এম হুমায়ুন কবীর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত। ছিলেন কলকাতায় ডেপুটি হাইকমিশনার। সেপ্টেম্বর-২০১০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজেস ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি। বাংলাদেশের সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কূটনীতি ও নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতি নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
মুজাহিদুল ইসলাম

স্ট্রিম: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বৈদেশিক সফরে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রধানের প্রথম সফর সাধারণত ভারতে হয়ে থাকে। তারেক রহমানের এই প্রথা ভাঙার বিষয়টিকে আপনি কেমন কূটনৈতিক বার্তা বা কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন?
এম হুমায়ুন কবির: বিষয়টিকে 'কৌশলগত পুনর্বিন্যাস' বলা ঠিক হবে না। আমার দেশের পররাষ্ট্রনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে তা নির্ভর করে দেশের সমসাময়িক অবস্থা, অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন বা চাহিদা ও অগ্রাধিকারের। ভারত বা চীনেই প্রথম সফর করতে হবে—এমন ধরাবাঁধা ধারণাকে আমি চ্যালেঞ্জ করতে চাই। বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন আমরা প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপে রয়েছি। এই চাপ মোকাবিলায় বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পণ্য বহুমুখীকরণ এবং নতুন বড় বাজারের সঙ্গে যুক্ত হওয়া আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো কর্মসংস্থান। আমরা যদি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখব এর মূলে ছিল তরুণ প্রজন্মের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা। উদীয়মান এই তরুণদের যদি আমরা কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে একটি ইতিবাচক স্বপ্ন দেখাতে না পারি, তবে কোনো প্রশাসনই স্বস্তিতে থাকতে পারবে না। আমি মূলত এই অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের প্রেক্ষাপট থেকেই মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে দেখছি।
স্ট্রিম: অর্থনৈতিক চাপ ও তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তার দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখি— মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশাগুলো কী কী? এই দুই দেশ আমাদের সেই অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
এম হুমায়ুন কবির: মালয়েশিয়া সফরে মূলত দুটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে—প্রথমত, বন্ধ থাকা শ্রমশক্তির বাজার পুনরায় চালু করা এবং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা। তবে এফটিএ-র ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আমাদের রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি। শুল্ক তুলে দিলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে পারে। একইসঙ্গে, সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রযুক্তি খাতে আমরা মালয়েশিয়ার সহায়তা চেয়েছি।
চীনের ক্ষেত্রেও আমাদের চাওয়াগুলো স্পষ্ট। চীন আমাদের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিলেও আমরা সেখানে পর্যাপ্ত পণ্য রপ্তানি করতে পারি না। আমরা চাই চীনারা মংলাসহ বিভিন্ন ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ করুক। তাদের শ্রমঘন শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর করুক। এতে আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে, পণ্যের বহুমুখীকরণ ঘটবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
এই সফরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।
প্রথমত, চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের (প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে আমাদের নতুন সরকারের প্রধানের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচিতি স্থাপিত হয়েছে। নতুন সরকারের জন্য এই শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক আস্থাশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এর ফলে প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মুখ দেখবে।
দ্বিতীয়ত, চীনের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে একটি বড় প্রস্তাব এসেছে—চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপন। মিয়ানমারে চলমান সংকট ও রোহিঙ্গা ইস্যু থাকা সত্ত্বেও, চীন যদি উদ্যোগ নেয় এবং আমরা ইতিবাচক সাড়া দিই, তবে এটি আমাদের জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এই করিডোরের মাধ্যমে আমরা শুধু চীনের সাথেই নয়, বরং আসিয়ানের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হতে পারব। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন এবং আসিয়ান বাজারের সঙ্গে যুক্ত হলে আমাদের অর্থনীতির আধুনিকীকরণ ঘটবে। এছাড়া, আসিয়ানের এনার্জি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তাও সুসংহত হবে।
স্ট্রিম: আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, চীনের এই প্রস্তাবে বিশেষ করে ভারত কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে?
এম হুমায়ুন কবির: ভারতের জন্য এটি চিন্তার কারণ হতে পারে। তবে এই উদ্বেগ নিরসনে আমরা ২০১৩ সাল পর্যন্ত আলোচিত 'বিসিআইএম' (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) করিডোরের ধারণাকে পুনরায় উজ্জীবিত করার কথা ভাবতে পারি। সম্প্রতি ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে সহযোগিতামূলক বৈঠক হয়েছে। একদিকে চীন ও ভারত তাদের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশকে করিডোরের প্রস্তাব দিচ্ছে। বাংলাদেশ মাঝখানে থেকে এই দুটি প্রক্রিয়াকে সমন্বয় করতে পারলে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশ তার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে লাভবান হবে।
অবশ্যই এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং ভারতের সম্মতি এখানে বড় ফ্যাক্টর। এছাড়া এ ধরনের বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক উদ্যোগ বিশ্ব পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো মাথায় রেখেই আমাদের এগোতে হবে। এই বড় ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আমরা কীভাবে সামলাব, তা নির্ভর করবে আমাদের কূটনৈতিক সক্ষমতা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার ওপর। তবে সার্বিকভাবে, এই সফরগুলো থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে বলে আমি মনে করি।
স্ট্রিম: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতিটি বাংলাদেশের জন্য কতটা টেকসই হবে? ঢাকা কীভাবে ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়কেই পাশে রাখার এই চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন?
এম হুমায়ুন কবির: এই ভারসাম্য নীতি কতটা টেকসই হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে আমাদের কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের ওপর। এশিয়া অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনামের কথা বলা যায়। তাদের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই হয় চীনের সঙ্গে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের শক্তিশালী নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব রয়েছে। একইভাবে, সিঙ্গাপুর যুক্তরাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রতিরক্ষা অংশীদার হলেও চীনের সঙ্গে তাদের বিশাল অঙ্কের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। অর্থাৎ, বৈশ্বিক এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়েই এই অঞ্চলের দেশগুলো সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের সমীকরণে একটি বাড়তি ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভারত। আমাদের মূলত ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করতে হবে—চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বনাম ভারত। এর পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো আঞ্চলিক সমীকরণও রয়েছে। এই বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আমরা কতটা দক্ষতার সাথে আমাদের জন্য সহযোগিতায় রূপান্তর করতে পারব, তার ওপরই আমাদের সফলতা নির্ভর করবে।
এটি কোনো এক বা দুই দিনের কাজ নয়। ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদী একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর জন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদী ভিশন, জাতীয় ঐকমত্য এবং কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো স্ট্যামিনা প্রয়োজন। আমাদের বিদেশি অংশীদাররা দূর থেকে সবসময় পর্যবেক্ষণ করে যে এত বড় ভূ-রাজনৈতিক খেলা সামলানোর মতো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতা আমাদের আছে কি না। আমরা যদি সেই সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারি, তবেই তারা আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হবে।
স্ট্রিম: আন্তর্জাতিক ও ভূ-কৌশলগত প্রেক্ষাপটে, একদিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি। এই দুই বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের মাঝে বাংলাদেশ কীভাবে তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে?
এম হুমায়ুন কবির: চীন স্বভাবতই তাদের যেকোনো বড় বিনিয়োগ বা প্রকল্পকে ‘বিআরআই’-এর আওতাভুক্ত হিসেবে দেখতে চায়। বাংলাদেশ ২০১৬ সাল থেকেই বিআরআই-এর অংশীদার। ফলে, চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর (সিমেক) বা এই ধরনের কোনো বড় আঞ্চলিক যোগাযোগ উদ্যোগে আমরা যুক্ত হলে, সেটি নিশ্চিতভাবেই বিআরআই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই বাস্তবায়িত হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি বা আইপিএস-এর সাথেও আমরা ইতিবাচকভাবে যুক্ত আছি। তবে আইপিএস-এ আমাদের সম্পৃক্ততার মূল জায়গাটি সামরিক নয়; বরং অ-সামরিক নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং প্রথাগত নয় এমন নিরাপত্তা ঝুঁকি (যেমন: জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলা) নিয়ে আমরা কাজ করছি।
এখানে ভারসাম্য রক্ষার মূল কৌশলটি হলো সম্পর্কগুলোর সুস্পষ্ট বিভাজন। চীনের সঙ্গে আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত বিষয়ে যুক্ত থাকব। আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অ-সামরিক নিরাপত্তা ও মানবিক বিষয়গুলোতে কাজ করব। ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ড ঠিক এভাবেই অত্যন্ত কৌশলে তাদের ভারসাম্য বজায় রাখছে।
আমাদের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা সাধারণত আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকি, বৈশ্বিক পরিসরে বড় চিন্তা করার চর্চা আমাদের কম। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই ধরনের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে, আমাদের নিজেদের গণ্ডির বাইরে গিয়ে ভাবার এবং কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তবেই আমরা এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে সফল হতে পারব।
স্ট্রিম: অনেকদিন ঝুলে থাকা তিস্তা প্রকল্পে চীন সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে। এই প্রকল্প নিয়ে তো ভারতের একধরনের উদ্বেগ রয়েছে। এই উদ্বেগ কি আরও বাড়বে?
এম হুমায়ুন কবির: আমি বিষয়টিকে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে দেখতে চাই। আমরা বাংলাদেশে সাধারণত শুধু 'তিস্তা' নিয়ে কথা বলি। কিন্তু চীনের সঙ্গে মূলত আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশের সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে। আমরা নদীমাতৃক ও ভাটির দেশ। হিমালয়ের বেশিরভাগ নদী আমাদের ওপর দিয়ে সাগরে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ পরিস্থিতিতে সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা আমাদের ভবিষ্যৎ ও জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় হোয়াংহো নদীকে চীনের দুঃখ বলা হতো। কিন্তু তারা সেই দুঃখ জয় করেছে। চীনের সেই কারিগরি দক্ষতা শুধু তিস্তা নয়, আমাদের সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগতে পারে। ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে তা আমাদের ইতিবাচক জায়গায় নিয়ে যাবে।
এর পাশাপাশি আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও জরুরি। আমাদের ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটান থেকে এসেছে। চীন ইতিমধ্যেই ব্রহ্মপুত্রের উজানে ১৬৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এর প্রভাব আমাদের ওপর পড়তে বাধ্য। তাই সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন। সেখানে ভারত ও চীন উভয়েরই সহযোগিতা লাগবে। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের নিজেদের ইতিবাচক সক্রিয়তা ও দূরদর্শিতা। আমরা নদী ব্যবস্থাপনায় আগের মতো অবহেলা দেখালে ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়বে।
স্ট্রিম: চীনের সহায়তায় মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ অনেক অবকাঠামোগত প্রকল্পের কাজ চলছে। এই অতি-নির্ভরতা কি ভবিষ্যতে আমাদের চীনের 'ঋণের ফাঁদে' ফেলবে? আমাদের বাজেটেই ঋণের সুদ পরিশোধের অঙ্ক এখন বিশাল। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?
এম হুমায়ুন কবির: ঋণের ফাঁদ এড়াতে তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, প্রকল্পগুলো রাজনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে নয়, বরং শতভাগ পেশাদারত্বের সঙ্গে প্রণয়ন করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প নিলে তা হাম্বানটোটার মতো মুখ থুবড়ে পড়বে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে প্রকল্প মানেই অতিরিক্ত সময় ও খরচ বৃদ্ধি পাওয়া। এই দুর্বলতা কাটাতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রকল্পগুলোকে অবশ্যই অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল হতে হবে। আবেগের বশবর্তী হয়ে প্রকল্প নিলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। যেমনটি আমরা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলের ক্ষেত্রে দেখছি।
চীন বা অন্য যে-ই প্রস্তাব দিক না কেন, কোন প্রকল্প আমাদের উৎপাদন ও সক্ষমতা বাড়াবে, তার ভিত্তিতে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এআই বা সেমিকন্ডাক্টর—এগুলো আধুনিক ও উৎপাদনশীল খাত। এসব খাতে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করলে ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি নেই। বরং এই প্রকল্পগুলো নিজেদের ঋণ নিজেরাই পরিশোধ করে জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
স্ট্রিম: বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে কাজ করে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করছে। আমাদের নতুন সরকারও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির কথা বলছে। ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে এই নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা কি আমাদের আছে?
এম হুমায়ুন কবির: আমরা যেহেতু জুলাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী 'নতুন বাংলাদেশ'-এর কথা বলছি। তাই আমাদের সক্ষমতা ও দৃষ্টিভঙ্গির জায়গাগুলোও নতুন করে সাজাতে হবে। পুরোনো ধাঁচের শাসনব্যবস্থা দিয়ে আমরা বেশিদূর এগোতে পারব না। আমাদের শাসনব্যবস্থাকে পেশাদার, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছ করতে হবে, যা সাধারণ মানুষের বর্তমান চাওয়া।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শুধু একটি স্লোগান হলে চলবে না। একে কাজে লাগাতে হলে 'জাতীয় স্বার্থ' নিয়ে দেশে একটি বৃহত্তর ঐকমত্য তৈরি করতে হবে। আমাদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, আমরা যেকোনো বিষয়কে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি। এক দল যায়, অন্য দল আসে এবং রাষ্ট্রের নীতি নতুন করে শুরু হয়।
তরুণ প্রজন্মের নতুন ভাবনার আলোকে আমাদের আগামী ৫০ বা ৫৫ বছরের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় ভিশন ঠিক করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য থাকলে, সরকার বদল হলেও রাষ্ট্রের নীতি বদলাবে না, প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সম্মান ও স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন থাকবে।
স্ট্রিম: আমাদের দেশের কূটনীতি মূলত ব্যক্তি-নির্ভর। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সক্রিয়তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি, ট্র্যাক-টু ডায়ালগ বা থিংক ট্যাংক কূটনীতির অভাবে বর্তমান কূটনৈতিক সফরগুলোর সাফল্য কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আপনি মনে করেন?
এম হুমায়ুন কবির: আমরা এখনো আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের নীতিগত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। কিন্তু সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান বারবার প্রমাণ করেছে যে, এই দেশ সাধারণ মানুষের। তাই যেকোনো টেকসই পরিকল্পনা বা নীতি প্রণয়নে মানুষের সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। জনগণকে বাইরে রেখে শুধু সরকার নিজেদের মতো কী ভাবল, তার ভিত্তিতে গৃহীত নীতি টেকসই হয় না। অতীত ব্যর্থতা থেকে সেই শিক্ষা আমাদের নেওয়া উচিত। নতুন করে সেই একই ব্যর্থ এক্সপেরিমেন্টে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
স্ট্রিম: চীন আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম উৎস। কিন্তু দুই দেশের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের মধ্যে ১৯ বিলিয়নই চীনের অনুকূলে। এই বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে কি কোনো দরকষাকষির সুযোগ আছে?
এম হুমায়ুন কবির: আমি বলব, লেভারেজ এমনিতেই থাকে না, এটি তৈরি করে নিতে হয়। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বেশ কিছু উপায় আছে। প্রথমত, 'বাই-ব্যাক অ্যারেঞ্জমেন্ট'—অর্থাৎ চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে পণ্য তৈরি করে তা আবার চীনে রপ্তানি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রামের চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং শুধু চীনের জন্যই ডেডিকেটেড থাকে, তবে তা রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে।
বৃহত্তর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমরা চীন থেকে কাঁচামাল আমদানি করে মূল্য সংযোজনের পর তা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে রপ্তানি করি। ফলে বৈশ্বিক পরিসরে আমাদের বাণিজ্য কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে আমরা সরাসরি রপ্তানি করতে পারি না, এটি আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা। চীন বছরে ১৪০-১৪৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করলেও নিজেরা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের স্বল্পমূল্যের পোশাক আমদানি করে। অথচ গত ২০ বছর ধরে চীনের বাজারে আমাদের পোশাক রপ্তানি মাত্র ৬৯ মিলিয়ন ডলারের আশেপাশে আটকে আছে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো নতুন করে সাজাতে হবে।
স্ট্রিম: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতা করছে। এই সফরগুলোতে কি রোহিঙ্গা ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে? চীন কি মিয়ানমারের ওপর কোনো চাপ তৈরি করবে?
এম হুমায়ুন কবির: মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় মেকানিজম রয়েছে। তাই চীনের সঙ্গেও নিশ্চয়ই আলোচনা হয়েছে। চীন এ মুহূর্তে বিষয়টি সমাধানে কতটা উদ্যোগী হবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে যদি 'চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর' বাস্তবায়নের দিকে এগোয়, তবে সেই বৃহৎ প্রকল্পের স্বার্থেই চীনকে রোহিঙ্গা সংকটের একটি সম্মানজনক সমাধানে আগ্রহী হতে হবে বলে আমি মনে করি।
স্ট্রিম: জিয়াউর রহমানের কূটনীতির মূলনীতি ছিল সবার সাথে বন্ধুত্ব এবং কারও ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। তারেক রহমানও বাস্তববাদী কূটনীতির কথা বলছেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী এবং চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই পুরোনো নীতি কি আজও একইরকম প্রযোজ্য?
এম হুমায়ুন কবির: না। আমি মনে করি এটি পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। কারণ তখনকার এবং এখনকার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন আমরা কেবল আমাদের অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিলাম, বৈশ্বিক কোনো বড় চাপ আমাদের ওপর ছিল না।
কিন্তু এখন আমরা বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক চাপের মধ্যে আছি। একদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধ, অন্যদিকে ভারত-চীন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর পাশাপাশি পাকিস্তান-ভারত উত্তেজনা এবং মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিরতার আঁচও আমাদের ওপর পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার বিশাল বিস্ফোরণ।
আগে অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে ভূ-রাজনীতি সামলানো যেত। কিন্তু এখনকার চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। এখন বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকেই আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা সাজাতে হবে। আর সেই সুশৃঙ্খল অভ্যন্তরীণ কাঠামোর জোরেই বাইরের বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলো মোকাবিলা করতে হবে। উভয় সময়েই রাষ্ট্রে বড় 'পরিবর্তন' ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু বর্তমান সংকটের গভীরতা ও বিস্তৃতি পঁচাত্তরের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন মাত্রার।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
এম হুমায়ুন কবির: আপনাকেও ধন্যবাদ।

এম হুমায়ুন কবীর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত। ছিলেন কলকাতায় ডেপুটি হাইকমিশনার। সেপ্টেম্বর-২০১০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজেস ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি। বাংলাদেশের সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কূটনীতি ও নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতি নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
.png)
স্ট্রিম: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বৈদেশিক সফরে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রধানের প্রথম সফর সাধারণত ভারতে হয়ে থাকে। তারেক রহমানের এই প্রথা ভাঙার বিষয়টিকে আপনি কেমন কূটনৈতিক বার্তা বা কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন?
এম হুমায়ুন কবির: বিষয়টিকে 'কৌশলগত পুনর্বিন্যাস' বলা ঠিক হবে না। আমার দেশের পররাষ্ট্রনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে তা নির্ভর করে দেশের সমসাময়িক অবস্থা, অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন বা চাহিদা ও অগ্রাধিকারের। ভারত বা চীনেই প্রথম সফর করতে হবে—এমন ধরাবাঁধা ধারণাকে আমি চ্যালেঞ্জ করতে চাই। বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন আমরা প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপে রয়েছি। এই চাপ মোকাবিলায় বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পণ্য বহুমুখীকরণ এবং নতুন বড় বাজারের সঙ্গে যুক্ত হওয়া আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো কর্মসংস্থান। আমরা যদি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখব এর মূলে ছিল তরুণ প্রজন্মের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা। উদীয়মান এই তরুণদের যদি আমরা কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে একটি ইতিবাচক স্বপ্ন দেখাতে না পারি, তবে কোনো প্রশাসনই স্বস্তিতে থাকতে পারবে না। আমি মূলত এই অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের প্রেক্ষাপট থেকেই মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে দেখছি।
স্ট্রিম: অর্থনৈতিক চাপ ও তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তার দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখি— মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশাগুলো কী কী? এই দুই দেশ আমাদের সেই অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
এম হুমায়ুন কবির: মালয়েশিয়া সফরে মূলত দুটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে—প্রথমত, বন্ধ থাকা শ্রমশক্তির বাজার পুনরায় চালু করা এবং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা। তবে এফটিএ-র ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আমাদের রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি। শুল্ক তুলে দিলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে পারে। একইসঙ্গে, সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রযুক্তি খাতে আমরা মালয়েশিয়ার সহায়তা চেয়েছি।
চীনের ক্ষেত্রেও আমাদের চাওয়াগুলো স্পষ্ট। চীন আমাদের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিলেও আমরা সেখানে পর্যাপ্ত পণ্য রপ্তানি করতে পারি না। আমরা চাই চীনারা মংলাসহ বিভিন্ন ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ করুক। তাদের শ্রমঘন শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর করুক। এতে আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে, পণ্যের বহুমুখীকরণ ঘটবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
এই সফরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।
প্রথমত, চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের (প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে আমাদের নতুন সরকারের প্রধানের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচিতি স্থাপিত হয়েছে। নতুন সরকারের জন্য এই শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক আস্থাশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এর ফলে প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মুখ দেখবে।
দ্বিতীয়ত, চীনের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে একটি বড় প্রস্তাব এসেছে—চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপন। মিয়ানমারে চলমান সংকট ও রোহিঙ্গা ইস্যু থাকা সত্ত্বেও, চীন যদি উদ্যোগ নেয় এবং আমরা ইতিবাচক সাড়া দিই, তবে এটি আমাদের জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এই করিডোরের মাধ্যমে আমরা শুধু চীনের সাথেই নয়, বরং আসিয়ানের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হতে পারব। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন এবং আসিয়ান বাজারের সঙ্গে যুক্ত হলে আমাদের অর্থনীতির আধুনিকীকরণ ঘটবে। এছাড়া, আসিয়ানের এনার্জি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তাও সুসংহত হবে।
স্ট্রিম: আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, চীনের এই প্রস্তাবে বিশেষ করে ভারত কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে?
এম হুমায়ুন কবির: ভারতের জন্য এটি চিন্তার কারণ হতে পারে। তবে এই উদ্বেগ নিরসনে আমরা ২০১৩ সাল পর্যন্ত আলোচিত 'বিসিআইএম' (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) করিডোরের ধারণাকে পুনরায় উজ্জীবিত করার কথা ভাবতে পারি। সম্প্রতি ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে সহযোগিতামূলক বৈঠক হয়েছে। একদিকে চীন ও ভারত তাদের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশকে করিডোরের প্রস্তাব দিচ্ছে। বাংলাদেশ মাঝখানে থেকে এই দুটি প্রক্রিয়াকে সমন্বয় করতে পারলে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশ তার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে লাভবান হবে।
অবশ্যই এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং ভারতের সম্মতি এখানে বড় ফ্যাক্টর। এছাড়া এ ধরনের বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক উদ্যোগ বিশ্ব পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো মাথায় রেখেই আমাদের এগোতে হবে। এই বড় ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আমরা কীভাবে সামলাব, তা নির্ভর করবে আমাদের কূটনৈতিক সক্ষমতা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার ওপর। তবে সার্বিকভাবে, এই সফরগুলো থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে বলে আমি মনে করি।
স্ট্রিম: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতিটি বাংলাদেশের জন্য কতটা টেকসই হবে? ঢাকা কীভাবে ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়কেই পাশে রাখার এই চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন?
এম হুমায়ুন কবির: এই ভারসাম্য নীতি কতটা টেকসই হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে আমাদের কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের ওপর। এশিয়া অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনামের কথা বলা যায়। তাদের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই হয় চীনের সঙ্গে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের শক্তিশালী নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব রয়েছে। একইভাবে, সিঙ্গাপুর যুক্তরাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রতিরক্ষা অংশীদার হলেও চীনের সঙ্গে তাদের বিশাল অঙ্কের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। অর্থাৎ, বৈশ্বিক এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়েই এই অঞ্চলের দেশগুলো সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের সমীকরণে একটি বাড়তি ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভারত। আমাদের মূলত ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করতে হবে—চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বনাম ভারত। এর পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো আঞ্চলিক সমীকরণও রয়েছে। এই বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আমরা কতটা দক্ষতার সাথে আমাদের জন্য সহযোগিতায় রূপান্তর করতে পারব, তার ওপরই আমাদের সফলতা নির্ভর করবে।
এটি কোনো এক বা দুই দিনের কাজ নয়। ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদী একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর জন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদী ভিশন, জাতীয় ঐকমত্য এবং কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো স্ট্যামিনা প্রয়োজন। আমাদের বিদেশি অংশীদাররা দূর থেকে সবসময় পর্যবেক্ষণ করে যে এত বড় ভূ-রাজনৈতিক খেলা সামলানোর মতো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতা আমাদের আছে কি না। আমরা যদি সেই সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারি, তবেই তারা আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হবে।
স্ট্রিম: আন্তর্জাতিক ও ভূ-কৌশলগত প্রেক্ষাপটে, একদিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি। এই দুই বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের মাঝে বাংলাদেশ কীভাবে তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে?
এম হুমায়ুন কবির: চীন স্বভাবতই তাদের যেকোনো বড় বিনিয়োগ বা প্রকল্পকে ‘বিআরআই’-এর আওতাভুক্ত হিসেবে দেখতে চায়। বাংলাদেশ ২০১৬ সাল থেকেই বিআরআই-এর অংশীদার। ফলে, চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর (সিমেক) বা এই ধরনের কোনো বড় আঞ্চলিক যোগাযোগ উদ্যোগে আমরা যুক্ত হলে, সেটি নিশ্চিতভাবেই বিআরআই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই বাস্তবায়িত হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি বা আইপিএস-এর সাথেও আমরা ইতিবাচকভাবে যুক্ত আছি। তবে আইপিএস-এ আমাদের সম্পৃক্ততার মূল জায়গাটি সামরিক নয়; বরং অ-সামরিক নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং প্রথাগত নয় এমন নিরাপত্তা ঝুঁকি (যেমন: জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলা) নিয়ে আমরা কাজ করছি।
এখানে ভারসাম্য রক্ষার মূল কৌশলটি হলো সম্পর্কগুলোর সুস্পষ্ট বিভাজন। চীনের সঙ্গে আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত বিষয়ে যুক্ত থাকব। আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অ-সামরিক নিরাপত্তা ও মানবিক বিষয়গুলোতে কাজ করব। ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ড ঠিক এভাবেই অত্যন্ত কৌশলে তাদের ভারসাম্য বজায় রাখছে।
আমাদের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা সাধারণত আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকি, বৈশ্বিক পরিসরে বড় চিন্তা করার চর্চা আমাদের কম। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই ধরনের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে, আমাদের নিজেদের গণ্ডির বাইরে গিয়ে ভাবার এবং কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তবেই আমরা এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে সফল হতে পারব।
স্ট্রিম: অনেকদিন ঝুলে থাকা তিস্তা প্রকল্পে চীন সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে। এই প্রকল্প নিয়ে তো ভারতের একধরনের উদ্বেগ রয়েছে। এই উদ্বেগ কি আরও বাড়বে?
এম হুমায়ুন কবির: আমি বিষয়টিকে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে দেখতে চাই। আমরা বাংলাদেশে সাধারণত শুধু 'তিস্তা' নিয়ে কথা বলি। কিন্তু চীনের সঙ্গে মূলত আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশের সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে। আমরা নদীমাতৃক ও ভাটির দেশ। হিমালয়ের বেশিরভাগ নদী আমাদের ওপর দিয়ে সাগরে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ পরিস্থিতিতে সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা আমাদের ভবিষ্যৎ ও জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় হোয়াংহো নদীকে চীনের দুঃখ বলা হতো। কিন্তু তারা সেই দুঃখ জয় করেছে। চীনের সেই কারিগরি দক্ষতা শুধু তিস্তা নয়, আমাদের সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগতে পারে। ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে তা আমাদের ইতিবাচক জায়গায় নিয়ে যাবে।
এর পাশাপাশি আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও জরুরি। আমাদের ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটান থেকে এসেছে। চীন ইতিমধ্যেই ব্রহ্মপুত্রের উজানে ১৬৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এর প্রভাব আমাদের ওপর পড়তে বাধ্য। তাই সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন। সেখানে ভারত ও চীন উভয়েরই সহযোগিতা লাগবে। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের নিজেদের ইতিবাচক সক্রিয়তা ও দূরদর্শিতা। আমরা নদী ব্যবস্থাপনায় আগের মতো অবহেলা দেখালে ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়বে।
স্ট্রিম: চীনের সহায়তায় মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ অনেক অবকাঠামোগত প্রকল্পের কাজ চলছে। এই অতি-নির্ভরতা কি ভবিষ্যতে আমাদের চীনের 'ঋণের ফাঁদে' ফেলবে? আমাদের বাজেটেই ঋণের সুদ পরিশোধের অঙ্ক এখন বিশাল। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?
এম হুমায়ুন কবির: ঋণের ফাঁদ এড়াতে তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, প্রকল্পগুলো রাজনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে নয়, বরং শতভাগ পেশাদারত্বের সঙ্গে প্রণয়ন করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প নিলে তা হাম্বানটোটার মতো মুখ থুবড়ে পড়বে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে প্রকল্প মানেই অতিরিক্ত সময় ও খরচ বৃদ্ধি পাওয়া। এই দুর্বলতা কাটাতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রকল্পগুলোকে অবশ্যই অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল হতে হবে। আবেগের বশবর্তী হয়ে প্রকল্প নিলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। যেমনটি আমরা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলের ক্ষেত্রে দেখছি।
চীন বা অন্য যে-ই প্রস্তাব দিক না কেন, কোন প্রকল্প আমাদের উৎপাদন ও সক্ষমতা বাড়াবে, তার ভিত্তিতে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এআই বা সেমিকন্ডাক্টর—এগুলো আধুনিক ও উৎপাদনশীল খাত। এসব খাতে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করলে ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি নেই। বরং এই প্রকল্পগুলো নিজেদের ঋণ নিজেরাই পরিশোধ করে জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
স্ট্রিম: বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে কাজ করে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করছে। আমাদের নতুন সরকারও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির কথা বলছে। ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে এই নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা কি আমাদের আছে?
এম হুমায়ুন কবির: আমরা যেহেতু জুলাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী 'নতুন বাংলাদেশ'-এর কথা বলছি। তাই আমাদের সক্ষমতা ও দৃষ্টিভঙ্গির জায়গাগুলোও নতুন করে সাজাতে হবে। পুরোনো ধাঁচের শাসনব্যবস্থা দিয়ে আমরা বেশিদূর এগোতে পারব না। আমাদের শাসনব্যবস্থাকে পেশাদার, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছ করতে হবে, যা সাধারণ মানুষের বর্তমান চাওয়া।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শুধু একটি স্লোগান হলে চলবে না। একে কাজে লাগাতে হলে 'জাতীয় স্বার্থ' নিয়ে দেশে একটি বৃহত্তর ঐকমত্য তৈরি করতে হবে। আমাদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, আমরা যেকোনো বিষয়কে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি। এক দল যায়, অন্য দল আসে এবং রাষ্ট্রের নীতি নতুন করে শুরু হয়।
তরুণ প্রজন্মের নতুন ভাবনার আলোকে আমাদের আগামী ৫০ বা ৫৫ বছরের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় ভিশন ঠিক করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য থাকলে, সরকার বদল হলেও রাষ্ট্রের নীতি বদলাবে না, প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সম্মান ও স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন থাকবে।
স্ট্রিম: আমাদের দেশের কূটনীতি মূলত ব্যক্তি-নির্ভর। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সক্রিয়তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি, ট্র্যাক-টু ডায়ালগ বা থিংক ট্যাংক কূটনীতির অভাবে বর্তমান কূটনৈতিক সফরগুলোর সাফল্য কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আপনি মনে করেন?
এম হুমায়ুন কবির: আমরা এখনো আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের নীতিগত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। কিন্তু সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান বারবার প্রমাণ করেছে যে, এই দেশ সাধারণ মানুষের। তাই যেকোনো টেকসই পরিকল্পনা বা নীতি প্রণয়নে মানুষের সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। জনগণকে বাইরে রেখে শুধু সরকার নিজেদের মতো কী ভাবল, তার ভিত্তিতে গৃহীত নীতি টেকসই হয় না। অতীত ব্যর্থতা থেকে সেই শিক্ষা আমাদের নেওয়া উচিত। নতুন করে সেই একই ব্যর্থ এক্সপেরিমেন্টে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
স্ট্রিম: চীন আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম উৎস। কিন্তু দুই দেশের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের মধ্যে ১৯ বিলিয়নই চীনের অনুকূলে। এই বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে কি কোনো দরকষাকষির সুযোগ আছে?
এম হুমায়ুন কবির: আমি বলব, লেভারেজ এমনিতেই থাকে না, এটি তৈরি করে নিতে হয়। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বেশ কিছু উপায় আছে। প্রথমত, 'বাই-ব্যাক অ্যারেঞ্জমেন্ট'—অর্থাৎ চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে পণ্য তৈরি করে তা আবার চীনে রপ্তানি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রামের চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং শুধু চীনের জন্যই ডেডিকেটেড থাকে, তবে তা রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে।
বৃহত্তর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমরা চীন থেকে কাঁচামাল আমদানি করে মূল্য সংযোজনের পর তা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে রপ্তানি করি। ফলে বৈশ্বিক পরিসরে আমাদের বাণিজ্য কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে আমরা সরাসরি রপ্তানি করতে পারি না, এটি আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা। চীন বছরে ১৪০-১৪৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করলেও নিজেরা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের স্বল্পমূল্যের পোশাক আমদানি করে। অথচ গত ২০ বছর ধরে চীনের বাজারে আমাদের পোশাক রপ্তানি মাত্র ৬৯ মিলিয়ন ডলারের আশেপাশে আটকে আছে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো নতুন করে সাজাতে হবে।
স্ট্রিম: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতা করছে। এই সফরগুলোতে কি রোহিঙ্গা ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে? চীন কি মিয়ানমারের ওপর কোনো চাপ তৈরি করবে?
এম হুমায়ুন কবির: মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় মেকানিজম রয়েছে। তাই চীনের সঙ্গেও নিশ্চয়ই আলোচনা হয়েছে। চীন এ মুহূর্তে বিষয়টি সমাধানে কতটা উদ্যোগী হবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে যদি 'চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর' বাস্তবায়নের দিকে এগোয়, তবে সেই বৃহৎ প্রকল্পের স্বার্থেই চীনকে রোহিঙ্গা সংকটের একটি সম্মানজনক সমাধানে আগ্রহী হতে হবে বলে আমি মনে করি।
স্ট্রিম: জিয়াউর রহমানের কূটনীতির মূলনীতি ছিল সবার সাথে বন্ধুত্ব এবং কারও ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। তারেক রহমানও বাস্তববাদী কূটনীতির কথা বলছেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী এবং চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই পুরোনো নীতি কি আজও একইরকম প্রযোজ্য?
এম হুমায়ুন কবির: না। আমি মনে করি এটি পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। কারণ তখনকার এবং এখনকার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন আমরা কেবল আমাদের অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিলাম, বৈশ্বিক কোনো বড় চাপ আমাদের ওপর ছিল না।
কিন্তু এখন আমরা বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক চাপের মধ্যে আছি। একদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধ, অন্যদিকে ভারত-চীন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর পাশাপাশি পাকিস্তান-ভারত উত্তেজনা এবং মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিরতার আঁচও আমাদের ওপর পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার বিশাল বিস্ফোরণ।
আগে অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে ভূ-রাজনীতি সামলানো যেত। কিন্তু এখনকার চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। এখন বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকেই আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা সাজাতে হবে। আর সেই সুশৃঙ্খল অভ্যন্তরীণ কাঠামোর জোরেই বাইরের বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলো মোকাবিলা করতে হবে। উভয় সময়েই রাষ্ট্রে বড় 'পরিবর্তন' ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু বর্তমান সংকটের গভীরতা ও বিস্তৃতি পঁচাত্তরের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন মাত্রার।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
এম হুমায়ুন কবির: আপনাকেও ধন্যবাদ।
.png)
.png)

এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট। এই সংকটকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক। দেশীয় আস্থার সংকট মূলত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কাজ করছে। অন্যদিকে সরকারের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা এখনো সন্দিহান।
১২ আগস্ট ২০২৬
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্ত ছিল ৫ আগস্টের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। এর পেছনের পটভূমি এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নানা বিষয় নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের মুখোমুখি হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সাক্ষাৎকার নিয়
০৪ আগস্ট ২০২৬
আমাদের মোট আর্থিক ব্যবস্থার ৯০ শতাংশের বেশিই ব্যাংকনির্ভর। বাকি ১০ শতাংশের কম জুড়ে রয়েছে শেয়ারবাজার, বিমা ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। সুতরাং, এমন একটি ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোকে ভালো অবস্থানে না নিতে পারলে নিশ্চিতভাবেই দেশের পুরো আর্থিক কার্যক্রমই স্থবির হয়ে পড়বে।
৩১ জুলাই ২০২৬
নেতৃত্বকে জানতে হবে কীভাবে কাজ আদায় করে নিতে হয়। গৃহকর্ত্রীকে যেমন জানতে হয় গৃহকর্মীর কাছ থেকে কীভাবে কাজ আদায় করতে হবে, ঠিক তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও জানতে হবে আমলাদের দিয়ে কীভাবে নীতি বাস্তবায়ন করতে হয়। সরকারে যদি দলীয়, অযোগ্য বা অপদার্থ লোক বসানো হয়, তারা কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবে না।
২৪ জুলাই ২০২৬