রাতুল আল আহমেদ

আড়ংয়ে ঢুকলে তাদের প্রাইস ট্যাগ দেখে আমার কী মনে হয়?
আকাশ ছোঁয়া
আজকে গরম কেমন?
আকাশ ছোঁয়া
অফিসের চাপ কেমন চলছে?
আকাশ ছোঁয়া
সিলেবাস কতটুকু বাকি?
আকাশ ছোঁয়া
এই রকম অসংখ্য মিমে মিমে সয়লাব আমার নিউজ ফিড। শুধু তা-ই না, রিলে ঢুকলেই দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গের মানুষ ‘আকাশ ছোঁয়া’ বলতে থাকা মিউজিকে অদ্ভুত হাতের মুদ্রাসহ নাচছেন। এগুলো এমন অ্যাডিক্টিভ একটা দেখলে আরেকটা দেখতে ইচ্ছা করে। দেখতে দেখতে এখন আমার অ্যালগরিদম দুনিয়ার সব আকাশ ছোঁয়া নাচ আমার ফিডে এসে হাজির করছে।
আকাশ ছোঁয়া কি নতুন কোনো ব্রেনরট, নাকি পপ কালচারের নতুন কোনো এলিমেন্ট? কৌতূহলী হই আমি। কেন মানুষ ‘আকাশ ছোঁয়া’ ট্রেন্ডের সাথে দ্রুত নিজেদের কানেক্ট করে ফেলছে? এসব খোঁজাই আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য। যারা নতুন এই ট্রেন্ডের ফ্যান আর যারা এর সমন্ধে আগ্রহী আসুন ডুব দিই ‘আকাশ ছোঁয়া’ ট্রেন্ডের ভেতর।
কারা এই ‘আকাশ ছোঁয়া’
খুঁজতে খুঁজতে একটা রিলে ‘আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠীর’ ফোন নম্বর পাই। ফোন করার পর কথা হয় এ দলের প্রধান মোহাম্মদ আকাশ খানের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘আমি ভাই ২০০৪ সাল থেকে নাচের লাইনে আছি। তখন স্কাই টাচ ডান্স একাডেমি বলে একটা নাচের গ্রুপ ছিল আমার। পরে তো চিটাগং চলে আসলাম। ২০১৭ সালের দিকে এখনকার আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠী চালু করি।
আকাশ ছোঁয়ার নামকরণের হিস্ট্রিও বেশ চমকপ্রদ। আকাশ খান বলেন, ‘ভাই দেখেন, আমরা তো বাঙালি, বাংলা ভাষাটা দিয়েই আমরা ভাব বোঝাই। সেজন্যই গ্রুপটার নাম স্কাই টাচ থেকে বাংলা করলাম আকাশ ছোঁয়া’।

বাংলাদেশে একসময়ে যাত্রার যে রমরমা অবস্থা ছিল, বলা চলে আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠী তারই বিবর্তন। তাদের কস্টিউম, মেকআপ, এমনকি অভিনয়ের ধরনেও তারা যাত্রার প্রচন্ড হাইপার থিয়েট্রিকালিটিকে অনুসরণ করেন।
এ দলটি মূলত চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার জন্মদিন, বিয়ে, গায়ে হলুদ বা গেট টুগেদারের মতো প্রোগ্রামে বায়নার ভিত্তিতে নেচে থাকে। আকাশ জানান, তাদের বায়নার মূল্য অনেক সময় লাখ টাকাও পৌঁছায়। ‘ভাইরাল হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসে আমার কাছে। কিন্তু দূরে হইলে আমি বলে যে আমাদের নিয়ে যাইতেই আপনাদের যে কস্ট পড়বে তার চেয়ে আপনারা লোকাল আর্টিস্ট হায়ার করেন’, এমনটাই জানান আকাশ।
আকাশ ও সুমি, স্বামী-স্ত্রীর এ জুটি রিল ও রিয়েল, দুই মাধ্যমের ডান্স জগতেই বেশ জনপ্রিয়। বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম ও টিকটক মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ফলো করেন এঁদের।
কেন ভাইরাল আকাশ ছোঁয়া
পপের দুনিয়ার নিয়ম হচ্ছে এখানে ট্রেন্ড আসবে এবং যাবে। কিন্তু তারপরও একটু ব্রেন খাটানো যাক কেন ভাইরাল আকাশ ছোঁয়া ।
প্রথমত, এই ভাইরাল হওয়ার পেছনে ‘আকাশ ছোঁয়া’ শব্দ দুটির নিজস্ব একটা ভার আছে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে যখন কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় কিংবা অভাবনীয় কিছু ঘটে, তখন এই শব্দ দুটি যুতসইভাবে খাপ খেয়ে যায়। এটি একদিকে যেমন ‘ওভারহোয়েলমিং’ অনুভূতি প্রকাশে ব্যবহৃত হচ্ছে, আবার একই সাথে তা তীব্র ‘সারকাস্টিক আয়রনি’ হিসেবেও কাজ করছে। অফিসের কাজের চাপ থেকে শুরু করে আড়ংয়ের প্রাইস ট্যাগ–সবকিছুর উত্তর যখন ‘আকাশ ছোঁয়া’ হয়, তখন এটি একটি সর্বজনীন মিম টেমপ্লেটে পরিণত হয়।
কিন্তু ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট হচ্ছে আকাশ ছোঁয়া দলের নাচ বা রিল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও আজকে এই যে ভাইরাল, তার হাত অবশ্য ইন্ডিয়ান সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের হাত ধরে। এরকম ভাইরাল ভিডিও চাইলে দেখে নিতে পারেন পরের আলাপে আরও এঙ্গেজ হতে চাইলে। ক্লিক করুন এখানে, এখানে, ও এখানে।
এরপরে রিলগুলো বাংলাদেশেও ভাইরাল হতে শুরু করে। যেমনটা দেখুন এখানে ও এখানে।
এবার ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, মনে হতে পারে ‘আকাশ ছোঁয়া’ ব্যাকগ্রাউন্ডের রিলগুলো বানানো হয়েছে ব্রেনরট হিসেবে। যেগুলো আমরা স্ক্রল করে চলে যাই না; বরং থেমে দেখি, আবার দেখি। এই অদ্ভুত আকর্ষণকে কেবল ‘ব্রেনরট’ বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। বরং চলেন, এটিকে বোঝার জন্য একটু অন্য ফ্রেমওয়ার্ক ‘ক্যাম্প অ্যাস্থেটিক’ দিয়ে দেখি।
এখন, ক্যাম্প অ্যাস্থেটিক কী?
‘ক্যাম্প’ শব্দটা আজকের ইন্টারনেট কালচারে খুব সহজভাবে ব্যবহার করা হলেও এর শিকড় বেশ পুরোনো।
উনিশ শতকের ইউরোপে, বিশেষ করে ইংরেজি ও ফরাসি সাংস্কৃতিক পরিসরে ‘ক্যাম্প’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় এমন এক ধরনের রুচি বোঝাতে, যা ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরঞ্জিত, নাটকীয় এবং কিছুটা কৃত্রিম। তবে তখনও এটি মূলধারার আলোচনায় ছিল না। বরং একধরনের সাবকালচার ছিল ক্যাম্প। বিশেষ করে ক্যুয়ার কমিউনিটির মধ্যে ‘ক্যাম্প’ হয়ে ওঠে এক ধরনের এক্সপ্রেশন, যেখানে সমাজের প্রচলিত ‘ভালো রুচি’কে একটু ব্যঙ্গ করে, একটু উল্টে দিয়ে, নিজের মতো করে উপস্থাপন করা হয়।
মানে বোঝা যাচ্ছে ক্যাম্প শুধু স্টাইল নয় বরং একধরনের কালচারাল রিঅ্যাকশন।
এখন ক্যাম্পের ধারণাটিকে মূলধারায় নিয়ে আসেন ১৯৬৪ সালে মার্কিন বুদ্ধিজীবী সুসান সোনট্যাগ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘নোটস অন ক্যাম্প’ এর মাধ্যমে। তিনি বলেন, ক্যাম্প হলো এমন এক নান্দনিকতা, যেখানে ব্যাড টেস্টও একধরনের আনন্দ তৈরি করতে পারে। কারণ, সেটি এতটাই অতিরঞ্জিত, এতটাই সিরিয়াস হতে চায়, যে শেষ পর্যন্ত তা অদ্ভুতভাবে ফানি হয়ে ওঠে।

এই লেন্স দিয়ে আপনি যদি ‘আকাশ ছোঁয়া’র রিলগুলো দেখেন তখন তা আর সস্তা বিনোদন থাকে না। বরং এগুলো হয়ে ওঠে এক ধরনের পপ কালচারাল ফেনোমেনন।
‘আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠী’র শিকড় চট্টগ্রামের বায়েজিদের শ্রমজীবী পরিবেশে। প্রথমে মনে হতে পারে ‘আকাশ ছোঁয়া’ খুবই লোকাল একটা ব্যাপার, চট্টগ্রামের একটা নাচের দল, লোকাল প্রোগ্রামে পারফর্ম করে। কিন্তু ইন্টারনেটের দুনিয়ায় লোকাল বলে আলাদা কিছু থাকে না। এই কনটেন্ট প্রথমে লোকালি প্রোডিউস হয়, তারপর ইন্ডিয়ান ইনফ্লুয়েন্সারদের উসিলায় নতুন করে ভাইরাল হয়, আবার সেই ভাইরাল ঢেউ বাংলাদেশে ফিরে এসে আরও বড় আকার নেয়। ফলে এটি শুধু ভাইরাল কনটেন্ট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং একধরনের গ্লোকাল (গ্লোবাল+লোকাল) কালচারাল ফ্লো তৈরি করে, যেখানে এক জায়গার কনটেন্ট অন্য জায়গায় নতুন অর্থ পায়, নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার হয়, এবং শেষে নিজের জায়গাতেই ফিরে এসে এক নতুন পরিচয় গড়ে তোলে।
ক্যাম্প অ্যাস্থেটিকের তিনটি বৈশিষ্ট্য এখানে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। প্রথমত, অতিরঞ্জন–চড়া মেকআপ ও কস্টিউম। দ্বিতীয়ত, ব্যর্থ গাম্ভীর্য–গভীর আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে তৈরি হয় হাস্যরস। তৃতীয়ত, কৃত্রিমতা–তা সে সেটআপ হোক বা আনাড়ি এডিটিং, সব মিলিয়ে এমন এক ভিজ্যুয়াল যা ‘খুব খারাপ’ হয়েও অদ্ভুতভাবে ‘দারুণ’ হয়ে ওঠে।
অবশ্য ক্যাম্পের বৈশিষ্ট্য থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আকাশ ছোঁয়া কিন্তু একইসঙ্গে ইউনিকও। ইউনিক এ জন্য যে ক্যাম্পের হিস্ট্রিতে ওয়েস্ট যেরকম ভীষণ রকম জেন্ডারড, মানে পিংক পরলেই মেয়ে আর নীল মানেই ছেলে, বাংলাদেশের কালচার কিন্তু সেরকম জেন্ডারড না। এবং যাত্রাপালায় যে অ্যাস্থেটিক, বা অনেক সময় পুরুষেরা নারী চরিত্রে অভিনয়ের যে সোশ্যাল অ্যাক্সেপ্টেন্স আছে, সেটা ক্যাম্পের হিস্ট্রিতে নাই। ফলে আকাশ ছোঁয়া নিজে কিন্তু ক্যাম্প নয়, বরং সে একটা কালচার এবং তার একটা নিশ অডিয়েন্স আছে।
তবে আকাশ ছোঁয়া ট্রেন্ড আসলে ক্যাম্পের মতোই রিঅ্যাকশনারি। শহুরে তরুণরা যখন এ ব্যাকগ্রাউন্ডে রিল বানাচ্ছে তারা ঠিক সরাসরি প্রশংসা করছে না, বরং একধরনের আইরনিক কনজাম্পশনে অংশ নিচ্ছে। মানে, আমরা জানি এটা হাই-কালচার না। কিন্তু এটা দেখে মজা নেওয়ার মধ্যে একটা আলাদা মজা আছে।
এ ছাড়াও ইন্টারনেটে একটা মজার রুচি তৈরি হয়েছে গত কয়েক বছরে, যাকে অনেকেই বলে ‘ক্রিঞ্জ কালচার’। যে জিনিসটা আগে লজ্জার, অস্বস্তিকর বা খারাপ বলে মনে হত, এখন সেটাই মানুষ ইচ্ছা করে দেখে, শেয়ার করে, এমনকি উপভোগও করে। ‘আকাশ ছোঁয়া’র রিলগুলো ঠিক এই জায়গাটাতেই কাজ করে।
আপনি হয়তো প্রথমবার দেখে একটু অস্বস্তি বোধ করেন, অভিনয়টা বেশি হয়ে যাচ্ছে, এক্সপ্রেশনটা অদ্ভুত, সেটআপটা খুবই সাদামাটা। কিন্তু তবুও আপনি স্ক্রল করে চলে যান না। বরং একটু থামেন। আবার দেখেন। হয়তো বন্ধুকেও পাঠান। এই থেমে যাওয়াটাই আসল ব্যাপার। ক্রিঞ্জ কালচারে কনটেন্ট ভালো লাগে না, ভালো না লাগার কারণেই ভালো লাগে।
তবে, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা রয়ে যায়, এটি কি সত্যিই ‘ব্রেনরট’? নাকি এটি আমাদের সময়ের নতুন কালচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ, যা প্রচলিত রুচির ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে?
হয়তো উত্তরটা এত সরল নয়। তবে এটা নিশ্চিত, আপনি হাসুন বা বিরক্ত হন, যতক্ষণ আপনি একটু থেমে আকাশ ছোঁয়া দেখছেন বা অজান্তেই গুনগুন করে আকাশ ছোঁয়া বলছেন, ততক্ষণ আকাশ ছোঁয়া স্কাই টাচিং।

আড়ংয়ে ঢুকলে তাদের প্রাইস ট্যাগ দেখে আমার কী মনে হয়?
আকাশ ছোঁয়া
আজকে গরম কেমন?
আকাশ ছোঁয়া
অফিসের চাপ কেমন চলছে?
আকাশ ছোঁয়া
সিলেবাস কতটুকু বাকি?
আকাশ ছোঁয়া
এই রকম অসংখ্য মিমে মিমে সয়লাব আমার নিউজ ফিড। শুধু তা-ই না, রিলে ঢুকলেই দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গের মানুষ ‘আকাশ ছোঁয়া’ বলতে থাকা মিউজিকে অদ্ভুত হাতের মুদ্রাসহ নাচছেন। এগুলো এমন অ্যাডিক্টিভ একটা দেখলে আরেকটা দেখতে ইচ্ছা করে। দেখতে দেখতে এখন আমার অ্যালগরিদম দুনিয়ার সব আকাশ ছোঁয়া নাচ আমার ফিডে এসে হাজির করছে।
আকাশ ছোঁয়া কি নতুন কোনো ব্রেনরট, নাকি পপ কালচারের নতুন কোনো এলিমেন্ট? কৌতূহলী হই আমি। কেন মানুষ ‘আকাশ ছোঁয়া’ ট্রেন্ডের সাথে দ্রুত নিজেদের কানেক্ট করে ফেলছে? এসব খোঁজাই আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য। যারা নতুন এই ট্রেন্ডের ফ্যান আর যারা এর সমন্ধে আগ্রহী আসুন ডুব দিই ‘আকাশ ছোঁয়া’ ট্রেন্ডের ভেতর।
কারা এই ‘আকাশ ছোঁয়া’
খুঁজতে খুঁজতে একটা রিলে ‘আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠীর’ ফোন নম্বর পাই। ফোন করার পর কথা হয় এ দলের প্রধান মোহাম্মদ আকাশ খানের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘আমি ভাই ২০০৪ সাল থেকে নাচের লাইনে আছি। তখন স্কাই টাচ ডান্স একাডেমি বলে একটা নাচের গ্রুপ ছিল আমার। পরে তো চিটাগং চলে আসলাম। ২০১৭ সালের দিকে এখনকার আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠী চালু করি।
আকাশ ছোঁয়ার নামকরণের হিস্ট্রিও বেশ চমকপ্রদ। আকাশ খান বলেন, ‘ভাই দেখেন, আমরা তো বাঙালি, বাংলা ভাষাটা দিয়েই আমরা ভাব বোঝাই। সেজন্যই গ্রুপটার নাম স্কাই টাচ থেকে বাংলা করলাম আকাশ ছোঁয়া’।

বাংলাদেশে একসময়ে যাত্রার যে রমরমা অবস্থা ছিল, বলা চলে আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠী তারই বিবর্তন। তাদের কস্টিউম, মেকআপ, এমনকি অভিনয়ের ধরনেও তারা যাত্রার প্রচন্ড হাইপার থিয়েট্রিকালিটিকে অনুসরণ করেন।
এ দলটি মূলত চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার জন্মদিন, বিয়ে, গায়ে হলুদ বা গেট টুগেদারের মতো প্রোগ্রামে বায়নার ভিত্তিতে নেচে থাকে। আকাশ জানান, তাদের বায়নার মূল্য অনেক সময় লাখ টাকাও পৌঁছায়। ‘ভাইরাল হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসে আমার কাছে। কিন্তু দূরে হইলে আমি বলে যে আমাদের নিয়ে যাইতেই আপনাদের যে কস্ট পড়বে তার চেয়ে আপনারা লোকাল আর্টিস্ট হায়ার করেন’, এমনটাই জানান আকাশ।
আকাশ ও সুমি, স্বামী-স্ত্রীর এ জুটি রিল ও রিয়েল, দুই মাধ্যমের ডান্স জগতেই বেশ জনপ্রিয়। বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম ও টিকটক মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ফলো করেন এঁদের।
কেন ভাইরাল আকাশ ছোঁয়া
পপের দুনিয়ার নিয়ম হচ্ছে এখানে ট্রেন্ড আসবে এবং যাবে। কিন্তু তারপরও একটু ব্রেন খাটানো যাক কেন ভাইরাল আকাশ ছোঁয়া ।
প্রথমত, এই ভাইরাল হওয়ার পেছনে ‘আকাশ ছোঁয়া’ শব্দ দুটির নিজস্ব একটা ভার আছে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে যখন কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় কিংবা অভাবনীয় কিছু ঘটে, তখন এই শব্দ দুটি যুতসইভাবে খাপ খেয়ে যায়। এটি একদিকে যেমন ‘ওভারহোয়েলমিং’ অনুভূতি প্রকাশে ব্যবহৃত হচ্ছে, আবার একই সাথে তা তীব্র ‘সারকাস্টিক আয়রনি’ হিসেবেও কাজ করছে। অফিসের কাজের চাপ থেকে শুরু করে আড়ংয়ের প্রাইস ট্যাগ–সবকিছুর উত্তর যখন ‘আকাশ ছোঁয়া’ হয়, তখন এটি একটি সর্বজনীন মিম টেমপ্লেটে পরিণত হয়।
কিন্তু ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট হচ্ছে আকাশ ছোঁয়া দলের নাচ বা রিল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও আজকে এই যে ভাইরাল, তার হাত অবশ্য ইন্ডিয়ান সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের হাত ধরে। এরকম ভাইরাল ভিডিও চাইলে দেখে নিতে পারেন পরের আলাপে আরও এঙ্গেজ হতে চাইলে। ক্লিক করুন এখানে, এখানে, ও এখানে।
এরপরে রিলগুলো বাংলাদেশেও ভাইরাল হতে শুরু করে। যেমনটা দেখুন এখানে ও এখানে।
এবার ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, মনে হতে পারে ‘আকাশ ছোঁয়া’ ব্যাকগ্রাউন্ডের রিলগুলো বানানো হয়েছে ব্রেনরট হিসেবে। যেগুলো আমরা স্ক্রল করে চলে যাই না; বরং থেমে দেখি, আবার দেখি। এই অদ্ভুত আকর্ষণকে কেবল ‘ব্রেনরট’ বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। বরং চলেন, এটিকে বোঝার জন্য একটু অন্য ফ্রেমওয়ার্ক ‘ক্যাম্প অ্যাস্থেটিক’ দিয়ে দেখি।
এখন, ক্যাম্প অ্যাস্থেটিক কী?
‘ক্যাম্প’ শব্দটা আজকের ইন্টারনেট কালচারে খুব সহজভাবে ব্যবহার করা হলেও এর শিকড় বেশ পুরোনো।
উনিশ শতকের ইউরোপে, বিশেষ করে ইংরেজি ও ফরাসি সাংস্কৃতিক পরিসরে ‘ক্যাম্প’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় এমন এক ধরনের রুচি বোঝাতে, যা ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরঞ্জিত, নাটকীয় এবং কিছুটা কৃত্রিম। তবে তখনও এটি মূলধারার আলোচনায় ছিল না। বরং একধরনের সাবকালচার ছিল ক্যাম্প। বিশেষ করে ক্যুয়ার কমিউনিটির মধ্যে ‘ক্যাম্প’ হয়ে ওঠে এক ধরনের এক্সপ্রেশন, যেখানে সমাজের প্রচলিত ‘ভালো রুচি’কে একটু ব্যঙ্গ করে, একটু উল্টে দিয়ে, নিজের মতো করে উপস্থাপন করা হয়।
মানে বোঝা যাচ্ছে ক্যাম্প শুধু স্টাইল নয় বরং একধরনের কালচারাল রিঅ্যাকশন।
এখন ক্যাম্পের ধারণাটিকে মূলধারায় নিয়ে আসেন ১৯৬৪ সালে মার্কিন বুদ্ধিজীবী সুসান সোনট্যাগ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘নোটস অন ক্যাম্প’ এর মাধ্যমে। তিনি বলেন, ক্যাম্প হলো এমন এক নান্দনিকতা, যেখানে ব্যাড টেস্টও একধরনের আনন্দ তৈরি করতে পারে। কারণ, সেটি এতটাই অতিরঞ্জিত, এতটাই সিরিয়াস হতে চায়, যে শেষ পর্যন্ত তা অদ্ভুতভাবে ফানি হয়ে ওঠে।

এই লেন্স দিয়ে আপনি যদি ‘আকাশ ছোঁয়া’র রিলগুলো দেখেন তখন তা আর সস্তা বিনোদন থাকে না। বরং এগুলো হয়ে ওঠে এক ধরনের পপ কালচারাল ফেনোমেনন।
‘আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠী’র শিকড় চট্টগ্রামের বায়েজিদের শ্রমজীবী পরিবেশে। প্রথমে মনে হতে পারে ‘আকাশ ছোঁয়া’ খুবই লোকাল একটা ব্যাপার, চট্টগ্রামের একটা নাচের দল, লোকাল প্রোগ্রামে পারফর্ম করে। কিন্তু ইন্টারনেটের দুনিয়ায় লোকাল বলে আলাদা কিছু থাকে না। এই কনটেন্ট প্রথমে লোকালি প্রোডিউস হয়, তারপর ইন্ডিয়ান ইনফ্লুয়েন্সারদের উসিলায় নতুন করে ভাইরাল হয়, আবার সেই ভাইরাল ঢেউ বাংলাদেশে ফিরে এসে আরও বড় আকার নেয়। ফলে এটি শুধু ভাইরাল কনটেন্ট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং একধরনের গ্লোকাল (গ্লোবাল+লোকাল) কালচারাল ফ্লো তৈরি করে, যেখানে এক জায়গার কনটেন্ট অন্য জায়গায় নতুন অর্থ পায়, নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার হয়, এবং শেষে নিজের জায়গাতেই ফিরে এসে এক নতুন পরিচয় গড়ে তোলে।
ক্যাম্প অ্যাস্থেটিকের তিনটি বৈশিষ্ট্য এখানে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। প্রথমত, অতিরঞ্জন–চড়া মেকআপ ও কস্টিউম। দ্বিতীয়ত, ব্যর্থ গাম্ভীর্য–গভীর আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে তৈরি হয় হাস্যরস। তৃতীয়ত, কৃত্রিমতা–তা সে সেটআপ হোক বা আনাড়ি এডিটিং, সব মিলিয়ে এমন এক ভিজ্যুয়াল যা ‘খুব খারাপ’ হয়েও অদ্ভুতভাবে ‘দারুণ’ হয়ে ওঠে।
অবশ্য ক্যাম্পের বৈশিষ্ট্য থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আকাশ ছোঁয়া কিন্তু একইসঙ্গে ইউনিকও। ইউনিক এ জন্য যে ক্যাম্পের হিস্ট্রিতে ওয়েস্ট যেরকম ভীষণ রকম জেন্ডারড, মানে পিংক পরলেই মেয়ে আর নীল মানেই ছেলে, বাংলাদেশের কালচার কিন্তু সেরকম জেন্ডারড না। এবং যাত্রাপালায় যে অ্যাস্থেটিক, বা অনেক সময় পুরুষেরা নারী চরিত্রে অভিনয়ের যে সোশ্যাল অ্যাক্সেপ্টেন্স আছে, সেটা ক্যাম্পের হিস্ট্রিতে নাই। ফলে আকাশ ছোঁয়া নিজে কিন্তু ক্যাম্প নয়, বরং সে একটা কালচার এবং তার একটা নিশ অডিয়েন্স আছে।
তবে আকাশ ছোঁয়া ট্রেন্ড আসলে ক্যাম্পের মতোই রিঅ্যাকশনারি। শহুরে তরুণরা যখন এ ব্যাকগ্রাউন্ডে রিল বানাচ্ছে তারা ঠিক সরাসরি প্রশংসা করছে না, বরং একধরনের আইরনিক কনজাম্পশনে অংশ নিচ্ছে। মানে, আমরা জানি এটা হাই-কালচার না। কিন্তু এটা দেখে মজা নেওয়ার মধ্যে একটা আলাদা মজা আছে।
এ ছাড়াও ইন্টারনেটে একটা মজার রুচি তৈরি হয়েছে গত কয়েক বছরে, যাকে অনেকেই বলে ‘ক্রিঞ্জ কালচার’। যে জিনিসটা আগে লজ্জার, অস্বস্তিকর বা খারাপ বলে মনে হত, এখন সেটাই মানুষ ইচ্ছা করে দেখে, শেয়ার করে, এমনকি উপভোগও করে। ‘আকাশ ছোঁয়া’র রিলগুলো ঠিক এই জায়গাটাতেই কাজ করে।
আপনি হয়তো প্রথমবার দেখে একটু অস্বস্তি বোধ করেন, অভিনয়টা বেশি হয়ে যাচ্ছে, এক্সপ্রেশনটা অদ্ভুত, সেটআপটা খুবই সাদামাটা। কিন্তু তবুও আপনি স্ক্রল করে চলে যান না। বরং একটু থামেন। আবার দেখেন। হয়তো বন্ধুকেও পাঠান। এই থেমে যাওয়াটাই আসল ব্যাপার। ক্রিঞ্জ কালচারে কনটেন্ট ভালো লাগে না, ভালো না লাগার কারণেই ভালো লাগে।
তবে, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা রয়ে যায়, এটি কি সত্যিই ‘ব্রেনরট’? নাকি এটি আমাদের সময়ের নতুন কালচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ, যা প্রচলিত রুচির ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে?
হয়তো উত্তরটা এত সরল নয়। তবে এটা নিশ্চিত, আপনি হাসুন বা বিরক্ত হন, যতক্ষণ আপনি একটু থেমে আকাশ ছোঁয়া দেখছেন বা অজান্তেই গুনগুন করে আকাশ ছোঁয়া বলছেন, ততক্ষণ আকাশ ছোঁয়া স্কাই টাচিং।

আগে আমি গান করতাম। আমার কিছু গান এখনো ইউটিউবে পাওয়া যায়, যা মোটামুটি ১০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ শুনছেন। একদিন আমার চ্যানেলের কমেন্ট সেকশন ঘাটতে গিয়া একটা কমেন্টে চোখ আটকায় গেল। একজন লিখছেন: ‘ব্রো, প্লিজ এরকম আন্ডাররেটেডই থাইকেন!’
১১ দিন আগে
দুজনের মধ্যে কেউ আসলে কারো নামে তেমন সমালোচনা ঠিক করতো না, কিন্তু অলক্ষ্যে একটা বিভাজন ছিল, সেই বিভাজন তৎকালীন আশেপাশের কবিরাই সৃষ্টি করেছিল। শামসুর রাহমান আল মাহমুদ কিন্তু এগুলা করেন নাই। আমরাই করছি। একদল চলে গেছিল শামসুর রাহমানের সাথে, আরেকটা ক্ষুদ্র দল মাহমুদ সাথে। এই যে বিচ্ছিন্ন আল মাহমুদ, তাঁর
১২ দিন আগে
হিউম্যান হিস্ট্রি ঘাঁটলে দেখবেন, দুনিয়ার তাবৎ প্রাণিকে মানুষ পোষ মানাইছে নিজের লাভের জন্য। কুকুরকে পোষ মানাইছে বাড়ি পাহারার জন্য, ঘোড়াকে দিয়ে জিনিসপত্র টানাইছে। কিন্তু আমাকে বিড়ালের ব্যাপারটা কেউ একটু লজিক্যালি বুঝাবেন প্লিজ? এ আবার কী কাজ করবে যে আমার কাজে লাগবে?
১৩ দিন আগে
হিরোসেন্ট্রিক সিনেমাটিক ইউনিভার্সরে ফিল্মবাফরা অনেক আগেই টাটা গুডবাই বইলা দিছেন। আজকাল মাস্ক পরা হিরোর চেয়ে ডার্ক ক্যারেক্টারগুলার প্রতি মানুষ বেশি কিউরিয়াস। আর এই চেইনটা যিনি স্টার্ট করছিলেন, তার নাম হিথ লেজার।
১৪ দিন আগে