leadT1ad

বাজেট মূল্যায়ন

প্রস্তাবিত বাজেট: সম্ভাবনা, সংস্কার ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

ড. আব্দুর রাজ্জাক
ড. আব্দুর রাজ্জাক

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ২০: ৩৭
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

এক বাক্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে মূল্যায়ন করতে হলে বলতে হয়— এই বাজেটে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী ও ভালো উদ্যোগ রয়েছে। তবে এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারকে সমানতালে অনেকগুলো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

বর্তমান অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঝুঁকি বেড়েছে। তৈরি পোশাক খাতে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানিতে চাপ রয়েছে, আবার দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রবণতা দৃশ্যমান। অন্যদিকে, নানা অস্থিরতা কাটিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার (বিএনপি) ক্ষমতায় আসায় মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এই বিপুল প্রত্যাশা ও কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকেই এবারের বাজেট প্রণীত হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতার রূপরেখা ও সরকারের সদিচ্ছা প্রশংসনীয় হলেও, ভালো কথা বলা আর তা বাস্তবায়ন করার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

প্রথমে বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে কথা বলব। বাজেটের সবচেয়ে ভালো দিক হলো স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো অবহেলিত খাতগুলোতে বরাদ্দ বৃদ্ধি। সরকার জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা ও ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে এবং ৩ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা এই বাজেটে প্রতিফলিত।

সামাজিক সুরক্ষা খাতের অধীনে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে ৪১ লাখ পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার উদ্যোগটি যুগান্তকারী। বয়স্ক বা বিধবা ভাতার মতো প্রচলিত প্রকল্পগুলোতে ভাতার পরিমাণ ছিল মাত্র ৬০০-৭০০ টাকা। ২০২২ সালের পর থেকে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি বেড়েছে, ফলে বহু মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এই সময়ে ফ্যামিলি কার্ডের উদ্যোগটি সময়োপযোগী। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে প্রকৃত দরিদ্র ও দুস্থ পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার ওপর। এখানে কোনো অনিয়ম হলে মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ ও কর সংস্কার

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম বড় সংস্কার হলো ‘উৎস কর’ ব্যবস্থা যৌক্তিকীকরণ। আগে আমদানির শুরুতেই উৎস কর কেটে রাখা হতো, যা বছর শেষে মোট আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার সুযোগ ছিল না। এটি ছিল একধরনের দ্বৈত কর এবং ব্যবসায়ীদের মূলধন ঘাটতির বড় কারণ। নতুন বাজেটে উৎস করকে ‘অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স’ হিসেবে বছর শেষে সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়, বিদেশি ঋণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরই নির্ভর করছে এই বাজেটটির চূড়ান্ত সফলতা।

এ ছাড়া দ্রুততম সময়ে বিজনেস রেজিস্ট্রেশনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, যা নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে। করকাঠামোতে স্বচ্ছতা আনতে আগামী ৫ বছরের জন্য করহার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ২-৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ৩৫% হারে নতুন একটি ট্যাক্স স্ল্যাব বা স্তর যুক্ত করা হয়েছে, যা কর বৈষম্য হ্রাসে সহায়ক হবে।

ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে চাল, ডালের মতো প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎস কর ১-৫% থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫% করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এটি সাধারণ ভোক্তাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে।

সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত অস্পষ্টতা

বাজেটে ভালো কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। সরকার ‘থ্রি-আর’ (থ্রি-আর’- রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন) নীতির কথা বলেছে। কিন্তু পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে এর সমন্বয় কীভাবে হবে এবং অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, তা স্পষ্ট নয়। বেসরকারি খাতকে সুবিধা দিলে তা থেকে কীভাবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তার কোনো যৌক্তিক বিশ্লেষণ বাজেটে নেই।

সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের অভাব। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে শুধু রিফাইন্যান্সিং বা তারল্য সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু টাকা দিলে তা কোনো কাজেই আসবে না; বরং জনগণের অর্থের অপচয় হবে। এ বিষয়ে বাজেটে শক্ত দিকনির্দেশনা প্রত্যাশিত ছিল।

বাজেট বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জসমূহ

এই বাজেট বাস্তবায়নের পথে প্রধানত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

প্রথমত, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ও শ্লথ বাস্তবায়ন: বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো অবাস্তব রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের বাজেটের ৮০-৮৫ ভাগের বেশি বাস্তবায়ন হয় না। এর মূল কারণ রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি (যেমন— পিডি নিয়োগে বা ভূমি অধিগ্রহণে দেরি হওয়া)। রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রায় না পৌঁছালে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে, তা আরও বিশাল আকার ধারণ করবে।

দ্বিতীয়ত, বিদেশি ঋণের নির্ভরতা ও ঝুঁকি: সরকার ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা বিদেশি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্নয়ন সহায়তা বা কনসেশনাল ঋণ কমে যাচ্ছে। আইএমএফ বা অন্যান্য সংস্থার ঋণ পেতে কঠোর শর্ত ও দীর্ঘমেয়াদি দরকষাকষির প্রয়োজন হয়। তদুপরি, বিদেশি ঋণ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয় বলে রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে। ফলে কাঙ্ক্ষিত বিদেশি ঋণ না পেলে বাজেট বাস্তবায়ন হোঁচট খাবে।

তৃতীয়ত, প্রবৃদ্ধি বনাম মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পলিসি ডিলেমা: সরকার একদিকে মূল্যস্ফীতি ৯-১০% থেকে কমিয়ে ৭.৫% এ আনতে চায়, অন্যদিকে ৬.৭৫% জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অর্থনীতির নিয়মানুযায়ী এই দুটি লক্ষ্য সাংঘর্ষিক। মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে সুদের হার বাড়াতে হবে এবং টাকার সরবরাহ কমাতে হবে, যা প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। আবার প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাইলে সম্প্রসারণমূলক নীতি বা বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। বেসরকারি খাত স্বাভাবিক কাজ করলে ৫-৫.৫% প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন নয়, কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরে ৬.৭৫% প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সরকারের জন্য একটি বড় নীতিগত সংকট তৈরি করবে।

সার্বিকভাবে, নতুন সরকারের এই বাজেটে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সদিচ্ছা ও বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কারের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়, বিদেশি ঋণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরই নির্ভর করছে এই বাজেটটির চূড়ান্ত সফলতা।

ড. আব্দুর রাজ্জাক: অর্থনীতিবিদ; সভাপতি, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টেগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড)

Ad 300x250

সম্পর্কিত