জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী

নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ওপর অবিচার করা হয়েছে

ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী জাতীয় পার্টির মহাসচিব। তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি সম্পন্ন করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিজি সার্টিফিকেট অন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি ল ডিগ্রি নেন। সিটি ইউনিভার্সিটির ইনস অব কোর্ট স্কুল অব ল (আইসিএসএল) থেকে বিভিসি (পিজি ডিপ্লোমা ইন প্রফেশনাল অ্যান্ড লিগ্যাল স্কিলস) করেছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন, জাতীয় পার্টির অবস্থান, বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতির গতিপথসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬, ১৮: ৩৭
জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী

স্ট্রিম: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এবং নির্বাচন পরবর্তী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: দেখুন, এই নির্বাচনটিকে আমরা ‘হাইব্রিড’ বলছি। এর কারণ হলো, বেশ কিছু জায়গায় সুকৌশলে যৌথভাবে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির (জাপা) শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও আমাদের প্রার্থীদের তৃতীয় স্থানে নামিয়ে আনা হয়েছে, এমনকি দু-এক জায়গায় জামানত বাজেয়াপ্ত করানো হয়েছে। অসংখ্য কেন্দ্রে জাপার জিরো বা সিঙ্গেল ডিজিট ভোট দেখানোটা পুরোপুরি অস্বাভাবিক। আমি মনে করি, এটি জাপাকে শূন্য আসন এবং ১%-এর কম ভোটে নামিয়ে আনার একটি কেন্দ্রীয় ব্লুপ্রিন্ট বা ষড়যন্ত্র।

তবে এর বাইরে ইতিবাচক দিক হলো, দেশে একটি গণতান্ত্রিক ট্রানজিশন বা পালাবদল ঘটেছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (ইউনূস সরকার) থেকে দেশ এখন স্থিতিশীলতার দিকে যাবে বলে আমরা আশাবাদী। সেই জায়গা থেকে আমি নতুন সরকার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভাকে স্বাগত জানাবো। দেশ রক্ষার যে সুযোগ তারা পেয়েছেন, তা কাজে লাগাতে হলে তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে এবং সংসদকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে।

আমরা মনে করি, এই ভোটের মাধ্যমে দেশ চালাতে অপারগ ও দায়বদ্ধতাহীন ইউনূস সরকারের বিদায় হয়েছে। তারা ‘মব’কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। বিগত সরকারের আমলে জাতীয় পার্টি চরম বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর তীব্র অনৈতিক চাপ ছিল যাতে জাপা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে। এত বৈরী পরিবেশেও যে আমরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে মাঠে টিকে ছিলাম, এর রাজনৈতিক গুরুত্ব মোটেও অর্থহীন নয়। এটি আমাদের একটি প্রাথমিক বিজয়।

স্ট্রিম: ১৯৯১ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পরও আপনারা অনেক আসন পেয়েছিলেন। এবার আপনাদের শূন্য আসন কেন? ফলাফল এমন হলো কেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় ছিল এবং নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ছিল। প্রশাসনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ধারণাটি তখনো আসেনি। সে সময় জাপার নেতাকর্মীরা জেলে থাকলেও ভোট মোটামুটি সুষ্ঠু হয়েছিল এবং জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটেছিল। কিন্তু এবার জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। আমাদের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং একাধিকবার নির্বাচিত এমপিরাও তৃতীয় হয়েছেন। রংপুর সদরের মতো জায়গায় জাপা মাত্র ২০ হাজার ভোট পেতে পারে না। পুরো প্রক্রিয়াটিতেই একটি নীল নকশা বা ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল।

আমাদের সন্দেহ, জাপার সাথে ইউনূস সরকার, এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীর যে টানাপোড়েন ছিল, সেই প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই একটি নির্দিষ্ট ‘সুইচ চেপে’ ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জাপাকে সংসদ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

স্ট্রিম: পুরো নির্বাচনেই কি ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে বলে মনে করেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: পুরো নির্বাচনের কথা বলব না, তবে আমাদের আসনগুলোতে জাপার অস্বাভাবিক কম ভোট পাওয়াটা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

স্ট্রিম: ভোটার উপস্থিতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন? ৬০ থেকে ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পড়েছে।

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: এককথায় এটি ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর চেয়ে ভালো নির্বাচন। তবে ভোট কাস্টিংয়ে অসামঞ্জস্য রয়েছে। কোথাও ৫০% ভোট পড়েছে, আবার পাশের আসনেই হয়তো ৭০% ভোট পড়েছে। এছাড়া, প্রায় সব আসনেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যালট স্টাফিং হয়েছে এবং গণনার সময় কোনো এজেন্ট ছিল না। প্রায় ৭৪ লক্ষ গণভোট বাতিল হওয়াটা বিস্ময়কর; আমার সন্দেহ এর মধ্যে প্রচুর ‘না’ ভোট ছিল। ‘হ্যাঁ’ ভোটে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সেটি প্রার্থীর ভোটেও অনিয়মের পথ খুলে দিয়েছে। আমরা পুরো ফলাফল প্রত্যাখ্যান করছি না, তবে জাপার প্রতি যে অবিচার হয়েছে, তার দায় নির্বাচন কমিশন ও ইউনূস সরকার এড়াতে পারে না।

স্ট্রিম: নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? অনেক নতুন প্রার্থী এবং দ্বৈত নাগরিকের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটিকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: কমিশনের কিছু কর্মকর্তার মধ্যে আমরা সদিচ্ছা দেখেছি। কিন্তু দুর্বল ও মব-নিয়ন্ত্রিত একটি সরকারের অধীনে তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছিল না। নির্বাচনটিকে আরও সুষ্ঠু ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য বা সদিচ্ছা কমিশনের ছিল না।

দুঃখজনকভাবে এই নির্বাচনে অনেক ঋণখেলাপি টাকার জোরে এমপি হয়েছেন। প্রকৃত রাজনীতিবিদরা কালো টাকার কাছে সাইডলাইন হয়ে গেছেন। প্রতিটি আসনে বিপুল পরিমাণ অর্থের ছড়াছড়ি ছিল, যা নির্বাচন কমিশন আটকাতে পারেনি। যারা এত টাকা বিনিয়োগ করে নির্বাচিত হয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই দেশের স্বার্থে কাজ করবেন না।

তবে আমি তাদের পুরোপুরি দোষ দেব না। কারণ প্রশাসন ও পুলিশ তখনো হতাশাগ্রস্ত ছিল, আন্দোলনকারীরা নানা নামে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করত। এমন ভঙ্গুর ও বৈরী পরিস্থিতিতে তারা যে একটি নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছে, সেটিকে অন্তত একটি সাফল্য বলা যায়।

স্ট্রিম: এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা যে বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি দেখছি, তা কি আমাদের কোনো আশার বাণী শোনায়?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: দুঃখজনকভাবে এই নির্বাচনে অনেক ঋণখেলাপি টাকার জোরে এমপি হয়েছেন। প্রকৃত রাজনীতিবিদরা কালো টাকার কাছে সাইডলাইন হয়ে গেছেন। প্রতিটি আসনে বিপুল পরিমাণ অর্থের ছড়াছড়ি ছিল, যা নির্বাচন কমিশন আটকাতে পারেনি বা চায়নি। যারা এত টাকা বিনিয়োগ করে নির্বাচিত হয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই দেশের স্বার্থে কাজ করবেন না।

তারপরও আমি বলব, ইউনূস সরকারের চেয়ে এই ট্রানজিশন বা উত্তরণটি ইতিবাচক। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর আওয়ামী লীগের বিদায় এবং দেশে একটি নির্বাচিত সরকার আসা—এই পরিবর্তনকে আমরা সাধুবাদ জানাবো।

স্ট্রিম: এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মতো বড় দল ছিল না। অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে কি এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তবে এবার আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থকও ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছেন, যা ২০১৪ সালে ছিল না (সেবার ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন)। ২০১৮ সালের মতো এবার রাতের বেলা ব্যালট স্টাফিং হয়নি এবং ২০২৪ সালের মতো এটি একতরফাও ছিল না।

অবশ্য ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ বা ২০০৮ সালের মানদণ্ডে এটি সম্পূর্ণ ভালো বা সুষ্ঠু ভোট নয়। বিশ্লেষকরাও একে 'তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক' নির্বাচন বলছেন। নির্বাচনটি আরও ভালো হতে পারত। তারপরও আমি মনে করি, কোনো নির্বাচন না হওয়ার চেয়ে একটি তুলনামূলক খারাপ নির্বাচনও ভালো এবং সরকার না থাকার চেয়ে একটি দায়বদ্ধ সরকার থাকা অনেক ভালো। আমরা প্রত্যাশা করি, নতুন এই সরকার সংবিধান, সংসদ ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থেকে দেশ পরিচালনা করবে।

স্ট্রিম: ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম জাতীয় পার্টি সংসদের বাইরে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন এবং দলকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন কি?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: এর মধ্যে আসলে একটি বৈপরীত্য আছে। সংসদে আমাদের কোনো প্রতিনিধি নেই, এটি কিছুটা অস্বস্তিকর। তবে অতীতে দুই থেকে দশজন এমপি থাকার কারণে দলের যে বিশাল কোনো উপকার হয়েছে, এমনটি নয়। বরং কয়েকজন নির্বাচিত হলে দলের ভেতরেই অভিযোগ উঠত যে তারা দালালি করেছে বা দল বিক্রি করে দিয়েছে। এখন সংসদে কেউ না থাকায় আমরা অন্তত একতাবদ্ধ আছি এবং জোট করার কোনো অপবাদও কাউকে নিতে হচ্ছে না।

২০০১ বা ২০০৮ সালের পর এবারই প্রথম আমরা প্রায় ২০০ আসনে স্বকীয়তা বজায় রেখে প্রার্থী দিয়েছি। আগের নির্বাচনগুলোতে (২০০৮, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) আমরা ৩০ থেকে ৬০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে পারিনি। তখন অনেক জায়গায় জোটের কারণে প্রার্থীরা হতাশ হতেন। এবার জাতীয় পার্টি তার প্রার্থীদের নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ভোট করেছে। এই নির্বাচনের ফলে মাঠে লাঙ্গলের যে বীজ বপন করা হলো, তা আস্তে আস্তে বড় গাছে পরিণত হবে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সুফল দল পাবে।

কারও সাথে জোট না করায় আমাদের সব রাজনৈতিক পথ খোলা রয়েছে। অন্যদিকে, এনসিপির মতো উজ্জীবিত দলও এত বড় আন্দোলনের পর জামায়াতের সঙ্গে জোট করে মাত্র ৬টি আসন পেয়েছে। এতে তারা সংসদে গেলেও একটি আদর্শিক ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেছে, যার বাইরে তারা আর যেতে পারবে না। সেদিক থেকে জাতীয় পার্টি অনেক ফ্লেক্সিবল অবস্থানে আছে এবং দলকে নতুন করে গড়ে তোলার দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

স্ট্রিম: ৫ আগস্টের পর গঠিত ইউনূস সরকারের দেড় বছরের দেশ পরিচালনাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: আমি বলব, দু-একটি মন্ত্রণালয় ছাড়া তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তারা মব বা উন্মত্ত জনতাকে উজ্জীবিত করেছে এবং জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। প্রশাসন আমাদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে। তারা সেনাবাহিনীর সাথে অযাচিত দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে; পুলিশ, প্রশাসন এবং সাধারণ ভোটারদেরও কটাক্ষ করেছে।

দায়বদ্ধতাহীন কোনো কাঠামো কখনোই ভালো কিছু দিতে পারে না। তাদের অনেকেই বিগত আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, সাহসী ও উচ্চশিক্ষিত ছিল; কিন্তু তাদের কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। সরকারের মেয়াদ ৫ বছর না ১০ বছর হবে—এ নিয়ে তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা একটি সরকার ভালো কাজ করতে পারে না। এছাড়া তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। আমি মনে করি বিগত সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তবে তারা যে একটি নির্বাচন আয়োজন করে দিয়ে গেছে, সেটিই তাদের একমাত্র সাফল্য।

এনসিপির মতো উজ্জীবিত দলও এত বড় আন্দোলনের পর জামায়াতের সঙ্গে জোট করে মাত্র ৬টি আসন পেয়েছে। এতে তারা সংসদে গেলেও একটি আদর্শিক ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেছে, যার বাইরে তারা আর যেতে পারবে না। সেদিক থেকে জাতীয় পার্টি অনেক ফ্লেক্সিবল অবস্থানে আছে এবং দলকে নতুন করে গড়ে তোলার দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

স্ট্রিম: দীর্ষ সময় ধরে প্রবাসে থাকা নেতার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলো। তাদের মন্ত্রিসভা ও কার্যক্রমকে কীভাবে দেখছেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: দেখুন, তিনি (তারেক রহমান) দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত ছিলেন। তাঁর মা দু’বছর জেলে ছিলেন এবং মারা গেছেন, এক ভাই নির্বাসিত অবস্থায় মারা গেছেন। পঁচাত্তরে শেখ হাসিনার পরিবারের পর রাজনৈতিক কারণে সবচেয়ে বেশি ভিক্টিমাইজেশনের শিকার যদি কেউ হয়ে থাকেন, তবে সেটি তারেক রহমান। দীর্ঘ সময় তিনি লন্ডনে ছিলেন, তাই আমরা আশা করতে পারি তাঁর মধ্যে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটেছে এবং অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি নতুন আলোকে দেশ চালাবেন।

দেশে ফেরার পর তিনি এখন পর্যন্ত এমন কোনো বেফাঁস কথা বলেননি, যা রাজনৈতিক সমালোচনার জন্ম দেয় বা কাউকে কটাক্ষ করে। তাঁর প্রত্যাবর্তনের ফলে দেশের রাজনীতির মোড় ঘুরে গেছে। এর আগে মনে হচ্ছিল দেশে হয়তো একটি ইসলামিক বিপ্লব ঘটে যাবে, কিন্তু তিনি রাজনীতিকে একটি কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। এমনকি শোনা যায়, অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থকও তার দলকে ভোট দিয়েছে, যা অবিশ্বাস্য হলেও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

তবে ক্ষমতায় আসার চেয়ে ক্ষমতার বলয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করাটা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাঁর পুরোনো বন্ধু কিন্তু বর্তমান বিরোধী দল জামায়াত, অন্যদিকে প্রবল প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ—যাদের গণতন্ত্রের স্বার্থেই স্পেস দেওয়া প্রয়োজন। এই শক্তিগুলোর মাঝে তিনি কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবেন, সেটি দেখার বিষয়। তবে আমি মনে করি, এখন পর্যন্ত তিনি কোনো ভুল পদক্ষেপ নেননি।

স্ট্রিম: আমাদের রাজনীতি বা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূ-রাজনৈতিক (ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, মিয়ানমার, পাকিস্তান) প্রভাব কতটা বলে আপনি মনে করেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: দেশের মানুষ ভোট দেয় এবং প্রশাসন নির্বাচন পরিচালনা করে। তাই নির্বাচনে বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের ব্যাপক বা সরাসরি প্রভাব থাকে বলে আমি মনে করি না। তবে কেউ যদি বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন করে, সেটি প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই কেউ বাংলাদেশের স্বার্থে এ ধরনের ফান্ডিং করবে না।

কেউ যদি বাংলাদেশকে নিয়ে নোংরা আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলা খেলতে চায়, তবে জনগণকে সচেতন হতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সব দল মিলে আমাদের একটি ‘বাংলাদেশ পলিসি’ বা জাতীয় নীতিমালা ঠিক করতে হবে, যেখানে বিদেশি হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ আমরা দেব না। এরশাদ বা জিয়ার আমলে তারা অনেক দেশের সাথে সুসম্পর্ক রাখলেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতেন না। ২০০৮ সালের পর থেকে এই ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে এবং ২০১৪ সালের পর তা চরমে পৌঁছায়।

আমাদের দেশ আমরা চালাব এবং আমরাই সিদ্ধান্ত নেব। আমরা শুধু এটুকু নিশ্চিত করব যেন আমাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে সন্ত্রাসবাদ বা বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম না চলে। আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এর বাইরে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশকে ডেকে আনা যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই মর্যাদাহানিকর।

স্ট্রিম: জাতীয় পার্টিকে তৃণমূল পর্যায়ে গুছিয়ে নেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কি আপনাদের আছে?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমরা কিছুটা শঙ্কিত যে, নতুন সরকার হয়তো কেন্দ্র থেকে না চাইলেও মাঠপর্যায়ে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। পুলিশ, ইউএনও এবং স্থানীয় প্রশাসন তাদের পছন্দের হওয়ায় এমন একটি পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে অন্যরা নির্বাচনের সাহসই পাবে না।

তবে সরকার যদি কঠোর বার্তার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করে, তবে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেব। এর মাধ্যমেই আমরা দলকে তৃণমূল থেকে সুসংগঠিত করতে চাই। জাতীয় নির্বাচনে আমাদের ভোট যে ইঞ্জিনিয়ারিং করে কমিয়ে দেখানো হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে চাই যে আমাদের প্রকৃত জনসমর্থন এর চেয়ে অনেক বেশি।

স্ট্রিম: ৫ আগস্টের পর তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি সচেতন হয়েছে, অনেকেই বিভিন্ন দলের দিকে ঝুঁকছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন এবং এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে তরুণদের একটি বড় অংশের মুক্তিযুদ্ধের (১৯৭১) প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পরও আওয়ামী লীগ সরকার তরুণ প্রজন্মকে একাত্তরমুখী করতে পারেনি, কারণ তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না।

তরুণদের একটি বড় অংশ এখন ইসলামি রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু একসময় তাদের অনেকেই হতাশ হবে, যেমনটা এনসিপির ক্ষেত্রে অনেকে হয়েছে। তরুণদের পুনরায় শেকড়ে ফিরিয়ে আনতে হলে সমাজে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক ধারা এবং সব ধরনের মতবাদের উন্মুক্ত চর্চা থাকতে হবে। সমাজে যদি একটি বা দুটি মতবাদ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তরুণরা হয় সেটি বেছে নেয়, নয়তো রাজনীতিবিমুখ বা হতাশ হয়ে পড়ে।

আমাদের তরুণদের মধ্যে তীব্র ভারতবিমুখতা কাজ করছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা, একাত্তর বিরোধিতা এবং ভারত বিরোধিতা—এই তিনটি বিষয় একাকার হয়ে গেছে; এগুলোকে আলাদা করতে হবে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমাদের শুধুমাত্র দেশীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হবে।

তরুণদের আবেগী বা উসকানিমূলক বক্তব্য এবং সস্তা স্টান্টবাজি থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতা এবং তাদের এই কথাগুলোই থেকে যাবে। তরুণদের মূলধারায় নিয়ে এসে ‘বাংলাদেশ ডকট্রিন’ বা প্রকৃত দেশপ্রেম বোঝাতে হবে। তারা সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং কর্মসংস্থান চায়। তরুণরা যেন হতাশ হয়ে কোনো ভ্রান্ত মতবাদের দিকে পা না বাড়ায়, সে বিষয়ে সরকার ও সব রাজনৈতিক দলের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে।

স্ট্রিম: তরুণদের মধ্যে ধর্মীয় রাজনীতির এত প্রভাব কেন? আগে যারা ৭-৮% ভোট পেত, এবার তারা বিপুল ভোট পেয়েছে। এটি কি দ্বি-দলীয় রাজনীতির বা আপনাদের ব্যর্থতার কারণে হলো?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: বিশ্বজুড়েই এখন ‘আল্ট্রা-রাইটিস্ট’ বা কট্টর ডানপন্থি আন্দোলন জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এর মূল কারণ হলো আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দুঃশাসন। তরুণরা তাদের নিপীড়ন, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিজ চোখে দেখেছে এবং শেষ পর্যন্ত তরুণরাই তাদের উৎখাত করেছে। আমি অনেক আগে থেকেই বলে আসছিলাম যে, আওয়ামী লীগের ‘হার্ডলাইন’ রাজনীতির সাথে আদর্শিকভাবে লড়াই করার সক্ষমতা কেবল ইসলামি ছাত্র সংগঠনগুলোরই ছিল। আমরা দেখেছি, ছাত্রশিবির ভেতরে ভেতরে বেশ সংঘবদ্ধ ছিল। আওয়ামী লীগের পতনের পর স্বাভাবিকভাবেই তারা উৎসাহিত হয়েছে এবং তাদের প্রসার ঘটেছে।

দেশে একটি ইসলামিক বিপ্লব ঘটে যাবে এমনটা মনে হচ্ছিল। কিন্তু তারেক রহমান রাজনীতিকে একটি কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। এমনকি শোনা যায়, অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থকও তার দলকে ভোট দিয়েছে, যা অবিশ্বাস্য হলেও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

রাষ্ট্র তরুণদের কাছে ‘একাত্তর’-এর চেতনা সঠিকভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু ইসলামি দলগুলো তাদের কাছে একটি বিকল্প মতাদর্শ তুলে ধরতে পেরেছে। শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থিদেরও বিশাল ভূমিকা ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সরকার গঠন বা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাদের কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্র নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে বেছে নিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, যা একটি বড় ব্যর্থতা।

যেহেতু বিএনপি একটি মুক্তিযুদ্ধপন্থি দল এবং তারা জয়লাভ করেছে, তাই আমি আশাবাদী তারা একাত্তরের চেতনা ও বহুত্ববাদকে ধারণ ও প্রোমোট করবে। এর ফলে অসংখ্য তরুণ আবারও হয়তো একাত্তরের চেতনায় ও উদারপন্থি রাজনীতিতে ফিরে আসবে।

স্ট্রিম: এক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ (সিভিল সোসাইটি) এবং মিডিয়ার ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: নাগরিক সমাজ পুরোপুরি বিভক্ত হয়ে পড়েছিল; একটি অংশ আওয়ামী লীগের সাথে মিশে গিয়েছিল, বাকিদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। মিডিয়ার বিষয়টিও অনেকটা বাণিজ্যিক টিকে থাকার লড়াই। যে মিডিয়া ৪ আগস্ট একটি হত্যার খবর ছাপাতে পারেনি, তারাই ৬-৭ তারিখে পুরোদমে আওয়ামী লীগ বিরোধী সংবাদ প্রচার করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে মিডিয়া সবসময় ক্ষমতাসীনদের সাথে আপস করে চলে।

তবে আশার কথা হলো, সিটিজেন জার্নালিজম এবং অনলাইন মিডিয়ার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এর ফলে এখন আর কোনো অন্যায় বা মতবাদকে চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিগত দুই বছরে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে এনসিপির নেতাদের মিডিয়াতে অতিমাত্রায় হাইলাইট করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয়ভাবেই জাতীয় পার্টিকে মিডিয়া থেকে পুরোপুরি ব্ল্যাকআউট করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

স্ট্রিম: ৫ আগস্টের পর প্রধান এজেন্ডা ছিল সংস্কার। লোকাল গভর্মেন্ট থেকে শুরু করে অনেক কমিশন ও প্রস্তাব হলো, কিন্তু নির্বাচনের পর সেগুলো যেন হারিয়ে যাচ্ছে। সংস্কারগুলো কি করা উচিত ছিল না?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: শুধু সংস্কার প্রস্তাব সুন্দর হলেই হয় না, তার প্রক্রিয়াটিও আইনিভাবে সঠিক হতে হয়। বিগত ইউনূস সরকার ৩০টি রাজনৈতিক দলকে (জাতীয় পার্টিসহ) বাদ দিয়ে একটি ঐক্যমত কমিশন গঠন করেছিল। তারা রাষ্ট্রপতির আদেশের (পিও) এবং অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু সংবিধান বলবৎ থাকা অবস্থায় অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় না।

এর বৈধতা খুঁজতে তারা ‘গণভোট’ -এর আশ্রয় নিয়েছে, অথচ আমাদের সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধানই নেই। তাছাড়া এই গণভোট সর্বজনীনও ছিল না। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ‘না’ ভোট পড়েছে, ৭৪ লাখ ভোট বাতিল হয়েছে। ভোট গণনার সময় কোনো এজেন্ট ছিল না এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট বাড়ানোর জন্য সুস্পষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনা ছিল বলে আমাদের সন্দেহ।

আসলে একমাত্র নির্বাচিত সংসদই সার্বভৌম। তারা চাইলে এই গণভোটের প্রস্তাবগুলো গ্রহণ বা বাতিল করতে পারে। সবচেয়ে যৌক্তিক উপায় হলো, সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে সংসদে সাংবিধানিক সংশোধনী হিসেবে এনে পাস করানো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি থাকে না, তাই ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার কাজের মতো সংসদীয় আইনের মাধ্যমে এগুলোর বৈধতা দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আস্থাহীনতার কারণে বিগত সরকার গণভোট ও ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) আইনের মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছে, যা গণঅভ্যুত্থানকেও কিছুটা কালিমালিপ্ত করেছে।

স্ট্রিম: পুলিশ বা সাধারণ মানুষসহ যে অসংখ্য হত্যার ঘটনা ঘটল, সেগুলোর তো কোনো সুষ্ঠু বিচার হলো না। বিচারগুলো হওয়া কি জরুরি ছিল না?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: বিগত সরকারের এসব হত্যাকাণ্ডের বৈজ্ঞানিক ও সুষ্ঠু বিচার করার কোনো চেষ্টাই ছিল না। ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক পরীক্ষা, ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ—কোনো আলামতই সংগ্রহ করা হয়নি। এর বদলে ঢালাওভাবে মামলা দেওয়া হয়েছে। ৬৪ জেলার মানুষকে জড়িয়ে মামলা হয়েছে, যেখানে শিল্পী, ক্রিকেটার, আইনজীবী, ডাক্তার থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদেরও জড়ানো হয়েছে। মূলত চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে এসব করা হয়েছে।

যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের আত্মাকে বিক্রি করে মামলার বাণিজ্য হয়েছে, কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়নি। নিহতের স্বজনরা বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বিচার পাননি। এটি বিগত সরকারের একটি বিশাল ব্যর্থতা। আবার ৫ আগস্টের পর প্রতিহিংসার বশে যাদের হত্যা করা হয়েছে, সেগুলোরও বিচার হওয়া প্রয়োজন।

স্ট্রিম: আইসিটি (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) আইনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের যে বিচার করা হচ্ছে, এটিকে কীভাবে দেখছেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: আইসিটি আইনটি মূলত ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে করা হয়েছিল। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ সম্ভব। কিন্তু এই আইনে অনেকগুলো সাক্ষ্যগত ছাড় রয়েছে এবং সংবিধানের মানবাধিকার সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলো এখানে প্রযোজ্য নয়।

বিগত সরকার ভূতাপেক্ষিকভাবে নতুন অপরাধ সংজ্ঞায়িত করে এই আইনে বিচার করেছে এবং আইনটি কয়েকবার সংশোধন করেছে। বিশেষ করে সেনা সদস্যদের বিচার সামরিক আদালতে বা সাধারণ আদালতেও হতে পারত। তাদেরকে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসাটা দুটি ভিন্ন আইনি সংস্কৃতিকে এক করে ফেলার মতো। এর জন্য নতুন আইনি ব্যাখ্যার প্রয়োজন।

স্ট্রিম: সদ্য গঠিত নতুন সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ বা সুপারিশ কী থাকবে?

শামীম হায়দার পাটোয়ারি: এই সরকারটি ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। আমার প্রথম পরামর্শ হলো—তাদেরকে অতীতের ‘ভীতিকর স্মৃতি’ বা ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিএনপি ও জামায়াতের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তার সুষ্ঠু বিচার অবশ্যই হতে হবে; কিন্তু বিচারের নামে সরকার যেন কোনো প্রতিহিংসায় লিপ্ত না হয়।

দেশটা সবার এবং দেশটাকে বাঁচাতে হবে। আওয়ামী লীগের আমলে দেশ খাদের কিনারায় গিয়েছিল, আর ইউনূস সরকারের আমলে তা খাদের আরও কাছে চলে গেছে। বর্তমান সরকারের সামান্য ভুলেই দেশ খাদে পড়ে যেতে পারে, যেখান থেকে উত্তরণ হয়তো আর সম্ভব হবে না। তাই প্রতিহিংসা পরিহার করে, সবাইকে সাথে নিয়ে, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির মাধ্যমে এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশ পরিচালনা করা উচিত।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত