আমার লড়াই হবে কর্মসংস্থানহীনতার বিরুদ্ধে: এনসিপির মেয়রপ্রার্থী মোবাশ্বের

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাঁচ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে লড়বেন মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা এই নেতা ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির স্বপ্ন নিয়ে এনসিপির হাল ধরেছেন। স্ট্রিম-এর সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন তার রাজনৈতিক দর্শন, রাজশাহীর উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতি নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসিবুর রহমান।

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ২৩: ৫৪
মো. মোবাশ্বের আলী। সংগৃহীত ছবি

স্ট্রিম: আপনি রাজশাহী মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মেয়র পদে মনোনয়ন পেয়েছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় বেশ আলোচিত হচ্ছে—বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক বসানো হলো। এই পদক্ষেপকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোবাশ্বের আলী: দেখুন, আমার দল এনসিপি ইতিমধ্যে এই বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর একটি নগ্ন হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন কোনো নির্বাচিত সরকার আসে, তখন তাদের প্রাথমিক ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করা। অর্থাৎ, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কিন্তু বর্তমান সরকার নির্বাচনের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না দিয়ে যেভাবে প্রশাসক বসিয়ে কাজ চালাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। নির্বাচিত সরকার আর অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার প্রয়োজন এক নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দাবি নিয়ে আসা সরকারের কাছে মানুষ নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রত্যাশা করে।

স্ট্রিম: আপনি অন্তর্বর্তী সরকারের কথা বললেন, কিন্তু বিএনপিও তো প্রশাসক বসানোর ক্ষেত্রে একই পথে হাঁটছে।

মোবাশ্বের আলী: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরামত এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই একই যুক্তি একটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদে খাটে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণকে রুদ্ধ করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়।

স্ট্রিম: এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি, কবে ভোট হবে তা-ও নিশ্চিত নয়। কিন্তু এনসিপি অনেক আগেই প্রার্থী ঘোষণা করে দিল। এই আগাম প্রস্তুতির পেছনে আপনাদের কৌশলটা আসলে কী?

মোবাশ্বের আলী: এটি আমাদের জন্য একটি কৌশলগত সুবিধা। আমাদের বুঝতে হবে যে এনসিপি একটি নতুন রাজনৈতিক দল এবং আমাদের অধিকাংশ কর্মী-সমর্থকই তরুণ ও নতুন। জনগণের কাছে আমাদের দলের পরিচয় এবং প্রার্থীর পরিচিতি তুলে ধরার জন্য পর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজন। বড় দলগুলোতে অনেক আগে থেকেই পরিচিত মুখ থাকে, কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেই পরিচিতি তৈরি করতে হবে। আগাম প্রার্থী ঘোষণার ফলে মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে যেমন আলোচনায় আসছি, তেমনি মাঠপর্যায়েও ভোটারদের সঙ্গে ‘অ্যাডভান্স’ কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি। শিডিউল ঘোষণার পর সবাই দৌড়াবে, কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছি। এই বাড়তি সময় আমাদের ভোটের মাঠে এগিয়ে রাখবে, ইনশাআল্লাহ।

স্ট্রিম: আপনি তো এর আগে কখনো নির্বাচন করেননি। রাজশাহী সিটি করপোরেশনে একজন নতুন মুখ হিসেবে মানুষের সাড়া কেমন পাচ্ছেন?

মোবাশ্বের আলী: রাজনীতির মাঠে প্রার্থী হিসেবে আমি নতুন হতে পারি, কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। রাজশাহীর গতানুগতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানুষের সমস্যার সঙ্গে আমি পরিচিত। প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকে আমি অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ সমাজ এবং সমাজের সচেতন নাগরিকরা আমাদের এই সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। বড় দলগুলোর বাইরে বিকল্প একটি শক্তির খোঁজে ছিল মানুষ। আমাদের বন্ধুমহল, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং রাজশাহীর প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি যারা নিরপেক্ষ থাকেন, তারা আমাকে উৎসাহ দিচ্ছেন। এই ইতিবাচক রেসপন্স আমাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

স্ট্রিম: রাজশাহীকে আমরা ‘গ্রিন সিটি’ বা ‘এডুকেশন সিটি’ হিসেবে জানি। অনেক উন্নয়নও হয়েছে সেখানে। নির্বাচিত হলে আপনি নতুন কী করতে চান যা অন্য সিটি মেয়ররা করেননি?

মোবাশ্বের আলী: রাজশাহীর সুনাম আছে এর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্রশস্ত রাস্তাঘাটের জন্য। রাতের রাজশাহী ঝলমলে দেখায়—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে একটি মারাত্মক সংকট আছে, তা হলো কর্মসংস্থান। আমাদের রাজশাহীর যুবকদের কর্মসংস্থানের অভাব তাদের সামাজিক অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বেকারত্বের কারণে অনেকেই মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। আমার প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হবে কর্মসংস্থান।

এ ছাড়া রাজশাহীতে শিল্পকারখানা নেই বললেই চলে। বর্তমানে হাতেগোনা দু-একটি বড় প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। আমি মেয়র হলে প্রাইভেট সেক্টরকে রাজশাহীতে বিনিয়োগ করতে সব ধরনের প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান করব। আমাদের লক্ষ্য থাকবে রাজশাহীর ইয়াং জেনারেশনকে আইটি বেসড, ফ্রিল্যান্সিং ও সফটওয়্যার সেক্টরে দক্ষ করে তোলা। আমাদের এখানে একটি হাইটেক পার্ক আছে, কিন্তু সেটি সরকারি নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অকেজো হয়ে আছে। ফ্যাসিবাদের পতনের পর সেখানকার অবস্থাও নাজুক। আমি এই হাইটেক পার্ককে পুরোপুরি সচল করতে চাই, যাতে হাজার হাজার তরুণ ঘরে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। আমার লড়াই হবে কর্মসংস্থানহীনতার বিরুদ্ধে।

স্ট্রিম: আপনি কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিচ্ছেন, কিন্তু শুধু কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি কি ভোটারদের মন জয় করতে পারবে? অন্যান্য খাত নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

মোবাশ্বের আলী: কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পর্যটনও রাজশাহীতে গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী শহরটি পদ্মা নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। অথচ আমরা পদ্মা পাড়কে পর্যটন নগরী হিসেবে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পারিনি। আমি চাই সমগ্র রাজশাহীকে একটি পর্যটন জোনে রূপান্তর করতে। পদ্মা নদীর তীরকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসবে। এর ফলে হোটেল, মোটেল, আবাসন ও পরিবহন খাতে বিপুল উদ্যোক্তা তৈরি হবে। এ ছাড়া আমরা মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করব এবং নারীদের জন্য নিরাপদ শহর নিশ্চিত করব। রাজশাহীকে শুধু পরিষ্কার শহর নয়, একটি ‘ইনকাম জেনারেটিং’ শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

স্ট্রিম: এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোবাশ্বের আলী: আমি এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখি। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে বড় দলগুলোর একধরনের আধিপত্য তৈরি হয়। এর ফলে যোগ্য স্বতন্ত্র কিংবা নতুন ছোট দলের প্রার্থীরা বৈষম্যের শিকার হন। দলীয় প্রতীক না থাকলে ভোটাররা প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তির যোগ্যতা, শিক্ষা এবং কর্মপরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দেবে। এটি আমাদের মতো নতুন দলের প্রার্থীদের জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করবে।

স্ট্রিম: জাতীয় নির্বাচনে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিল। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনে আপনারা আলাদা প্রার্থী দিচ্ছেন। এতে কি ভোটে কোনো প্রভাব পড়বে না?

মোবাশ্বের আলী: জাতীয় রাজনীতির কৌশল আর স্থানীয় সরকারের সমীকরণ সব সময় এক হয় না। জোটগতভাবে নির্বাচন করতে পারলে অবশ্যই বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, বর্তমান প্রজন্মের ভোটাররা এখন দলবাজির চেয়ে ব্যক্তির সক্ষমতা বেশি দেখে। স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ অনেক বড় ফ্যাক্টর। জামায়াত বা এনসিপি—উভয়েরই মাঠ পর্যায়ে শক্ত অবস্থান আছে। যদি জোটবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত হয়, তবে আমরা তা মেনে নেব। আর যদি সবাই আলাদা লড়ে, তবে সেটি হবে একটি সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। তবে শেষ পর্যন্ত জোটের সিদ্ধান্তই আমার কাছে চূড়ান্ত।

স্ট্রিম: আমরা জেনেছি, আপনি একসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেই আদর্শ থেকে সরে এসে কেন এনসিপির মতো একটি নতুন ধারার রাজনৈতিক দলে যুক্ত হলেন?

মোবাশ্বের আলী: এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দেখুন, গত ১৭ বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে দমবন্ধ করা পরিবেশ ছিল, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতের ওপর যে ফ্যাসিবাদী দমনপীড়ন চলেছে, তা আমাদের নতুনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের মানুষের জন্য এখন একটি ‘ইনক্লুসিভ’ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন।

আমি যখন শিবিরের রাজনীতি করতাম, তখনো দলের ভেতর ভয়েস রেইজ করেছি যে আমাদের একটি আধুনিক ও সার্বজনীন রাজনৈতিক রূপান্তর দরকার। জামায়াতে ইসলামীর পলিটিক্যাল প্র্যাকটিসে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সেখানে চাইলেই সব ধর্ম, বর্ণ বা পেশার মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে মিশতে পারে না। যেমন, তাদের ব্যবস্থায় একজন থিয়েটারকর্মী বা ভিন্ন মতাবলম্বী নারীর নেতৃত্বের জায়গা পাওয়া কঠিন। কিন্তু রাষ্ট্র চালাতে গেলে আপনার সবাইকে প্রয়োজন। ধর্মপ্রাণ মুসলমান যেমন নাগরিক, তেমনি একজন শিল্পী, খেলোয়াড় বা অন্য ধর্মাবলম্বীও সমান নাগরিক। অনেক মানুষ হয়তো ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মানেন না, কিন্তু তারা অত্যন্ত সৎ এবং দেশপ্রেমিক। সেই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতেই আমি এনসিপিতে যোগ দিয়েছি। আমরা একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে মানুষের যোগ্যতাই হবে শেষ কথা।

স্ট্রিম: আপনার মূল্যবান সময়ের জন্য ধন্যবাদ।

মোবাশ্বের আলী: আপনাকেও ধন্যবাদ। রাজশাহীর মানুষের দোয়া ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত