leadT1ad

পাঁচ তোপ দেগে জামায়াত জোট ছাড়লেন চরমোনাই পীর

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

দীর্ঘ আলোচনার পর গাঁটছড়া। তবে তা মধুচন্দ্রিমার আগেই শেষ। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান জানান, ইসলামী আন্দোলন ২৬৮ আসনে এককভাবে নির্বাচন করবে। বাকি আসনে নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রয়েছে– এমন প্রার্থীকে সমর্থন দেবে।

এ সময় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পেছনে যেসব কারণ তুলে ধরেন গাজী আতাউর, তার বেশির ভাগই জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে। ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র বলেন, লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে ইসলামী আন্দোলন। ইসলামের পক্ষের ‘বাক্সের’ হেফাজত করবে বলেও জানান তিনি।

ক্ষমতায় গেলে জামায়াতের শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করতে ‘না চাওয়া’, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের অভাবকে অনৈক্যের জন্য দায়ী করে গাজী আতাউর আরও বলেন, ইসলামের মৌলিক নীতির প্রশ্নে জামায়াতের অস্পষ্ট অবস্থান এবং রাজনৈতিক আস্থাহীনতার কারণে তাদের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় ইসলামী আন্দোলন থাকছে না।

লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা

গাজী আতাউর বলেন, ‘আমরা ইসলামের পক্ষে সমঝোতার নীতি নিয়েছিলাম। কিন্তু জামায়াতের প্রাধান্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তা আর ইসলামের পক্ষের থাকছে না। একইসঙ্গে এই ঐক্যের রাজনৈতিক লক্ষ্য পরিষ্কার না। সেজন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই সমঝোতার অংশ থাকছে না।’

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে ইসলামী আন্দোলন মনে করে– ইসলামের আলোকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতেই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের ‘এক বাক্স নীতি’ ঘোষণা করেন আমাদের আমির সৈয়দ রেজাউল করীম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো– আমরা দেখলাম ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইসলামপন্থী শক্তির এই ধারাকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

বিএনপিকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন

সংবাদ সম্মেলনের পরে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গাজী আতাউর বলেছেন, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করে জাতীয় সরকার ও প্রয়াত খালেদা জিয়ার তৈরি করা ঐক্যের পাটাতনের ওপরে কাজ করার কথা বলেছেন। তাঁর এই বক্তব্য আমাদের মধ্যে পাতানো নির্বাচনের শঙ্কা তৈরি করেছে। এমন বাস্তবতায় ইসলামী আন্দোলন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সঙ্গে থাকা সমীচীন মনে করেনি।

শরিয়া আইন না চাওয়া

গাজী আতাউর বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রক্ষমতা নয়, চাই শরিয়া আইনের বাস্তবায়ন। কিন্তু ১১ দলীয় সমঝোতার অংশীদ্বারেরা এটি বাস্তবায়ন করতে চায় না।’ জামায়াতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘জামায়াত ইসলামি রাজনীতি করেও শরিয়ার বাস্তবায়ন চায় না। তারা প্রচলিত আইনে রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে। যে প্রচলিত আইন আমাদের দিনের পর দিন বৈষম্যের মধ্য দিয়ে নিয়ে গেল, সেটি তো আমরা চাই না।’

আস্থা-বিশ্বাসের অভাব

গাজী আতাউর বলেন, ‘আগামী দিনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না– এমন আশঙ্কা আমাদের মধ্যে প্রবল। মূলত আমাদের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তারা পর্দার আড়ালে অন্য পরিকল্পনা করছে। আপনারা জানেন, যেকোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা ঐক্য হতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আস্থার প্রয়োজন। কিন্তু আস্থা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার স্থান নষ্ট হলে সেখানে ঐক্য টেকে না।’

আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতা

ঐক্য ভেঙে যাওয়ার পেছনে আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতা রয়েছে কিনা– সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে গাজী আতাউর বলেন, ‘আসন কমবেশি হতেই পারে। তবে এখানে আমাদের আত্মসম্মানবোধে লেগেছে।’ তিনি বলেন, ‘জামায়াত ও আমাদের আমির একসঙ্গে বসেছিলেন। প্রথম দিনই তিনি (জামায়াত আমির) অপমান করেছেন।’

কীভাবে অপমান করেছিলেন, তা উল্লেখ করে গাজী আতাউর বলেন, যেদিন তারা (দুই দলের আমি) বসেছিলেন, সেদিন একটি পত্রিকা জরিপে বলেছিল– বিএনপিকে চায় ৬৫ ও জামায়াতকে চায় ২৫ শতাংশ মানুষ। সেখানে ইসলামী আন্দোলনের ছিল শূন্য দশমিক এক শতাংশ। ওইদিন আলোচনার শুরুতেই জামায়াত আমির আমাদের আমিরকে বলে বসেন– ‘পত্রিকায় একটি জরিপ এসেছে, এটি দেইখেন’। তাঁর এই কথা বলার অর্থ কী? অর্থ হলো– অপমান করা যে আপনাদের তো কোনো পয়েন্টই নেই।

তিনি বলেন, ‘ওই বৈঠকের পরই আমাদের আমির বলেছিলেন– তাদের মতলব কিন্তু ভালো নয়। হয়তো তারা আমাদের সঙ্গে বে-ইনসাফি করবে।’

এদিকে, শুক্রবার বিবৃতিতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান সম্প্রতি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একটি সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতার বরাত দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে ব্রিফিংয়ের সময়ই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

‘আল্লাহর আইন ও ইসলামী আদর্শ থেকে জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন দিকে চলে গেছে’– গাজী আতাউরের এমন মন্তব্য সঠিক নয় দাবি করে জুবায়ের বলেন, ‘জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্যই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন। জামায়াত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) আদর্শের আলোকে পরিচালিত একটি ইসলামী সংগঠন।’

জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়– এমন বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য গাজী আতাউর রহমানের প্রতি আহ্বান জানান জামায়াতের এই নেতা।

গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৫৩ আসনে চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা দেয় ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’। সেই অনুষ্ঠানে ইসলামী আন্দোলন ছিল না। আসন সমঝোতায় জামায়াত ১৭৯, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০, খেলাফত মজলিস ১০, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩, নেজামে ইসলাম পার্টি ২ ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) দুটি আসন পেয়েছে। শরিক বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) আসন এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত