জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রাজশাহী বিভাগে উপেক্ষিত তৃণমূল, ১১ আসন হাতছাড়া বিএনপির

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী

স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১১টি জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হারিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিন আসনের সবগুলো ও পাবনাতে অর্ধেকের বেশি আসনে জিততে পারেননি বিএনপি প্রার্থীরা। এ ছাড়া বেশ কিছু আসনে বিএনপির শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও হেরেছেন প্রার্থীরা।

আসন হারানোর পর এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। নেতাকর্মীদের ভাষ্য, বিএনপির প্রার্থীরা ডুবেছেন ‘অহংকারের’ কারণে। বিভাগে সাংগঠনিকভাবেই শক্তিশালী দুটি আসন ছাড়া জামায়াতের জেতার কথা ছিল না। তবে বিএনপি প্রার্থীদের অতি আত্মবিশ্বাস ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দূরে ঠেলার কারণে হার দেখতে হয়েছে। এ ছাড়া একাধিক আসনে যোগ্যদের বাদ দিয়ে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা মাঠে সুবিধা করতে পারেননি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সব আসনে পরাজয়

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় জামায়াতের ভিত আগে থেকেই শক্ত। তবে এতটা নয় যে, সবগুলো আসনে জয় পাবে– বলছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী শাজাহান মিঞা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে হারুনুর রশীদ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে আমিনুল ইসলাম–তিনজনই আবার ছিলেন সংসদ সদস্য।

এমন প্রার্থীদের পরাজয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর নেতাকর্মীরা চেয়েছিলেন নতুন মুখ। কারণ, এই নেতারা তো আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন না। জনগণও তাদের গ্রহণ করেনি। তারা ভেবেছে, এদেরকে তো ১৭ বছর পাওয়া যায়নি। নির্বাচিত হলেও তাদের পাওয়া যাবে না।’

জেলা সদরে পরাজিত বিএনপির হেভিওয়েট নেতা হারুনুর রশীদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘তিনি হলেন পীর। নির্বাচনী যেসব সভা করেছেন তাতে নিজে প্রধান অতিথি আর স্ত্রী ও ছেলেকে করেন বিশেষ অতিথি। অহংকার করে অন্য নেতাকর্মীদের ডাকেননি। এ ছাড়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীদের নিয়ে চলেছেন। তাকে পীর মেনে অন্য দুই আসনের প্রার্থীরাও একই কাজ করেছেন।’

তার ভাষ্য, ‘এখানে বিএনপির ভোট বিএনপিরই আছে। কিন্তু প্রার্থীরা নিতে জানেননি বলে হেরেছেন।’

এ বিষয়ে বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদের মোবাইল ফোন নম্বরে কল করলে তিনি বলেন, ‘লোকজনের মধ্যে আছি ভাই। পরে এগুলো কথা হবে।’ এরপর আর যোগাযোগ করা যায়নি।

অহমিকা, বিদ্রোহী ও অযোগ্যতায় ডুবেছেন প্রার্থীরা

রাজশাহী জেলার কোনো আসনে আগে জয় পাননি জামায়াত নেতারা। তবে এবার রাজশাহী-১ ও ২ আসনে জয়ী হয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। নেতাকর্মীরা বলছেন, অনেক প্রার্থী অহংকারের কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাত্তা দেননি। তাদের দূরে রেখে নির্বাচন করায় হেরেছেন।

রাজশাহী-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন। স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কার্যত এড়িয়ে গেছেন। তার নির্বাচনী প্রচারে এক ছেলে ছাড়া পরিবারের পরিচিত মুখদেরও কেউ ছিলেন না। এমনকি তার ভাই তিনবারের এমপি প্রয়াত ব্যারিস্টার আমিনুল হকের স্ত্রী আভা হককেও দেখা যায়নি। এ ছাড়া আসনটিতে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ভোটের মাঠে ঠিকমতো নামেননি। শরীফও এ নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেননি। সব মিলিয়ে হেরেছেন।

রাজশাহী-৪ আসনের প্রার্থী ডিএমডি জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ অবশ্য ভিন্ন। নেতাকর্মীরা জানান, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে একাধিকবার বিতর্কিত কাজ করে সমালোচিত হয়েছেন জিয়াউর। অথচ তাকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। বিষয়টি নেতাকর্মীরা মানতেই পারেননি। এমনকি তিনি মনোনয়ন পাওয়ার পর খুশিতে মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা। তাই তার হার অনুমেয় ছিল।

স্থানীয় একজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকবেই। কিন্তু জিয়াউর মনোনয়ন পাওয়ার পর অন্য কাউকে ডাকেননি। কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে কাছে গেলে বলতেন, তাকে ফেল করানোর জন্য এসেছে। ফলে প্রচার স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। এতে সাধারণ মানুষের ভোট টানতে পারেনি ধানের শীষ।’

এ ছাড়া জিয়াউর হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের ভোটের দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন বলেও জানান তিনি।

জয়পুরহাট-১ আসনে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ রানা প্রধান জামায়াত প্রার্থীর কাছে হেরেছেন ৯ হাজার ৮৮৩ ভোটে। এখানে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী সাবেকুন নাহার পেয়েছেন ১৩ হাজার ২৮৬ ভোট। নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপির অনেকেই সাবেকুন নাহারকে ভোট দিয়েছেন। এই ভোট না গেলে বিএনপি প্রার্থী জিততেন।

সাবেকুন নাহারকে ভোট দেওয়ার কারণ হিসেবে স্থানীয় বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘যাকে প্রার্থী করা হয়েছে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ছোট। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের কার্যক্রমে মানুষের ক্ষোভও ছিল। এ ছাড়া মনোনয়নবঞ্চিত দু’জন নেতা ধানের শীষের জন্য কাজ করেননি। মাসুদও তাদের সেভাবে ডাকেননি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।’

পাবনা-৩ ও ৪ আসনেও বিএনপিকে ডুবিয়েছে মূলত দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা। পাবনা-১ এ শুরুতে ভালো অবস্থান ছিল ধানের শীষের প্রার্থী হাসান জাফির তুহিনের। তবে শেষপর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকায় জয় হাতছাড়া হয়েছে। পাবনা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবকেও ডুবিয়েছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। দুটি আসনেই ‘বিদ্রোহী’ সুবিধা তুলেছে জামায়াতের প্রার্থীরা।

এ ছাড়া নওগাঁ-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী সামসুজ্জোহা খান শুরুতে ভালো অবস্থানে ছিলেন। তবে ভোটের দিন যত এগিয়েছে ততই পিছিয়ে পড়েছেন তিনি। ভোটের ফলেও সেই প্রভাবই পড়েছে।

এর বাইরে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও পাবনা-১ আসনে জামায়াতের সাবেক আমির প্রয়াত মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাজিবুর রহমান শুরু থেকেই ভোটের মাঠে এগিয়ে ছিলেন। আসন দুটিতে জামায়াতের অবস্থান শক্তিশালীও। এতে বিএনপির দুই প্রার্থী পাবনায় শামসুর রহমান ও সিরাজগঞ্জে এম আকবর আলী পেরে ওঠেননি।

দলের প্রার্থীদের ভেতর অহংকারী মনোভাব ছিল কিনা জানতে চাইলে বিএনপির রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত বলেন, ‘সেগুলোর বিষয় অধিকতর তদন্ত করে দেখব। তারপর যা পাব হাইকমান্ডকে জানাব। ভবিষ্যতে যাতে এই ভুল আর না হয়।’

প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল ছিল কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘মনোনয়নের ক্ষেত্রে আমি ভুল ধরতে পারব না। তবে চয়েসের ক্ষেত্রে কিছু কিছু সময় ভুল হয়ে যায়।’

তবে বিভাগের সামগ্রিক ফলাফলে বিএনপি খুশি বলে জানান শাহীন শওকত। তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে আমরা খুশি। আমাদের চেয়ারম্যান চেয়েছেন শক্তিশালী বিরোধী দল থাকুক এবং গঠনমূলক সমালোচনা করুক। জনগণ পছন্দের ব্যক্তিকে ভোট দিয়েছে। অন্যদের কোনো কোনো গুণাবলি হয়ত আকর্ষণ করেছে। সে কারণেই তারা নির্বাচিত হতে পেরেছেন।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত