ধর্ষকামী ‘পুরুষত্ব’, ছেলে শিশুর ভবিষ্যৎ কী

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ৪২
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

একটা সময় মনে করা হতো, কেবল মেয়ে শিশুই যৌন সহিংসতার ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকছে। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, ততই ছেলে শিশুদের ওপর ঘটে যাওয়া যৌন সহিংসতার চিত্র সামনে আসতে শুরু করেছে। অনেকে রিপোর্ট করছে, অনেকে আবার লজ্জায় বলছে না।

ছেলে শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা সমাজে ট্যাবুর সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এক্ষেত্রেও ‘মহান সমাজ’ আরও একটি ‘মহান’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বসে আছে। ‘ছেলে মানুষ কাঁদতে পারবে না’ বলে যে একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে রাখা হয়েছে, ঠিক তেমনই আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো—ছেলে শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হলে কাউকে জানাতে পারবে না।

যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে জানলে তাকে লজ্জা দেওয়া হবে। হেয় করা হবে। সমাজসৃষ্ট ‘পুরুষ’ ধারণাটির ওপর আঘাত আসবে। অথচ নিপীড়িত শিশুটির বয়ে বেড়ানো ট্রমা তার ভবিষ্যৎ জীবনকে বিষিয়ে তোলে। কর্মক্ষমতা, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

অবসাদ (ডিপ্রেশন), মানসিক ও শারীরিক অসংগতি, আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা যায় তাদের মধ্যে। এর মধ্যে অনেকেই অনেক বেশি সহিংস (ভায়োলেন্ট) হয়ে যায়। নিরাপদ শৈশবপ্রাপ্ত অন্য কোনো শিশুর মতো তারা আত্মবিশ্বাসী হতে পারে না। ফলে টিকে থাকার জন্য সে নিজের মতো তরিকা বের করতে সচেষ্ট হয়। অনেক সময় নিজেকে শক্তপোক্ত ‘পুরুষত্ব’ প্রমাণ করার জন্য সমাজের দেখানো পথে চলতে শুরু করে; সহিংসতার পথে হাঁটতে থাকে। এভাবেই ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাবনাময় ধর্ষকামী ‘পুরুষতন্ত্র’ ও ‘পিতৃতন্ত্রের’ আরেকটি ধরন সম্ভবত তৈরি করে ফেলা হয়।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, দেশে ২০১৭ সালে ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২০টি, ২০১৮ সালে ৭টি, ২০১৯ সালে ৩৭টি, ২০২০ সালে ৫১, ২০২১ সালে ৩১টি, ২০২২ সালে ৫২টি, ২০২৩ সালে ৬৯টি, ২০২৪ সালে ৩৬টি এবং ২০২৫ সালে ৪৮টি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫২টি। যার মধ্যে ০-৬ বছর বয়সী দুটি, ৭-১২ বছর বয়সী ৩৩টি, ১৩-১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের সঙ্গে ঘটনা তিনটি। এছাড়া, বয়স উল্লেখ করেনি আরও ১৪টি ঘটনায় আক্রান্ত শিশু বা কিশোররা। মোট সংখ্যার মধ্যে থানায় অভিযোগ করেছেন ৩৭ জন। এই সংখ্যাগুলোও আবার পরিপূর্ণ নয়। ভয়ভীতি এবং ক্ষমতার কারণে অনেক ভুক্তভোগী মুখ খুলতে সাহস পায় না।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেন্দ্রিক বেশ কিছু গ্রুপের সন্ধান মিলেছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেসব গ্রুপে হরহামেশা শিশুদের ছবি শেয়ার করে তাদের নিয়ে বিকৃত যৌনাচারের কথা প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয়টি হলো, যারা তথ্য ও ছবি শেয়ার করছে, তারা ওই শিশুদেরই আত্মীয় বা প্রতিবেশী।

ধর্ষণ হলো যৌন হিংসার এমন একটি রূপ, যা সম্মতির বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, জোরজবরদস্তি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। ছেলেশিশুর ওপর ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাকে কেন ‘ধর্ষণ’ না বলে ‘বলাৎকার’ বলা হচ্ছে—এটিও ভাববার বিষয়।

যৌন নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশের জন্য ‘আওয়াজ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মে ভয়াবহ তথ্য উঠে আসছে। এখানে মানুষ নিজেদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শৈশবে কিংবা কৈশোরে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে রিপোর্ট করেছেন ১১১ জন। তাদের মধ্যে বাসাবাড়িতে শতকরা ৪২ ভাগ, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৪০ ভাগ, খোলা জায়গায় ১০ ভাগ এবং বাণিজ্যিক ও পরিবহনে ৮ ভাগ ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এই ১১১ জনের মধ্যে ৪১ ভাগ একবার, ৪৪ ভাগ একাধিকবার এবং ১৫ ভাগ ছেলে শিশু দীর্ঘমেয়াদে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ৭-১৫ বছর বয়সী ছেলে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা বলছে, ধর্ষণ হলো যৌন হিংসার এমন একটি রূপ, যা সম্মতির বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, জোরজবরদস্তি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। ছেলেশিশুর ওপর ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাকে কেন ‘ধর্ষণ’ না বলে ‘বলাৎকার’ বলা হচ্ছে—এটিও ভাববার বিষয়।

সম্প্রতি সাভারে একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত পোশাক শ্রমিক দম্পতির সাত বছর বয়সী একটি ছেলে শিশু একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বয়সে বড় সহপাঠী এবং শিক্ষকের মাধ্যমে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

শিশুটিকে জোর করে টয়লেটে নিয়ে প্রথম ধর্ষণ করা হয়। কান্না করলে কিংবা কাউকে জানালে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। মাদ্রাসার আরেক শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনাটি জানতে পারায় শিশুটিকে আবারও টয়লেটে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ওই মাদ্রাসারই আরও তিন শিক্ষার্থী ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে ধর্ষণে যুক্ত হয়। সহপাঠীদের কাছে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিরাপত্তার জন্য শিশুটি শিক্ষকের দ্বারস্থ হয়েছিল। দুঃখজনক বিষয় হলো, সেই শিক্ষকও শিশুটিকে ধর্ষণ করেন।

শিশুটির বাবা সংবাদমাধ্যমে জানান, অভিযুক্ত শিক্ষক ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য শিশুটিকে চাপ প্রয়োগ করে। মক্তব থেকে হেফজখানায় উঠতে না দেওয়া, পরীক্ষায় পাস না করা এবং কোরআনের হাফেজ না হতে পারার মতো ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। শিশুটি অন্য শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ করলে মিথ্যা বলছে বলে ধামাচাপা দিতে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মারধরের শিকার হয় ভুক্তভোগী। এমনকি বাবা-মাকে জানালে আরও মারধরের ভয় দেখানো হয়।

মাদ্রাসার মুহতামিমকে জানানো হলে তিনি ঘটনাটি চেপে যেতে অনুরোধ করেন। আশ্বাস দিলেও আইন অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে অপরাধীদের ‘জুতা পেটা করে বের করে দেওয়া হয়েছে’ বলে ভুক্তভোগীর বাবাকে জানানো হয়। যদিও শিশুটির বাবা মনে করছেন মুহতামিম আদতে প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। মুহতামিম ঘটনাটিকে অস্বীকার করে বলেন, এতদিন ধরে যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে শিশুটি কেন তার বাবা-মাকে জানায়নি। এমনকি ঘটনাটিকে অবান্তর বলেও মন্তব্য করেন। পুলিশ শিশুটির বাবার দায়ের করা মামলায় ওই মাদ্রাসার তিন শিক্ষার্থী ও দুই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা যায়।

যৌন নির্যাতন কাকে বলে, একজনের শরীরের সীমা কীভাবে টানতে হবে সেই শিক্ষা পায় না আমাদের শিশুরা। শিশুদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোন বিষয়টি স্বাভাবিক আর কোনটি নিপীড়ন—এই বিষয়ে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয় না।

এই ঘটনায় কয়েকটি বিষয়ের ওপর দৃষ্টিপাত করা যাক। প্রথমত, শিশুটির বাবা-মা পোশাক শ্রমিক। দ্বিতীয়ত, ধর্ষণের পর মেরে ফেলার হুমকি। তৃতীয়ত, শিক্ষক কর্তৃক মারধর ও হুমকি প্রদর্শন এবং চতুর্থত, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করা ও ঘটনা অস্বীকার করা। অন্যদিকে, ধর্ষণের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে কিছু দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিও মনোযোগী হতে হবে। ব্যক্তিগত নানা বিচ্যুতি, সমাজ থেকে পাওয়া শিক্ষা, সংস্কৃতির প্রভাব, চিন্তা-চেতনার অসামঞ্জস্য―এগুলোকে একত্রে মিলিয়ে বিবেচনা না করলে ধর্ষণের মনস্তত্ত্ব বোঝা সহজ নয়।

একজন মানুষ ক্ষমতা প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থেকে ধর্ষণ করতে পারে। যেমন উল্লিখিত শিশুটি বড় সহপাঠী এবং শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে আরেকটি বিষয় বিবেচনা করলে বিষয়টি আরও সহজে বোধগম্য হয়। শিশুটির বাবা-মা দুজনেই পোশাকশ্রমিক বলে শ্রেণিগত কারণে ও সচেতনতার অভাবে তারা কতটা শক্ত অবস্থান নিতে পারবেন, তা সহজে অনুমেয়। যার ফলে এই বাবা-মার সন্তানের ওপর যৌন নিপীড়ন করার আগে খুব একটা বেশি ভাবতে হয় না।

সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক শিক্ষা এবং পরিবেশ মানুষকে প্রভাবিত করে। ফলে এ ধরনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে বরং অপরাধীদের পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা জরুরি। শৈশবে যৌন বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা, বাবা-মার থেকে দূরে থাকা, পর্যাপ্ত ভালোবাসা ও মনোযোগ না পাওয়া একটি শিশুর ভবিষ্যতের জন্য বিভিন্ন মানসিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। ছোটবেলা থেকেই তার মনে হিংস্র মনোভাব তৈরি হয়।

সকল ধর্ষণকারীর মধ্যে মানসিক অসুস্থতা না থাকলেও ক্ষেত্র বিশেষে ‘সাইকোপ্যাথিক’ মানসিকতা ধর্ষণের একটি কারণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

কেন এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা এমন অদ্ভুতুরে উপায়ে ডালপালা গজিয়ে বিষবৃক্ষে পরিণত হয়? কেন যৌনতা ও যৌনশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ট্যাবু করে রাখা হয়? বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীদের কেন সঠিক শিক্ষার অভাবে নিষিদ্ধ সাইটে যেতে হয়? কেন লৈঙ্গিক ‘হেইট স্পিচ’ তৈরি করেন তথাকথিত ধর্মপ্রচারকরা? বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ বিষয়গুলো বোঝাপড়া করা সহজ নয়, বেশ জটিল।

এ দেশের সামাজিক বাস্তবতা এমন যে, শিশুদের শরীরবৃত্তীয় শিক্ষা দেওয়া হয় না। একটি শিশুর জন্য নিরাপদ ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো লঘু মনে করা হয়। যৌন নির্যাতন কাকে বলে, একজনের শরীরের সীমা কীভাবে টানতে হবে সেই শিক্ষা পায় না আমাদের শিশুরা। শিশুদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোন বিষয়টি স্বাভাবিক আর কোনটি নিপীড়ন—এই বিষয়ে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয় না।

শিশুরা অরক্ষিত (ভার্নারেবল) থাকে বলে ফায়দা নিতে পারে তারই পরিজন, আত্মীয় বা শিক্ষক। ভয়ভীতি প্রদর্শন, কাছের মানুষকে মেরে ফেলার হুমকি, কিংবা ধর্মের দোহাই দিয়ে শিশুদের ওপর এ ধরনের নির্যাতন করা হয়। ধরা পড়লে মানসিক সমস্যা কিংবা ‘শয়তানের প্ররোচনায়’ এই অন্যায়টি হয়েছে বলে উল্লেখ করে বিষয়টিকে লঘু করে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

শিশুদের জন্য সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ এবং পরিবেশ গড়ে তোলায় রাষ্ট্রিক, সামাজিক, পারিবারিকসহ সকল ধরনের পরিবেশে সচেতনতা তৈরি করাটা জরুরি। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাসযোগ্য একটি সাজানো বাগান শিশুদের অধিকার। সেটি বাস্তবায়িত না হলে, ধর্ষণের মতো এই মহামারি থেকে সন্তানদের নিরাপদে রাখা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাবে।

  • অর্থী দাস: শিক্ষণ সহকারী, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত