বিশ্বের নজর ট্রাম্প-শি বৈঠকে, ইরান ইস্যুতে জোর আলোচনা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১৬: ৩৯
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ বুধবার চীন পৌঁছাবেন । তাঁর এই সফর দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক নতুনভাবে শুরুর ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির সম্পর্কও এই সফরের মাধ্যমে নতুনভাবে নির্ধারিত হতে পারে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রযুক্তি, বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং তাইওয়ান-সংক্রান্ত জটিল বিরোধ সামলাতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ, যা দুই দিনব্যাপী এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

২০১৭ সালে ট্রাম্পের সফরের পর এবারই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফরে যাচ্ছেন। তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্প ও শি জিনপিং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দুই বিপরীত প্রান্তে অবস্থান করছেন। বিশেষ করে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান এখনো স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে তাদের দাবির ওপর অটল রয়েছে। চীনও আগের চেয়ে বদলে গেছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বেইজিং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চপ্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। ট্রাম্প এমন এক নেতার সঙ্গে বৈঠকে বসবেন, যিনি সাংবিধানিক মেয়াদসীমা পেরিয়ে নিজের ক্ষমতা আরও দৃঢ় করেছেন। অন্যদিকে শির সামনে থাকবেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা এক নেতা, যাঁর এটিই শেষ মেয়াদ।

ট্রাম্প কী চান
ট্রাম্পের জন্য এটি কেবল কোনো কল্পনার সফর নয়, বরং এটি তাঁকে করতে হচ্ছে। গত অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর দুই নেতার মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে। সেখানে বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক শিথিলের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। গত মার্চে অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে আরেকটি শীর্ষ বৈঠকের পরিকল্পনা থাকলেও ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের কৌশলকে জটিল করে তোলে। ট্রাম্প ধারণা করেছিলেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হবে, কিন্তু এখন তা তৃতীয় মাসে গড়িয়েছে। সোমবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে এক মাসের যুদ্ধবিরতি এখন 'লাইফ সাপোর্টে' আছে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের কারণে এখন প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধে থাকা অবস্থায় ট্রাম্প কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন কি না। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ইরান নিয়ে শির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ আলোচনা হবে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় চীনের জন্য বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে, কারণ চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প শিকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানাবেন। ট্রাম্পের সফরের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরানি তেল চীনে বিক্রিতে সহায়তার অভিযোগে ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

তাইওয়ান ও বাণিজ্য আলোচনা
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, শি জিনপিং তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কমানোর বিষয়টি এই বৈঠকে তুলতে পারেন। তবে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে না। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এবং চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেং বৈঠক করবেন। মার্কিন প্রতিনিধিদলে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক এবং টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কসহ এক ডজনের বেশি ব্যবসায়ী নেতা থাকছেন। হোয়াইট হাউসের মতে, ট্রাম্প ও শি মহাকাশ, কৃষি ও জ্বালানি খাতে কয়েকটি চুক্তি ঘোষণা করতে পারেন। ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় তুলবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শি জিনপিং কী চান
চীনের দৃষ্টিতে এই বৈঠকে তাদের অবস্থান শক্তিশালী। চীনা সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ ও আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে বেইজিং কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে। বেইজিং উচ্চপ্রযুক্তি রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি জানাতে পারে। এ ছাড়া তাইওয়ান স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরও স্পষ্ট অবস্থান এবং দ্বীপে অস্ত্র বিক্রি কমানোর বিষয়েও চাপ দিতে পারে চীন। বেইজিং মনে করে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতির ধাক্কা মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে। এআই, সবুজ জ্বালানি ও রোবোটিকসে চীনের অগ্রগতি তাদের অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে। শির জন্য মূল বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রেখে চীনের উত্থানকে আরও শক্তিশালী করা। ইরান যুদ্ধ শির জন্য নতুন জটিলতা তৈরি করলেও চীন নিজেকে সম্ভাব্য শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। মঙ্গলবার এক রেডিও সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, 'আমাদের একসঙ্গে চলার অনেক সুবিধা আছে।' এই সফর দুই পরাশক্তির মধ্যে স্থিতিশীলতা আনলে চীন সেটিকেই সফলতা হিসেবে দেখবে।

সম্পর্কিত