মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার মহাজনপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এক তরুণ প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা। তবে ক্লাসরুম কিংবা ল্যাবের গণ্ডির চেয়ে রাজপথের লড়াকু পরিচিতিই তাঁকে বেশি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ২০১৫ সালের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা সেই সোহেল রানা এবার নেমেছেন সংসদ নির্বাচনের ময়দানে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুর-১ (সদর-মুজিবনগর) আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মেহেরপুর-১ আসনটি স্বাধীনতার সূতিকাগার মুজিবনগরকে ধারণ করে। ঐতিহাসিকভাবেই এখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলগুলোর আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। এই প্রথাগত রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরে নতুন দল এনসিপির একজন তরুণ প্রার্থীর উপস্থিতি কেবল একটি লড়াই নয়, বরং এক নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোহেল রানার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু কোনো ছাত্রসংগঠন থেকে নয়, বরং রাজপথের দাবি আদায়ের মধ্য দিয়ে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার অভিজ্ঞতা এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের ভূমিকা তাঁকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তিনি এখন সরাসরি জাতীয় রাজনীতির অংশীদার।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মেহেরপুর-১ আসনের গ্রাম ও বাজারগুলোতে বড় দলগুলোর ব্যানার-পোস্টারের ছড়াছড়ি থাকলেও শিক্ষিত ও তরুণ ভোটারদের আড্ডায় সোহেল রানার নাম বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। একজন তরুণ ভোটার বলেন, ‘তিনি শিক্ষিত এবং আন্দোলনের ইতিহাস আছে। নতুন কিছু করতে চান—এটা ভালো লাগে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটটা কোথায় যাবে, সেটাই প্রশ্ন।’
অন্যদিকে, গ্রামীণ প্রবীণ ভোটারদের কণ্ঠে বাস্তবতার সুর। তাদের একজন বলেন, ‘ভালো মানুষ হলেই এমপি হওয়া যায় না। দল লাগে, শক্তি লাগে।’ স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, এই নির্বাচন সোহেল রানার জন্য জেতা-হারার চেয়ে বিকল্প রাজনীতির একটি শক্তিশালী বার্তা প্রচারের বড় সুযোগ।
স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক রুহুল কুদ্দুস টিটোর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোহেল রানার ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেটিকে জনমতে রূপান্তর করাই তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এনসিপির জেলা সমন্বয় কমিটির সদস্য মো. হাসনাত জামান সৈকত বলেন, ‘এটি আমাদের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। আমরা জানি লড়াইটা সহজ নয়। তবে মানুষ পরিবর্তনের কথা বলছে, সেটাই আমাদের বড় শক্তি।’
বিশ্লেষকদের মতে, মেহেরপুর-১ আসনে সোহেল রানার এই অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের একটি রাজনৈতিক বিনিয়োগ। জয়-পরাজয় যাই হোক, বড় দলের বাইরে বিকল্প রাজনীতির সম্ভাবনা নিয়ে তিনি যে প্রশ্নটি সামনে এনেছেন, তা এই নির্বাচনের পরও আলোচনায় থাকবে। রাজপথের আন্দোলন থেকে সংসদের যাত্রা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।