দেশে গত ২৪ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ১৫৯ জন নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহুরে এলাকাগুলোতে হামের প্রকোপ এখন এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিদিন সেখানে বাড়ছে রোগীর ভিড়। এমন এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে আজ একটি প্রশ্নই সবার সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে—হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাধি হঠাৎ কেন এমন প্রাণঘাতী রূপ নিল? আমাদের ঘাটতির জায়গাটাই বা ঠিক কোথায়?
প্রথমেই যে বিষয়টি আমাদের অনুধাবন করা প্রয়োজন, তা হলো—হাম শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। এটি প্রতিরোধের একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা দেওয়া।
বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা উচিত যে, হাম কোনো নতুন রোগ নয় এবং প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়েই এর প্রাদুর্ভাব ঘটে। তাই সেই নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যদি দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা যেত, তবে আমাদের শিশুদের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। আজ হামে আক্রান্ত হয়ে যে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে, তা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অযাচিত। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই শিশুদের বেশিরভাগকেই আমরা বাঁচাতে পারতাম।
হাম এমন একটি রোগ, যার ছড়িয়ে পড়া রোধ করার কোনো জাদুকরী উপায় নেই। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। কিন্তু একটি শিশুকে যদি সময়মতো টিকা দেওয়া থাকে, তবে তার শরীরে হাম ছড়াতে পারে না। পৃথিবীর সব দেশেই এই সহজ ও পরীক্ষিত পদ্ধতিতেই হাম মোকাবিলা করা হয়। উদাহরণ হিসেবে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের দিকেই তাকানো যাক। তারাও আমাদের মতো একই ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু তারা হাম প্রতিরোধে সম্পূর্ণ সফল হয়েছে, কারণ তারা সময়মতো টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে এবং প্রতিটি শিশুর টিকা নিশ্চিত করেছে। তারা যদি পারে, তবে আমরা কেন পারব না?
সবচেয়ে বড় পরিতাপের বিষয় হলো, হাম মোকাবিলায় আমাদের কোনো কিছুরই অভাব নেই। হাম আমাদের দেশে নতুন নয়, তাই এটি মোকাবিলার পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত আমাদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সফল টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) রয়েছে। আমাদের পর্যাপ্ত লোকবল আছে এবং হামের পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী বা টিকাও মজুত আছে। এতসব ইতিবাচক দিক থাকার পরও কেন আমরা সময়মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে শিশুদের রক্ষা করতে পারলাম না?
সরকারের উচিত অবিলম্বে এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা। কাদের অবহেলা বা সিদ্ধান্তহীনতার কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, যেসব পরিবার তাদের সন্তানদের হারিয়েছে, তাদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
এর মূল দায়ভার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, গৃহীত সিদ্ধান্ত সময়মতো কার্যকর না করা এবং পরিস্থিতির আগাম মূল্যায়ন করতে না পারাই আজকের এই ভয়াবহ পরিণতির জন্য দায়ী।
এই গাফিলতির কারণে আজ যে প্রাণগুলো ঝরে গেল, তার দায় কে নেবে? কোনো মৃত্যুই আমাদের কাছে কাম্য নয়। প্রতিটি শিশুই তার মা-বাবা এবং পরিবারের কাছে অমূল্য সম্পদ। যে পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, কেবল তারাই বোঝে এই শোক কতটা ভারী। হামের মতো একটি টিকা-প্রতিরোধযোগ্য রোগে এই অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
সরকারের উচিত অবিলম্বে এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা। কাদের অবহেলা বা সিদ্ধান্তহীনতার কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, যেসব পরিবার তাদের সন্তানদের হারিয়েছে, তাদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ এই মৃত্যুগুলোতে ওই শিশু বা তাদের পরিবারের কোনোই অপরাধ ছিল না; এটি পুরোপুরিভাবে কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এখন আমাদের করণীয় কী? প্রাদুর্ভাব যেহেতু ইতিমধ্যেই মারাত্মক আকার ধারণ করে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই এখন টিকাদান কর্মসূচি এগিয়ে আনলে শতভাগ সমাধান হয়তো মিলবে না। টিকা দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে। তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই, এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে অন্ততপক্ষে রোগের ভয়াবহতা ও মৃত্যুর হার কিছুটা হলেও প্রশমন করা সম্ভব হবে।
এই জাতীয় বিপর্যয় থেকে আশু উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো চলমান টিকা কার্যক্রমকে আরও নিবিড় ও জোরদার করা। ভবিষ্যতের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আরও অনেক বেশি তৎপর ও দায়িত্বশীল হতে হবে। হামের মৌসুম আসার আগেই যেন প্রতিটি শিশু টিকার আওতায় আসে, তার শতভাগ নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের প্রতিও পরামর্শ থাকবে, সরকারের টিকাদান কর্মসূচির খবর রাখা এবং সময় অনুযায়ী নিজ নিজ সন্তানের টিকা নিশ্চিত করা। সমন্বিত উদ্যোগ ও সময়োচিত সিদ্ধান্তই কেবল পারে আমাদের শিশুদের এমন অযাচিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে।
অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ