রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো বিচার বিভাগ। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ সুশাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের নাগরিকদের হতাশ করেছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে ফিরে যাচ্ছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ধারণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কারের আলোচনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু। বিশেষ করে, বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি দীর্ঘ দুই দশক বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার ছিল। অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টে ন্যস্ত করা, পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারক নিয়োগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করার দাবিগুলো তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
এই দাবিগুলোর পেছনে দলটির নিজস্ব অভিজ্ঞতাও যুক্ত। বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নেতা-কর্মীদের হয়রানি করার অভিযোগ তারা বারবার করেছে। শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি রাখা বা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার কারণে দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকতে বাধ্য হওয়া—এসবই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না থাকার উদাহরণ। বিএনপির তরফ থেকেই বলা হতো, বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকলে তাদের এই রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হতে হতো না।
কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ করা যাচ্ছে। অতীত দাবি, ৩১ দফা কর্মসূচি, জুলাই সনদ কিংবা নির্বাচনী ইশতেহার—সবখানেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হলেও সংসদে অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগে মনে হচ্ছে যে দলটি তাদের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে এসেছে।
আইনি দিক থেকে বিবেচনা করলে এই অধ্যাদেশ বাতিল কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বড় ধরনের আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতাও তৈরি করছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এই ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকলেও চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তা রাষ্ট্রপতির (কার্যত নির্বাহী বিভাগের) হাতে ন্যস্ত করা হয়।
তবে জনস্বার্থে করা একটি মামলায় হাইকোর্ট ২০২৫ সালে এক যুগান্তকারী রায় দেন (যার পূর্ণাঙ্গ পাঠ ৭ এপ্রিল ২০২৬-এ প্রকাশিত), যেখানে ১১৬ অনুচ্ছেদকে ১৯৭২ সালের মূল অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আপিল বিভাগ থেকে এর ওপর কোনো স্থগিতাদেশ না থাকায় এই রায় মানা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক। অন্তর্বর্তী সরকার হাইকোর্টের এই রায় ঘোষণার পরে পৃথক সচিবালয় গঠনের অধ্যাদেশ জারি করেছিল।
কেবল বিচার বিভাগ নয়, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোও যদি একই পরিণতি বরণ করে, তবে তা হবে দেশের শাসনকাঠামো সংস্কারের ক্ষেত্রে এক বড় পশ্চাদপসরণ।
এখন সংসদ যদি সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে অধস্তন আদালতকে আবারও আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে যায়, তবে তা সরাসরি হাইকোর্টের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে এবং আদালত অবমাননার শামিল হতে পারে।
প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। অধ্যাদেশটি জারির পর থেকে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। সচিব নিয়োগ, জনবল কাঠামো তৈরি, কর্মী নিয়োগ থেকে শুরু করে বাজেট বরাদ্দ—সব মিলিয়ে দালিলিক ও বাস্তবিক কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন হঠাৎ করে অধ্যাদেশটি অকার্যকর হয়ে গেলে এই পুরো কাঠামোটি কী অবস্থায় দাঁড়াবে? এতে প্রশাসনিক ও আইনি শূন্যতা তৈরি হবে। নতুন সরকারের শুরুতেই নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে এ ধরনের টানাপোড়েন কাম্য নয়।
কেবল বিচার বিভাগ নয়, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোও যদি একই পরিণতি বরণ করে, তবে তা হবে দেশের শাসনকাঠামো সংস্কারের ক্ষেত্রে এক বড় পশ্চাদপসরণ। ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার যে বিপুল কর্মযজ্ঞ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর হাতে নেওয়া হয়েছিল, তা শুরুতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
হাইকোর্টের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং সংস্কারের প্রবল জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা এবং একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় কার্যকর রাখাই হবে সময়োপযোগী ও যৌক্তিক পদক্ষেপ। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাই পারে একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে।
- ড. শরীফ ভূঁইয়া: সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী