জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিএনপি নেতাদের ভাষ্য

‘রিফাইন্ড’ হলেই কেবল আ. লীগ ছাড় পাবে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২: ৫৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

নির্বাচনের পর তৎপরতা বাড়িয়েছে কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞায় থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কার্যক্রম বাড়লেও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনে আগে সরকারে থাকা দল বিএনপির কাছ থেকে ছাড় পাবে না। তবে অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয় আওয়ামী লীগের এমন নেতাকর্মীরা সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পেতে পারেন। স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপকালে এমনটাই বলছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।

এদিকে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হতে শুরু করেন। ফলে বিগত ১৭ বছরের শাসনামল এবং ছাত্র-জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে, সব বাধা কাটিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনা চলছে। বিশেষ করে, সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় দলটির নেতাকর্মীদের তৎপরতা এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার ইস্যুতে কৌশলগত কারণে নিজ নামে কোনো মন্তব্য রাজি নন। তাঁদের বক্তব্যে আওয়ামী লীগ ইস্যুতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। তবে বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—এখনই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই।

বিএনপি নেতাদের মতে, জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হলে এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্ব কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন না এলে দলটির পক্ষে রাজনীতিতে ফিরে আসা সহজ হবে না।

কৌশলগত কারণে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়ে দলের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করছে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য ও মন্ত্রী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নেতা জানান, আওয়ামী লীগ ইস্যুতে এখন পর্যন্ত দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলের কিছু নেতা ভোটের স্বার্থে হয়ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের বোঝাপড়া করে থাকতে পারেন। তবে, সেটিকে দলীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা যাবে না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু-মিত্র না থাকলেও শেখ হাসিনা শাসনামলের ‘ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা’ ভোলার মতো নয়। বিশেষ করে খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং নানাভাবে চরিত্র হননের চেষ্টা করেছে শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে তাঁকে পরিত্যক্ত কারাগারে রাখা এবং বিদেশে চিকিৎসা নিতে না দেওয়ার বিষয়টি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ভেতরে এখনো গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। এ ছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা খুব দ্রুত তুলে দেওয়া সম্ভব না।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলা স্ট্রিমকে বলেন, ‘নির্বাচন-পরবর্তী কোথায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা হয়েছে, সেটি আমার জানা নেই। আর তাদের রাজনীতিতে ফেরা কিংবা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

অবশ্য দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এখনো উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন রয়েছে বলে মনে করেন বিএনপির নেতারা। তাঁরা বলছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থক গোষ্ঠীর বিশাল একটা অংশ রয়েছে, যারা সরাসরি অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়। মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে তাঁরা দলটিকে পছন্দ করে। ফলে, ভোটের রাজনীতির কথা মাথায় রাখলে, আগামীতে আওয়ামী লীগ সীমিত পরিসরে সুযোগ পেতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব বলেন, ‘জুলাই গণহত্যার দায় এড়িয়ে আওয়ামী লীগের ফেরা সম্ভব নয়। তাদের রাজনীতিতে ফিরতে কিংবা ফেরাতে হলে আগে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের বা জাহাঙ্গীর কবির নানকের মতো বিতর্কিত নেতাদের নেতৃত্বে রেখে আওয়ামী লীগের ফেরা অসম্ভব। কারণ, এটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত, জুলাই গণহত্যার সঙ্গে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে সরাসরি জড়িত ছিল। তাঁদের হুকুমে এই হত্যাযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছিল। তাই, আমি মনে করি খুন, গুম ও দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় এমন নতুন নেতৃত্ব আসলে আওয়ামী লীগের ফেরার পথ কিছুটা সহজ হতে পারে।’

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বিএনপির সরকার খুব কঠোর না হলেও জাতীয় নির্বাচনের মতো আগামী কয়েক বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে না বলে মনে করেন বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের একটি সূত্র।

সূত্রটির মতে, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। এ সময়ের মধ্যে জুলাই হত্যাকাণ্ডের চলমান বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে বলে মনে করেন না তাঁরা। ফলে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও আওয়ামী লীগ পরিচয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জায়গায় অফিস খোলা নিয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চাইলে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) এক অনুষ্ঠানে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই যে, বিএনপি একটি উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল, সবাইকে নিয়ে আমরা রাজনীতি করি, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। এটা আমাদের নেতা তারেক রহমান বারবার বলেছেন। ’

মঈন খান আরও বলেন, ‘আমরা ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার যে বিপ্লব হয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় আমরা বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি। এই গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আমরা রক্ষা করব।’

এর একদিন আগে আওয়ামী লীগের অফিস খোলা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এটা আমরা চাইনি। যেহেতু আইনগতভাবে বলা আছে যে তাদের (আওয়ামী লীগের) কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেইভাবে এটাকে দেখা হবে, সব জায়গায়।’

দেশের বর্তমান অবস্থায় আওয়ামী লীগ ইস্যুতে মন্তব্য করলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাই নাম না প্রকাশ করার শর্তে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে নির্বাহী আদেশে। সন্ত্রাস দমন আইন-২০০৯ অনুসারে। এটা আমরাও আগে কখন সমর্থন করিনি। যখন আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছিল, তখন আমরা এর বিরোধিতা করেছি। এখানে যদি আদালত বলতেন, যতদিন পর্যন্ত তাদের বিচার না শেষ হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত তাদের কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে—তখন একটা কথা থাকত।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাহী আদেশে যে কাজটি হয়েছে, এটাকে নীতিগতভাবে সমর্থন করা যায় না। কারণ, আওয়ামী লীগ তো এটা আইনিভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি। এভাবে কোনো দলের কার্যক্রম বন্ধ করে রাখাটাকে আমরা যৌক্তিক মনে করি না।’

বিএনপি চাইলে যে কোনো মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপরে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে পারে বলে মন্তব্য করেন এই বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘এটা তো সরকারের সিদ্ধান্ত। এক সরকারের সিদ্ধান্ত চাইলে আরেক সরকার বাতিল করে দিতে পারে।’

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৩ মে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ এর ধারা-১৮(১) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

নির্বাচনের পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কার্যালয় খুলতে রাজনৈতিকভাবে কোনা বাধা না পেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি এসেছে। সদ্য বিদায়ী পুলিশের আইজি বাহারুল আলম গত রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) এক সভায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে না। কেউ বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।’

সম্পর্কিত