সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদের সাক্ষাৎকার

‘শ্রমিকদের উপেক্ষা করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হবে না’

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান। শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা, অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকের অধিকারসহ নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন স্ট্রিমের প্রতিবেদক তৌফিক হাসান

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ১২: ২৩
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। স্ট্রিম ছবি

স্ট্রিম: দেশের ৮৫ ভাগ শ্রমিকের কোনো সুরক্ষা, মজুরির মানদণ্ড ও সামাজিক স্বীকৃতি নেই। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও কেন এগুলো তৈরি হলো না? আগামীতে এগুলো তৈরি হওয়ার কতটুকু সম্ভাবনা দেখছেন?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: বাংলাদেশের শ্রম জগত নিয়ে কোনো সরকারই সংস্কারের কথা চিন্তা করেনি। এর রূপান্তরের চেষ্টাও করেনি। এটা সব সময়ই ফায়ার ব্রিগেড অ্যাপ্রোচ। অর্থাৎ সমস্যা তৈরি হয়েছে, সরকার সমস্যার সমাধান করার উদ্যোগ নিয়েছে। সমাধান পুরোপুরি হয়নি। আর এই না হওয়ার পেছনে বড় কারণ হচ্ছে শ্রমজীবীদের প্রতি উপেক্ষা। ধরেই নেওয়া হয়, এরা কোনো না কোনোভাবে একটা কাজ খুঁজে ঠিকই টিকে থাকবে। এখন যদি এদের খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যদি এদের মানদণ্ড তৈরি করা হয়, মজুরি বাড়ানো হয় ও কাজের নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাহলে বেকারত্ব বাড়বে। এই ধরনের ভুল চিন্তাগুলোর ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এর পাশাপাশি আমাদের গার্মেন্টসসহ রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর বিকাশ হয়েছে এই ধারণা থেকে যে, আমাদের সস্তা শ্রম আছে বলেই আমরা প্রতিযোগিতায় টিকে আছি। আর এই সমস্ত কারণেই কখনোই সংস্কারের বিষয়টি সামনে আসেনি। এই গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছিল বলেই সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সেটা নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আর খুব বেশি আগানো যায়নি। কিন্তু এটা এগোবে। যেহেতু শ্রমিক আন্দোলন আছে সেহেতু শ্রমিকদের সমস্যার সমাধানও সরকারকে করতে হবে। আমরা আশাবাদী, এই সরকার এটা নিয়ে কাজ করবে। তারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এটা নিয়ে কথা বলেছে।

স্ট্রিম: শ্রম সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে বেশ কিছু প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। তাঁর কতটুকু এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: শ্রম সংস্কার কমিশনের দেওয়া প্রস্তাবনা খুব বেশি বাস্তবায়ন হয়নি। তবে শ্রম মন্ত্রণালয় কিছুটা সক্রিয় হয়েছে। সে কারণে একটা অগ্রাধিকার তৈরি হয়েছে। এবারের শ্রম আইন সংশোধনীতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সহজীকরণ যে শর্তগুলো আমরা প্রস্তাব করেছি সেগুলো রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি জাতীয় সামাজিক সংলাপ ফোরাম গঠনের আইনও তৈরি হয়েছে। এটা গঠন হলে অনেক দূর আগানো যাবে। সুতরাং বলাই যায়, আমাদের একটা স্টেপ ফরোয়ার্ড হয়েছে।

স্ট্রিম: শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিতে এই মুহূর্তে আপনাদের প্রস্তাব করা কোন কোন সংস্কার হওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিতে এই মুহূর্তে বেশ কিছু সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, শ্রম আইনকে সর্বজনীন করে সব শ্রমিককে সুরক্ষার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। একটা জাতীয় ন্যূনতম মজুরির মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। যাতে সব শ্রমিক তার মজুরি নিয়ে কথা বলার জন্য একটা ভিত্তি পায়। সামাজিক সুরক্ষাটা সর্বজনীন করতে হবে। যাতে ৭০ বছরের মানুষকে আর রিকশা চালাতে না হয়। একটু ঝড়-বৃষ্টি হলেই যেন শ্রমিকের খাওয়া বন্ধ না হয়ে যায়। যেকোনো দুর্ঘটনায় যেন কোনো শ্রমিকের পরিবারকে রাস্তায় না নামতে হয়। সকল শ্রমিকের যেন সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত হয়।

স্ট্রিম: শ্রম আইনে বিভিন্ন সময়ে নানা পরিবর্তন আসতে দেখা গেছে। কিন্তু আহত-নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ কিংবা মালিক পক্ষের শাস্তির জায়গায় স্পষ্ট কোনো পরিবর্তন আসতে দেখা যায়নি। কেন এই পরিবর্তন এলো না?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: আহত-নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ কিংবা মালিক পক্ষের শাস্তির জায়গায় কোনো পরিবর্তন আসেনি কারণ শ্রমিকের জীবনের খুব বেশি দাম নেই—এই মানসিকতা এখনো বিদ্যমান। এজন্যই এই জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আসেনি। অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষ একটা উপেক্ষার শিকার। এই উপেক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শ্রমের মর্যাদাও অবজ্ঞার শিকার। দেখা যায়, একটা বাড়িতে ছোট বাচ্চা গৃহকর্মীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে আমরা একে খারাপ আচরণ হিসেবে ধরি না। একজন ছাত্র-ছাত্রী যদি রিকশাওয়ালাকে তুই কিংবা তুমি বলে সম্বোধন করে, সেটাকেও কিন্তু আমরা খারাপ আচরণ হিসেবে ধরি না। কারণ জাতীয়ভাবেই আমাদের মনোজগতে শ্রমজীবী মানুষ উপেক্ষা এবং অবজ্ঞার জায়গায় থাকেন। সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে সমাজকে।

স্ট্রিম: এক মাস পর নতুন সরকারের বাজেট উপস্থাপন হবে। প্রতি বছরই আমরা দেখেছি শ্রমখাত সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ের জন্য তেমন বরাদ্দ থাকে না। এবারের বাজেটে শ্রমখাত সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ের জন্য কেমন বরাদ্দ থাকবে বলে আশা করছেন?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: বাজেট নিয়ে আমরা খুব একটা আশাবাদী নই। এখন পর্যন্ত ওই রকম কোনো লক্ষণ দেখি না। তবে আমরা চেষ্টা করব সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে যে, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সেই প্রতিশ্রুতি আছে। একে জনগণের সঙ্গে চুক্তি বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। শ্রমজীবী মানুষ তো জনগণের একটা বড় অংশ, সেই চুক্তির আলোকে যেন বাজেট প্রণীত হয়, এটা আমরা স্মরণ করিয়ে দেব অবশ্যই।

স্ট্রিম: শ্রমবাজারকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য আপনারা শ্রম জরিপের ক্ষেত্রে আইএলওর সর্বশেষ মানদণ্ড অনুসরণ করার প্রস্তাব করেছেন। এই প্রস্তাব কি এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: এটা সরকার গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এটা নিয়ে কাজ করছে। আমি যতটুকু জানি এটা নিয়ে খুব নেতিবাচক অবস্থান নেই।

স্ট্রিম: শ্রমিকদের সুরক্ষায় আপনারা জরুরি তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেছেন। জরুরি তহবিল গঠন কেন প্রয়োজন?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: গত দুই বছর সবচেয়ে বেশি বকেয়া মজুরির দাবিতে শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছেন। যদি প্রতি কারখানায় শ্রমিকের দুই মাসের মজুরি একটি তহবিলে জমা থাকত তাহলে সরকার সেখান থেকেই বকেয়া মজুরি পরিশোধ করে দিতে পারত। অর্থাৎ আমরা বলতে চেয়েছি, জরুরি তহবিল মালিকের কাছেই থাকবে। কিন্তু যদি কোনো মালিক শ্রমিকের মজুরি বকেয়া করে ফেলে কিংবা কারখানা একদম বন্ধ করে দেয়, তখন সরকার ওই তহবিল থেকে শ্রমিকের বকেয়া পরিশোধ করবে। পরে সেটি পুনরায় তহবিলে যুক্ত করবে। আমরা মনে করি, শ্রমিকদের সুরক্ষায় জরুরি তহবিল গঠন খুব জরুরি একটা বিষয়। খুব দ্রুত সরকারের এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

স্ট্রিম: গৃহভিত্তিক ও রাইড শেয়ারিংসহ অনেক শ্রমিকের এখনো স্বীকৃতি নেই। আপনারা তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। রাষ্ট্র থেকে তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও কি সমাজে তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আপনি মনে করেন?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: এবারের আইনে গৃহভিত্তিক ও রাইড শেয়ারিংসহ যে সব শ্রমিকদের স্বীকৃতি নেই, তাদের সংগঠিত হওয়ার অধিকারটা দেওয়া হচ্ছে। এটা একটা ভালো অগ্রগতি। তো এখন এই অগ্রগতিকে সামনে ধরে যখন তারা সংগঠিত হতে পারবে, তখন তারা তাদের দাবিটা উচ্চারণ করতে পারবে, জানাতে পারবে। আর দাবি জানাতে পারলেই রাষ্ট্র নড়েচড়ে বসবে।

স্ট্রিম: জাতীয় মজুরির মানদণ্ড তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন আপনারা। যদি জাতীয় মজুরির মানদণ্ড তৈরি হয় সেটি মর্যাদাপূর্ণ মানদণ্ড হবে বলে কি আপনি মনে করেন?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: জাতীয় মজুরির মানদণ্ড মর্যাদাপূর্ণ হবে কি না, তা অনেক কিছুর ওপরে নির্ভর করে। তবে তা মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত আমরা দেখি না। যদি না সবাই খুব সক্রিয় থাকে।

স্ট্রিম: আপনারা ট্রেড ইউনিয়নের শর্ত শিথিল করতে বলেছেন। কেন?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: শর্ত শিথিল করে ট্রেড ইউনিয়ন গড়তে না পারলে কোনো সমস্যারই সমাধান হবে না। সেজন্য এটিই হচ্ছে মূল দাবি। এটা হলে শ্রমিক নিজেই সোচ্চার হতে পারবে, তারা সংগঠিতভাবে তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। এখানে প্রতিনিধিত্বের ব্যাপার আছে। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক তো নিজেরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। তাদের পক্ষ থেকে কাউকে দায়িত্ব নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে।

স্ট্রিম: মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কি কোনো বার্তা দিতে চান?

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: মে দিবসের চেতনা শুধু আট ঘণ্টা কাজের দাবি না। এই দাবির পেছনে অনেক কিছু ছিল। যাতে শ্রমিক পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারে, যে কাজ পাবে সে কাজের বিনিময়ে সে যেন মর্যাদাকর জীবনযাপন করতে পারে এবং সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ভূমিকা রাখতে পারে। সুতরাং এটা সামাজিক ন্যায়বিচার, এটি একটি সমতাভিত্তিক শোষণমুক্ত সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর ভিত্তিতেই শ্রমিক ও সমাজকে সংগঠিত করতে হবে। আজকের এই গণতান্ত্রিক পরিবেশে আমরা বলব, শ্রমিকদের উপেক্ষা করে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হবে না। এটাই হোক এবারের মে দিবসের আহ্বান।

স্ট্রিম: আপনাকে ধন্যবাদ।

সুলতান উদ্দিন আহম্মদ: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত