leadT1ad

অর্থনীতির আধুনিকায়ন ও অলিগার্কি থেকে মুক্তি

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

একটি দেশের গণতন্ত্র তখনই সার্থক হয়, যখন তার অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের সমান অংশগ্রহণ থাকে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘সিন্ডিকেট’ এবং ‘সম্পদ কুক্ষিগতকরণ’। ২০২৬ সালের বিভিন্ন নির্বাচনী ইশতেহারে যে অর্থনৈতিক দর্শন উঠে এসেছে, তা মূলত এই ধারা পরিবর্তনের পক্ষের ঐকমত্যের কথা বলছে।

অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ

সাধারণত আমরা ‘গণতন্ত্র’ বলতে ভোটের অধিকার বুঝি। কিন্তু ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’ মানে হলো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা এবং সম্পদ যেন মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির হাতে বন্দি না থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পুঁজির একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসার পথ সুগম করা হয়।

দেশের ভোজ্যতেলের বাজার যদি মাত্র ৫টি বড় কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করে, তবে সেটি ‘অর্থনৈতিক স্বৈরতন্ত্র’। কিন্তু যদি ৫০০টি ছোট কোম্পানি সেই বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায় এবং ব্যাংক থেকে ঋণ পায়, তবে সেটিই হবে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের উদাহরণ।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের সিংহভাগ ঋণ বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলোর হাতে। সাধারণ তরুণ উদ্যোক্তারা জামানত বা রাজনৈতিক তদবিরের অভাবে ঋণ পান না। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ মানে হলো ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনা, যাতে একজন গ্রামের তরুণও তার উদ্ভাবনী ব্যবসার জন্য ন্যায্য ঋণ পায়। এটি মূলত ‘বিত্তবানদের অর্থনীতি’ থেকে ‘জনগণের অর্থনীতিতে’ উত্তরণের প্রক্রিয়া।

অলিগার্কি মুক্ত করা

‘অলিগার্কি’ একটি গ্রিক শব্দ, যার অর্থ ‘অল্প কয়েকজনের শাসন’। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যখন গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে এবং নিজেদের স্বার্থে আইন বানায়, তখন তাকে অলিগার্কি বলে। এই গোষ্ঠীগুলো বাজার সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ায় এবং প্রতিযোগীদের পথ বন্ধ করে দেয়।

রাশিয়া বা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর অলিগার্কদের উত্থান ঘটেছিল। তারা রাষ্ট্রের খনিজ সম্পদ ও বড় শিল্পগুলো পানির দরে কিনে নিয়ে দখল করেছিল। বাংলাদেশেও ‘অলিগার্ক’ বলতে তাদের বোঝানো হচ্ছে যারা ব্যাংক লুটে জড়িত অথবা সরকারের ঘনিষ্ঠ থেকে একচেটিয়া ব্যবসা করছে।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার প্রধান কারণ বাজার সিন্ডিকেট। অলিগার্কি মুক্ত করা মানে হলো—বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক করা। যখন কোনো ব্যবসায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাজারে একাধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না, তখনই পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে। তরুণ ভোটারদের জন্য এটি একটি পরিষ্কার বার্তা: মেধা থাকলে আপনিও বড় ব্যবসায়ী হতে পারবেন, প্রভাবশালী হওয়ার প্রয়োজন নেই।

গিগ ইকোনমি

গিগ ইকোনমি হলো প্রথাগত দীর্ঘমেয়াদী চাকরির বদলে স্বল্পমেয়াদী বা প্রজেক্ট-ভিত্তিক কাজের বাজার। ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং (যেমন পাঠাও/উবার), ই-কমার্স ডেলিভারি কিংবা অনলাইন কনসাল্টেন্সি—এই সবই গিগ ইকোনমির অংশ। এখানে মানুষ নিজের সময়মতো একাধিক কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশে লাখ লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তাদের কোনো সামাজিক স্বীকৃতি নেই। অনেক সময় ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড পেতে বা লোন পেতে সমস্যা হয়। নির্বাচনের আগে থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় ‘গিগ ইকোনমি’র স্বীকৃতি মানে হলো—ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আইনি সুরক্ষা, বিমা সুবিধা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা। এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক বাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়ার পথ খুলে যেতে পারে।

ব্লু ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমি

  • ব্লু ইকোনমিসমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলীয় সম্পদ ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। যেমন: গভীর সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণ, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, সামুদ্রিক পর্যটন ইত্যাদি।
  • ক্রিয়েটিভ ইকোনমিমানুষের মেধা, উদ্ভাবন এবং সৃজনশীলতাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করা। যেমন: সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ভিডিও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি, ফিল্ম মেকিং, ডিজাইন এবং বিজ্ঞাপনী সংস্থা।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা থাকলেও আমরা এখনও এর পূর্ণ ব্যবহার করতে পারিনি। ব্লু ইকোনমি সফল হলে দেশের জ্বালানি সংকট ও আমিষের চাহিদা মিটবে। অন্যদিকে, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি হলো শিক্ষিত তরুণদের জন্য সোনার খনি। বাংলাদেশ যদি কেবল সস্তা শ্রমের ‘গার্মেন্টস পণ্য’ রপ্তানির ওপর নির্ভর না করে ‘সফটওয়্যার’ বা ‘ডিজিটাল আর্ট’ রপ্তানি করতে পারে, তবে আমরা দ্রুত ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ হতে পারব। এটি তারুণ্যের মেধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির নামান্তর।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও স্টার্ট-আপ ফান্ড

নতুন ও উদ্ভাবনী ব্যবসার জন্য যে প্রাথমিক মূলধন বিনিয়োগ করা হয়, তাকে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বলে। এটি প্রচলিত ঋণের মতো নয় যে মাসের শেষে সুদ দিতে হবে; বরং বিনিয়োগকারী আপনার ব্যবসার অংশীদার হয়।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: তরুণদের কাছে আইডিয়া আছে কিন্তু টাকা নেই। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এই ফান্ডের কথা থাকা মানে হলো রাষ্ট্র তরুণদের ব্যবসায়িক ঝুঁকি ভাগ করে নেবে।

জাস্ট ট্রানজিশন ফ্রেমওয়ার্ক

পরিবেশ বাঁচাতে যখন রাষ্ট্র ক্ষতিকর জ্বালানি (কয়লা) থেকে আধুনিক জ্বালানিতে (সৌরশক্তি) শিফট করবে, তখন যেন কোনো শ্রমিকের কাজ না হারায় বা কোনো ছোট ব্যবসা পথে না বসে—তার সুষ্ঠু পরিকল্পনা।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের আধুনিক হতে হবে, কিন্তু সেই আধুনিকায়ন যেন সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা না হয়—এই পরিভাষাটি সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করে।

এই অর্থনৈতিক পরিভাষাগুলো আমাদের একটি ‘স্মার্ট’ ও ‘ইনক্লুসিভ’ অর্থনীতির স্বপ্ন দেখায়। রাজনীতির মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। ‘অলিগার্কি’ ভেঙে যখন ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’ হবে, তখন বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, পণ্যের দাম কমবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলবে।

নাগরিকের কর্মসংস্থান কি কেবল সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করবে, নাকি রাষ্ট্র আপনাকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য একটি উন্মুক্ত ও নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম দেবে? আগামীর নির্বাচনে এই বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ঠিক করে দেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি কি গুটিকয়েক অলিগার্কের পকেটে থাকবে, নাকি সাধারণের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত