leadT1ad

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬ বছরে পদার্পন

দলীয় ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাস এখন আর নেই

১২ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) দিবস। দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬ বছরে পদার্পণ করল। স্বাধীনতার প্রায় সমবয়সী এ বিশ্ববিদ্যালয় ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নানা পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদগুলোতে রদবদল। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন দর্শন বিভাগের অধ্যাপক কামরুল আহসান। স্ট্রিম প্রতিবেদক হাসিবুর রহমান-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০০: ২৩
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কামরুল আহসান। সংগৃহীত ছবি

স্ট্রিম: ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডাররা নানা দাবিদাওয়া তুলে ধরে। সেসব দাবির কতটুকু পূরণ হয়েছে?

কামরুল আহসান: গত ৫৫ বছরে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল, যার কিছু পূরণ হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়নি। এত অল্প সময়ে দীর্ঘদিনের সব প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন। তবে আমরা গুণগত কিছু পরিবর্তন আনতে পেরেছি।

তবে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন তা হলো প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলে নিজেদের আসন বুঝে পেয়েছে। এই সংকট দীর্ঘকাল ভুগিয়েছে জাহাঙ্গীরনগরকে। এরপরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্যাম্পাসে এখন র‍্যাগিং নেই, গণরুম কালচার বিলুপ্ত হয়েছে এবং দলীয় ছাত্ররাজনীতির নামে যে সন্ত্রাস ছিল, তা এখন আর নেই।

এছাড়া গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এবং গত দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় র‍্যাংকিংয়ে আমরা ভালো অবস্থান ধরে রেখেছি। মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস ও শৃঙ্খলা ফেরাতে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি, যা আগে ছিল না।

স্ট্রিম: র‍্যাংকিংয়ের বিষয় যেহেতু এসেছে; পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‍্যাংকিংয়ে ২০০-৩০০ এর মধ্যে থাকে, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন এত পিছিয়ে? এখানে কি সক্ষমতার অভাব, নাকি কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে?

কামরুল আহসান: এখানে দুই পক্ষের দায় আছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা অবশ্যই একটি বড় ফ্যাক্টর। আমাদের জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়, যেখানে জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী তা ৪ থেকে ৬ শতাংশ হওয়া উচিত। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এই বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে কমছে। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সদিচ্ছা থাকলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

আমাদের শিক্ষকদের অনেক গবেষণা আছে, কিন্তু সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করার ক্ষেত্রে একধরনের অলসতা লক্ষ করা যায়। অথচ এই শিক্ষকেরাই যখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নেন, তখন তাদের গবেষণা ওই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে। আমরা ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে আছি।

তবে গবেষণার পরিবেশ আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং লাইব্রেরিতে আন্তর্জাতিক জার্নাল সাবস্ক্রাইব করা হচ্ছে। আশা করছি ভবিষ্যতে এর ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।

আমাদের শিক্ষকদের অনেক গবেষণা আছে, কিন্তু সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করার ক্ষেত্রে এক ধরনের অলসতা লক্ষ করা যায়। অথচ এই শিক্ষকেরাই যখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নেন, তখন তাদের গবেষণা ওই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে। আমরা ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে আছি।

স্ট্রিম: টেকনোলজির এই যুগে ক্যাম্পাসের স্টেকহোল্ডাররা এখনও ম্যানুয়ালি সবকিছু ব্যবহার করছে। অটোমেশনের কাজ কতদূর এগিয়েছে? শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কবে নাগাদ এর পূর্ণ সুফল পাবে?

কামরুল আহসান: অটোমেশন হলে সেবাগ্রহীতা ও প্রদানকারীর মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারী বা বাধা থাকে না। বর্তমানে লাইব্রেরি, অ্যাকাউন্টস ও ভর্তি শাখায় অটোমেশনের কাজ চলছে। শীঘ্রই পরীক্ষা শাখা ও পরিবহন শাখাও এর আওতায় আসবে। আমার ধারণা, আগামী এক বছরের মধ্যে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের আওতায় আনতে পারব।

স্ট্রিম: ৫৫ বছরে মাত্র ৬টি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী সমাবর্তন কবে অনুষ্ঠিত হতে পারে?

কামরুল আহসান: সমাবর্তন নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত কমিটি কাজ করছে। গত সপ্তাহেও তাদের সাথে কথা হয়েছে। তারা খুব শীঘ্রই আমাকে জানাবে যে প্রস্তুতির জন্য তাদের ঠিক কতটা সময় প্রয়োজন। আশা করছি খুব দ্রুত আমরা এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে পারব।

একজন নাগরিক হিসেবে শিক্ষকের রাজনৈতিক আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু যখন কেউ উপাচার্যের মতো পেশাদার দায়িত্বে আসেন, তখন তাকে কোনো বিশেষ দলের পরিচয়ে নয়, বরং সততা ও সবার অভিভাবক হিসেবে কাজ করতে হয়।

স্ট্রিম: আপনি দীর্ঘদিন ‘জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের’ সভাপতি ছিলেন। অথচ উপাচার্য হওয়ার পর আপনাকে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দল বা জামায়াত সংশ্লিষ্ট বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর কারণ কী?

কামরুল আহসান: একজন নাগরিক হিসেবে শিক্ষকের রাজনৈতিক আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু যখন কেউ উপাচার্যের মতো পেশাদার দায়িত্বে আসেন, তখন তাকে কোনো বিশেষ দলের পরিচয়ে নয়, বরং সততা ও সকলের অভিভাবক হিসেবে কাজ করতে হয়। অতীতে আমরা দেখেছি দলীয় আনুগত্যের কারণে অনেকে দায়িত্বশীল আচরণ করেননি। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের অঙ্গীকার হলো—ক্যাম্পাসে কোনো অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা হতে দেওয়া যাবে না। আমি যখন নিয়ম মেনে কাজ করছি, তখন রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের বিষয়গুলো মূলত আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দৈন্যতা বা ভুল বোঝাবুঝি থেকে আসছে। আমার কাছে দলের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও সততাই প্রধান।

স্ট্রিম: দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় অনেকের মধ্যে অসন্তোষ আছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া ও নীতিমালার বিষয়ে আপনাদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন আছে, কী বলবেন?

কামরুল আহসান: শিক্ষক নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। একজন শিক্ষক নিয়োগ মানে ৪০ বছরের জন্য সেবা গ্রহণ। অতীতে দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ফলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা চেয়েছি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুণগত পরিবর্তন আনতে। এ জন্য একাডেমিক কাউন্সিলে কমিটি করে নীতিমালা সংস্কারে কিছুটা সময় লেগেছে। যারা অসন্তুষ্ট, তারা হয়তো দ্রুত নিয়োগ চান। কিন্তু আমরা চাই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হোক, যেন কোনোভাবেই দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য কেউ শিক্ষক হিসেবে না আসেন। আমাদের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে, এখন আমরা নতুন করে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করব।

স্ট্রিম: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আপনাকে নিয়োগ দিয়েছে। সামনে নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হবে, নির্বাচিত সরকারের আমলে আপনার দায়িত্বে থাকা নিয়ে কোনো শঙ্কা কাজ করে কি না?

কামরুল আহসান: সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণের কোনো সংঘাত নেই। যে সরকারই আসুক, তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়া। একজন উপাচার্য যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে সঠিক কাজ করেন, তবে তিনি যেকোনো সরকারের কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারেন। আমার কাছে পদ আঁকড়ে থাকা বা হারানোর ভীতি—কোনোটাই বিবেচ্য নয়। যতদিন দায়িত্বে আছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে কাজ করে যাব। সময় বলে দেবে ভবিষ্যতে কী হবে।

স্ট্রিম: আপনাকে ধন্যবাদ।

কামরুল আহসান: ঢাকা স্ট্রিমকেও ধন্যবাদ।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত