ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

সুনীল কর্মকারকে প্রথমবার দেখি সেই শৈশবে। নিজের গ্রামের এক আসরে। তখনও রাত জেগে গান শোনার অনুমতি ছিল না। রাত দশটার দিকে বাউলরা এসে পৌঁছলেন আসরে। খুব মনে পড়ছে। ধান ও আখ কাটা হয়ে যাওয়ার পর যে খেত বিরান পড়ে থাকে তাতে খেজুরের রস জ্বাল করার বিশাল আড়ার পাশে মঞ্চ বানানো হয়েছিল। আসর শুরু হওয়ার পরপরই অভিভাবকদের তাগাদায় বাড়ি ফিরতে হয়েছিল সেদিন।
পরে আবার সকাল ৭টার মধ্যে সেই আসরে গিয়ে উপস্থিত হলাম। তখন পালা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। সকালে পালাক্রমে গান গাইছেন বাউল সুনীল কর্মকার আর মাহতাব সরকার। সেই যে দুই গায়ক মাথায় ঢুকে গেলেন, মনে ঠাঁই গেড়ে নিলেন, আর তারা আমাকে ছেড়ে গেলেন না। ৩৫ বছরের বেশি হয়ে গেছে এই স্মৃতির। এই স্মৃতি আমার একার নয়। সুনীল কর্মকারকে নিয়ে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকার মানুষের এটা একটা যৌথস্মৃতি।
স্মৃতির এ ধরনের সাংস্কৃতিক শক্তির কথা বলতে গিয়েই হয়তো আফ্রিকান কালো মানুষের মুখপাত্র দার্শনিক ফ্রান্জ ফানো ‘জগতের লাঞ্ছিত’ কিংবা ‘কালো চামড়া শাদা মুখোশ’ গ্রন্থে অনেক কথাই বলেছিলেন। সুনীলদাকে নিয়ে আমাদের স্মৃতি মোটেও শুধু ব্যক্তিগত নয়, এই স্মৃতি সমষ্টিগত ও প্রজন্মগতও। আর কে না জানে, স্মৃতি নেই মানে তো সংস্কৃতিও নেই, কিংবা আমি ও আমরাও নেই। এসব দিক থেকে সুনীল কর্মকার আমাদের বাউল গানের এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের তথা বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা বড় প্রতীক।
বাউল সুনীল কর্মকারের সঙ্গে শেষবার মুখোমুখি দেখা হয়েছিল একটি উজ্জ্বল সন্ধ্যায়। ২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ দিন। কালীপূজার আয়োজন চলছে কিংবা দীপাবলির। আলোর উৎসবে মুখর ময়মনসিংহ শহরের পুরনো অংশের অলিগলি। শ্যামা মায়ের আবাহনী চারদিকে। বাউল সুনীল কর্মকারের বাসার সামনেই মণ্ডপ প্রস্তুত। দীপ জ্বলছে। পটকার শব্দ। বাজি ফুটছে এদিক-ওদিক।
বাজি আর পটকার আওয়াজের মধ্যে আমাদের হাঁক, ‘দাদা, বাসায় আছেন?’
‘আছি, আসো।’
আমরা হুট করেই ঢুকে গেলাম সুনীলদার বাসায়। প্রতিবেশীর বাসায় ঢুকতে এত কি আর বলা-কওয়া।
বসার ঘরে ছোট একটা খাটে উদাম গায়ে শুয়ে আছেন তিনি। দেখেন না তিনি। দেখেন না তো সেই সাত-আট বছর বয়স থেকেই। চোখের দৃষ্টি হারানোর পর মনের দৃষ্টি প্রসারিত করে গেছেন আমৃত্যু। আমাদের দেখলেন না বটে। উপলব্ধি করলেন। চোখ ও মুখ তুললেন আমাদের গলার আওয়াজ লক্ষ করে। মনের চোখ দিয়ে দেখলেন আমাদের। হাঁকডাকে ঠাউর করে নিয়েছিলেন কারা এসেছে। তারপরও পরিচয় দিয়ে বসে গেলাম।
বসতে না বসতেই শুরু হয়ে গেল কথা। ‘দাদা, আমার বাড়ি এখানেই। ফুলপুরে।’ সব সুনীলদার চেনা। ফুলপুরের কোন গ্রামের কোন বাড়ি জেনে নিলেন সব। সুনীলদাকে ছোটবেলায় যেমন দেখেছি এখনও তেমনই আছেন। বয়স যেন তার বাড়ে না।
আমাদের গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় বাউলের মালজোড়া, আমরা বলি পালা গান, গাইতে হর বছর আসতেন তিনি ও বাউল মাহতাব। আসর শুরু হতো রাত ১১টার পর। রাত বাড়ত আর লোক বাড়ত। শীতের রাতের ধান কাটা নাড়ার ক্ষেতগুলো হয়ে উঠত বিরাট এক জনতার মেলা। গান চলত সকাল ৭টা বা ৮টা পর্যন্ত। সুনীলদার দিকে তাকাতেই সেসব দিন সামনে হাজির। অন্তত দশটি আসরে রাত জেগে হাজির হয়েছি সেই শৈশবে ও তারুণ্যে।
সুনীল কর্মকার ছিলেন আমাদের একেবারে ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং সত্তারও অংশ। আমরা যারা ময়মনসিংহ অঞ্চলে বেড়ে উঠেছি, ময়মনসিংহের গ্রামগঞ্জে ও খেতখামারে যাদের শৈশব লেপ্টে আছে তাদের অস্তিত্বের একটা বিশেষ অংশ বাউল সুনীল কর্মকার। তাঁর সঙ্গে এবং তাঁকে নিয়ে এত এত স্মৃতি আমাদের। আজ সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে সব যেন, সব স্মৃতি যেন, হঠাৎ নিজের ভেতর বিশেষভাবে জেগে উঠে আর্তনাদ ও আহাজারি করছে তাঁর জন্য।
তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর কেটে গেছে তাঁর গান শুনে। বাউল জালাল খাঁর গানের প্রামাণ্য ভান্ডার ছিলেন তিনি। তাঁর গায়কি ছিল বিশেষভাবে আলাদা। শুধু গাওয়া নয়, বাউলতত্ত্বের এক ভান্ডারও ছিলেন তিনি। সেই ভান্ডারের সন্ধান জানেন তার ভক্তরা।
গ্রামের শীতকালের রাতগুলোর কথা মনে পড়ে বিশেষভাবে। যাত্রাপালা, নাটক, কিচ্ছা, পালা, গাজির গানের আসর বসত এ গ্রামে ও গ্রামে। মধ্যরাত্তিরে হঠাৎ বেহালার রোদন আমাদের উন্মাদ করে তুলত। আমরা বুঝতে পারতাম এই বেহালা কার গলায় বাজছে। সুনীল কর্মকারের দরাজ গলা আর বেহালা আমাদের চুম্বকের চেয়েও বেশি টানত। এখনো টানে। শিল্পীকে, সাধককে তো আর সবসময় সামনে বসে দেখতে হয় না। পরিণত জীবনে তাঁর গান বেশি শোনা হতো ইউটিউবে। জালালউদ্দিন খাঁ’র গানের প্রামাণ্য কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
ময়মনসিংহ শহরে শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির লোকজনের একটা বড় আড্ডাস্থল ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষা জয়নুল আবেদীন পার্ক আর কাচারি ঘাট। সেসব স্থানে সুনীল কর্মকারের উপস্থিতি একটা অনিবার্যতা। সেখানে যারাই আড্ডা দিত বা আড্ডা দেয় তাদের সাথেই কমবেশি দেখা ও কুশল বিনিময় হয়েছে সুনীল কর্মকারের। ব্যক্তিত্বে, প্রজ্ঞায় ও প্রসারে সুনীল কর্মকার অনেক বড় হলেও প্রতিদিনের দেখা মানুষ, জানা মানুষকে, আমাদের বড় মনে হয় না। এই না-হওয়াটা যে সবসময় খারাপ তা নয়। সুনীলদাও তেমনই আমাদের আপন, বড় নন।
ময়মনসিংহ শহরে উদীচী কার্যালয়ে একবার রাতে প্রখ্যাত গায়ক কাশেম তালুকদারকে নিয়ে একটা আয়োজন করা হলো। সেই আয়োজনের মূল কারিগর তখন উদীচীর রবীন ভাই। কাশেম তালুকদার তখন খুব অসুস্থ। ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। সেখান থেকে তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হলো গাওয়ার জন্য। কাশেম তালুকদারকে সুনীলদা বলতেন বাবা।
কাশেম তালুকদার উদীচী কার্যালয়ে পৌঁছার আগে গাইছিলেন মোহনগঞ্জের বিখ্যাত গায়ক গৌরাঙ্গ আদিত্য। যাত্রাপালায় বিবেকের গান গেয়ে তিনি খুব বিখ্যাত ছিলেন। কীর্তনাঙ্গের গান গেয়ে সে রাতে মাত করে দিচ্ছিলেন গৌরাঙ্গ আদিত্য। তারপরই সুনীলদার গাওয়ার পালা। রাত বাড়ছে। গৌরাঙ্গ আদিত্যকে গানে পেয়ে বসেছে। তিনিও ছাড়ছেন না। সুনীলদাসহ আমরা জনাবিশেক শ্রোতা। সুনীলদা এক সময় রাগে গজগজ করতে থাকলেন। সে রাতে তাঁকে শান্ত করলেন রবীন ভাই।
শেষ দেখায় এসব অনেক কথাই হচ্ছিল, গ্রামের আসরগুলোতে যখন যেতেন কেমন ছিল সেসব গ্রাম। কীভাবে যাতায়াত, কারা কদর করে নিয়ে যেত। এসব কথার মধ্যেই হঠাৎ প্রস্তুত কাজী মোস্তফা মুন্না, আমাদের মুন্না ভাই। বললেন, হ্যাঁ, আমরা রেডি।
তার কথা শুনে সুনীলদা বললেন, ‘কী হচ্ছে? কী ব্যাপার?’ মুন্নার জবাব, ‘দাদা একটু কথাবার্তা বলব, আর তা রেকর্ড করব।’
‘তা করো, কিন্তু আমারে তো শার্টটা পরতে দিবা, এই শার্টটা নিয়ে আয় তো।’ হাঁক দিলেন সুনীলদা। বাড়ির অল্প বয়সী ছেলেটি শার্টটা এনে দিলো। পরে নিয়ে তিনিও প্রস্তুত। শুরু হয়ে গেল আমাদের আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা। সাক্ষাৎকার। শুরু করেই বুঝলাম। ভুল। এভাবে হয় না। সুনীলদা, যিনি আমাদের গৃহের লোক, তিনি যে আবার গ্রহের লোক, তা তো খেয়াল করিনি। কথা বলতে বলতে দেখলাম অধিকারের লোক, পরিবারের লোক, হিসেবে তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের আনুষ্ঠানিকতা তো করা যায় না। প্রশ্নটশ্নও খুব গুছিয়ে করা যায় না। সুনীলদাও উত্তর দিলেন খুব ঘরোয়া কথার মতো। শেষ পর্যন্ত যা হলো তা সাক্ষাৎকার হলো না।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত বাউল সুনীল কর্মকারের জন্ম ১৫ জানুয়ারি ১৯৫৯ সালে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার বারনাল গ্রামে। সাত বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চোখের আলো হারান তিনি। সেই দৃষ্টিহীন ছেলেটিকে বাবা দীনেশ কর্মকার তুলে দেন বাউল গায়ক ইস্রাইল মিয়ার হাতে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে দোতরা, বেহালা, তবলা ও হারমোনিয়াম বাজাতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন সুনীল কর্মকার। তখন থেকেই পেশাদার শিল্পী হিসেবে গান গাইতে থাকেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকার প্রত্যন্ত গ্রাম ও হাটের আসরে। তাঁর হাতের পরশে যেন একলাই গেয়ে ওঠে একতারা, স্বরাজ, খমক, খুনজরি, ঢোল ও ঢাক।
সুনীল কর্মকার ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসঙ্গীত, বাউল গান এবং জালালগীতিকে নিয়ে গেছেন বিশ্বদরবারে। গান গেয়েছেন তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতে। দেশের ভেতরে খুব বড় পুরস্কার সম্ভবত তিনি পাননি। পাবেনও না বোধহয়। সুনীল কর্মকারের বড় পুরস্কার তাঁর ভক্ত ও শিষ্যরা। তিনি যে অস্তিত্ব নির্মাণ করেছেন নিজের, সেটি অনেক বেশি সম্প্রসারিত এবং সে কারণেই তিনি একটা লৌকিক অমরত্ব লাভ করেছেন।
ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ, লেখক ও সাংবাদিক

সুনীল কর্মকারকে প্রথমবার দেখি সেই শৈশবে। নিজের গ্রামের এক আসরে। তখনও রাত জেগে গান শোনার অনুমতি ছিল না। রাত দশটার দিকে বাউলরা এসে পৌঁছলেন আসরে। খুব মনে পড়ছে। ধান ও আখ কাটা হয়ে যাওয়ার পর যে খেত বিরান পড়ে থাকে তাতে খেজুরের রস জ্বাল করার বিশাল আড়ার পাশে মঞ্চ বানানো হয়েছিল। আসর শুরু হওয়ার পরপরই অভিভাবকদের তাগাদায় বাড়ি ফিরতে হয়েছিল সেদিন।
পরে আবার সকাল ৭টার মধ্যে সেই আসরে গিয়ে উপস্থিত হলাম। তখন পালা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। সকালে পালাক্রমে গান গাইছেন বাউল সুনীল কর্মকার আর মাহতাব সরকার। সেই যে দুই গায়ক মাথায় ঢুকে গেলেন, মনে ঠাঁই গেড়ে নিলেন, আর তারা আমাকে ছেড়ে গেলেন না। ৩৫ বছরের বেশি হয়ে গেছে এই স্মৃতির। এই স্মৃতি আমার একার নয়। সুনীল কর্মকারকে নিয়ে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকার মানুষের এটা একটা যৌথস্মৃতি।
স্মৃতির এ ধরনের সাংস্কৃতিক শক্তির কথা বলতে গিয়েই হয়তো আফ্রিকান কালো মানুষের মুখপাত্র দার্শনিক ফ্রান্জ ফানো ‘জগতের লাঞ্ছিত’ কিংবা ‘কালো চামড়া শাদা মুখোশ’ গ্রন্থে অনেক কথাই বলেছিলেন। সুনীলদাকে নিয়ে আমাদের স্মৃতি মোটেও শুধু ব্যক্তিগত নয়, এই স্মৃতি সমষ্টিগত ও প্রজন্মগতও। আর কে না জানে, স্মৃতি নেই মানে তো সংস্কৃতিও নেই, কিংবা আমি ও আমরাও নেই। এসব দিক থেকে সুনীল কর্মকার আমাদের বাউল গানের এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের তথা বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা বড় প্রতীক।
বাউল সুনীল কর্মকারের সঙ্গে শেষবার মুখোমুখি দেখা হয়েছিল একটি উজ্জ্বল সন্ধ্যায়। ২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ দিন। কালীপূজার আয়োজন চলছে কিংবা দীপাবলির। আলোর উৎসবে মুখর ময়মনসিংহ শহরের পুরনো অংশের অলিগলি। শ্যামা মায়ের আবাহনী চারদিকে। বাউল সুনীল কর্মকারের বাসার সামনেই মণ্ডপ প্রস্তুত। দীপ জ্বলছে। পটকার শব্দ। বাজি ফুটছে এদিক-ওদিক।
বাজি আর পটকার আওয়াজের মধ্যে আমাদের হাঁক, ‘দাদা, বাসায় আছেন?’
‘আছি, আসো।’
আমরা হুট করেই ঢুকে গেলাম সুনীলদার বাসায়। প্রতিবেশীর বাসায় ঢুকতে এত কি আর বলা-কওয়া।
বসার ঘরে ছোট একটা খাটে উদাম গায়ে শুয়ে আছেন তিনি। দেখেন না তিনি। দেখেন না তো সেই সাত-আট বছর বয়স থেকেই। চোখের দৃষ্টি হারানোর পর মনের দৃষ্টি প্রসারিত করে গেছেন আমৃত্যু। আমাদের দেখলেন না বটে। উপলব্ধি করলেন। চোখ ও মুখ তুললেন আমাদের গলার আওয়াজ লক্ষ করে। মনের চোখ দিয়ে দেখলেন আমাদের। হাঁকডাকে ঠাউর করে নিয়েছিলেন কারা এসেছে। তারপরও পরিচয় দিয়ে বসে গেলাম।
বসতে না বসতেই শুরু হয়ে গেল কথা। ‘দাদা, আমার বাড়ি এখানেই। ফুলপুরে।’ সব সুনীলদার চেনা। ফুলপুরের কোন গ্রামের কোন বাড়ি জেনে নিলেন সব। সুনীলদাকে ছোটবেলায় যেমন দেখেছি এখনও তেমনই আছেন। বয়স যেন তার বাড়ে না।
আমাদের গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় বাউলের মালজোড়া, আমরা বলি পালা গান, গাইতে হর বছর আসতেন তিনি ও বাউল মাহতাব। আসর শুরু হতো রাত ১১টার পর। রাত বাড়ত আর লোক বাড়ত। শীতের রাতের ধান কাটা নাড়ার ক্ষেতগুলো হয়ে উঠত বিরাট এক জনতার মেলা। গান চলত সকাল ৭টা বা ৮টা পর্যন্ত। সুনীলদার দিকে তাকাতেই সেসব দিন সামনে হাজির। অন্তত দশটি আসরে রাত জেগে হাজির হয়েছি সেই শৈশবে ও তারুণ্যে।
সুনীল কর্মকার ছিলেন আমাদের একেবারে ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং সত্তারও অংশ। আমরা যারা ময়মনসিংহ অঞ্চলে বেড়ে উঠেছি, ময়মনসিংহের গ্রামগঞ্জে ও খেতখামারে যাদের শৈশব লেপ্টে আছে তাদের অস্তিত্বের একটা বিশেষ অংশ বাউল সুনীল কর্মকার। তাঁর সঙ্গে এবং তাঁকে নিয়ে এত এত স্মৃতি আমাদের। আজ সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে সব যেন, সব স্মৃতি যেন, হঠাৎ নিজের ভেতর বিশেষভাবে জেগে উঠে আর্তনাদ ও আহাজারি করছে তাঁর জন্য।
তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর কেটে গেছে তাঁর গান শুনে। বাউল জালাল খাঁর গানের প্রামাণ্য ভান্ডার ছিলেন তিনি। তাঁর গায়কি ছিল বিশেষভাবে আলাদা। শুধু গাওয়া নয়, বাউলতত্ত্বের এক ভান্ডারও ছিলেন তিনি। সেই ভান্ডারের সন্ধান জানেন তার ভক্তরা।
গ্রামের শীতকালের রাতগুলোর কথা মনে পড়ে বিশেষভাবে। যাত্রাপালা, নাটক, কিচ্ছা, পালা, গাজির গানের আসর বসত এ গ্রামে ও গ্রামে। মধ্যরাত্তিরে হঠাৎ বেহালার রোদন আমাদের উন্মাদ করে তুলত। আমরা বুঝতে পারতাম এই বেহালা কার গলায় বাজছে। সুনীল কর্মকারের দরাজ গলা আর বেহালা আমাদের চুম্বকের চেয়েও বেশি টানত। এখনো টানে। শিল্পীকে, সাধককে তো আর সবসময় সামনে বসে দেখতে হয় না। পরিণত জীবনে তাঁর গান বেশি শোনা হতো ইউটিউবে। জালালউদ্দিন খাঁ’র গানের প্রামাণ্য কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
ময়মনসিংহ শহরে শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির লোকজনের একটা বড় আড্ডাস্থল ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষা জয়নুল আবেদীন পার্ক আর কাচারি ঘাট। সেসব স্থানে সুনীল কর্মকারের উপস্থিতি একটা অনিবার্যতা। সেখানে যারাই আড্ডা দিত বা আড্ডা দেয় তাদের সাথেই কমবেশি দেখা ও কুশল বিনিময় হয়েছে সুনীল কর্মকারের। ব্যক্তিত্বে, প্রজ্ঞায় ও প্রসারে সুনীল কর্মকার অনেক বড় হলেও প্রতিদিনের দেখা মানুষ, জানা মানুষকে, আমাদের বড় মনে হয় না। এই না-হওয়াটা যে সবসময় খারাপ তা নয়। সুনীলদাও তেমনই আমাদের আপন, বড় নন।
ময়মনসিংহ শহরে উদীচী কার্যালয়ে একবার রাতে প্রখ্যাত গায়ক কাশেম তালুকদারকে নিয়ে একটা আয়োজন করা হলো। সেই আয়োজনের মূল কারিগর তখন উদীচীর রবীন ভাই। কাশেম তালুকদার তখন খুব অসুস্থ। ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। সেখান থেকে তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হলো গাওয়ার জন্য। কাশেম তালুকদারকে সুনীলদা বলতেন বাবা।
কাশেম তালুকদার উদীচী কার্যালয়ে পৌঁছার আগে গাইছিলেন মোহনগঞ্জের বিখ্যাত গায়ক গৌরাঙ্গ আদিত্য। যাত্রাপালায় বিবেকের গান গেয়ে তিনি খুব বিখ্যাত ছিলেন। কীর্তনাঙ্গের গান গেয়ে সে রাতে মাত করে দিচ্ছিলেন গৌরাঙ্গ আদিত্য। তারপরই সুনীলদার গাওয়ার পালা। রাত বাড়ছে। গৌরাঙ্গ আদিত্যকে গানে পেয়ে বসেছে। তিনিও ছাড়ছেন না। সুনীলদাসহ আমরা জনাবিশেক শ্রোতা। সুনীলদা এক সময় রাগে গজগজ করতে থাকলেন। সে রাতে তাঁকে শান্ত করলেন রবীন ভাই।
শেষ দেখায় এসব অনেক কথাই হচ্ছিল, গ্রামের আসরগুলোতে যখন যেতেন কেমন ছিল সেসব গ্রাম। কীভাবে যাতায়াত, কারা কদর করে নিয়ে যেত। এসব কথার মধ্যেই হঠাৎ প্রস্তুত কাজী মোস্তফা মুন্না, আমাদের মুন্না ভাই। বললেন, হ্যাঁ, আমরা রেডি।
তার কথা শুনে সুনীলদা বললেন, ‘কী হচ্ছে? কী ব্যাপার?’ মুন্নার জবাব, ‘দাদা একটু কথাবার্তা বলব, আর তা রেকর্ড করব।’
‘তা করো, কিন্তু আমারে তো শার্টটা পরতে দিবা, এই শার্টটা নিয়ে আয় তো।’ হাঁক দিলেন সুনীলদা। বাড়ির অল্প বয়সী ছেলেটি শার্টটা এনে দিলো। পরে নিয়ে তিনিও প্রস্তুত। শুরু হয়ে গেল আমাদের আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা। সাক্ষাৎকার। শুরু করেই বুঝলাম। ভুল। এভাবে হয় না। সুনীলদা, যিনি আমাদের গৃহের লোক, তিনি যে আবার গ্রহের লোক, তা তো খেয়াল করিনি। কথা বলতে বলতে দেখলাম অধিকারের লোক, পরিবারের লোক, হিসেবে তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের আনুষ্ঠানিকতা তো করা যায় না। প্রশ্নটশ্নও খুব গুছিয়ে করা যায় না। সুনীলদাও উত্তর দিলেন খুব ঘরোয়া কথার মতো। শেষ পর্যন্ত যা হলো তা সাক্ষাৎকার হলো না।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত বাউল সুনীল কর্মকারের জন্ম ১৫ জানুয়ারি ১৯৫৯ সালে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার বারনাল গ্রামে। সাত বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চোখের আলো হারান তিনি। সেই দৃষ্টিহীন ছেলেটিকে বাবা দীনেশ কর্মকার তুলে দেন বাউল গায়ক ইস্রাইল মিয়ার হাতে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে দোতরা, বেহালা, তবলা ও হারমোনিয়াম বাজাতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন সুনীল কর্মকার। তখন থেকেই পেশাদার শিল্পী হিসেবে গান গাইতে থাকেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকার প্রত্যন্ত গ্রাম ও হাটের আসরে। তাঁর হাতের পরশে যেন একলাই গেয়ে ওঠে একতারা, স্বরাজ, খমক, খুনজরি, ঢোল ও ঢাক।
সুনীল কর্মকার ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসঙ্গীত, বাউল গান এবং জালালগীতিকে নিয়ে গেছেন বিশ্বদরবারে। গান গেয়েছেন তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতে। দেশের ভেতরে খুব বড় পুরস্কার সম্ভবত তিনি পাননি। পাবেনও না বোধহয়। সুনীল কর্মকারের বড় পুরস্কার তাঁর ভক্ত ও শিষ্যরা। তিনি যে অস্তিত্ব নির্মাণ করেছেন নিজের, সেটি অনেক বেশি সম্প্রসারিত এবং সে কারণেই তিনি একটা লৌকিক অমরত্ব লাভ করেছেন।
ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ, লেখক ও সাংবাদিক

এই লেখায় আমরা ধাপে ধাপে জানব, কীভাবে আপনি সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে আপনার মূল্যবান রায় প্রদান করবেন।
২ ঘণ্টা আগে
গত পরশু সন্ধ্যায় শুনলাম বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকার অসুস্থ। বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় শুয়ে আছেন। এই কথা শোনার পর থেকে মনে হচ্ছিল আজকের এই সন্ধ্যাটাকে কেউ নীলপর্দা দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে।
৩ ঘণ্টা আগে
এই প্রথমবার কোনো ব্যান্ড একুশে পদক পেতে যাচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘ওয়ারফেজ’-কে ২০২৬ সালের একুশে পদকের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
১ দিন আগে
হাল আমলের বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলাপচারিতার ভাষায় ‘অন্তর্ভুক্তিমূলকতা’ (inclusiveness) একটা চেনা শব্দ। কিন্তু খুব কম সময়ই এই ভূখণ্ডের জনমানুষ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সাক্ষাৎ পেয়েছে।
১ দিন আগে