leadT1ad

কৃষকের সমস্যার সমাধান চায় বিএনপি, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৪৭
এআই দিয়ে বানানো ছবি

নির্বাচিত হলে দেশের মাঝারি, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে সার-বীজ ও কীটনাশক পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ডের দেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ব্যাংক কার্ডের আদলে মাইক্রোচিপ যুক্ত এই কার্ডের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে কৃষকদের জমি, ফসল, ঋণসহ নানা তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। এই সংরক্ষিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে দলটি।

বিএনপির পরিকল্পনা অনুযায়ী কৃষক কার্ডে ১০ ধরনের সুবিধা যুক্ত করতে চায় বিএনপি। জমির পরিমাণ অনুযায়ী কৃষকদের সার, বীজ ও কীটনাশকের জোগান নিশ্চিত হবে এই কার্ডের মাধ্যমে। কোন কৃষকের কতটুকু জমি রয়েছে, কোন কৃষকের কতটুকু সার দরকার, বীজ দরকার, কীটনাশক দরকার, সেটা কার্ডের ডাটাবেজের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। কোনো কৃষক কী ধরনের ফসল উৎপাদন করেন, সেটাও ওই কৃষক কার্ডে বলা থাকবে।

এ ছাড়াও আবাহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে কৃষকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করাসহ কৃষি ঋণের তথ্য সংরক্ষণ ও কৃষিসংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় সব সেবা নিশ্চিত করতে এই কৃষক কার্ডের প্রচলন করতে চায় বিএনপি। নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলে দেড় কোটি কৃষককে এ সুবিধার আওতায় আনতে চায় দলটি।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে তাঁর নির্বাসন জীবনের শেষ বক্তৃতায় কৃষক কার্ডের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশে যত কৃষি জমি যা আছে, সবএকটা সার্ভারের ভেতরে আমরা নিয়ে আসব। হয়তো যার দুটো ফসল হচ্ছে, তাঁকে আমরা যেকোন একটা ফসলের ফুল সাপোর্টটা দেওয়ার চেষ্টা করব। তার প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও কীটনাশকের পুরা সাপোর্টটা তাঁকে আমরা দেব।’

তারেক রহমান আরও বলেন, ‘আমাদের রিসার্চ বলছে, পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে যদি আমরা এই সাপোর্টটা মোটামুটিভাবে চলমান রাখতে পারি তাহলে কৃষকদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড শক্তিশালী হবে। আজকের যে ক্ষুদ্র কৃষক, হয়তো সে মাঝারি কৃষক হবে। যে প্রান্তিক কৃষক, সে ক্ষুদ্র কৃষক হবে। যদি না-ও হয়, অন্তত তাঁর অবস্থার পরিবর্তন হবে। তার উৎপাদন বাড়বে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটির কাছাকাছি। এই জনসংখ্যাকে যদি খাদ্যের জোগান দিতে হয় আমাদেরকে অবশ্যই কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে।’

জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ কৃষির সাথে জড়িত। কেউ সরাসরি চাষাবাদের সাথে জড়িত, কেউ বর্গা চাষি, কেউ জমি লিজ দেয়, কেউ মাঠে কাজ করে। এই ৬০ ভাগ মানুষের যদি ভাগ্য পরিবর্তন না হয়, তাঁদের অর্থনৈতিক উন্নতি না হয়, তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হবে না। বিএনপি ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরেছে, কৃষকের উন্নতির সাথেই বাংলাদেশের উন্নতি নির্ভর করছে।’

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে এই পরিকল্পনা কৃষকের প্রয়োজনীয়তা মেটাবে উল্লেখ করে তুহিন বলেন, ‘বাংলাদেশের একটি বড় অংকের টাকা সরকার ভর্তুকি দেয় কৃষকদের জন্য। এটা বিভিন্ন ভর্তুকির টাকার অপব্যবহার হচ্ছে, দুর্নীতি লুটপাট হচ্ছে, এ জন্য এই ভর্তুকির টাকা খুব একটা কাজে লাগছে না। কৃষক কার্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে কৃষকের ভর্তুকির টাকা তাদের কার্ডে চলে আসবে, যখন-তখন এই কার্ডের টাকা কৃষক খরচ করতে পারবেন। কৃষক কার্ডে জমির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে কে কতটুকু ব্যাংক ঋণ পাবেন, এটাও নির্ধারিত থাকবে।’

পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক হেমায়েত জাহান স্ট্রিমকে বলেন, ‘এটা তো আসলে বলার অপেক্ষা রাখে না এটা খুবই ভালো একটি উদ্যোগ। এটা সমন্বিত এবং আধুনিক কৃষি সেবাব্যবস্থায় ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটা বাস্তবায়ন হলে সে ক্ষেত্রে একটা ডাটাবেস হয়ে যাবে এবং তাদেরকে যে প্রয়োজন অনুসারে যেমন আমরা কৃষকদেরকে শনাক্ত করতে পারব এবং তাঁদের সার, বীজ বা কীটনাশকের যে ভর্তুকি বা সহায়তা সঠিকভাবে তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারবে এবং যেটা আমাদের এই কৃষিনির্ভর দেশের অর্থনীতিটাকে আরও চাঙ্গা করবে নিঃসন্দেহে।’

অধ্যাপক হেমায়েত জাহান আরও বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো দিক হলো, আমাদের একটা খুব শক্তিশালী ডাটাবেস ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা চালু হবে। যেখানে কৃষকের জমির পরিমাণটাও উল্লেখ থাকবে। কোনো ধরনের ফসল তাঁরা উৎপাদন করে সেই ধরনের ফসলের নামটা উল্লেখ থাকবে। উৎপাদনের ইতিহাস যদি ওখানে আমরা তুলে ধরতে পারি, সে ক্ষেত্রে পরিকল্পনা করা সহজ হবে এবং যে কোনো উৎপাদন সংকট অথবা এ রকমের কোনো ম্যানেজমেন্ট খুব সহজ হবে।’

বিএনপির কৃষক কার্ডের পরিকল্পনাকে সময়োপযোগী হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আইডিয়াটা ভালো। এটা করা যায়। কীভাবে করবে? ইমপ্লিমেন্টেশনটা তাদের কার্ডটা যখন করবে, আপডেটেড থাকবে কিনা, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে লিঙ্ক করা থাকবে কিনা—এই কিছু বিষয় ভেবে নিলে সমস্যা হওয়ার কথা না।’

তবে পরিকল্পনা ভালো হলেও বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক হেমায়েত জাহান বলেন, ‘যদি আমাদের যে একটা প্রিভিয়াস যে রেকর্ড আছে, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম—এগুলো যদি বহাল থাকে, সে ক্ষেত্রে এটা আগেকার অন্যান্য প্রজেক্টের মতোই ফেল করবে।’

এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের কাজ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার বা চেয়ারম্যান—তাদেরকে দিয়েই করতে হয়। তারা যদি সততার সাথে কাজ না করে, তখন এই সমস্যাটা হতে পারে। ’

আগের সরকারের উদাহরণ টেনে অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি বাড়ি একটি খামার নামে একটি প্রকল্প ছিল। সেই উদ্দেশ্য ভালো ছিল। ইমপ্লিমেন্টেশন পর্যায়ে গিয়ে আমরা শুনি যে অনেক উল্টাপাল্টা ছিল আসলে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত