জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ভোট উৎসবের প্রতীক্ষায় দেশ, যা জানা জরুরি

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫: ৪৪
রাজধানীর রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি। ছবি: নেত্র নিউজের ফেসবুক পেজ থেকে

সব অনিশ্চয়তা, আশঙ্কা এখন পেছনে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) শুধুই উৎসবের। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর আজ নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভোট দেবেন দেশের মানুষ। একইসঙ্গে তারা গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দিয়ে মত জানাবেন।

বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার হরণের কলঙ্ক মুছে ফেলে গণতন্ত্রের নতুন পথযাত্রার এই নির্বাচন উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ করতে সব প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলবে বেলা সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।

সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় মাঠে রয়েছেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে আজ ভোট হবে ২৯৯টি আসনে। একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া ৫০টি রাজনৈতিক দল। অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে রয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি ইত্যাদি। বহু বছর পর শঙ্কামুক্ত ভোটদানের প্রত্যাশা নিয়ে গ্রামেগঞ্জে গেছেন লাখো তরুণ, যুবক ও প্রবীণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে ‘একতরফা’, ২০১৮ সালে ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামির নির্বাচন’ দেশের নির্বাচনব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভোটারদের একটি বড় অংশের অভিযোগ ছিল, তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলে তা হবে যেমন গণতন্ত্র উত্তরণের প্রথম ধাপ, তেমনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে তা হবে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের সূচনা।

গত ১১ ডিসেম্বের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী দুয়ারে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। এবারের নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৫ ভোটারের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটদানের সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের সঙ্গে এই ব্যবস্থাপনায় ভোট দিতে পারছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বন্দিরা।

শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে এবার ২৯৯টি আসনে দল, স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২ হাজার ২৮ প্রার্থী ভোটযুদ্ধে নেমেছেন। পুরো নির্বাচনে হাজারখানেক ড্রোন উড়িয়ে নজরদারি করছে ইসি।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ঢাকা স্ট্রিমকে বলেন, খুব সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশে ভোট হবে। টুকটাক কিছু হয়তো হতে পারে। কিন্তু বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেব না বলে আশাবাদী। আমি বিশ্বাস করি, ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়বে।

‘হ্যাঁ’ জিতলে আসবে পরিবর্তন

গণভোটে সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত যেসব প্রস্তাব থাকছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা। সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে সরকারি দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। কোনো বিষয়ে সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে। অবশ্য সংস্কার প্রস্তাবের কিছু কিছু বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে সংবিধানে পরিবর্তনগুলো নিশ্চিত করবে।

২ হাজার ২৮ প্রার্থী, নারী মাত্র ৮৩

নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৫০টি রাজনৈতিক দলের ১ হাজার ৭৫৫ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। বিভিন্ন দলের ৬৩ জনসহ নারী প্রার্থী আছেন ৮৩ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে আবার ২০ নারী লড়াইয়ে রয়েছেন।

৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোটদানের সুযোগ পাবেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। তাদের মধ্যে ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ পুরুষ, ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ১ হাজার ২৩২। ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে বাড়তি নিরাপত্তা দিচ্ছে ইসি। ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

ভোটগ্রহণের জন্য ৬৯ রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ৫৯৮ সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে ইসি। এছাড়া ৪২ হাজার ৭৭৯ প্রিসাইডিং অফিসার, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ পোলিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৮৩৮ ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এ জন্য ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪জন নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬; দেশের ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন।

গণনা ও ফল প্রকাশ কেন্দ্রেই

গণভোটের কারণে ১ ঘণ্টা বাড়ানোয় এবার ভোট শেষ হওয়ার কথা বিকেল সাড়ে ৪টায়। অবশ্য কেন্দ্রের ভেতর থাকলে এরপরও ভোট নেওয়া যাবে। এর পরপরই শুরু হবে ভোট গণনা। এ সময় প্রার্থী, পোলিং এজেন্ট, পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীরা থাকতে পারবেন।

গণনা শেষে বিবরণী কেন্দ্রের নোটিশ বোর্ড বা দেয়ালে টানিয়ে দেওয়া হবে। পরে প্রিসাইডিং অফিসার কেন্দ্রের ভোট গণনার বিবরণী নির্ধারিত ফরমে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করবেন। ডাকযোগে নির্বাচন কমিশনের কাছেও একটি কপি পাঠানো হবে।

ফল প্রকাশে দেরি নিয়ে শঙ্কা

এবারের নির্বাচনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের ব্যালটও গণনা করা লাগবে। তাই সময় বেশি লাগবে। বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই আশঙ্কার কথা জানিয়ে আসছেন রাজনৈতিক দলগুলো। কেউ কেউ মনে করছেন, বেশি দেরি নির্বাচনী সহিংসতা বাড়িয়ে দিতে পারে। ছড়াতে পারে বিভিন্ন গুজব।

১৯৭৭ সালে প্রথম গণভোটের ফল ঘোষণায় সময় লেগেছিল ৩০ ঘণ্টা। সেবার ভোটার ছিল ৩ কোটি ৮৪ লাখ। এবার ভোটার বেড়ে হয়েছে ১৩ কোটি। এই কারণে এবার কত সময় লাগবে তা স্পষ্ট করতে পারেনি ইসি।

অবশ্য মঙ্গলবার ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ফল প্রকাশ কোনো অবস্থাতেই ‘অযথা দীর্ঘায়িত’ করা হবে না। ভোটগ্রহণ শেষে ধাপে ধাপে ফলাফল প্রকাশ করা হবে এবং ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া যাবে।

বিদেশি পর্যবেক্ষক-সাংবাদিক এসেছেন ৫৪০ জন

ভোট পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ কাভারেজে ৫৪০ বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে এসেছেন। তাদের মধ্যে ইসির আমন্ত্রণে এসেছেন ৬০ জন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে এসেছেন ৩৩০ এবং ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছেন ১৫০ সাংবাদিক।

ভোট এলাকায় ৪ দিন বহিরাগত নিষিদ্ধ

ভোটের দিন যে কোনো ব্যক্তির নিজ এলাকার বাইরে ৮১ ঘণ্টার জন্য বা ৪ দিন অবস্থান নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সব জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও পুলিশ কমিশনারদের নির্দেশনা পাঠিয়েছে ইসি। গত ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা থেকে আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান করতে পারবে না। নির্বাচনি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, নির্বাচন কমিশনের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার বাসিন্দা বা ভোটার ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে ভোটগ্রহণ সমাপ্তির ২৪ ঘণ্টা পর পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবে না।

২ ঘণ্টা অন্তর তথ্য জানানোর নির্দেশ

নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে প্রতি ২ ঘণ্টা পরপর ভোটের হার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে ইসি। ইসির পরিপত্র অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু করে বেসরকারি ফল না পাওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। রিটার্নিং অফিসারদের কাছ থেকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ভোটগ্রহণ চলাকালে নির্বাচনী পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রতি ২ ঘণ্টা অন্তর অন্তর ভোট দেওয়ার হার, ভোটগ্রহণ শেষে প্রিসাইডিং অফিসার থেকে প্রাপ্ত ভোট গণনার বিবরণী পাঠাতে হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত