leadT1ad

ইনস্ক্রিপ্টের নিবন্ধ

যাদের আরশোলা বলা হয়েছিল, তারাই কি হয়ে উঠছে ভারতের নতুন রাজনৈতিক প্রতিরোধ

লেখা:
লেখা:
অত্রি ভট্টাচার্য

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬, ২২: ০৩
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

নয়াদিল্লির যন্তরমন্তরে শনিবার এক অভিনব প্রতিবাদ দেখল ভারত। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ডাকা বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা তেলাপোকার মুখোশ পরে রাস্তায় নামেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানসহ একাধিক নেতার পদত্যাগের দাবিতে। এই দৃশ্যকে ঘিরেই সরব হয়েছে রাজনৈতিক মহল।

‘অর্গানাইজার’ পত্রিকা সম্প্রতি সরকারের প্রযুক্তিনীতির সমালোচকদের ‘তেলাপোকা সিনড্রোম’ আখ্যা দেওয়ার পর থেকেই এই পরিভাষা বিতর্কের কেন্দ্রে। সিজেপির কর্মীরা এদিন সেই তকমাকেই প্রতীকী প্রতিবাদে রূপ দেন। তাদের দাবি, ‘তথাকথিত ককরোচ জনতা পার্টি আসলে ভারতের জাগ্রত নাগরিক সমাজ, যারা স্বজনপোষী পুঁজিবাদ ও স্বৈরাচারী প্রবণতার বিরুদ্ধে সরব।’

জর্জ সরোসের টাকায় চলে এই সব আন্দোলন। বিজেপি-আরএসএসের এই মন্তব্যের পরই সিজেপি পাল্টা বিবৃতি দিয়ে জানায়, ‘সরোস-যোগের পুরনো গল্প বলে আসল ইস্যু চাপা দেওয়া হচ্ছে।’ সংগঠনের মুখপাত্র স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমাদের তহবিল সম্পূর্ণ দেশীয় নাগরিকদের গণ-অনুদান থেকে আসে। প্রশ্ন যাঁরা করছেন, তাঁরাই বলুন, বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী নেটওয়ার্কের আর্থিক লেনদেনের হিসাব কোথায়?’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘তেলাপোকা’ বিতর্ক ঠাণ্ডাযুদ্ধকালীন ‘বিদেশি হাত’-এর অভিযোগেরই সমসাময়িক সংস্করণ। ইন্দিরা গান্ধী যেমন আরএসএস-কে সিআইএর দালাল বলে দমন করেছিলেন, তেমনই আজ সমালোচক নাগরিক সমাজকে ‘সরোস-চামচা’ বানিয়ে খাটো করার চেষ্টা চলছে।

এই টানাপোড়েনের শিকড় খুঁজতে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। উনিশশো পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান নির্ধারক ছিল ঠাণ্ডাযুদ্ধের বৈশ্বিক টানাপোড়েন। সেই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে আরএসএস ভারতের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখত, আর ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিকে (সিপিআই) মনে করত মস্কোর দেশীয় দালাল। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিছক প্রচার মাত্র ছিল না; সংঘের মূল আদর্শিক ভিত্তিই ছিল সাম্যবাদবিরোধিতা। আর এই বিরোধিতার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়; বরং এটি আরএসএসপন্থী সামাজিক বয়ানের প্রতি একটি কটাক্ষ। যা দিয়ে দুর্নীতি, স্বজনপোষী পুঁজিতন্ত্র ও সংখ্যালঘু-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার নাগরিকদের সামাজিক প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা চলছে।

অন্য দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন ভারত ছিল এক ধরনের কৌশলগত হতাশা। নেহরুর জোট-নিরপেক্ষ নীতি, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং ১৯৫৭ সালে কেরালায় বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার— এই তিনটি বাস্তবতা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছিল।

এই প্রেক্ষাপটেই মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ভারতীয় রাজনীতির দিকে ভিন্ন চোখে তাকাতে শুরু করে। তাদের দৃষ্টিতে আরএসএস ছিল একটি ব্যতিক্রমী সংগঠন— যেটি সুশৃঙ্খল, কঠোর মতাদর্শভিত্তিক এবং সর্বোপরি, গভীরভাবে সাম্যবাদবিরোধী একটি তৃণমূলস্তরের শক্তি। এশিয়ার মাটিতে বামপন্থী মতাদর্শের উত্থান ঠেকাতে সিআইএর যে বৈশ্বিক কৌশল, তাতে আরএসএস ছিল একটি কাঙ্ক্ষিত সহযোগী।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অশ্রেণিভুক্ত একাধিক গোপন তারবার্তা থেকে জানা যায়, ওয়াশিংটন নিয়মিতভাবে আরএসএসের শক্তি ও প্রভাব বিশ্লেষণ করত এবং সংগঠনটিকে পশ্চিমাপন্থী, কমিউনিজম-বিরোধী মনোভাবাপন্ন বলে চিহ্নিত করত। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের এই তারবার্তাগুলি প্রমাণ করে, সিআইএ অন্তত কাগজে-কলমে আরএসএসকে একটি সম্ভাব্য কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখেছিল। (U.S. State Department, declassified cables, 1950s-60s)।

ভারতীয় গোয়েন্দা ইতিহাসের অন্যতম চাঞ্চল্যকর অধ্যায় উন্মোচিত হয় প্রখ্যাত সাংবাদিক ও ইন্দিরা গান্ধীর প্রাক্তন তথ্য উপদেষ্টা বিজি ভার্গিসের ১৯৯৬ সালের গ্রন্থ ‘ওয়ারিয়র অফ দ্য ফোর্থ এস্টেট’-এ। বইটিতে তিনি দলিলসহ তুলে ধরেন, ১৯৬৬ সালে সিআইএ ভারতের অভ্যন্তরে একটি গোপন অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন নীতির পক্ষে ভারতীয় জনমত গঠন করা।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার উত্তর ভিয়েতনামে মার্কিন বোমাবর্ষণের প্রকাশ্য সমালোচনা করছিল। অন্য দিকে, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলিতে তখন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির প্রভাব ছিল প্রবল এবং তারা আমেরিকা-বিরোধী তীব্র বিক্ষোভ গড়ে তুলছিল। এই পরিস্থিতিতে সিআইএ দেখল, আরএসএসের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) বামপন্থীদের বিরুদ্ধে একটি আদর্শ পাল্টা-শক্তি হতে পারে।

ভার্গিসের বর্ণনা অনুযায়ী, সিআইএ একজন ভারতীয় মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অর্থ সরবরাহের পরিকল্পনা করে। লক্ষ্য ছিল খুব স্পষ্ট— ক্যাম্পাসগুলিতে সোভিয়েত-বিরোধী ও মার্কিন-পন্থী ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ মিছিল করানো। যা দেখে মনে হবে ভারতীয় ছাত্রসমাজের একাংশ আমেরিকার ভিয়েতনাম নীতিকে পুরোপুরি সমর্থন করছে।

কিন্তু পরিকল্পনাটি বেশি দূর এগোতে পারেনি। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা (আইবি) ও সে সময়ে নবগঠিত ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ (র) তাদের নিজস্ব সূত্রের মাধ্যমে এই ঘটনার আঁচ পেয়ে যায়। ইন্দিরা গান্ধীকে বিষয়টি জানানো হলে, তাঁর সরকার সরাসরি মার্কিন দূতাবাসের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই ঘটনা ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সমস্যার জন্ম দেয়। ভার্গিসের মতে, এই ঘটনাই ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে এই চিরস্থায়ী ধারণা গেঁথে দেয় যে, বিদেশি শক্তি চাইলে দেশীয় আদর্শগত সংগঠনগুলিকে ব্যবহার করতে পারে এবং করতে চেষ্টাও করবে (ভার্গিস, ১৯৯৬, পৃ. ১১২-১১৮)

বর্তমানে ভারতের রাস্তায় যে বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তার মূল লক্ষ্য হলো ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা স্বজনপোষী পুঁজিতন্ত্র। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে বেছে নেওয়া কয়েকটি বড় পুঁজিপতি গোষ্ঠীকে ঢালাও রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া।

এর ঠিক এক দশক পর, ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে হাজার হাজার বিরোধী নেতা কারারুদ্ধ হন এবং আরএসএস ছিল এই দমনপীড়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ইন্দিরা গান্ধী শুধু এই দমনই করেননি, বরং এর পক্ষে একটি শক্ত রাজনৈতিক যুক্তিও দাঁড় করিয়েছিলেন।

সংসদে দেওয়া একটি ভাষণে তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, সিআইএ তাদের ‘পরীক্ষিত মাধ্যম’ ব্যবহার করে ভারতে অর্থ ঢালছে। কারা সেই মাধ্যম? ইন্দিরা গান্ধীর ইঙ্গিত ছিল পরিষ্কার— তারা হলো আরএসএস ও অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠন। তাঁর অভিযোগ ছিল, সিআইএর মূল লক্ষ্য হলো তাঁর সরকারকে অস্থিতিশীল করা; কারণ তিনি সোভিয়েত-ঘনিষ্ঠ নীতি নিয়েছিলেন এবং ১৯৭৪ সালে সফল পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। পোখরান-১ ছিল ভারতের সামরিক শক্তির প্রদর্শন এবং ইন্দিরা গান্ধীর মতে, ওয়াশিংটন আসলে তার প্রতিশোধ নিতে চাইছিল।

জরুরি অবস্থার পরবর্তীকালে বহু ঐতিহাসিক ও গবেষক এই অভিযোগ পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং সিংহভাগই একে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। স্বয়ং মার্কিন সরকার কখনোই কোনো সংগঠিত ষড়যন্ত্রের কথা স্বীকার করেনি। ইন্দিরা গান্ধী পুরো অ-কমিউনিস্ট বিরোধীপক্ষকে ‘পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দালাল’ হিসেবে প্রতিপন্ন করার জন্য ‘বিদেশি হাত’-এর আখ্যানটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এই অভিযোগ তাঁকে একই সঙ্গে বিরোধীদের নৈতিকভাবে দুর্বল করার এবং নিজের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।

গবেষকদের দীর্ঘদিনের আগ্রহ সত্ত্বেও, ল্যাংলি (সিআইএ সদর দপ্তর) ও নাগপুর (আরএসএস সদর দপ্তর)-এর মধ্যে প্রত্যক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন বা নিয়ন্ত্রণের কোনো সম্পর্কের স্বাক্ষর আজ পর্যন্ত কোনো অশ্রেণিভুক্ত দলিলে পাওয়া যায়নি। আরএসএসের সংগঠনতন্ত্র ও মতাদর্শ গভীরভাবে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে নিমজ্জিত। এর কাঠামো, সদস্যপদ পদ্ধতি এবং আদর্শগত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বাইরের কোনো শক্তির পক্ষে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব করে তোলে। ফলে, সংগঠনটিকে সিআইএর ‘স্থায়ী সম্পদ’ হিসেবে কল্পনা করা ইতিহাসের নিরিখে বাস্তবসম্মত নয়।

আরএসএস বরাবরই সিআইএ-যোগাযোগের অভিযোগ তীব্রভাবে অস্বীকার করে এসেছে। তাদের বক্তব্য, এটি কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সৃষ্ট একটি মিথ্যা প্রচার, যার উদ্দেশ্য দেশীয় জাতীয়তাবাদী শক্তিকে কলঙ্কিত করা। এই অস্বীকৃতি শুধু পুরনো দিনের নয়; আজও সংঘ পরিবার যখনই এই অভিযোগের মুখোমুখি হয়, তখনই তারা একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে উড়িয়ে দেয়।

একবিংশ শতাব্দীতে যদিও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে গিয়েছে। এখন আর সিআইএর সঙ্গে সমান্তরালতার প্রশ্নই নেই; বরং মার্কিন থিংকট্যাংকগুলি আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলি ও মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য আরএসএসের মতাদর্শকে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই পরস্পর সন্দেহ ও সমালোচনা ঠান্ডাযুদ্ধকালীন সাময়িক সমান্তরালতার সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতা।

আরএসএস যেকোনো গণতান্ত্রিক প্রতিবাদী আন্দোলনে অংশ নিতে পারে, কিন্তু তার শর্ত একটিই—তাদের অবশ্যই নিজেদের বর্ণবাদী হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ এবং স্বজনপোষী পুঁজিবাদী কাঠামো ভেঙে ফেলার ও প্রকাশ্যে নিন্দা করার রাজনৈতিক নৈতিকতা প্রদর্শন করতে হবে।

২০২৬ সালের ২২ মে ‘অর্গানাইজার’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ককরোচ সিনড্রোম: দ্য নিউ ফেস অফ অ্যান্টি-ইন্ডিয়া টেক সিনিসিজম’ শীর্ষক প্রবন্ধটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত মতাদর্শিক আক্রমণ। তাতে বলা হয়, ভারতের প্রযুক্তি-সমালোচকদের একটি অংশ ‘আরশোলার মতো’ আচরণ করছে— তারা অন্ধকারে বাস করে, সমালোচনার বিষ ছড়ায় এবং ভারতের উন্নয়নের আলো সহ্য করতে পারে না।

পরবর্তীকালে ‘দ্য ওয়্যার’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে এই ভাষাকে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে, কীভাবে এই ধরনের পরিভাষা দিয়ে নাগরিক সমাজের একটি অংশকে অমানবিকীকরণ করা হচ্ছে। ‘সিজেপি’ অর্থাৎ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়; বরং এটি আরএসএসপন্থী সামাজিক বয়ানের প্রতি একটি কটাক্ষ। যা দিয়ে দুর্নীতি, স্বজনপোষী পুঁজিতন্ত্র ও সংখ্যালঘু-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার নাগরিকদের সামাজিক প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে আরএসএস ‘সিজেপি’ বা ককরোচ জনতা পার্টিকে কোনো ধরনের সমর্থন দিচ্ছে না। বরং, আরএসএসের মুখপত্র ও সহযোগী সংগঠনগুলির বিবৃতি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, তারা সিজেপির নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভগুলিকে কট্টরভাবে বিরোধিতা করছে। তাদের দৃষ্টিতে, এসব প্রতিবাদ হলো ‘ভারত-বিরোধী শক্তি’র ষড়যন্ত্র এবং ‘প্রযুক্তিবাদী-বিদ্বেষী নৈরাজ্যবাদ’। ঐতিহাসিকভাবেও আরএসএস যেকোনো গণতান্ত্রিক নাগরিক আন্দোলনের প্রতি বরাবরই সন্দেহপ্রবণ থেকেছে, যদি তা তাদের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়।

রাজনৈতিক নাগরিক সমাজ হলো রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যবর্তী সেই পরিসর, যেখানে বিভিন্ন সংগঠন, সমিতি, ধর্মীয় গোষ্ঠী, ট্রেড ইউনিয়ন ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সক্রিয় থাকে এবং জননীতিকে প্রভাবিত করে। এই সংজ্ঞার আলোকে আরএসএস নিঃসন্দেহে ভারতের রাজনৈতিক নাগরিক সমাজের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী অঙ্গ। তাদের কোটি কোটি স্বেচ্ছাসেবক, সহযোগী সংগঠন (যেমন: বিএমএস, বিজেপি, স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ ইত্যাদি) এবং নানা সাংস্কৃতিক প্রকল্প একে নিছক একটি সাধারণ গোষ্ঠীর চেয়ে অনেক বড় শক্তিতে পরিণত করেছে। জরুরি অবস্থার সময় যেমন আরএসএস রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের শিকার হয়েছিল এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তেমনই তারা তাত্ত্বিকভাবে আজও নাগরিক প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার অধিকার রাখে।

বর্তমানে ভারতের রাস্তায় যে বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তার মূল লক্ষ্য হলো ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা স্বজনপোষী পুঁজিতন্ত্র। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে বেছে নেওয়া কয়েকটি বড় পুঁজিপতি গোষ্ঠীকে ঢালাও রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া। সিজেপির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন সরাসরি অভিযোগ করছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার এই ব্যবস্থাকে দিনের পর দিন পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এখন প্রশ্ন হলো: এই স্বজনপোষী পুঁজিতন্ত্রের রমরমার সঙ্গে কি আরএসএস ও তার অঙ্গসংগঠনগুলির সত্যিই কোনো সম্পর্ক নেই?

আরএসএসের ‘অর্গানাইজার’-এর সাম্প্রতিক ভাষা শুধু আক্রমণাত্মক নয়, এটি গণতন্ত্র-বিরোধী মানসিকতারও প্রকাশ। সমালোচকদের কীটপতঙ্গের সঙ্গে তুলনা করে তাদের মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা হয়।

বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে শীর্ষ শিল্পপতিদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী নেটওয়ার্কের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। আরএসএসের অর্থনৈতিক মতাদর্শের দিক নির্ণয়কারী শাখা স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ (এসজেএম) অতীতে বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, ধীরে ধীরে তা নির্বাচনী তহবিল ও বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে বৃহৎ দেশীয় পুঁজির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে (গবেষণা প্রতিবেদন, ‘হিন্দুত্ব ও পুঁজি’, ২০২৪)।

আরেকটি গভীরতর সমস্যা হলো আরএসএসের বর্ণ-ভাবনা। সংঘের অভ্যন্তরীণ সংহিতা এখনও বর্ণ-ভিত্তিক সামাজিক ক্রমকে ‘আধ্যাত্মিক বৈচিত্র্য’ হিসেবে সমর্থন করে। হিন্দু সমাজের ঐক্যের যে তত্ত্ব তারা প্রচার করে, তাতে বর্ণপ্রথার বিলোপ নয়, বরং তার পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হয়। দলিত, আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলির জন্য এই অবস্থান তাদের অর্থনৈতিক সমতার অধিকারকে কাঠামোগতভাবে খর্ব করে। তাই আরএসএস যদি শুধুমাত্র ‘পুঁজিতন্ত্র’-এর বিরুদ্ধেও কথা বলে, কিন্তু নিজেদের বর্ণবাদী কাঠামো নিয়ে নীরব থাকে, তাহলে সেটিও হবে চরম ভণ্ডামি।

আরএসএস যেকোনো গণতান্ত্রিক প্রতিবাদী আন্দোলনে অংশ নিতে পারে, কিন্তু তার শর্ত একটিই—তাদের অবশ্যই নিজেদের বর্ণবাদী হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ এবং স্বজনপোষী পুঁজিবাদী কাঠামো ভেঙে ফেলার ও প্রকাশ্যে নিন্দা করার রাজনৈতিক নৈতিকতা প্রদর্শন করতে হবে। এই শর্ত পূরণ না করলে, তাদের অংশগ্রহণ হবে গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর এক ভণ্ডামি, যেখানে মতাদর্শিক আধিপত্যের লড়াইয়ের জন্য নাগরিক আন্দোলনের নাম ভাঙানো হবে।

গণতন্ত্র কোনো মূল্যহীন যন্ত্র নয়; এ জিনিস কিছু মৌলিক মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে থাকে: যেমন সাম্য, মর্যাদা, বহুত্ববাদ ও ন্যায়। যদি কোনো সংগঠন এই মূল্যবোধগুলির বিরোধিতা করে, কিন্তু নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে চায়, তাহলে তা হবে গণতন্ত্রের নামে প্রতারণা। আরএসএসকে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতেই হবে— হয় তারা বর্ণবাদ ও পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্তরিক অবস্থান নেবে, নয়তো তাদের নাগরিক সমাজের প্রতিবাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণের দাবি হবে ফাঁকা বুলি।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, কীভাবে ‘বিদেশি হাত’-এর তত্ত্ব ব্যবহার করে একদা দেশীয় বিরোধিতাকে দমন করা হয়েছিল। জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধী আরএসএসকে ‘সিআইএর দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন; বাস্তবে আরএসএস ছিল একটি দেশজ সংগঠন যাদের সঙ্গে সিআইএর কোনো আনুষ্ঠানিক জোট ছিল না। আজও কি একইভাবে ‘ককরোচ’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘আরবান নকশাল’— এই বিশেষণগুলি ব্যবহার করে প্রকৃত নাগরিক কণ্ঠকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে না?

ভারতীয় নাগরিক সমাজের আসল চ্যালেঞ্জ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই ভণ্ডামিকে চিহ্নিত করা এবং একটি প্রকৃত সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। আরএসএসকে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তারা কি বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের অংশীদার হবে, নাকি ‘ককরোচ’ বিশেষণের মাধ্যমে বিরোধীদের অমানবিক করে নিজেদের আধিপত্যের লড়াই চালিয়ে যাবে?

আরএসএসের ‘অর্গানাইজার’-এর সাম্প্রতিক ভাষা শুধু আক্রমণাত্মক নয়, এটি গণতন্ত্র-বিরোধী মানসিকতারও প্রকাশ। সমালোচকদের কীটপতঙ্গের সঙ্গে তুলনা করে তাদের মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা হয়। অথচ, এই একই সংগঠন যদি আবারও কোনোদিন পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে মিছিল করে, তাহলে যে দ্বৈতনীতি প্রকট হবে, তা ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিকে আরও দুর্বল করবে না কি?

ঠান্ডাযুদ্ধের দিনগুলিতে সিআইএ আরএসএসকে ব্যবহারের যে ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল এবং ইন্দিরা গান্ধী যে ‘বিদেশি হাত’-এর রাজনৈতিক ফন্দি এঁকেছিলেন, তার উত্তরাধিকার আজও ভারতীয় রাজনীতিতে বিদ্যমান। তবে ইতিহাস আমাদের এ-ও দেখায়, আরএসএস কোনো বিদেশি চক্রান্তের অন্ধ অনুকরণকারী ছিল না; তারা একটি আদর্শিকভাবে আত্মনিবিষ্ট দেশজ শক্তি ছিল এবং আছে।

কিন্তু এই স্বাদেশিকতার দাবির সঙ্গে আসে একটি বড় দায়িত্ব। যদি আরএসএস সত্যিই বিশ্বাস করে যে তারা ভারতীয় নাগরিক সমাজের একটি বৈধ অংশ, তাহলে তাদের অবশ্যই সেই সমাজের গণতান্ত্রিক ও সাম্যের মূল্যবোধ মেনে চলতে হবে। স্বজনপোষী পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে আজকের বিক্ষোভে শামিল হওয়ার আগে, তাদের উচিত নিজেদের বর্ণবাদী হিন্দুত্ববাদী পুঁজিবাদী নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলার অঙ্গীকার করা এবং প্রকাশ্যে তার নিন্দা করা।

তা না হলে, ‘সিজেপি’র নিন্দা কিংবা পুরনো সিআইএ-যোগসূত্র অস্বীকারের রাজনীতি হবে নিছক আত্মরক্ষার ছলনা। ভারতীয় নাগরিক সমাজের আসল চ্যালেঞ্জ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই ভণ্ডামিকে চিহ্নিত করা এবং একটি প্রকৃত সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। আরএসএসকে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তারা কি বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের অংশীদার হবে, নাকি ‘ককরোচ’ বিশেষণের মাধ্যমে বিরোধীদের অমানবিক করে নিজেদের আধিপত্যের লড়াই চালিয়ে যাবে? এর উত্তরই নির্ধারণ করবে ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের রূপরেখা।

  • অত্রি ভট্টাচার্য: ভারতীয় লেখক ও গবেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত