খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসনটি ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লীগের শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে পরিচিত। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার ভোটের মাঠে মূল লড়াই জমে উঠেছে এক সময়ের জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে।
ডুমুরিয়া ও ফুলতলা—এই দুই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনটি অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ফুলতলার শিল্পাঞ্চল, অন্যদিকে ডুমুরিয়ার বিশাল কৃষি ও সবজি ভাণ্ডার। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৮৬, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন ছাড়া এই আসনে বরাবরই আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য ছিল। তবে এবার বিএনপি ও জামায়াত পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় নির্বাচনী উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। অন্যদিকে বিএনপির হয়ে লড়ছেন বিসিবির সাবেক সভাপতি ও খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলী আসগর লবি।
বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন খেলাফত মজলিসের মো. কাইউম জমাদ্দার, সিপিবির চিত্তরঞ্জন গোলদার এবং জাতীয় পার্টির শামিম আরা পারভীন ইয়াসমীনসহ মোট ছয়জন প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৪ লাখ ২ হাজার ৭৯৮ জন ভোটারের এই আসনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৫০টি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে মিয়া গোলাম পরওয়ার আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। পরবর্তীতে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনেও এ আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ সময় পর এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে জামায়াতের পরওয়ার (ফুলতলার বাসিন্দা) এবং বিএনপির লবি (ডুমুরিয়ার বাসিন্দা) মুখোমুখি হওয়ায় লড়াই সমানে সমান হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এক সময় চরমপন্থীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে এখন পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন উদ্বেগ কাজ করছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোটার ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চাপের মুখে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ডুমুরিয়ার শাহপুর এলাকার এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভোট দিতে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করার জন্য প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ‘‘ফ্যাসিস্টের দোসর’’ তকমা দেওয়ার ভয়ও দেখানো হচ্ছে।’
এই আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটার সনাতন ধর্মাবলম্বী, যাদের নিরাপত্তা ও ভোটদানের অধিকার নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চাই, কিন্তু ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন কাম্য নয়। আমরা প্রার্থীদের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যাশা করছি।’
বর্তমানে ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে থাকায় জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘গত ১৫ বছরের ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। জনগণের জোয়ার দেখে প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হিন্দু ভোটারদের হুমকির বিষয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে।’
অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী আলী আসগর লবি ভোটারদের সাড়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি এই এলাকারই সন্তান। মানুষ এবার নির্বিঘ্নে ভোট দিতে চায়। প্রতিপক্ষ বিভিন্ন অপপ্রচার চালালেও সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন আমাদের সঙ্গে আছে।’
সব মিলিয়ে ডুমুরিয়া ও ফুলতলার শিল্প-কৃষিনির্ভর এই জনপদে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এক অভাবনীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার অপেক্ষা করছে সাধারণ মানুষ।