়মানুবর্তিতার প্রতীক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে হরিহরের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্রামীণ বাংলার এক শাশ্বত দরিদ্র অথচ স্নেহশীল পিতার অবয়ব, যিনি শত অভাবের মধ্যেও সন্তানদের জন্য মেলা থেকে সামান্য খেলনা বা খাতা কিনে আনার স্বপ্ন দেখেন।

তবে বিগত দুই দশকে বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনে বাঙালি পিতার চরিত্রে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটেছে। একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক সমাজতাত্ত্বিক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ‘আধুনিক শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে বাবা এখন আর কেবলই ‘ভীতি জাগানিয়া শাসক’ নন, বরং তিনি সন্তানের পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং মানসিক বিকাশের একজন সক্রিয় সঙ্গী বা বন্ধু’। আজ অনেক বাবাই ছুটির দিনে রান্নাঘরে সাহায্য করছেন, সন্তানের ডায়াপার পাল্টাচ্ছেন কিংবা প্যারেন্টিং সেশনে অংশ নিচ্ছেন। বাবা দিবসের একটি বড়ো তাৎপর্য হলো, পিতার এই নতুন এবং মানবিক রূপান্তরকে কুর্নিশ জানানো।

আধুনিক সমাজে পিতার নীরব মনস্তাত্ত্বিক সংকট

আমরা প্রায়শই মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রসবোত্তর বিষণ্নতা নিয়ে কথা বলি, যা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু পিতার ভেতরের নীরব মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও একাকিত্ব নিয়ে আমাদের সমাজ এখনও অন্ধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মধ্যবয়সী পুরুষদের মধ্যে বিষণ্নতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সফলতার তীব্র চাপ’।

আমাদের সমাজে একজন পুরুষকে ছোটোবেলা থেকেই শেখানো হয়—‘ছেলেরা কখনো কাঁদে না’। ফলে একজন বাবা যখন চাকরি হারান, ব্যবসায় লোকসান করেন, কিংবা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভোগেন, তখন তিনি তাঁর ভেতরের ঝড় সন্তানদের বুঝতে দেন না। তিনি হাসিমুখে ডাইনিং টেবিলে বসেন, অথচ রাতে তাঁর চোখের ঘুম উবে যায় পরের মাসের ফ্ল্যাট ভাড়া বা সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি জোগাড় করার চিন্তায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছিলেন, ‘পিতার এই দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা এবং আবেগ প্রকাশ না করতে পারার সংস্কৃতি তাঁদের হৃদরোগ ও মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে’ । বাবা দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই—যে বাবা সারাজীবন সন্তানের ঢাল হয়ে রইলেন, অন্তত একটি দিনে তাঁর পিঠে হাত রেখে বলা: ‘বাবা, আমি আছি তো, তোমার কোনো চিন্তা নেই।’

বৃদ্ধাশ্রমের দীর্ঘশ্বাস এবং আমাদের নৈতিক অবক্ষয়

বাবা দিবসের রঙিন উদযাপনের সমান্তরালে আমাদের সমাজে এক অন্ধকার চিত্রও সমানভাবে বিদ্যমান। যে বাবা নিজের সবটুকু সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে বিদেশে পাঠালেন বা বড় কর্মকর্তা বানালেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই বাবার ঠিকানা হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমের এক চিলতে নিঃসঙ্গ ঘর। বাংলাদেশ সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে গত এক দশকে বেসরকারি ও দাতব্য বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সিংহভাগ বাসিন্দা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের প্রবীণ মা-বাবা।

ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি বা এশীয় সমাজে বাবাকে দেখা হতো পরিবারের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি, অভিভাবক এবং শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে, বিশেষ করে ২০২৬ সালের চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ করপোরেট সংস্কৃতির যুগে, বাবারা এক দ্বিমুখী সংকটে জর্জরিত।

২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ পাস করে। এই আইনে সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ এবং তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে এবং অমান্য করলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন দিয়ে কি আসলেই হৃদয়ের ভালোবাসা তৈরি করা যায়? সুপ্রিম কোর্টের এক আইনি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই আইনের অধীনে মামলার সংখ্যা অত্যন্ত কম, কারণ কোনো বাবাই শেষ বয়সে এসে তাঁর সন্তানের বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়াতে চান না । বাবা দিবসে আমাদের এই নির্মম সত্যের মুখোমুখি হতে হবে যে, যদি বছরের একটি দিন ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে বাকি ৩৬৪ দিন বাবাকে অবহেলা আর একাকীত্বে রাখা হয়, তবে সেই উদযাপনের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না।

আধুনিক সমাজে পিতৃসত্তার সংকট: সময়ের চাকা বনাম ব্যস্ততা

ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি বা এশীয় সমাজে বাবাকে দেখা হতো পরিবারের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি, অভিভাবক এবং শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে, বিশেষ করে ২০২৬ সালের চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ করপোরেট সংস্কৃতির যুগে, বাবারা এক দ্বিমুখী সংকটে জর্জরিত।

উপস্থিতির সংকট: জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব বজায় রাখার তীব্র ইঁদুর-দৌড়ে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে একজন বাবাকে দিনের সিংহভাগ সময় কর্মক্ষেত্রে কাটাতে হচ্ছে। ফলে পরিবারে অর্থনৈতিক জোগান নিশ্চিত হলেও সন্তানের সাথে গুণগত সময় কাটানোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাবা হয়ে উঠছেন পরিবারের একজন ‘অর্থ সরবরাহকারী মেশিন’ মাত্র। সন্তানের শৈশব, তার বেড়ে ওঠার মানসিক পরিবর্তনগুলো দেখার মতো পর্যাপ্ত সময় আধুনিক বাবারা পাচ্ছেন না, যা পিতৃত্বের অন্যতম বড় মনস্তাত্ত্বিক সংকট।

ভূমিকাগত দ্বন্দ্ব: আধুনিক পরিবারগুলোতে এখন একক পরিবারের সংখ্যা বেশি। যৌথ পরিবারের সেই চেনা সমানুভূতি বা দায় ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ এখানে নেই। একই সাথে অনেক পরিবারে বাবা-মা উভয়েই কর্মজীবী। ফলে ঘরের বাইরে অর্থনৈতিক দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি ঘরের ভেতরেও সন্তান লালন-পালনের প্রথাগত ভূমিকা বদলে যাচ্ছে। এই নতুন কাঠামোর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে অনেক বাবাই এক ধরনের মানসিক হীনম্মন্যতা বা অতিরিক্ত ক্লান্তিতে ভুগছেন।

প্রযুক্তির ব্যবধান ও একাকীত্ব: বর্তমানের জেনারেশন আলফা বা জেনারেশন জেড-এর সন্তানরা প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের মধ্যে বড় হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক বাবারা সন্তানের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল দুনিয়ার গতির সঙ্গে মানসিক সংযোগ তৈরি করতে পারছেন না। ফলে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য ‘প্রজন্ম ব্যবধান’ বা জেনারেশন গ্যাপ। সন্তান যখন মা-বাবার চেয়ে স্মার্টফোনের পর্দায় বেশি সময় কাটায়, তখন বাবারা নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক বা একাকী বোধ করতে শুরু করেন।

উদযাপন বনাম করপোরেট বাণিজ্য

উদ্যোগটি প্রথম শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, মূলত মায়ের পাশাপাশি বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে বাবা দিবসের উদযাপন অনেকখানি করপোরেটাইজড বা বাণিজ্যনির্ভর হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দেওয়া, নামী ব্যান্ডের উপহার কেনা বা রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়ার মধ্যেই যেন উদযাপনের সার্থকতা আটকে গেছে।

ক্যাম্পেইন বা মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির ভিড়ে আমরা ভুলে যাই, বাবার আসল চাওয়া কোনো দামি উপহার নয়; তার চাওয়া একটুখানি শ্রদ্ধা, সময় এবং বার্ধক্যে একটু মানসিক স্বস্তি। একদিনের আড়ম্বরপূর্ণ উদযাপনের পর বছরের বাকি ৩৬৪ দিন যদি বাবাকে অবহেলা কিংবা একাকীত্বে কাটাতে হয়, তবে এই আন্তর্জাতিক দিবসের মূল চেতনাটাই মার খায়। উদযাপন তখনই সার্থক হবে যখন তা বাহ্যিক প্রদর্শনীর চেয়ে অন্তরের গভীর অনুভূতি থেকে আসবে।

আমাদের দায়: পরিবার ও রাষ্ট্রের ভূমিকা

আধুনিক সমাজ যে পিতৃসত্তার সংকট তৈরি করেছে, তা থেকে উত্তরণের এবং বাবাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার দায় আমাদের সবার। এই দায়বদ্ধতাকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যেতে পারে।

সন্তান ও পরিবারের দায়: প্রতিটি সন্তানের উচিত বাবার ত্যাগের মূল্যায়ন করা। ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় বাবার সাথে কথা বলা, তার স্বাস্থ্যের খোঁজ নেওয়া এবং তার মানসিক জগৎটাকে বোঝার চেষ্টা করা দরকার। বিশেষ করে বাবারা যখন বার্ধক্যে পদার্পণ করেন, তখন তাদের শিশুসুলভ আচরণ বা একাকীত্বকে অবহেলা না করে পরম যত্নে আগলে রাখা সন্তানের পরম কর্তব্য। আমাদের মনে রাখা দরকার, আজ আমরা আমাদের বাবার সাথে যে আচরণ করব, আমাদের সন্তানরাও ভবিষ্যতে আমাদের সাথে ঠিক একই আচরণের পুনরাবৃত্তি করবে।

সামাজিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ: বৃদ্ধাশ্রম কালচার আধুনিক সমাজের অন্যতম কালিমালিপ্ত দিক। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল সন্তানরাও অনেক সময় বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রেখে আসেন, যা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। বাবাকে পরিবারের বোঝা নয়, বরং বটবৃক্ষের মতো আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়: করপোরেট ও কর্মক্ষেত্রে বাবাদের জন্য কাজের পরিবেশ সুসংগত করা প্রয়োজন। কর্মঘণ্টার সুনির্দিষ্ট সীমা থাকা উচিত যাতে একজন বাবা কর্মক্ষেত্র শেষে পরিবারকে সময় দিতে পারেন। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে এখন মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি ‘পিতৃত্বকালীন ছুটি’ বা প্যাট্যারনিটি লিভ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এই ছুটির পরিধি ও কার্যকারিতা বাড়ানো উচিত, যাতে সন্তান জন্মের পর প্রাথমিক দিনগুলোতে একজন বাবা তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেন। এছাড়া প্রবীণ বাবাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সর্বজনীন পেনশন ও বিনামূল্যে মানসম্মত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

বাবা এমন এক নিরাপদ ছায়া, যা রোদের তীব্রতা নিজে সয়ে সন্তানকে শীতলতা দেয়। শৈশবে যে হাতটি ধরে আমরা হাঁটতে শিখেছি, যৌবনে বা বার্ধক্যে এসে সেই হাতটি ছেড়ে দেওয়া চরম অকৃতজ্ঞতা। ২০২৬ সালের এই তীব্র প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে আমরা যতই আধুনিক বা যান্ত্রিক হই না কেন, আমাদের আবেগের জায়গাগুলো যেন যান্ত্রিক না হয়ে যায়। বিশ্ব বাবা দিবসের প্রকৃত সার্থকতা তখনই আসবে, যখন পৃথিবীর কোনো বাবাকে আর বৃদ্ধাশ্রমের একাকী প্রকোষ্ঠে বসে চোখের জল ফেলতে হবে না; যখন প্রতিটি বাবা তার সন্তানের মাঝে একজন বিশ্বস্ত বন্ধু ও আশ্রয় খুঁজে পাবেন।

  • ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত