স্ট্রিম ডেস্ক

রাজনীতি কি আর গ্ল্যামারের ওপর ভরসা করছে না—এই প্রশ্ন দিয়েই আলোচনার সূচনা। একসময় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনোদন ও ক্রীড়াঙ্গনের তারকাদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ সরাসরি সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, কেউ দলীয় প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। ভোটের বাকি মাত্র ১৮ দিন থাকলেও এবার কোনো তারকাকে সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যাচ্ছে না; এমনকি প্রচারেও তাদের উপস্থিতি প্রায় অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতি কেবল একটি কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষণ।
অতীতে সংসদ ও প্রচারণায় তারকাদের সক্রিয় উপস্থিতি
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে ২০০৮ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর এবং সংগীতশিল্পী মমতাজ বেগম। আসাদুজ্জামান নূর নীলফামারী-২ আসন থেকে ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন; ২০০২ সালে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক এবং ২০০৯ সালে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মমতাজ বেগম ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হন; পরবর্তী সময়ে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হলেও ২০২৪ সালে পরাজিত হন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ ন্যাশনাল মুভমেন্ট (বিএনএম) থেকে অংশ নিয়ে সংগীতশিল্পী ডলি সায়ন্তনী জয়ী হতে পারেননি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী, খলনায়ক মনোয়ার হোসেন ডিপজল, চিত্রনায়ক শাকিল খান, মাহিয়া মাহি, অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান, চিত্রনায়ক রুবেল, গায়ক এসডি রুবেল ও শমী কায়সার। সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কিনেছিলেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও অপু বিশ্বাস। মনোনয়ন না পেয়ে মাহিয়া মাহি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও বিজয় অর্জন করতে পারেননি।
নির্বাচনী প্রচারণায় অতীতে যাঁরা সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন অভিনেতা রিয়াজ, সায়মন সাদিক, ইমন, অভিনেত্রী পূর্ণিমা, জ্যোতিকা জ্যোতি, সোহানা সাবা প্রমুখ। ক্রীড়াঙ্গন থেকেও রাজনীতিতে তারকাদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। জাতীয় ক্রিকেট দলের তারকা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ও সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন, ছিলেন জাতীয় ক্রিকেটা দলের সাবেক অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয়; ফুটবলার আব্দুস সালাম মুর্শেদীও আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, এমপি হয়েছেন আরেক সাবেক অধিনায়ক আরিফ খান জয়ও। এসব উদাহরণ দেখায়, একসময় রাজনীতি তারকাখ্যাতিকে একটি কার্যকর নির্বাচনী পুঁজি হিসেবে বিবেচনা করত।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দলগুলোর হিসাব
কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিনোদন ও ক্রীড়াঙ্গনের তারকাদের এই স্পষ্ট অনুপস্থিতি রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের দিকেই ইঙ্গিত করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনমতের রূপান্তর এবং গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রেক্ষাপটে তারকাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থেকে সরে আসার প্রবণতা বেড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডাক্তার জাহেদ উর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিনোদন জগতের অনেক শিল্পী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দলটির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; অনেকের সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাও গড়ে উঠেছিল।
ডাক্তার জাহেদের মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব শিল্পীকে যদি এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রচারণায় যুক্ত করে, তাহলে শিল্পীদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো শিল্পীকে প্রচারণায় যুক্ত করার পরই তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো নেতার পুরোনো ছবি বা সম্পর্ক সামনে চলে আসতে পারে, যা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই সম্ভাব্য বিপরীত ফলাফলের আশঙ্কায় রাজনৈতিক দলগুলো শিল্পীদের নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত করতে আগ্রহী নয়। তিনি আরও মনে করেন, জামায়াতে ইসলামী তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে চাইলেও শিল্পীদের যুক্ত করে না; আর বিএনপি এবারের নির্বাচনে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ অনুভব না করায় বাড়তি আকর্ষণ তৈরির জন্য তারকানির্ভর প্রচারণার পথে যাচ্ছে না।
শিল্পীদের অভিজ্ঞতা: নিরাপত্তা, চাপ ও পিছু হটার রাজনীতি
শিল্পীদের নিজস্ব বক্তব্যও এই অনুপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। তাঁদের মতে, অতীতে অনেক শিল্পী ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পেশাগত টিকে থাকা ও ক্ষমতার চাপের কারণে রাজনৈতিক প্রচারণায় যুক্ত হয়েছিলেন, যদিও তখনকার নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে তাঁদের নিজস্ব সংশয় ছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা শিল্পীদের রাজনীতিমুখী করলেও সরকার পরিবর্তনের পর সেই সম্পৃক্ততাই তাঁদের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। মামলা, হয়রানি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা থেকে এবারের নির্বাচনে অনেক শিল্পী রাজনীতি থেকে দূরে থাকাকেই নিরাপদ মনে করছেন।
জুলাই আন্দোলনে আলোচিত অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচন এবং ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। স্ট্রিমকে তিনি জানান, ব্যক্তিগত স্বার্থেই সে সময় তিনি এসব প্রচারণায় যুক্ত হন। তাঁর ভাষায়, তৎকালীন উচ্চপদস্থ একসেনা গোয়েন্দার কর্মকর্তার সঙ্গে পারিবারিক পরিচয়ের সূত্রে তিনি হয়রানির শিকার হয়েছিলেন এবং চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টার মামলার মুখোমুখি হন। সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য তিনি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেন, যদিও তিনি জানতেন যে নির্বাচনগুলো ছিল ‘পাতানো’। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্ল্যামার জগতের মানুষের রাজনীতিতে না জড়ানোর বিষয়টিকে তিনি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখেন এবং নাগরিক অধিকার বলে বিবেচনা করেন।
অন্যদিকে অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত শিল্পীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে থাকার কারণে বিতর্কের মুখে পড়ে শিল্পকলা একাডেমির চাকরি হারানোর অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি স্ট্রিমের কাছে দাবি করেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতিবান্ধব ছিলেন বলেই শিল্পীরা রাজনীতিতে যুক্ত হতে উৎসাহিত হয়েছিলেন। তবে সরকার পরিবর্তনের পর শিল্পীদের বিরুদ্ধে যেভাবে ঢালাও মামলা হয়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, তাতে অনেকেই এখন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে ভয় পাচ্ছেন। নাম প্রকাশে না করার শর্তে এক অভিনেত্রীও স্ট্রিমকে জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে নারী শিল্পীরা হেনস্তা ও মবের শিকার হয়েছেন, যা তাঁদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার প্রবণতা বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সামগ্রিক মূল্যায়ন
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু শিল্পীদের অতীত ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, শিল্পীরা স্বেচ্ছায় না বাধ্য হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন—সে ব্যাখ্যা তাঁরাই দিতে পারবেন। তবে তিনি মনে করেন, যাঁরা এসব কর্মকাণ্ডে জড়াননি, তাঁরা এখন নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গেই অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কিছু শিল্পী বর্তমানে দায়িত্বশীল পদে থাকলেও নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁদের ব্যবহার করা হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে তারকাদের অনুপস্থিতি রাজনীতির গ্ল্যামারনির্ভর কৌশল থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয় না শুধু; বরং এটি শিল্পীসমাজের নিরাপত্তাহীনতা, জনমতের পরিবর্তন এবং রাজনীতির প্রতি আস্থাহীনতার সম্মিলিত প্রতিফলন। প্রশ্নটি তাই শুধু—রাজনীতি কি আর গ্ল্যামারের ওপর ভরসা করছে না—এই নয়; বরং আরও গভীরভাবে প্রশ্ন উঠছে, এই গ্ল্যামার কি আদৌ এখন রাজনীতির ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?

রাজনীতি কি আর গ্ল্যামারের ওপর ভরসা করছে না—এই প্রশ্ন দিয়েই আলোচনার সূচনা। একসময় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনোদন ও ক্রীড়াঙ্গনের তারকাদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ সরাসরি সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, কেউ দলীয় প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। ভোটের বাকি মাত্র ১৮ দিন থাকলেও এবার কোনো তারকাকে সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যাচ্ছে না; এমনকি প্রচারেও তাদের উপস্থিতি প্রায় অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতি কেবল একটি কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষণ।
অতীতে সংসদ ও প্রচারণায় তারকাদের সক্রিয় উপস্থিতি
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে ২০০৮ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর এবং সংগীতশিল্পী মমতাজ বেগম। আসাদুজ্জামান নূর নীলফামারী-২ আসন থেকে ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন; ২০০২ সালে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক এবং ২০০৯ সালে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মমতাজ বেগম ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হন; পরবর্তী সময়ে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হলেও ২০২৪ সালে পরাজিত হন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ ন্যাশনাল মুভমেন্ট (বিএনএম) থেকে অংশ নিয়ে সংগীতশিল্পী ডলি সায়ন্তনী জয়ী হতে পারেননি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী, খলনায়ক মনোয়ার হোসেন ডিপজল, চিত্রনায়ক শাকিল খান, মাহিয়া মাহি, অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান, চিত্রনায়ক রুবেল, গায়ক এসডি রুবেল ও শমী কায়সার। সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কিনেছিলেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও অপু বিশ্বাস। মনোনয়ন না পেয়ে মাহিয়া মাহি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও বিজয় অর্জন করতে পারেননি।
নির্বাচনী প্রচারণায় অতীতে যাঁরা সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন অভিনেতা রিয়াজ, সায়মন সাদিক, ইমন, অভিনেত্রী পূর্ণিমা, জ্যোতিকা জ্যোতি, সোহানা সাবা প্রমুখ। ক্রীড়াঙ্গন থেকেও রাজনীতিতে তারকাদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। জাতীয় ক্রিকেট দলের তারকা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ও সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন, ছিলেন জাতীয় ক্রিকেটা দলের সাবেক অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয়; ফুটবলার আব্দুস সালাম মুর্শেদীও আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, এমপি হয়েছেন আরেক সাবেক অধিনায়ক আরিফ খান জয়ও। এসব উদাহরণ দেখায়, একসময় রাজনীতি তারকাখ্যাতিকে একটি কার্যকর নির্বাচনী পুঁজি হিসেবে বিবেচনা করত।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দলগুলোর হিসাব
কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিনোদন ও ক্রীড়াঙ্গনের তারকাদের এই স্পষ্ট অনুপস্থিতি রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের দিকেই ইঙ্গিত করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনমতের রূপান্তর এবং গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রেক্ষাপটে তারকাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থেকে সরে আসার প্রবণতা বেড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডাক্তার জাহেদ উর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিনোদন জগতের অনেক শিল্পী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দলটির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; অনেকের সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাও গড়ে উঠেছিল।
ডাক্তার জাহেদের মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব শিল্পীকে যদি এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রচারণায় যুক্ত করে, তাহলে শিল্পীদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো শিল্পীকে প্রচারণায় যুক্ত করার পরই তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো নেতার পুরোনো ছবি বা সম্পর্ক সামনে চলে আসতে পারে, যা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই সম্ভাব্য বিপরীত ফলাফলের আশঙ্কায় রাজনৈতিক দলগুলো শিল্পীদের নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত করতে আগ্রহী নয়। তিনি আরও মনে করেন, জামায়াতে ইসলামী তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে চাইলেও শিল্পীদের যুক্ত করে না; আর বিএনপি এবারের নির্বাচনে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ অনুভব না করায় বাড়তি আকর্ষণ তৈরির জন্য তারকানির্ভর প্রচারণার পথে যাচ্ছে না।
শিল্পীদের অভিজ্ঞতা: নিরাপত্তা, চাপ ও পিছু হটার রাজনীতি
শিল্পীদের নিজস্ব বক্তব্যও এই অনুপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। তাঁদের মতে, অতীতে অনেক শিল্পী ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পেশাগত টিকে থাকা ও ক্ষমতার চাপের কারণে রাজনৈতিক প্রচারণায় যুক্ত হয়েছিলেন, যদিও তখনকার নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে তাঁদের নিজস্ব সংশয় ছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা শিল্পীদের রাজনীতিমুখী করলেও সরকার পরিবর্তনের পর সেই সম্পৃক্ততাই তাঁদের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। মামলা, হয়রানি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা থেকে এবারের নির্বাচনে অনেক শিল্পী রাজনীতি থেকে দূরে থাকাকেই নিরাপদ মনে করছেন।
জুলাই আন্দোলনে আলোচিত অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচন এবং ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। স্ট্রিমকে তিনি জানান, ব্যক্তিগত স্বার্থেই সে সময় তিনি এসব প্রচারণায় যুক্ত হন। তাঁর ভাষায়, তৎকালীন উচ্চপদস্থ একসেনা গোয়েন্দার কর্মকর্তার সঙ্গে পারিবারিক পরিচয়ের সূত্রে তিনি হয়রানির শিকার হয়েছিলেন এবং চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টার মামলার মুখোমুখি হন। সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য তিনি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেন, যদিও তিনি জানতেন যে নির্বাচনগুলো ছিল ‘পাতানো’। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্ল্যামার জগতের মানুষের রাজনীতিতে না জড়ানোর বিষয়টিকে তিনি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখেন এবং নাগরিক অধিকার বলে বিবেচনা করেন।
অন্যদিকে অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত শিল্পীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে থাকার কারণে বিতর্কের মুখে পড়ে শিল্পকলা একাডেমির চাকরি হারানোর অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি স্ট্রিমের কাছে দাবি করেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতিবান্ধব ছিলেন বলেই শিল্পীরা রাজনীতিতে যুক্ত হতে উৎসাহিত হয়েছিলেন। তবে সরকার পরিবর্তনের পর শিল্পীদের বিরুদ্ধে যেভাবে ঢালাও মামলা হয়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, তাতে অনেকেই এখন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে ভয় পাচ্ছেন। নাম প্রকাশে না করার শর্তে এক অভিনেত্রীও স্ট্রিমকে জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে নারী শিল্পীরা হেনস্তা ও মবের শিকার হয়েছেন, যা তাঁদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার প্রবণতা বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সামগ্রিক মূল্যায়ন
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু শিল্পীদের অতীত ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, শিল্পীরা স্বেচ্ছায় না বাধ্য হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন—সে ব্যাখ্যা তাঁরাই দিতে পারবেন। তবে তিনি মনে করেন, যাঁরা এসব কর্মকাণ্ডে জড়াননি, তাঁরা এখন নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গেই অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কিছু শিল্পী বর্তমানে দায়িত্বশীল পদে থাকলেও নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁদের ব্যবহার করা হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে তারকাদের অনুপস্থিতি রাজনীতির গ্ল্যামারনির্ভর কৌশল থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয় না শুধু; বরং এটি শিল্পীসমাজের নিরাপত্তাহীনতা, জনমতের পরিবর্তন এবং রাজনীতির প্রতি আস্থাহীনতার সম্মিলিত প্রতিফলন। প্রশ্নটি তাই শুধু—রাজনীতি কি আর গ্ল্যামারের ওপর ভরসা করছে না—এই নয়; বরং আরও গভীরভাবে প্রশ্ন উঠছে, এই গ্ল্যামার কি আদৌ এখন রাজনীতির ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?

বাংলাদেশকে নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বপ্ন, তারেক রহমানের ৩১ দফা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থাণের মূলমন্ত্রকে ধারণ করে ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
৩৫ মিনিট আগে
আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনকে প্রাণিবান্ধব মডেল এবং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নিরাপদ আবাসনস্থল হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
১ ঘণ্টা আগে
জাতিসংঘের অধীনে ওসমান হাদি হত্যার তদন্ত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতাকে যমুনার প্রবেশমুখগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানের ডাক দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অবস্থান কর্মসূচিতে অবস্থান নিতে দেখা যায় ঢাকা-৮ আসনের ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীকে।
৩ ঘণ্টা আগে
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাবনা-৫ (সদর) আসনে বইছে অন্যরকম এক আমেজ। তবে ভোটারদের চোখেমুখে এখন শুধু উন্নয়নের হিসাব-নিকাশ নয়, বরং প্রাধান্য পাচ্ছে নাগরিক অধিকার ও বৈষম্যমুক্ত এক জনপদের স্বপ্ন।
৩ ঘণ্টা আগে