leadT1ad

খালেদা জিয়ার সঙ্গে ১৬ বছর: কেমন ছিল ফাতেমার সন্তানদের জীবন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ভোলা

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৫৯
ভোলা সদরের কাচিয়া ইউনিয়নে ফাতেমার বাড়ি

কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ হোক কিংবা হাসপাতালের নিঃসঙ্গ রাত—একজন মানুষ প্রায় সব সময় নীরবে পাশে ছিলেন। কোনো মঞ্চে তাঁকে দেখা যায়নি, কোনো বক্তব্যেও তাঁর নাম শোনা যায়নি। অথচ সদ্য প্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে যিনি ছায়ার মতো সঙ্গ দিয়েছেন, তিনি ফাতেমা বেগম।

ফাতেমা কোনো রাজনৈতিক কর্মী নন। নেই কোনো দলীয় পরিচয় বা পদ। তবু গৃহবন্দিত্ব, কারাবাস, অসুস্থতা, বিদেশ সফর—সব পর্বেই তাঁর উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য। দায়িত্ব আর মানবিকতার সম্পর্কের এক নীরব নাম তিনি। সেই নীরবতাই আজ তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।

৩৫ বছর বয়সী ফাতেমা বেগম এখন শোকাহত। যাঁকে তিনি অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছিলেন, সেই খালেদা জিয়াকে চিরতরে হারিয়েছেন। এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর পাশেই ছিলেন ফাতেমা। নিজের পরিবার থেকে দূরে থেকেও বছরের পর বছর তিনি ছিলেন আরেক পরিবারের ছায়াসঙ্গী। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়টায় ফাতেমার নিজের সংসার, নিজের সন্তানদের জীবন কেটেছে কীভাবে—সেই গল্পটা রয়ে গেছে আড়ালে।

ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের শাহ-মাদার গ্রামে ফাতেমা বেগমের পৈতৃক বাড়ি। সেখানেই কথা হয় তাঁর সেজো বোন মমতাজ বেগমের (৩০) সঙ্গে। ময়মনসিংহের শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রায় এক সপ্তাহ আগে বাবার বাড়িতে এসেছেন তিনি।

মমতাজ বলেন, ‘চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে ফাতেমা সবার বড়। বাকি দুই বোন জোহরা বেগম ও নুরজাহান বেগমের বিয়ে হয়েছে। একমাত্র ভাই রুবেল ভোলা সদর উপজেলার পরানগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে।’

ফাতেমা বেগমের দুই সন্তান—মেয়ে জাকিয়া আক্তার (রিয়া) এবং ছেলে রিফাত। রিয়া ভোলার নিজ এলাকার স্কুল থেকে এইচএসসি পাস করে এখন ঢাকায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে সে। ছেলে রিফাত (১৭) স্থানীয় টবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে উঠেছে।

দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচসহ পরিবারের যাবতীয় ব্যয়ভার একাই বহন করছেন ফাতেমা বেগম, জানান মমতাজ।

এই দায়িত্ববোধের পেছনে আছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। এক সময় পরিবারটি ছিল চরম অভাবে। বাবা রফিজল ইসলাম (৭৫) ঢাকার ঘুইয়া পাড়া রেলগেটে একটি ছোট মুদির দোকান চালাতেন। সেই আয়ে চলত সংসার। ভোলার কাচিয়া ইউনিয়নের মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকার দরিদ্র মাছ ব্যবসায়ী মো. হারুন লাহাড়ির সঙ্গে বিয়ে হয় ফাতেমার। হারুন কখনো মাছ বিক্রি করে, কখনো চরে কৃষিকাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাতেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পাশে ফাতেমা বেগম। সংগৃহীত ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পাশে ফাতেমা বেগম। সংগৃহীত ছবি

প্রায় ১৭ বছর আগে মেঘনার ভাঙ্গনে তাঁদের বসতবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান হারুন লাহাড়ি। মুহূর্তে বদলে যায় ফাতেমার জীবনের মানচিত্র। স্বামীহারা দুই সন্তান আর ভিটেমাটি হারানোর শোক নিয়ে শুরু হয় নতুন লড়াই।

জীবনের তাগিদেই কাজের সন্ধানে ঢাকায় যান ফাতেমা। এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মাধ্যমে তিনি সুযোগ পান বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনে কাজ করার। সেই শুরু। এরপর কেটে গেছে দেড় দশকের বেশি সময়।

২০১০ সাল থেকে তিনি ছিলেন খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। বাসভবন, কার্যালয়, রাজপথ, হাসপাতাল, বিদেশ সফর, এমনকি কারাগার—সবখানেই ছিলেন তাঁর পাশে। গৃহকর্মী থেকে হয়ে ওঠেন ব্যক্তিগত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এখন ফাতেমা বেগমকে দেখা যাচ্ছে জাইমা রহমানের সঙ্গে। আগে যেভাবে দৈনন্দিন কাজে খালেদা জিয়াকে সঙ্গ দিতেন, একইভাবে এখন সঙ্গ দিচ্ছেন জাইমা রহমানকেও।

এই দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফাতেমার পরিবারও ছিল নানা অস্বস্তির মধ্যে। তাঁর ভাসুরের ছেলে আবুল খায়ের জানান, গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মানসিকভাবে চাপে ছিলেন ফাতেমার বাবা-মা ও সন্তানরা।

তিনি বলেন, গত প্রায় ১০ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ফাতেমা বেগমের বাড়ির সামনের রাস্তাটি পাকাকরণের কথা ছিল। কিন্তু ওই সময়ে সেই রাস্তাটি ফাতেমার বাড়ির সামনের অংশ বাদ রেখেই করা হয়েছে। ফাতেমার বাড়ির সামনের রাস্তাটি এখনো সংস্কার করা হয়নি।

এ ছাড়া প্রায় ১৫ বছর আগে ঢাকায় বর্তমান নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ফাতেমার বাবা রফিজল ইসলামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর তিনি ভোলায় ফিরে আসেন। তখন থেকে তিনি বেকার জীবনযাপন করছেন।

ফাতেমার বাবা-মা দুজনই বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। ঢাকায় থাকছেন তাঁর মেয়ে জাকিয়া আক্তার রিয়াও। তিনি আজ শনিবার (৩ ডিসেম্বর) সকালে মোবাইল ফোনে স্ট্রিমকে জানান, মায়ের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ হয়। তিনি মাঝে মাঝে খালেদা জিয়ার বাসাতেও যান।

রাজনীতির আলো-আঁধারির বাইরে ফাতেমা বেগমের জীবন তাই এক নিঃশব্দ আত্মত্যাগের গল্প। ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম বড় করে লেখা নাও থাকতে পারে। কিন্তু দায়িত্ব, মানবিকতা আর নিরব ভালোবাসার যে ছাপ তিনি রেখে গেছেন, তা অদৃশ্য হয়েও গভীর।

Ad 300x250

সম্পর্কিত