ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি কি কূটনৈতিক বিপর্যয়

ভারতের নয়াদিল্লিতে চলমান ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিংবা বাংলাদেশ সরকারের কোনো প্রতিনিধিও সেখানে থাকছেন না। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, আমন্ত্রণটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে নয়, বরং বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও বলেছেন, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবেই হবে।
এই সিদ্ধান্তকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের সামনে থাকা বৃহত্তর কৌশলগত প্রশ্নটি ধরা পড়বে না। আসল প্রশ্ন হলো—ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের কূটনৈতিক পরিসর ধরে রাখবে? ব্রিকস থেকে দূরত্ব কি ঢাকাকে বেশি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন দেবে, নাকি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে অনুপস্থিত থেকে বাংলাদেশ নিজের দর-কষাকষির সুযোগ কিছুটা সংকুচিত করবে?
প্রথম সম্ভাব্য প্রভাবটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। নতুন সরকারের সময়েও সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। এমন অবস্থায় দিল্লিতে একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য তুলনামূলকভাবে কম রাজনৈতিক ঝুঁকিতে ভারতের নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারত।
বহুপক্ষীয় সম্মেলনের একটি সুবিধা হলো, সেখানে কোনো বৈঠককে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সফরের সমান রাজনৈতিক গুরুত্ব দিতে হয় না। সম্মেলনের ফাঁকে সংক্ষিপ্ত বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা কিংবা ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। ফলে ব্রিকস সম্মেলন ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি তুলনামূলক কম খরচের কূটনৈতিক সুযোগ হতে পারত। সে সুযোগ আপাতত থাকছে না। তবে এর বিপরীত যুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা যদি মনে করে যে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর শুধু একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ না থেকে নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি ও দৃশ্যমান ফলাফল নিয়ে হওয়া উচিত, তাহলে বর্তমান সিদ্ধান্তের মধ্যেও কৌশলগত যুক্তি আছে। অর্থাৎ সম্মেলনে না যাওয়াকে একদিকে যেমন একটি সুযোগ হারানো হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে এটিকে ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকার দর-কষাকষির বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
কিন্তু এখানে একটি শর্ত আছে। দিল্লি যদি এই অনুপস্থিতিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে দেখে, তাহলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হতে পারে। তাই ঢাকা কীভাবে এ সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করছে, সেটিও সিদ্ধান্তটির মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ না যাওয়ার অর্থ বাংলাদেশ ব্রিকসের অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আগ্রহ জানিয়েছিল। তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বাংলাদেশ আবেদন করেছে বলে নিশ্চিত করেছিলেন। সে সময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার সভাপতিত্বের সময় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই আগ্রহ জানায়।
কিন্তু পরবর্তী সম্প্রসারণে বাংলাদেশ পূর্ণ সদস্য হয়নি। বর্তমানে ব্রিকসের পূর্ণ সদস্যের সংখ্যা বেড়েছে এবং অংশীদার দেশও যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ এখনো এই দুই তালিকার কোনোটিতেই নেই। ব্রিকসের সরকারি তথ্য বিষয়টি নিশ্চিত করে।
তারপরও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংযোগটি ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকেই ব্রিকস-প্রতিষ্ঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) সদস্য। এনডিবির সদস্য তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশের সদস্যপদ কার্যকর হয় ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য না হয়েও বাংলাদেশ এই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবহার করতে পারছে। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে এনডিবির অনুমোদিত তিনটি প্রকল্পে মোট অর্থায়নের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। এনডিবির বাংলাদেশবিষয়ক তথ্যপত্র এ তথ্য দিয়েছে। ২০২৬ সালেও ব্যাংকটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে নতুন অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। আগস্টে এনডিবির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ঢাকা সফরে এসে রেলপথ, বিমানবন্দর কার্গো কেন্দ্র, সড়ক এবং পর্যটন অবকাঠামোয় ভবিষ্যৎ অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছেন। এনডিবির আগস্ট ২০২৬-এর বিবৃতি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে। তাই একটি ব্রিকস সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকার তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক মূল্য খুব বেশি হওয়ার কথা নয়।
সমস্যাটি অর্থনীতির চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক। ব্রিকস এখন আর শুধু ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার একটি ছোট গোষ্ঠী নয়। সম্প্রসারণের পর বৈশ্বিক দক্ষিণের বহু গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রশ্নে ব্রিকস ক্রমে একটি বড় আলোচনার মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
ব্রিকসের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের পরিচালন কাঠামো আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা উন্নত করার বিষয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন ব্রিকসের পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বাংলাদেশের মতো একটি বড় উন্নয়নশীল অর্থনীতির এসব আলোচনা থেকে দূরে থাকার বিশেষ কোনো কারণ নেই। জলবায়ু অর্থায়ন, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সংস্কার, বাণিজ্য অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রেই ব্রিকসের আলোচনার সঙ্গে মিলে যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের লক্ষ্য ব্রিকস থেকে দূরে থাকা নয়; বরং নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী এর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নির্ধারণ করা।
বাংলাদেশের বর্তমান সিদ্ধান্তের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক সম্ভবত ভারত-চীন সমীকরণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুনে চীন সফর করেছেন। ২২ থেকে ২৬ জুনের সেই সফরে দুই দেশ সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ, সম্ভাব্য ‘২+২’ পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সংলাপ, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, বন্দর, শিল্পাঞ্চল, তিস্তা প্রকল্প, প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ২৬ জুন প্রকাশিত চীন-বাংলাদেশ যৌথ ইশতেহার এসবের বিস্তারিত তুলে ধরেছে।
এর কয়েক মাসের মধ্যেই ভারত আয়োজিত একটি বড় সম্মেলনে বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের অনুপস্থিতি দিল্লিতে স্বাভাবিকভাবেই পর্যবেক্ষণ করা হবে। এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য আছে। ব্রিকস নিজেই চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং দিল্লির সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন এবং ভারত ও চীন উভয় দেশই সম্মেলনটিকে পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনার একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সম্মেলনের সময় শি চিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। অতএব ব্রিকসে অংশ নেওয়া মানেই চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া নয়। আবার ব্রিকস থেকে দূরে থাকা মানেই পশ্চিমের দিকে যাওয়া নয়। বাংলাদেশের জন্য আসল সমস্যা হলো, অন্য রাষ্ট্রগুলো ঢাকার নীতিকে কীভাবে দেখছে।
বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ালে এবং একই সময়ে ভারতের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ পিছিয়ে গেলে দিল্লিতে ভারসাম্যহীনতার ধারণা তৈরি হতে পারে। বাস্তবে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ থাকলেও এমন ধারণা তার কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন শুধু কোনো শক্তির সঙ্গে জোট না করার নাম নয়। সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের কাছে নিজের নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখাও এর একটি বড় অংশ।
অন্যদিকে ব্রিকসের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকেও বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না। দেশের অর্থনীতির কাঠামো এমন যে পূর্ব ও পশ্চিম—দুই দিকের সঙ্গেই গভীর সম্পর্ক প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে চীন ও ভারতকে বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎসগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে, বিশেষত শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী পণ্যের ক্ষেত্রে। একই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ফ্রান্সকে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫ বাংলাদেশের এই দ্বিমুখী অর্থনৈতিক নির্ভরতার বাস্তব চিত্র দেয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার ছিল। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই পক্ষের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো। যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। ২০২৬ সালে দুই দেশ একটি নতুন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতেও পৌঁছেছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব দেখায়। এই বাস্তবতায় কোনো একটি ভূরাজনৈতিক বলয়ের অংশ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
আরেকটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা জরুরি। ব্রিকসকে অনেক সময় সরলভাবে পশ্চিমবিরোধী একটি জোট হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এর সদস্যদের লক্ষ্য ও কৌশল এক নয়। চীন ও রাশিয়া ব্রিকসকে পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দিলেও ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার, কোয়াডের সদস্য এবং ব্রিকসেরও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। ভারত ব্রিকসকে বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা এবং নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার একটি মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে।
কার্নেগি এনডাউমেন্টের বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, ব্রিকসের উদ্দেশ্য নিয়েও সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে ভারত চায় না যে সংগঠনটি পুরোপুরি চীন-রাশিয়াকেন্দ্রিক পশ্চিমাবিরোধী জোটে পরিণত হোক।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই একটি শিক্ষা আছে। ব্রিকসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা মানেই যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ থেকে দূরে যাওয়া নয়। একইভাবে ব্রিকসের বাইরে থাকাও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রমাণ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ প্রতিটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে নিজের জাতীয় স্বার্থে কী অর্জন করতে পারছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই ‘ব্রিকস না পশ্চিম’—এমন কোনো দ্বৈত পছন্দ থাকা উচিত নয়। বরং প্রয়োজন সবার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা, কিন্তু কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত না হওয়া যাতে অন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। সীমান্ত, পানি, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই সম্পর্ককে অন্য যেকোনো বড় শক্তির সম্পর্ক থেকে আলাদা করেছে। চীন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ আবার বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তিন বাস্তবতার কোনোটিই অন্যটিকে বাতিল করে না। বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে একটি সম্পর্ক ব্যবহার করতে গিয়ে অন্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করার সক্ষমতার ওপর।
ব্রিকসে না যাওয়ার লাভ-ক্ষতি কী
তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ক্ষতি সম্ভবত সীমিত। এনডিবির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। ভারত ও চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও চলবে। ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য না হয়েও বাংলাদেশ বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে।
কিন্তু কূটনৈতিক সুযোগ হারানোর মূল্য তুলনামূলকভাবে বড়। বাংলাদেশ এমন একটি সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকছে যেখানে ভারত, চীন, রাশিয়াসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের বহু গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতা এক জায়গায় উপস্থিত থাকবেন। এ ধরনের সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক অধিবেশনের পাশাপাশি সাইডলাইন বৈঠক বা সাইডলাইন কূটনীতি, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক যখন পুনর্গঠনের পর্যায়ে, তখন এমন একটি সুযোগ হারানোর মূল্য একেবারে শূন্য নয়।
তারপরও এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ক্ষতিতে পরিণত হবে কি না, তা নির্ভর করবে এরপর কী ঘটে তার ওপর। যদি দ্রুত একটি অর্থবহ ঢাকা-দিল্লি সংলাপ শুরু হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফরে পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক আস্থার মতো বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে, তাহলে ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়াকে একটি হিসাবকৃত কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে। কিন্তু যদি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ দীর্ঘ সময় স্থবির থাকে, তাহলে একই সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে হারানো সুযোগ হিসেবে দেখা হতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন তাই ব্রিকসের ভেতরে না বাইরে থাকা নয়। প্রশ্ন হলো—ঢাকা কি পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের জন্য যথেষ্ট কৌশলগত পরিসর তৈরি করতে পারছে?
বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বিচ্ছিন্নতা দিয়ে অর্জন করা যায় না। বরং প্রয়োজন একই সঙ্গে দিল্লি, বেইজিং, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, টোকিও এবং অন্যান্য শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা, কিন্তু কোনো একটি সম্পর্ককে অন্য সম্পর্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ না দেওয়া। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি নিজে কোনো কূটনৈতিক বিপর্যয় নয়। আবার এটিকে বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবেও দেখার কারণ নেই।
এটি এমন এক সিদ্ধান্ত, যার মূল্য নির্ধারিত হবে পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো দিয়ে। ঢাকা যদি ব্রিকস ও এনডিবির অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগায়, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করে, চীনের সঙ্গে সহযোগিতাকে বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে রাখে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করে, তাহলে এই অনুপস্থিতি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। কিন্তু কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন যদি সম্পৃক্ততা কমানোর অজুহাতে পরিণত হয়, তাহলে ফল হবে উল্টো। কারণ বড় শক্তির প্রতিযোগিতার যুগে ছোট ও মাঝারি শক্তির সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো একটি পক্ষের কাছাকাছি থাকা নয়; সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো—সব পক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকা, কিন্তু কারও ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া।
লেখক: পিএইচডি শিক্ষার্থী, শানডং বিশ্ববিদ্যালয়, চীন; গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
.png)






-3ab4c2-256x144.webp)