২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। সেই অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিতব্য প্রথম সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ৫১ দফার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’-জাতীয় স্বার্থের এক নতুন দর্শন দিয়ে ইশতেহারটি শুরু করেছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান সংবলিত এই ঘোষণাটি কেবল একটি দলীয় ইশতেহার নয়, বরং একে একটি ‘সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছে দলটি। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভাষায়, এটি এমন এক রাষ্ট্রদর্শন যেখানে দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বিগত দশকগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে মেরুকরণ ও বিভাজনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে একটি ‘জাতীয় ঐক্য’ গঠনই এই দর্শনের মূল ভিত্তি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বলতে বোঝানো হয়েছে—রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণ এবং সার্বভৌমত্বের অখণ্ডতা বজায় রাখার লক্ষ্যে। এটি মূলত একটি সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের সংকট হলো ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ। এই সংকট নিরসনে ও ও রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের লক্ষে বিএনপি তাদের ইশতেহারে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কেউ দুই মেয়াদে (সর্বমোট ১০ বছর) বেশি থাকতে পারবেন না। এটি ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্ব ও স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধে একটি মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান। শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য আনতে এবং রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে বা বিশেষ প্রয়োজনে রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব নিশ্চিত করতে ‘উপ-রাষ্ট্রপতি’ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আইনসভার উচ্চকক্ষ প্রবর্তনের মাধ্যমে গুণীজন ও বিশেষজ্ঞদের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, উচ্চকক্ষে ২০% নারী আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব সংসদে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এছাড়াও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের এমন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যাতে সংসদ সদস্যরা জনস্বার্থ ও বিবেক অনুযায়ী সংসদে মতপ্রকাশ করতে পারেন, যা সংসদকে প্রকৃত অর্থে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে বিএনপি। দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়ে ‘ন্যায়পাল’ (Ombudsman) নিয়োগ এবং ইশতেহারে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার পাশাপাশি 'সার্চ কমিটি'র মাধ্যমে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার অঙ্গীকার দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য একে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ এবং উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটি কার্যকর হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ তৈরি হতে পারে। পুলিশ বাহিনীকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে একটি আধুনিক, জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। যেখানে পদোন্নতি ও বদলি হবে কেবল মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে ‘এক ট্রিলিয়ন ডলার’ জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি আন্তর্জাতিক ‘এভিয়েশন ও কার্গো হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার সাহসী পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ (মাসে ২৫০০ টাকা বা সমমূল্যের পণ্য) এবং কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার কার্ড’ প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতিগুলো জনতুষ্টির রাজনীতির বাইরে গিয়ে একটি টেকসই সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী গড়ার ইঙ্গিত দেয়।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিপ্লব আনতে বিএনপি জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যা একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব। নারীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ওয়াই-ফাই ও মিড-ডে মিলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ১ লক্ষ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলো জুলাই অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের নূন্যতম মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নারীর ক্ষমতায়নে ইশতেহারে একটি অভিনব দিক হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরিবারের নারী সদস্যের নামে ইস্যু করার প্রস্তাব। এছাড়া স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ নাগরিক সেবার মাধ্যমে একটি মানবিক ও মর্যাদাবান সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনআকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে ‘জুলাই সনদ’ ইশতেহারে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। শহীদ ও আহতদের পরিবারকে সামাজিক মর্যাদা ও আজীবন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির এই ইশতেহারটি মূলত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই ইশতেহারটি যদি সত্যিকারের ‘সামাজিক চুক্তি’ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে প্রভুত্ব নয়’—এই নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ হবে বৈদেশিক সম্পর্কের প্রধান মানদণ্ড। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং নিজের দেশে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ বরদাশত না করার কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কার্যকর ও সমমর্যাদার কূটনীতি পরিচালনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। প্রতিহিংসার রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করতে এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে একটি ‘জাতীয় সমঝোতা কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত বিভাজিত জাতিকে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ে (বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ) ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে ‘জাতীয় ঐকমত্য’ এবং প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির অঙ্গীকার জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ক্ষতবিক্ষত রাজনৈতিক পরিবেশে কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসবে।
বিএনপির ২০২৬ সালের ইশতেহারটি কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের একটি বিস্তারিত ‘মাস্টারপ্ল্যান’। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে জয়ী হওয়ার পর দলটির প্রতিশ্রুতি রক্ষার দৃঢ়তার ওপর। তবে এই ইশতেহার বাস্তবায়নে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও দলীয়করণের প্রভাব কাটিয়ে রাতারাতি একটি পেশাদার ও নিরপেক্ষ কাঠামো তৈরি করা কঠিন হতে পারে। এছাড়া ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ বা দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক কায়েমি স্বার্থের বাধা আসতে পারে। দুর্নীতি যেখানে শিকড় গেড়েছে, সেখানে সিস্টেম পরিবর্তন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বাস্তবায়নের অন্যতম বাধা হতে পারে।
বর্তমানে ইশতেহারে অর্থনীতিকে ‘ভঙ্গুর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সংকটময় অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে এত বড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং একই সাথে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিপুল বরাদ্দ নিশ্চিত করার জন্য যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় প্রয়োজন, তা বর্তমান কাঠামোতে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। প্রায় ১ কোটি পরিবারকে 'ফ্যামিলি কার্ড' সুবিধার আওতায় আনতে প্রতি বছর যে বিপুল অংকের অর্থের প্রয়োজন হবে, তা বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। এই অর্থ সংস্থানের জন্য সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য ও সমঝোতা বজায় রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পাহাড়সম জন-আকাঙ্ক্ষা বিরাজ করছে। দলীয় প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘রেইনবো নেশন’ বা ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করা রাজনৈতিক দলটির জন্য বড় পরীক্ষা হবে, বিশেষ করে যখন ইশতেহারে বিগত সময়ের জুলুম-নির্যাতনের বিচারের কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে।
বিএনপির এই ইশতেহারটি মূলত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই ইশতেহারটি যদি সত্যিকারের ‘সামাজিক চুক্তি’ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। ইশতেহারের ৫১টি দফার পরতে পরতে যে আধুনিকতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের ক্ষমতায়নের চিত্র ফুটে উঠেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সমৃদ্ধ ও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর বাস্তবায়ন মূলত নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার ওপর। জন-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই ইশতেহারটি আগামীর বাংলাদেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
- ড. মো. আবু সালেহ: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়