রায়হান রাহিম

সম্প্রতি নেটস্ফিয়ার থিকা পলিটিক্যাল স্ফিয়ার–মোটামুটি সব জায়গাতেই একটা শব্দ প্রচুর শোনা যাইতেছে। সেই শব্দটা হইতেছে ‘গুপ্ত’।
গুপ্ত একটা কমন বাংলা শব্দ। কিন্তু বর্তমানে এইটা ভাইরাল হবার কন্টেক্সট অনেক ইন্টারেস্টিং! আওয়ামী আমলে লীগের ছায়াতলে লীগ সাইজা থাকা শিবির কর্মীদের ব্যান্টারিং করতে মূলত ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এই ‘গুপ্ত’ শব্দটা এন্ডোর্স করছে। লাস্ট জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমান তার এক নির্বাচনী জনসভার বক্তৃতায় গুপ্ত শব্দটা ইউজ করার পর এইটা নিয়া মিম কন্টেন্টের বন্যা বয়ে যায়। তারপর থিকাই এইটা একটা মেইনস্ট্রিম পলিটিক্যাল স্ল্যাং হইয়া ওঠে।
তবে আমরা আজকে কোনো পলিটিক্যাল গুপ্ত নিয়া আলাপে যাবো না! আমরা আজকে খোঁজার ট্রাই করবো সাহিত্যের গুপ্তদের। তো সাহিত্যের গুপ্ত কারা? প্রাচীন কাল থিকা বর্তমান পর্যন্ত সেলফ, সোশ্যাল বা লিটারেরি পলিটিক্সের চিপায় পইড়া অনেক রাইটারদেরই গুপ্ত বা ছদ্মনামে লেখালেখি করতে হইছে। চলেন আজকে তাদের নিয়া আলাপ করি।
বাংলা সাহিত্যে নামের টাইটেল অনুযায়ী অনেক গুপ্ত আছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, প্রচেত গুপ্ত, রসময় গুপ্তরা তো নামে গুপ্ত। কিন্তু কাজ অনুযায়ী বাংলা সাহিত্যের প্রথম গুপ্ত দীনবন্ধু মিত্র। দীনবন্ধু মিত্র ১৮৬০ সালে যখন তার বিখ্যাত নাটক ‘নীল দর্পণ’ পাবলিশ করেন, তখন তিনি পোস্টাল বিভাগে সরকারি চাকরি করতেছেন। কোম্পানি সরকারের বাটাম খাওয়ার ডরে সেই সময় তিনি ‘নীলকর বিষধর দংশন কাতর প্রজানিকর ক্ষেমঙ্করেণ কেনচিৎ পথিকেনাভিপ্রণিতং’ নামে নাটকটা ঢাকা থিকা পাবলিশ করেন। এজ ইউজাল এই নাটক পাবলিশের পর পরই গ্যাঞ্জাম শুরু হয়। রেভারেন্ড জেমস লং নাটকটার ইংলিশ ট্রান্সলেশন করেন। এই কারণে তারে জরিমানা আর কারাদণ্ড দেয়া হইছিলো । কালীপ্রসন্ন সিংহ সেই জরিমানার টাকা আদালতেই দিয়া দিছিলেন।

এর পরে গুপ্ত হইতে হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগররে। ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাশ করানোর পর থিকাই রক্ষণশীল বামুনদের সাথে বিদ্যাসাগরের বিফিং স্টার্ট হয়। বিদ্যাসাগর যখন ১৮৭০-এর দশকে বহুবিবাহ রদ করার আন্দোলন নিয়া মাঠে নামেন, তখন তিনি আবারো পার্সোনাল অ্যাটাকের শিকার হন। অ্যান্টি-বিদ্যাসাগর পক্ষ যখন শাস্ত্রীয় তর্কের বদলে তারে প্যারা দেয়া শুরু করলো, তখন সেই আক্রমণগুলারে ট্যাকেল দেওয়ার জন্য ১৮৭৩ সালে তিনি বাইছা নেন ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনাম।

এই নামেই তিনি ‘অতি অল্প হইল’, ‘আবার অতি অল্প হইল’ আর ‘ব্রজবিলাস’-এর মতো স্যাটায়ারিক্যাল বইগুলা নামাইছিলেন। ওই সময় ‘বিদ্যাসাগর’ ব্র্যান্ড ইমেজ নিয়া এহেন রোস্টিং করা টাফ ছিলো। যদিও এইটা ছিল একটা ওপেন সিক্রেট, কারণ তার গদ্য রচনার সিগনেচার স্টাইল আর আর্গুমেন্টের ধরণ দেইখাই বোঝা যাইতো এইটা বিদ্যাসাগরেরই কারসাজি।
গুপ্ত হইতে হইছে বঙ্কিমরেও! বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ব্রিটিশের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তো এই রকম একটা চাকরিতে থাইকা ডিরেক্ট অ্যান্টি ব্রিটিশ পজিশন বঙ্কিম হয়তো এফোর্ট করতে পারতেন না। তো এই জায়গা থিকাই তারে একটা গুপ্ত পলিটিক্যাল অল্টার ইগো তৈরি করতে হয়। এইভাবেই তিনি ক্রিয়েট করেন দ্য গ্রেট শ্রী কমলাকান্ত চক্রবর্তীরে।

১৮৭৩ সাল (বাংলা ১২৮০ বঙ্গাব্দ, অগ্রহায়ন সংখ্যা) থিকা বঙ্কিম সম্পাদিত মাসিক বঙ্গদর্শন পত্রিকায় কমলাকান্তের দপ্তর নামে লেখাগুলা প্রকাশিত হইতে শুরু করে। পত্রিকায় এই লেখাগুলা আলাদা একটা কলাম হিসেবে ছাপা হইতো। শিরোনাম থাকতো ‘কমলাকান্তের দপ্তর’। বঙ্কিম একটা মিথ ছড়ায় দিছিলেন। তিনি প্রচার করছিলেন যে, কমলাকান্ত নামে একজন আফিম অ্যাডিক্টেড ব্রাক্ষণ তার কাছে এই খাতাগুলা জমা রাইখা নিখোঁজ হয়ে গেছেন। বঙ্কিম এজ এন এডিটর এগুলা জাস্ট ছাপাইতেছেন। এই মিথরে বিশ্বাসযোগ্য কইরা তোলার কারণেই কমলাকান্তের নামে ছাপা হওয়া লেখাগুলাতে বঙ্কিমরে তার অরিজিনাল রাইটিং স্টাইল থিকা বের হইয়া আসতে হইছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের গম্ভীর এবং সংস্কৃতঘেঁষা উপন্যাসের ভাষার চাইতে কমলাকান্তের ভাষা ছিল অনেক বেশি সহজ, চলিত এবং হাস্যরসে ভরা।
ল্যাঙ্গুয়েজ পলিটিক্স করতে গিয়া প্রমথ চৌধুরীরেও গুপ্ত হইতে হইছে। তৎকালীন সাহিত্যের আভিজাত্যের প্রতীক ‘সাধু ভাষা’র ব্যারিয়ার ভাঙার জন্য তিনি ১৯১৪ সালে তার ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায় ‘বীরবল’ নাম নিয়া চলিত ভাষার পক্ষে ব্যাটিং শুরু করেন। আকবরের সভার বীরবলের মতো তিনিও বুদ্ধিবৃত্তিক উইট আর স্যাটায়ার দিয়া পণ্ডিতদের রোস্ট করতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের মেইনস্ট্রিম ট্রেন্ডে পরিণত হয়।

ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভের ‘লেনিন’ হইয়া উঠার গল্প জানলে বুঝবেন বিশ্বসাহিত্যেও এমন গুপ্তের অভাব নাই! লেনিনের বড় ভাই আলেকজান্ডার উলিয়ানভরে ১৮৮৭ সালে রাশিয়ার জার থার্ড আলেকজান্ডারকে হত্যার কন্সপিরেসিতে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। তারপর থিকাই ‘উলিয়ানভ’ পরিবারটা জারের গোয়েন্দা সংস্থা ‘ওখরানা’র চোখে টার্গেটেড হয়ে যায়।

ভাই মরার পর ইয়াং ভ্লাদিমিরের ভেতর নানারকম চেঞ্জ আসে। উনি মার্ক্সিজমের প্রতি টান অনুভব করেন। তার কিছুদিন পর সেন্ট পিটার্সবার্গে বিপ্লবী কার্যক্রম চালানোর সময় ইয়াং ভ্লাদিমিররে অ্যারেস্ট কইরা ৩ বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দেয়া হয়। সেই সাইবেরিয়াতে বইসাই উনি রেভ্যুলুশনারি অর্গানাইজেশন তৈরির ব্লু-প্রিন্ট সাজান। নির্বাসন থেকে ফেরার পর তিনি ইউরোপ চইলা যান এবং ‘ইস্ক্রা’ নামের একটা পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন। ১৯০১ সালে ‘ইস্ক্রা’ পত্রিকায় তিনি প্রথম ‘এন. লেনিন’ ছদ্মনাম ইউজ করেন। মজার ব্যাপার হইলো, অনেকের মতে তিনি এক মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট ইউজ কইরা এই পরিচয়টা নিছিলেন। ১৯০২ সালে তাঁর বিখ্যাত রাজনৈতিক পুস্তিকা ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান?’ প্রকাশিত হয়। এই বইটাও উনি ‘এন. লেনিন’ নামে লেখছিলেন। এই একটা বই রাশিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী মহলে দাবানলের মতো ছড়ায় পড়ে। এই বইয়ের পর পরই ভ্লাদিমির একজন থট লিডার হিসেবে ‘লেনিন’ নামে সবার কাছে ভাইরাল হয়ে ওঠেন। তবে লেনিন নামে গুপ্ত হবার আগেও কে. তুলিন, পেত্রভ, ফ্রেডরিখ ফ্রেই নামে তার আরো কিছু গুপ্ত নাম ছিল।

লেনিন নিয়া আলাপ করতে করতে মনে পইড়া গেল আরেক গুপ্ত ভলতেয়ারের কথা! ভলতেয়ারের আসল নাম ছিল ফ্রঁসোয়া-মারি আরুয়ে। ফরাসি রাজতন্ত্ররে মক করার দায়ে তিনি যখন বাস্তিল দুর্গে ১১ মাস জেল খাটলেন, তখন থেকেই তিনি বুঝে যান আসল নামে লিখলে বারবার তারে জেলে যাইতে হবে। এই কারণে তিনি জেল থেকে বের হয়ে নিজের নামকে অ্যানাগ্রাম করে ভলতেয়ার নাম নেন। ১৭১৮ সালে ভলতেয়ার নামেই তার লেখা বিখ্যাত নাটক ‘অদিপাস’ মঞ্চস্থ হয় এবং রাতারাতি তিনি ভাইরাল হয়ে যান। ঐ নাটকে গ্রিক ট্র্যাজেডির আড়ালে রিলিজিয়াস ডগমা আর চার্চের হিপোক্রেসিরে এমনভাবে টাইট দিছিলেন যে সাধারণ মানুষ তারে তাদের ভোকাল বানায় ফেলে।

সাহিত্যের দুনিয়ায় আরেক সলিড গুপ্ত হইলেন জর্জ অরওয়েল, যার আসল নাম ছিল এরিক আর্থার ব্লেয়ার। ১৯৩৩ সালে ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ প্রকাশের সময় তিনি এই ছদ্মনাম নেন। ১৯৩৩ সালে তাঁর প্রথম বই ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ প্রকাশের সময় তিনি এই ছদ্মনামটা বাইছা নিছিলেন। ঐ বইটায় উনি লন্ডনের ভবঘুরে জীবন এবং প্যারিসের থালা-বাসন মাজার শ্রমিক হিসেবে নিজের চরম দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা লেখছিলেন। একজন অভিজাত ইটোনিয়ান হয়েও ঘরের ছেলে রাস্তায় ভিক্ষা করতেছে এই ট্রুথ তাঁর প্যারেন্টসের জন্য লজ্জার হইতে পারত। তার চেয়ে বড় কারণ ছিল ব্লেয়ারের পলিটিক্যাল ঘেন্না। তিনি ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল পুলিশের ওই পুরনো শোষক পরিচয় থাইকা বের হওয়ার জন্য একটা আইডিওলজিক্যাল ডিটাচমেন্ট চাইছিলেন। তার এই গুপ্ত আইডেন্টিটি এরপর এতটাই পাওয়ারফুল হইছে যে মানুষ এখন তার অরিজিনাল নাম ভুইলাই গেছে।
মজার ব্যাপার হইতেছে, আজও যেকোনো স্বৈরাচারী সিস্টেমরে আমরা ওই মানুষের আসল নামে নয়, বরং তার ছদ্মনামে ‘অরওয়েলিয়ান’ বইলা ডাকি।
এই লেখাটা শেষ করবো এক ফিমেল গুপ্তরে দিয়া।
তার নাম ম্যারি অ্যান ইভানস। ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম সেরা এই লেখিকারে দুনিয়া চেনে জর্জ এলিয়ট নামে। মেরি অ্যান যখন লেখালেখি শুরু করেন, তখনকার ইংল্যান্ডের সোসাইটি ছিল চরম কনজার্ভেটিভ। সমাজ মনে করত নারীরা বড়জোর ঘরকন্না বা হালকা মেজাজের সস্তা রোমান্টিক নভেল লিখতে পারে, সিরিয়াস সোশ্যাল ফিলোসফি, পলিটিক্স আর হিউম্যান সাইকোলজি নিয়া কাটাছেঁড়া করা কোনো নারীর পক্ষে সম্ভব না।

মেরি অ্যান চাইছিলেন তার লেখা যেন লোকে স্রেফ ‘মেয়েদের লেখা’ ভাইবা ইগনোর না করে বা কোনো ‘ফেমিনিন সফটনেস’ দিয়ে বিচার না করে। তিনি চাইছিলেন তার আর্গুমেন্ট আর সোশ্যাল ক্রিটিকগুলো যেন একজন ‘সিরিয়াস রাইটার’ হিসেবে কাউন্ট করা হয়। এই লিটারারি পলিটিক্স ট্যাকেল দিতেই তিনি বেছে নিছিলেন পুরুষ ছদ্মনাম জর্জ এলিয়ট।
মজার ব্যাপার হইলো, তৎকালীন অনেক বড় বড় রাইটার এবং ক্রিটিক জর্জ এলিয়টের লেখার স্টাইল দেইখা ফিদা হইয়া তারে ‘পরাক্রমশালী পুরুষ’ মনে করতেন। ১৮৫৯ সালে যখন তার মাস্টারপিস ‘অ্যাডাম বিড’ পাবলিশ হয়, তখন চারিদিকে আলোড়ন পইড়া যায়! পরে যখন জানাজানি হয় যে এই পলিটিক্যাল আর ফিলোসফিক্যাল থটগুলা একজন নারীর ব্রেইন ওয়ার্ক, তখন পুরা ভিক্টোরিয়ান সোসাইটির মাথা নষ্ট হওয়ার দশা হইছিল!

সম্প্রতি নেটস্ফিয়ার থিকা পলিটিক্যাল স্ফিয়ার–মোটামুটি সব জায়গাতেই একটা শব্দ প্রচুর শোনা যাইতেছে। সেই শব্দটা হইতেছে ‘গুপ্ত’।
গুপ্ত একটা কমন বাংলা শব্দ। কিন্তু বর্তমানে এইটা ভাইরাল হবার কন্টেক্সট অনেক ইন্টারেস্টিং! আওয়ামী আমলে লীগের ছায়াতলে লীগ সাইজা থাকা শিবির কর্মীদের ব্যান্টারিং করতে মূলত ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এই ‘গুপ্ত’ শব্দটা এন্ডোর্স করছে। লাস্ট জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমান তার এক নির্বাচনী জনসভার বক্তৃতায় গুপ্ত শব্দটা ইউজ করার পর এইটা নিয়া মিম কন্টেন্টের বন্যা বয়ে যায়। তারপর থিকাই এইটা একটা মেইনস্ট্রিম পলিটিক্যাল স্ল্যাং হইয়া ওঠে।
তবে আমরা আজকে কোনো পলিটিক্যাল গুপ্ত নিয়া আলাপে যাবো না! আমরা আজকে খোঁজার ট্রাই করবো সাহিত্যের গুপ্তদের। তো সাহিত্যের গুপ্ত কারা? প্রাচীন কাল থিকা বর্তমান পর্যন্ত সেলফ, সোশ্যাল বা লিটারেরি পলিটিক্সের চিপায় পইড়া অনেক রাইটারদেরই গুপ্ত বা ছদ্মনামে লেখালেখি করতে হইছে। চলেন আজকে তাদের নিয়া আলাপ করি।
বাংলা সাহিত্যে নামের টাইটেল অনুযায়ী অনেক গুপ্ত আছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, প্রচেত গুপ্ত, রসময় গুপ্তরা তো নামে গুপ্ত। কিন্তু কাজ অনুযায়ী বাংলা সাহিত্যের প্রথম গুপ্ত দীনবন্ধু মিত্র। দীনবন্ধু মিত্র ১৮৬০ সালে যখন তার বিখ্যাত নাটক ‘নীল দর্পণ’ পাবলিশ করেন, তখন তিনি পোস্টাল বিভাগে সরকারি চাকরি করতেছেন। কোম্পানি সরকারের বাটাম খাওয়ার ডরে সেই সময় তিনি ‘নীলকর বিষধর দংশন কাতর প্রজানিকর ক্ষেমঙ্করেণ কেনচিৎ পথিকেনাভিপ্রণিতং’ নামে নাটকটা ঢাকা থিকা পাবলিশ করেন। এজ ইউজাল এই নাটক পাবলিশের পর পরই গ্যাঞ্জাম শুরু হয়। রেভারেন্ড জেমস লং নাটকটার ইংলিশ ট্রান্সলেশন করেন। এই কারণে তারে জরিমানা আর কারাদণ্ড দেয়া হইছিলো । কালীপ্রসন্ন সিংহ সেই জরিমানার টাকা আদালতেই দিয়া দিছিলেন।

এর পরে গুপ্ত হইতে হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগররে। ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাশ করানোর পর থিকাই রক্ষণশীল বামুনদের সাথে বিদ্যাসাগরের বিফিং স্টার্ট হয়। বিদ্যাসাগর যখন ১৮৭০-এর দশকে বহুবিবাহ রদ করার আন্দোলন নিয়া মাঠে নামেন, তখন তিনি আবারো পার্সোনাল অ্যাটাকের শিকার হন। অ্যান্টি-বিদ্যাসাগর পক্ষ যখন শাস্ত্রীয় তর্কের বদলে তারে প্যারা দেয়া শুরু করলো, তখন সেই আক্রমণগুলারে ট্যাকেল দেওয়ার জন্য ১৮৭৩ সালে তিনি বাইছা নেন ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনাম।

এই নামেই তিনি ‘অতি অল্প হইল’, ‘আবার অতি অল্প হইল’ আর ‘ব্রজবিলাস’-এর মতো স্যাটায়ারিক্যাল বইগুলা নামাইছিলেন। ওই সময় ‘বিদ্যাসাগর’ ব্র্যান্ড ইমেজ নিয়া এহেন রোস্টিং করা টাফ ছিলো। যদিও এইটা ছিল একটা ওপেন সিক্রেট, কারণ তার গদ্য রচনার সিগনেচার স্টাইল আর আর্গুমেন্টের ধরণ দেইখাই বোঝা যাইতো এইটা বিদ্যাসাগরেরই কারসাজি।
গুপ্ত হইতে হইছে বঙ্কিমরেও! বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ব্রিটিশের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তো এই রকম একটা চাকরিতে থাইকা ডিরেক্ট অ্যান্টি ব্রিটিশ পজিশন বঙ্কিম হয়তো এফোর্ট করতে পারতেন না। তো এই জায়গা থিকাই তারে একটা গুপ্ত পলিটিক্যাল অল্টার ইগো তৈরি করতে হয়। এইভাবেই তিনি ক্রিয়েট করেন দ্য গ্রেট শ্রী কমলাকান্ত চক্রবর্তীরে।

১৮৭৩ সাল (বাংলা ১২৮০ বঙ্গাব্দ, অগ্রহায়ন সংখ্যা) থিকা বঙ্কিম সম্পাদিত মাসিক বঙ্গদর্শন পত্রিকায় কমলাকান্তের দপ্তর নামে লেখাগুলা প্রকাশিত হইতে শুরু করে। পত্রিকায় এই লেখাগুলা আলাদা একটা কলাম হিসেবে ছাপা হইতো। শিরোনাম থাকতো ‘কমলাকান্তের দপ্তর’। বঙ্কিম একটা মিথ ছড়ায় দিছিলেন। তিনি প্রচার করছিলেন যে, কমলাকান্ত নামে একজন আফিম অ্যাডিক্টেড ব্রাক্ষণ তার কাছে এই খাতাগুলা জমা রাইখা নিখোঁজ হয়ে গেছেন। বঙ্কিম এজ এন এডিটর এগুলা জাস্ট ছাপাইতেছেন। এই মিথরে বিশ্বাসযোগ্য কইরা তোলার কারণেই কমলাকান্তের নামে ছাপা হওয়া লেখাগুলাতে বঙ্কিমরে তার অরিজিনাল রাইটিং স্টাইল থিকা বের হইয়া আসতে হইছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের গম্ভীর এবং সংস্কৃতঘেঁষা উপন্যাসের ভাষার চাইতে কমলাকান্তের ভাষা ছিল অনেক বেশি সহজ, চলিত এবং হাস্যরসে ভরা।
ল্যাঙ্গুয়েজ পলিটিক্স করতে গিয়া প্রমথ চৌধুরীরেও গুপ্ত হইতে হইছে। তৎকালীন সাহিত্যের আভিজাত্যের প্রতীক ‘সাধু ভাষা’র ব্যারিয়ার ভাঙার জন্য তিনি ১৯১৪ সালে তার ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায় ‘বীরবল’ নাম নিয়া চলিত ভাষার পক্ষে ব্যাটিং শুরু করেন। আকবরের সভার বীরবলের মতো তিনিও বুদ্ধিবৃত্তিক উইট আর স্যাটায়ার দিয়া পণ্ডিতদের রোস্ট করতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের মেইনস্ট্রিম ট্রেন্ডে পরিণত হয়।

ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভের ‘লেনিন’ হইয়া উঠার গল্প জানলে বুঝবেন বিশ্বসাহিত্যেও এমন গুপ্তের অভাব নাই! লেনিনের বড় ভাই আলেকজান্ডার উলিয়ানভরে ১৮৮৭ সালে রাশিয়ার জার থার্ড আলেকজান্ডারকে হত্যার কন্সপিরেসিতে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। তারপর থিকাই ‘উলিয়ানভ’ পরিবারটা জারের গোয়েন্দা সংস্থা ‘ওখরানা’র চোখে টার্গেটেড হয়ে যায়।

ভাই মরার পর ইয়াং ভ্লাদিমিরের ভেতর নানারকম চেঞ্জ আসে। উনি মার্ক্সিজমের প্রতি টান অনুভব করেন। তার কিছুদিন পর সেন্ট পিটার্সবার্গে বিপ্লবী কার্যক্রম চালানোর সময় ইয়াং ভ্লাদিমিররে অ্যারেস্ট কইরা ৩ বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দেয়া হয়। সেই সাইবেরিয়াতে বইসাই উনি রেভ্যুলুশনারি অর্গানাইজেশন তৈরির ব্লু-প্রিন্ট সাজান। নির্বাসন থেকে ফেরার পর তিনি ইউরোপ চইলা যান এবং ‘ইস্ক্রা’ নামের একটা পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন। ১৯০১ সালে ‘ইস্ক্রা’ পত্রিকায় তিনি প্রথম ‘এন. লেনিন’ ছদ্মনাম ইউজ করেন। মজার ব্যাপার হইলো, অনেকের মতে তিনি এক মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট ইউজ কইরা এই পরিচয়টা নিছিলেন। ১৯০২ সালে তাঁর বিখ্যাত রাজনৈতিক পুস্তিকা ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান?’ প্রকাশিত হয়। এই বইটাও উনি ‘এন. লেনিন’ নামে লেখছিলেন। এই একটা বই রাশিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী মহলে দাবানলের মতো ছড়ায় পড়ে। এই বইয়ের পর পরই ভ্লাদিমির একজন থট লিডার হিসেবে ‘লেনিন’ নামে সবার কাছে ভাইরাল হয়ে ওঠেন। তবে লেনিন নামে গুপ্ত হবার আগেও কে. তুলিন, পেত্রভ, ফ্রেডরিখ ফ্রেই নামে তার আরো কিছু গুপ্ত নাম ছিল।

লেনিন নিয়া আলাপ করতে করতে মনে পইড়া গেল আরেক গুপ্ত ভলতেয়ারের কথা! ভলতেয়ারের আসল নাম ছিল ফ্রঁসোয়া-মারি আরুয়ে। ফরাসি রাজতন্ত্ররে মক করার দায়ে তিনি যখন বাস্তিল দুর্গে ১১ মাস জেল খাটলেন, তখন থেকেই তিনি বুঝে যান আসল নামে লিখলে বারবার তারে জেলে যাইতে হবে। এই কারণে তিনি জেল থেকে বের হয়ে নিজের নামকে অ্যানাগ্রাম করে ভলতেয়ার নাম নেন। ১৭১৮ সালে ভলতেয়ার নামেই তার লেখা বিখ্যাত নাটক ‘অদিপাস’ মঞ্চস্থ হয় এবং রাতারাতি তিনি ভাইরাল হয়ে যান। ঐ নাটকে গ্রিক ট্র্যাজেডির আড়ালে রিলিজিয়াস ডগমা আর চার্চের হিপোক্রেসিরে এমনভাবে টাইট দিছিলেন যে সাধারণ মানুষ তারে তাদের ভোকাল বানায় ফেলে।

সাহিত্যের দুনিয়ায় আরেক সলিড গুপ্ত হইলেন জর্জ অরওয়েল, যার আসল নাম ছিল এরিক আর্থার ব্লেয়ার। ১৯৩৩ সালে ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ প্রকাশের সময় তিনি এই ছদ্মনাম নেন। ১৯৩৩ সালে তাঁর প্রথম বই ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ প্রকাশের সময় তিনি এই ছদ্মনামটা বাইছা নিছিলেন। ঐ বইটায় উনি লন্ডনের ভবঘুরে জীবন এবং প্যারিসের থালা-বাসন মাজার শ্রমিক হিসেবে নিজের চরম দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা লেখছিলেন। একজন অভিজাত ইটোনিয়ান হয়েও ঘরের ছেলে রাস্তায় ভিক্ষা করতেছে এই ট্রুথ তাঁর প্যারেন্টসের জন্য লজ্জার হইতে পারত। তার চেয়ে বড় কারণ ছিল ব্লেয়ারের পলিটিক্যাল ঘেন্না। তিনি ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল পুলিশের ওই পুরনো শোষক পরিচয় থাইকা বের হওয়ার জন্য একটা আইডিওলজিক্যাল ডিটাচমেন্ট চাইছিলেন। তার এই গুপ্ত আইডেন্টিটি এরপর এতটাই পাওয়ারফুল হইছে যে মানুষ এখন তার অরিজিনাল নাম ভুইলাই গেছে।
মজার ব্যাপার হইতেছে, আজও যেকোনো স্বৈরাচারী সিস্টেমরে আমরা ওই মানুষের আসল নামে নয়, বরং তার ছদ্মনামে ‘অরওয়েলিয়ান’ বইলা ডাকি।
এই লেখাটা শেষ করবো এক ফিমেল গুপ্তরে দিয়া।
তার নাম ম্যারি অ্যান ইভানস। ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম সেরা এই লেখিকারে দুনিয়া চেনে জর্জ এলিয়ট নামে। মেরি অ্যান যখন লেখালেখি শুরু করেন, তখনকার ইংল্যান্ডের সোসাইটি ছিল চরম কনজার্ভেটিভ। সমাজ মনে করত নারীরা বড়জোর ঘরকন্না বা হালকা মেজাজের সস্তা রোমান্টিক নভেল লিখতে পারে, সিরিয়াস সোশ্যাল ফিলোসফি, পলিটিক্স আর হিউম্যান সাইকোলজি নিয়া কাটাছেঁড়া করা কোনো নারীর পক্ষে সম্ভব না।

মেরি অ্যান চাইছিলেন তার লেখা যেন লোকে স্রেফ ‘মেয়েদের লেখা’ ভাইবা ইগনোর না করে বা কোনো ‘ফেমিনিন সফটনেস’ দিয়ে বিচার না করে। তিনি চাইছিলেন তার আর্গুমেন্ট আর সোশ্যাল ক্রিটিকগুলো যেন একজন ‘সিরিয়াস রাইটার’ হিসেবে কাউন্ট করা হয়। এই লিটারারি পলিটিক্স ট্যাকেল দিতেই তিনি বেছে নিছিলেন পুরুষ ছদ্মনাম জর্জ এলিয়ট।
মজার ব্যাপার হইলো, তৎকালীন অনেক বড় বড় রাইটার এবং ক্রিটিক জর্জ এলিয়টের লেখার স্টাইল দেইখা ফিদা হইয়া তারে ‘পরাক্রমশালী পুরুষ’ মনে করতেন। ১৮৫৯ সালে যখন তার মাস্টারপিস ‘অ্যাডাম বিড’ পাবলিশ হয়, তখন চারিদিকে আলোড়ন পইড়া যায়! পরে যখন জানাজানি হয় যে এই পলিটিক্যাল আর ফিলোসফিক্যাল থটগুলা একজন নারীর ব্রেইন ওয়ার্ক, তখন পুরা ভিক্টোরিয়ান সোসাইটির মাথা নষ্ট হওয়ার দশা হইছিল!

গতরাতে আমি স্ক্রল করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছি। ফেসবুক থেকে ইনস্টাগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম থেকে টিকটক। এক ভিডিও শেষ হয়ে আরেকটা শুরু হয়। মুখ আসে, মুখ যায়। কোথাও বিয়ে, কোথাও ব্রেকআপ, কোথাও প্রতিবাদ, কোথাও নিখুঁত সাজানো ‘গার্ল ডিনার’। কোথাও কেউ তিরিশ সেকেন্ডে তার পুরো ট্রমা হিল করে ফেলছে—ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে
৭ দিন আগে
বাংলাদেশে এক সময়ে যাত্রার যে রমরমা অবস্থা ছিল, বলা চলে আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠী তারই বিবর্তন। তাদের কস্টিউম, মেকআপ, এমনকি অভিনয়ের ধরনেও তারা যাত্রার প্রচন্ড হাইপার থিয়েট্রিকালিটিকে অনুসরণ করেন।
৯ দিন আগে
আগে আমি গান করতাম। আমার কিছু গান এখনো ইউটিউবে পাওয়া যায়, যা মোটামুটি ১০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ শুনছেন। একদিন আমার চ্যানেলের কমেন্ট সেকশন ঘাটতে গিয়া একটা কমেন্টে চোখ আটকায় গেল। একজন লিখছেন: ‘ব্রো, প্লিজ এরকম আন্ডাররেটেডই থাইকেন!’
১৮ দিন আগে
দুজনের মধ্যে কেউ আসলে কারো নামে তেমন সমালোচনা ঠিক করতো না, কিন্তু অলক্ষ্যে একটা বিভাজন ছিল, সেই বিভাজন তৎকালীন আশেপাশের কবিরাই সৃষ্টি করেছিল। শামসুর রাহমান আল মাহমুদ কিন্তু এগুলা করেন নাই। আমরাই করছি। একদল চলে গেছিল শামসুর রাহমানের সাথে, আরেকটা ক্ষুদ্র দল মাহমুদ সাথে। এই যে বিচ্ছিন্ন আল মাহমুদ, তাঁর
১৯ দিন আগে