কালবৈশাখীতেই ঢাকা অচল: নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় দায় কার?

সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১৫: ৪৯
কালবৈশাখীতেই ঢাকা অচল। স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকার বাসিন্দা যারা গত বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় মিরপুর-১০ থেকে কারওয়ান বাজারে গিয়েছেন তাদের সময় লেগেছে ন্যূনতম আড়াই ঘণ্টা থেকে ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। অথচ আবহাওয়া অফিস বলছে, বৃষ্টি হয়েছিল মাত্র ৩৫ মিনিট। বাসের জানালা দিয়ে যাত্রীরা দেখছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ তখন দূষিত বুড়িগঙ্গার শাখা। রিকশা, সিএনজি, প্রাইভেট কার, আর বর্তমানের টেসলাখ্যাত অটো সব একসঙ্গে স্থবির, গতিহীন। রাস্তায় রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু জলাবদ্ধতার কাছে ইমারজেন্সি বা জরুরি সেবা—সেও অসহায়।

এই দৃশ্য আমাদের ঢাকাবাসীর জন্য নতুন কোন সিনেমাটিক দৃশ্য না। আক্ষেপ করে বলতে পারেন ঢাকার জন্য এটা বাৎসরিক ‘নগর ডোবা’ উৎসব! মে মাসের প্রথম ১০ দিনেই ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ৪ দিন। মানে ৪০ শতাংশ বৃষ্টির কারণে ট্রাফিক পুলিশের এক হিসেবে, শুধু ৮ মের ৩০/৪০ মিনিটের বৃষ্টিতে যানজটে নষ্ট হয়েছে প্রায় ১২ লাখ কর্মঘণ্টা। অর্থনীতির মার্কায় ক্ষতি ধরলে সংখ্যাটা কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়াবে।

আমরা মেট্রোরেল বানাই আকাশে, প্রায় গগনচুম্বী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বানাই, কিন্তু আমাদের কাছের, মাটির নিচের ড্রেনটা পরিষ্কার রাখা বা মেরামত করার সময় পাই না—কেন? কোটি টাকার প্রশ্ন হলো, ৩০ মিনিটের বৃষ্টিতে ৩ ঘণ্টার জ্যাম এর দায় আসলে কার? কালবৈশাখীতেই যদি গোটা শহর ডুবে যায় বর্ষা মৌসুমের ভারী বৃষ্টিপাতে আমাদের কি হাল হবে?

প্রথম দায়: খাল খেয়ে ফেলেছি

রাজউকের একটি তথ্য বলছে, গত ১০ বছরে ঢাকার প্রাকৃতিক জলাশয় ৬৫ শতাংশ কমেছে। জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন। সেগুনবাগিচা খাল, কাঁঠালবাগান খাল, ইব্রাহিমপুর খাল—সবই এখন কাজির গরুর মতো কেতাবে আছে, বাস্তবে নাই।

খাল ভরাট করে প্লট বিক্রি হয়েছে, ড্রেনের ওপর বাজার বসেছে, আরও কত কি হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, নগরীর প্রকৃতিগত পানি নিষ্কাশনের যে ক্যাপাসিটি থাকা দরকার, তার মাত্র ৩০ শতাংশ আমাদের অবশিষ্ট আছে। বাকি ৭০ শতাংশ পানি যাওয়ার জায়গা আমরা নিজেরাই নষ্ট করে ফেলেছি। তাই সে পরিমাণ পানি রাস্তায় থাকা ছাড়া যাওয়ার জায়গা কোথায়?

দ্বিতীয় দায়: উন্নয়নের নামে অপরিকল্পনা

আমরা ফ্লাইওভার বানাই, কিন্তু তার পানি কোথায় নামবে সেই চিন্তা করি না! মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু পানি জমে। কারণ ড্রেনেজ লাইন ফ্লাইওভারের পিলারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বন্ধ হয়েছে। নতুন নতুন প্রকল্প পাস হয়, অথচ ‘ড্রেনেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বলে কিছু কি আসলে থাকে? সড়ক বিভাগ বানায় সড়ক, ড্রেন দেখে ওয়াসা, খাল দেখে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কোথাও কোনো সমন্বয় নেই, দায়ও তাই কারও না।

তৃতীয় দায়: আমরা নিজেরা

প্রতিদিন ঢাকায় নাকি প্রায় ৭ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়। এর বড় অংশ যায় ড্রেনে। পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট সবার শেষ ঠিকানা ড্রেন—সব ড্রেনের মুখ আটকে রাখে। সিটি কর্পোরেশন দিনে দুইবার ময়লা তোলে, আমরা ফেলি তিনবার। এরপর বৃষ্টি হলে সরকারকে গালি দিই। এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ কি নেই? আছে। কিন্তু সেজন্য আমাদের নিজেদের চরিত্র স্বীয় দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

যেহেতু আমাদের দেশের এবং ঢাকা শহরের তো বটেই, অধিকাংশ নাগরিক মুসলমান তাই আমাদের ফি বছরের এই প্রাণান্তকর সমস্যার সমাধানে ইসলাম কি কিছু বলে? ইসলাম নগর পরিকল্পনাকে ইবাদতের অংশ করেছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো ঈমানের অঙ্গ’ [সহিহ মুসলিম]। মদিনা সনদে মদিনাবাসী সকল ধর্মের নাগরিকের নিরাপত্তা, নিরাপদ চলাচল যার অন্তর্ভুক্ত, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা মানে সাধারণ জনগণের কষ্ট লাঘব করা। এটা সাদাকাহ। খলিফা ওমর (রা.) নিজে মদিনা শহরের অলিগলি পরিদর্শন করতেন যাতে মানুষ তো বটেই, কোথাও কোনো পশুও যেন কষ্ট না পায়। আর আমরা পুরো রাজধানী শহরকে নয় প্রায় গোটা দেশটাকে প্রতি বর্ষায় প্লাবিত হতে দেই।

সমাধান কী

১. খাল উদ্ধার এখনই:

দখল হওয়া প্রায় ৫২টা খালের বা আসলে কতটা তার তালিকা ওয়াসার কাছে নিশ্চয় আছে। আমরা আমজনতা মনে করি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার দল যেহেতু ক্ষমতায় তাই তাঁর খাল খনন কর্মসূচীর আওতায় আদর্শ রাজনৈতিক সদিচ্ছা বাস্তবায়িত হলে সকল ‘গিলে ফেলা’ খাল ৬ মাসেই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। হাতিরঝিল আমাদের দেখিয়েছে, চাইলে পারা যায়।

২. সকল দায় এক জায়গায় আনুন:

এভ্রিবডিস বেবি ইজ নো বডিস বেবি! ড্রেনেজের দায়িত্ব এবং বাজেট একটা সংস্থার হাতে দিন। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, রাজউক—তিন সংস্থার মাঙ্কি শিফটিং—বাক পাসিং—ঠেলাঠেলিতে পানি এত এত বছরে যেহেতু নামেনি ভবিষ্যতেও নামবে না বলেই মনে হয়।

৩. ভবনের নকশায় ‘রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং’ বাধ্যতামূলক করুন:

নতুন সব ভবনে ‘রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং’ এবং নিজস্ব ড্রেনেজ প্ল্যান ছাড়া রাজউক অনুমোদন দেবে না—এই নিয়ম বাধ্যতামূলক করুন।

৪. নাগরিক চুক্তি:

আমরা পলিথিন উৎপাদন এবং সেই সাথে ব্যবহার বন্ধ করি। ড্রেনে ময়লা আবর্জনা না ফেলি। প্রতি ওয়ার্ডে জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবী ‘জলাবদ্ধতা নিরসন কমিটি’ কি গঠন করা যায়?

উন্নয়ন মানে শুধু সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা না; নিচের সিঁড়ি অপরিষ্কার থাকলে ওঠা শুরু করবেন কি করে? তাই প্রয়োজন নিচটাও ঠিক রাখা। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যেতে আমাদের কার না ভালো লাগে। কিন্তু যখন যাই, নীচে তাকালে দেখি মানুষ হাঁটু বা কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। এই নাগরিক বৈষম্য কোনো আধুনিক শহরের বাস্তব চিত্র হতে পারে না।

আগামী বছরের কালবৈশাখী আসার আগে আমাদের সঙ্গে নিয়েই কর্তৃপক্ষকে ঠিক করতে হবে, ঢাকা কি বিল-ঝিল নাকি তিলোত্তমা নগর হবে? সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে আপনাদের এবং আমাদেরই। কারণ প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না, শুধু হিসাব বুঝিয়ে দেয়। আর সেই হিসাবের খাতায় আমরা আর কত বছর ধরে ফেল করতেই থাকব?

  • কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

সম্পর্কিত