জামিনহীন বিচার: কারাগারের অন্ধকারেই কী হারিয়ে যাচ্ছে ‘আইনের শাসন’?

ঢাকার একটি আদালত। সেখানে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন এক বৃদ্ধা মা। তার ছেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা। অথচ ঘটনার দিন ছেলেটি ছিল হাসপাতালে শয্যাশায়ী। আদালতে সেই কাগজও জমা হয়েছে। তবু জামিন হয়নি। কয়েক মাস পর খবর এল—কারাগারে অসুস্থ হয়ে তার ছেলে মারা গেছে। দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর এ ধরনের গল্প এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা।

লেখা:
লেখা:
আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১৬: ৩৫
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

ঢাকার একটি আদালত। সেখানে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন এক বৃদ্ধা মা। তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা। অথচ ঘটনার দিন ছেলেটি ছিল হাসপাতালে শয্যাশায়ী। আদালতে সেই কাগজও জমা হয়েছে। তবু জামিন হয়নি। কয়েক মাস পর খবর এল—কারাগারে অসুস্থ হয়ে তাঁর ছেলে মারা গেছে। দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর এ ধরনের গল্প এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা।

অথচ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, পিবিআই-এর তদন্ত করা জুলাই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দায়েরকৃত ৫৬% মামলার কোন প্রমাণ মেলেনি। এর মধ্যে কিছু মামলা বাদী নিজেই প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বাকি ৪৪% মামলায় চার্জশিট দেয়া হলেও, সেসবের বেশির ভাগ আসামি ভুয়া। (যুগান্তর, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫)

একই বিষয়ে পিবিআইয়ের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও ভয়ংকর ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। পিবিআইয়ের হাতে আসা জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলোর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বহু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, আর্থিক সুবিধা আদায়, প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোসহ বিচিত্র ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে জুলাই আন্দোলনকে ব্যবহার করা হয়েছে।

কোথাও পরকীয়াজনিত হত্যাকাণ্ডকে ‘আন্দোলনের সহিংসতা’ হিসেবে উপস্থাপন, জমি বা পারিবারিক বিরোধকে হত্যা বা গুমের অভিযোগে রূপ দেওয়া; এমনকি জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে মামলার ঘটনাও মিলেছে। পাওনা টাকা না দিতে মামলা; এমনকি ডিভোর্স দেওয়ায় স্ত্রী ও শ্বশুরালয়কে ফাঁসাতে ছেলেকে দিয়ে মিথ্যা মামলা করানোর প্রমাণ মিলেছে পিতার বিরুদ্ধে। কোথাও বাদী নিজেই মামলার বিষয়ে অজ্ঞ, কোথাও ভুক্তভোগীর পরিচয়, ঠিকানা ও ফোন নম্বরের মধ্যে মিল নেই; আবার অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের অগ্রগতি টের পেয়ে ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে বাদীপক্ষ মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে (কালবেলা , ০৭ মে, ২০২৬)।

জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলোর প্রকৃত চিত্র নিয়ে মামলা বাণিজ্যসহ এরকম বহুবিধ অভিযোগ ও অনিয়মের খবরে গণমাধ্যম বরাবরই সরব। তারপরও ওই সব মামলায় হাজার হাজার মানুষ বিনা জামিনে কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। গত ২১ মাসে যেভাবে দোষী-নির্দোষ নির্বিচারে অভিযুক্তদের জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তাতে প্রশ্ন জাগে— জামিন কি এখন আর অধিকার নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল এক অনিশ্চিত দয়া? জামিন কী এখন ব্যতিক্রম, কারাবাসই নিয়ম?

জামিন কী?

জামিন’ শব্দটি আরবি ‘দামিন’’, ‘জামিন’ শব্দ থেকে এসেছে। এর মূল ধাতু ‘দামানা’, যার অর্থ—দায়িত্ব নেওয়া, নিশ্চয়তা দেওয়া বা কারও দায় নিজের ওপর গ্রহণ করা।

তবে আইনের পরিভাষায়, জামিন (Bail) শব্দের অর্থ হলো কোনো মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট শর্তে বা জামানতের বিনিময়ে সাময়িকভাবে আইনগত হেফাজত বা জেলখানা থেকে জামিনদারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া। এটা মামলা চলাকালীন অস্থায়ী মুক্তি। সেই মুক্তিকাল কখনও নির্দিষ্ট বা কখনও অনির্দিষ্ট। সাধারণভাবে কোন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হলে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে হয়। এটি মূলত বিচার চলাকালীন অভিযুক্ত ব্যক্তির আদালতে হাজিরার নিশ্চয়তা বা নিরাপত্তা প্রদান করে।

জামিন কি অধিকার, নাকি করুণা?

জামিনযোগ্য মামলায় জামিন একটি অধিকার। জামিনযোগ্য মামলায় জামিন দিতে আদালত বাধ্য। তবে সে অধিকার কিছু শর্তসাপেক্ষ। আদালতের নিদের্শমতে হাজির না হলে, প্রভাব খাটানোর ঝুঁকি থাকলে, সাক্ষী ভয় পেলে, বিচার ব্যাহত হলে—এ অধিকার বাতিল হয়ে যায়।

অন্যদিকে জামিন মানে অপরাধীর মুক্তি নয়। আইনের ভাষায়, এটি কিছু শর্ত সাপেক্ষে বিচার পর্যন্ত স্বাধীন থাকার সুযোগ।

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জামিন কোনো করুণা নয়। এটি ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত একটি মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে ব্যক্তির আইনগত সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬, ৪৯৭ ও ৪৯৮ ধারায় জামিনের বিধান রয়েছে। সাধারণভাবে কেবল জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন অধিকার হিসেবে গণ্য হলেও, অজামিনযোগ্য অপরাধেও আদালত পরিস্থিতি বিবেচনায় জামিন দিতে পারেন। বিশেষ করে তদন্ত শেষ হতে দেরি হলে, আসামি অসুস্থ বা বৃদ্ধ হলে, নারী বা শিশু হলে, অথবা মামলার অভিযোগ দুর্বল হলে আদালত জামিন দিতে পারেন।

জামিনের ক্ষেত্রে আদালতের বিবেচনা

আইনের মৌলিক দর্শন খুব পরিষ্কার— ‘বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী ধরা যাবে না।’ এ কারণেই পৃথিবীর প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশে নীতি হলো— ‘Bail is the rule, jail is the exception.’ বাংলাদেশের উচ্চ আদালতও বহু রায়ে বলেছেন, তদন্ত বা বিচার চলাকালে অযথা দীর্ঘ কারাবাস মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা বহু ক্ষেত্রে উল্টো। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা মামলা বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় অনেককে দীর্ঘদিন বিচার শুরুর আগেই কারাগারে থাকতে হচ্ছে।

জামিনেরে আবেদন বিবেচনায় আদালত সাধারণত নিম্নোক্ত বিষয়াবলী দেখেন—১. আসামি পলাতক হওয়ার ঝুঁকি আছে কি না; ২. সাক্ষীকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা আছে কি না; ৩. অপরাধের প্রকৃতি কতটা গুরুতর; ৪. তদন্তে সহযোগিতা করছেন কি না, ৫. আসামির বয়স, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মামলার প্রকৃতি নয়; রাজনৈতিক পরিচয়ই অনেক সময় জামিনের ভাগ্য নির্ধারণ করছে।

কখন জামিন নাও হতে পারে?

সব মামলায় জামিন বাধ্যতামূলক নয়। অজামিনযোগ্য ধারার মামলায় জামিনটা অধিকার নয়, আদালতের এখতিয়ারাধীন ও বিবেচনাধীন বিষয়। যেমন মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধের মামলা। সাধারণত খুন, সন্ত্রাস, সংঘবদ্ধ অপরাধ, রাষ্ট্রবিরোধী সহিংস কর্মকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে আদালত জামিন নাকচ করতে পারেন। কিন্তু আইনের অপব্যবহার শুরু হয় তখন, যখন রাজনৈতিক বিরোধীকে দমন করতে নির্বিচারে হত্যা মামলা, বিস্ফোরক আইন বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে বহুবার দেখা গেছে, একটি রাজনৈতিক ঘটনার পর শত শত ‘অজ্ঞাতনামা’ ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা হয়েছে। আর ওই ‘অজ্ঞাতনামা’ কোটায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্ন মতের মানুষকে নির্বিচারে গ্রেফতার ও জেলে আটকে রাখা হচ্ছে। পরে প্রকৃত তদন্তে দেখা গেছে, অপরাধ সংঘটনের সাথে তাদের অনেকের সংযোগ দূরে থাক, অনেকে ঘটনাস্থলেই ছিলেন না।

এমনকি মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী নাগরিক বা হাসপাতালে ভর্তি মানুষও আসামির তালিকায় এসেছে—এমন নজির সংবাদমাধ্যমে বহুবার প্রকাশিত হয়েছে।

নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭(১) ধারায় নারী, শিশু, অসুস্থ ও অক্ষম ব্যক্তিদের জামিনের বিষয়ে আদালতকে বিশেষ মানবিক বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এ ধারানুযায়ী নারী, অনূর্ধ্ব ১৬ বছরের শিশু, অসুস্থ ও অক্ষম ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যে কোন মামলায় আদালত বিশেষ বিবেচনায় জামিন দিতে পারেন। এমনকি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডযোগ্য অপরাধের মামলায়ও সেটা প্রযোজ্য। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়েও বলা হয়েছে—বৃদ্ধ, গুরুতর অসুস্থ কিংবা শারীরিকভাবে দুর্বল বা অক্ষম অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনায় আদালতকে উদার হতে হবে।

বহু রায়ে বলা হয়েছে—গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে, নারী ও শিশুর ক্ষেত্রে কারাবাস সর্বশেষ বিকল্প হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা যথেষ্ট ভিন্ন। প্রবীণ লেখক শাহরিয়ার কবির গুরুতর অসুস্থ হয়েও দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দী। তিনি হুইল চেয়ার ছাড়া চলাফেরাও করতে পারেন না। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এবং তাঁর জামিন ও সুচিকিৎসা দাবী করে আন্তর্জাতিক মহলও সরকার প্রধান বরাবর চিঠি দিয়েছে। তারপরও তাঁর ভাগ্যে এখনও জামিন জুটেনি। অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও, বারংবার সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক-এর জামিন আবেদন প্রত্যাখান তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অর্থাৎ, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও মানবিকতা এখন যেন বিচারব্যবস্থার ‘ঐচ্ছিক’ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এ বিষয়ে আইন ও উচ্চ আদালতের অবস্থান খুবই সুস্পষ্ঠ।

তদন্ত বা বিচার বিলম্ব হলে জামিন

ফৌজাদারি কার্যবিধিতে একটি বিশেষ বিধান আছে। তা হল— কোন মামলার তদন্ত, অনুসন্ধান বা বিচারের যে কোন পর্যায়ে যদি দেখা যায়, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য ও যুক্তি সঙ্গত কোন কারণ নেই; তবে অভিযুক্তকে জামিন দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া মামলার তদন্ত বা অনুসন্ধানে বিলম্ব হলে, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে জামিন দেয়া যেতে পারে। আনীত অভিযোগ বা মামলা যতই গুরুতর হউক না কেন, এ নিয়ম প্রযোজ্য [ধারা-৪৯৭(২)]। উচ্চ আদালতের রায়েও বলা আছে, বিচার বিলম্ব হলে দীর্ঘ কারাবাস অনুচিত। প্রশ্ন হল, আইনের এই বিধানের প্রয়োগ কোথায়? বাস্তবে অনেকের ক্ষেত্রে ‘বিনা বিচারে আটক‘ বা ’কারাগার’ই যেন বিচার হয়ে উঠছে। হাজতবাস

মিথ্যা ও রাজনৈতিক মামলার ভয়াবহতা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণহারে দায়ের হওয়া গুম-খুনের মামলা নিয়ে ইতোমধ্যে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ মামলাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এ নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। সরকার নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছে। এমনকি মিথ্যা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। তারা কাজও করছে।

বাস্তবতা হল, জুলাই আন্দোলনকে পুঁজি করে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা হয়রানিমূলক মামলায় জামিন পাওয়া এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। একটি মামলা তদন্তাধীন থাকতেই কাউকে বছরের পর বছর জেলে আটকে রাখা মানে, বিচার শুরুর আগেই তাকে কার্যত শাস্তি দেওয়া—যা কোনভাবেই আইনানুগ নয়। অথচ উচ্চ আদালত বহুবার বলেছেন, যদি মামলার উদ্দেশ্য হয় হয়রানি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, তবে আদালতকে জামিনের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল হতে হবে। রায়ে আরও বলা হয়, ‘মালাফাইড’ বা অসৎ উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলায় জামিন উদারভাবে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু নিম্ন আদালতের কাছে অনেক সময় ‘মামলা আছে’, এই যুক্তিই যেন জামিন প্রত্যাখানের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কারা হেফাজতে মৃত্যু: নীরব অন্ধকার

কারাগার কোন মানুষের মৃত্যুফাঁদ হতে পারে না। একজন বন্দীর স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে, কিন্তু তার মানবাধিকার নয়। জাতিসংঘের “নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস” অনুযায়ী, বন্দীর চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কিন্তু বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়— বন্দী রোগীকে হাসপাতালে নিতে দেরি, চিকিৎসা অবহেলা, বা হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ। গত ২১ মাসে এ অভিযোগগুলো আরও প্রকটতর হয়েছে।

জুলাই আন্দোলনের মামলায় কারাবন্দী ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীর কারাগারে অসুস্থতা, চিকিৎসা না পাওয়া বা মৃত্যুর অভিযোগ সামনে এসেছে। তন্মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এক মন্ত্রীর চিকিৎসায় অবহেলা জনিত মৃত্যুর পর তার হাতকড়া পরিহিত লাশের ছবি সারা দেশে আলোড়ন তুলেছিল। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর পরও ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং কারা ফটকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করা; চূড়ান্ত অমানবিকতার অনন্য নজির স্থাপন করেছিল।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে কমপক্ষে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তন্মধ্যে ৬৯ জন ছিল হাজতী। এ তথ্যই বলে দেয়, কারাগারের অন্ধকারে কত নির্মমতার খেলা চলছে।

‘শ্যোন অ্যারেস্ট’: জামিনের পরও মুক্তি নেই

জুলাই আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া মামলায় এমনিতেই জামিনে মুক্তি যেন প্রায় সোনার হরিণ! গোদের ওপর বিষফোঁড়া, ‘শ্যোন আরেস্ট’— এক মামলায় জামিন পেলেই আরেক মামলায় গ্রেফতার দেখানোর নাটক! এমনকি স্বয়ং পুলিশের নিজ উদ্যেগে নিজস্ব বিবেচনায় শ্যোন অ্যারেস্টের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারির ঘটনাও ঘটেছে। পাঠকদের রাজশাহী পুলিশ রেঞ্জের ২৪ ফেব্রুয়ারির সেই বিজ্ঞপ্তির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে— যেখানে রাজশাহীর আট জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আদালত থেকে জামিন পেলে তাদের পুনরায় অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান। সত্যিই এ অবিচার শেষ কোথায়?

আজকের বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলোর একটি হল এই ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’। এই প্রবণতা কেবল বেআইনী নয়, এটি কার্যত জামিনের অধিকারকে অর্থহীন করে দেয়।

রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিশোধে নয়, ন্যায্যতায়

একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় বোঝা যায়, সে কীভাবে তার বিরোধীদের সঙ্গে আচরণ করে। ক্ষমতায় থাকলে প্রতিপক্ষকে জেলে ভরা খুব সহজ। কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। আজ যারা ক্ষমতাবান, কাল তারা বিরোধীও হতে পারেন। এই কারণেই আইনের নিরপেক্ষতা কোন রাজনৈতিক দলের জন্য নয়; পুরো রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য জরুরি।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রতিশোধ নয়; তার ন্যায়বিচার। ইতিহাস বলে, যখন বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষতার আস্থা হারায়, তখন কারাগার কেবল বন্দিদের নয়—গণতন্ত্রকেও বন্দি করে ফেলে।

জামিন মানে অপরাধ মাফ নয়। জামিন মানে কেবল একজন মানুষকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া। আদালতে হাজির না হলে, বিচারকে প্রভাবিত করলে, প্রমাণ নষ্টের আশঙ্কা থাকলে বা আদালত নির্ধারিত শর্ত অমান্য করলে জামিন বাতিল হতেই পারে। কিন্তু কেবল রাজনৈতিক পরিচয়, জনরোষ বা সামাজিক চাপের কারণে জামিন না দেওয়া হলে সেটি ন্যায়বিচারের বদলে প্রতিহিংসার কাছাকাছি চলে যায়।

অপরাধ করলে, তার বিচার হতেই হবে। অপরাধী সে যে-ই হউক। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দায়েরকৃত মামলায় গত ২১ মাসে যেভাবে বিনা বিচারে, বিনা জামিনে দোষী-নির্দোষ নির্বিচারে হাজার হাজার মানুষকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হয়েছে, তাতে প্রশ্ন জাগে, এই আটক কেন? কার স্বার্থে, কোন আইনে এই আটক? পৃথিবীর কোন আইনের কোন সংজ্ঞায় এর নাম ন্যায়বিচার? কোন অর্থে এর নাম ‘আইনের শাসন’? এসব ঘটনা কি মৌলিক অধিকার, মানবাধিকারসহ পৃথিবীর সকল সভ্য সমাজের সকল রীতি-নীতি, আইন-কানুনের লঙ্ঘন নয়?

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব: প্রাবন্ধিক ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সম্পর্কিত