নিউজফিড যখন ফ্রয়েডের ড্রিমওয়ার্ক: পোস্ট, পারফরম্যান্স ও অ্যালগরিদমিক অবচেতন

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ৩২
স্ট্রিম গ্রাফিক

গতরাতে আমি স্ক্রল করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছি। ফেসবুক থেকে ইনস্টাগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম থেকে টিকটক। এক ভিডিও শেষ হয়ে আরেকটা শুরু হয়। মুখ আসে, মুখ যায়। কোথাও বিয়ে, কোথাও ব্রেকআপ, কোথাও প্রতিবাদ, কোথাও নিখুঁত সাজানো ‘গার্ল ডিনার’। কোথাও কেউ তিরিশ সেকেন্ডে তার পুরো ট্রমা হিল করে ফেলছে—ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে সেই চেনা লো-ফি বিট।

একসময় মনে হলো, আমি আর শুধু স্ক্রল করছি না। আমি এক ধরনের সামষ্টিক স্বপ্নের ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছি। আর তখনই মনে পড়ে সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে।

স্বপ্ন ও নিউজফিড: দুটো কি আলাদা?

ফ্রয়েডের দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস বইয়ের কাভার
ফ্রয়েডের দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস বইয়ের কাভার

১৮৯৯ সালে প্রকাশিত দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমসে ফ্রয়েড যুক্তি দিয়েছিলেন, স্বপ্ন কখনোই এলোমেলো নয়। স্বপ্ন হলো আমাদের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও অপূর্ণ চাহিদার একটি রূপান্তরিত প্রকাশ। তিনি স্বপ্নকে ভেঙেছিলেন দুই স্তরে:

ম্যানিফেস্ট কন্টেন্ট: যা আমরা স্বপ্নে দেখি—দৃশ্যমান বয়ান

ল্যাটেন্ট কন্টেন্ট: তার নিচে চাপা পড়ে থাকা আসল অর্থ—রূপান্তরিত আকাঙ্ক্ষা, ভয় বা অভাব

এখন একটু ভাবুন। আপনার ইনস্টাগ্রাম ফিড খুলুন। যা দেখছেন—সেলফি, রিল, স্টোরি, কনফারেন্স আপডেট, ফটো ডাম্প, এ সবই এক ধরনের ম্যানিফেস্ট কন্টেন্ট। আর এই পোস্টগুলোর পেছনে থাকা যে আকাঙ্ক্ষা, অনিশ্চয়তা বা যন্ত্রণার কথা সরাসরি বলা হচ্ছে না-সেটাই ল্যাটেন্ট কন্টেন্ট।

ফ্রয়েডের ধারণাটি এখানে এসে নতুন একটি মাত্রা পায়। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটিকে ব্যক্তিগত মানসিকতার গভীর থেকে তুলে এনে সামষ্টিক ও দৃশ্যমান করে দিয়েছে।

ড্রিমওয়ার্ক যেভাবে কাজ করে

ফ্রয়েড এই রূপান্তরের প্রক্রিয়াটির নাম দিয়েছেন ড্রিমওয়ার্ক। ঘুমের মধ্যে আমাদের অবচেতন মন যখন অবদমিত উপাদানগুলোকে সরাসরি প্রকাশ করতে পারে না, তখন সে সেগুলোকে রূপান্তরিত করে প্রতীকে, ইমেজে, গল্পে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ড্রিমওয়ার্কের কাজটা করছি আমরা নিজেরাই, অনেকটা সচেতনভাবেই।

আমরা বলি না, ‘অনিশ্চয়তায় রয়েছি’, লিখি: ‘নিউ বিগিনিংস’ আমরা বলি না, ‘ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছি’, পোস্ট করি: ‘স্লো মর্নিং, সেল্ফ কেয়ার এরা’ আমরা বলি না, ‘কাউকে দেখাতে চাইছি আমি ভালো আছি’, ক্যাপশন দিই: ‘লিভিং মাই বেস্ট লাইফ’

এখানে সাফল্য থাকে, কিন্তু সংশয় থাকে না। সম্পর্ক থাকে, কিন্তু তার ভেতরের দ্বন্দ্ব থাকে না। ঘটনাগুলো থাকে, কিন্তু প্রেক্ষাপট অনুপস্থিত।

এই প্রেক্ষিতে ফ্রয়েডের তিনটি মূল প্রক্রিয়া বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

ডিসপ্লেসমেন্ট: আসল ব্যথা লুকায় কোথায়?

ডিসপ্লেসমেন্ট বা স্থানচ্যুতি হলো সেই প্রক্রিয়া যেখানে অনুভূতির আসল উৎস থেকে তা সরিয়ে অন্য একটি নিরাপদ রূপে প্রকাশ করা হয়। সমসাময়িক সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। চাকরি নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কিন্তু সেই কথা সরাসরি বলা যাচ্ছে না। তাই সেটি রূপ নেয় ‘সফট লাইফ’, ‘স্লো লিভিং’ বা ‘রোমান্টিসাইজ ইওর লাইফ’-এর ন্যারেটিভে।

টিকটকে ভাইরাল হওয়া একটি ট্রেন্ড মনে আছে? ‘একটা ভালো মর্নিং রুটিনই আমার জীবন বদলে দেবে।’ সকালে ঠান্ডা পানি খাও, জার্নাল রাখো, সূর্যোদয় দেখো আর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এটা আসলে কীসের প্রতিফলন? এটা গভীরতর সামাজিক বাস্তবতার স্থানচ্যুত প্রকাশ, যেখানে ব্যক্তি চাকরির বাজার, মানসিক স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো কাঠামোগত সমস্যাকে ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার ঘাটতি হিসেবে পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হচ্ছে। মূল উদ্বেগ কিন্তু হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে না, স্রেফ খোলস বদলাচ্ছে।

মার্ক ফিশারের ক্যাপিটালিস্ট রিয়ালিজম বইয়ের কাভার
মার্ক ফিশারের ক্যাপিটালিস্ট রিয়ালিজম বইয়ের কাভার

সমাজবিজ্ঞানী মার্ক ফিশার তাঁর বই ক্যাপিটালিস্ট রিয়ালিজমে এই প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন ভিন্ন ভাষায়: যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প কল্পনা করা সম্ভব হয় না, মানুষ তখন ব্যবস্থাগত সমস্যার সমাধান ব্যক্তিগত স্তরে খুঁজতে থাকে। ‘হিল ইওরসেলফ’ কালচার এরই ডিজিটাল প্রকাশ।

কনডেন্সেশন: একটা মিমে কতটা বলা যায়?

কনডেন্সেশন হলো সেই প্রক্রিয়া যেখানে একাধিক অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি একটি একক চিহ্নে এসে মিশে যায়।

টিকটকের বিখ্যাত অডিও ‘আই অ্যাম জাস্ট আ গার্ল’ এই কনডেন্সেশনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কর্মক্ষেত্রের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশার বোঝা, দায়িত্বের ক্লান্তি, ব্যক্তিগত ব্যর্থতার লজ্জা, এমন সব ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটের মানুষ শুধু একটি অডিওর নিচে জড়ো হয়ে বলছে: আমি শুধু একটা মেয়ে, আর কী-ইবা পারি। হাস্যরসের আড়ালে গভীর ক্লান্তি আর ব্যবস্থাগত হতাশা কনডেন্স হয়ে যাচ্ছে।

ভাষাতত্ত্ববিদরা যেটাকে বলেন সেমিওটিক ওভারলোড, ফ্রয়েড সেটাকেই বলেছিলেন কনডেন্সেশন। একটি চিহ্নে অনেক অর্থ একসঙ্গে বাস করে।

সিমবোলাইজেশন: সহজ কথা যায় না বলা সহজে?

সিমবোলাইজেশন বা প্রতীকায়নে সরাসরি প্রকাশের পরিবর্তে প্রতীকের মাধ্যমে অর্থ প্রকাশ পায়।

‘ফটো ডাম্প’ সংস্কৃতির কথা ধরুন। যা দেখতে অগোছালো, স্বতঃস্ফূর্ত, আসলে অত্যন্ত সচেতন নির্মাণ। কোন ছবিগুলো রাখা হবে, কোন ফিল্টার, কোন ক্রম, সবকিছু ভেবেচিন্তে বেছে নেওয়া। ‘ক্যান্ডিড’ হওয়ার একটি পারফরম্যান্স।

সম্পর্কের ‘সফট লঞ্চ’-এ নতুন সঙ্গীর পরিচয় আড়ালে রাখা হয়, কিন্তু হাতের ওপর রাখা হাতখানা বলে দেয় কেউ আছে। এটি আধুনিক অন্তরঙ্গতার এক নতুন প্রতীকী ভাষা, একই সঙ্গে ঘোষণা এবং গোপনীয়তা।

এরভিং গফম্যানের দ্য প্রেজেন্টেশন অব সেল্ফ ইন এভরিডে লাইফের কাভার
এরভিং গফম্যানের দ্য প্রেজেন্টেশন অব সেল্ফ ইন এভরিডে লাইফের কাভার

এরভিং গফম্যান তাঁর দ্য প্রেজেন্টেশন অব সেলফ ইন এভরিডে লাইফে বলেছিলেন, আমরা প্রতিদিন নাট্যমঞ্চে পারফর্ম করছি। সোশ্যাল মিডিয়া সেই মঞ্চ সাত দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা রেখেছে আর দর্শকও এখন শত শত কোটি।

অ্যালগরিদম: নতুন যুগের সেন্সর

ফ্রয়েড যে সেন্সরের কথা বলেছিলেন, সুপারইগোর সেই নজরদারি শক্তি যা অবচেতনের উপাদানগুলোকে সরাসরি প্রকাশ পেতে দেয় না, তা এখন আর শুধু মানসিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ নেই।

তা এখন অ্যালগরিদমিক হয়ে উঠেছে।

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কন্টেন্ট মডারেশন নীতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোন বিষয়বস্তু দৃশ্যমান হবে, কোনটি নয়। এনগেজমেন্ট মেট্রিকস—লাইক, শেয়ার, কমেন্ট, এগুলো একটি নিরন্তর পুরস্কার-শাস্তির ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ফলে ব্যবহারকারী পোস্ট করার আগেই নিজেকে সম্পাদনা করতে শুরু করেন।

কী বলা যাবে, কীভাবে বলতে হবে, এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত আর থাকে না। এনগেজমেন্ট মেট্রিকস, অ্যালগরিদমিক প্রাধান্য এবং সম্ভাব্য ভুল ব্যাখ্যার আশঙ্কা— সব মিলিয়ে অবচেতনে একটি সেন্সর ইনস্টল হয়ে যায়।

সোশানা জুবভ তাঁর দ্য এইজ অব সারভেইলেন্স ক্যাপিটালিজমে দেখিয়েছেন, এই প্ল্যাটফর্মগুলো শুধু আমাদের উপাত্ত সংগ্রহ করছে না, আচরণও পরিবর্তন করছে। আমরা যা পোস্ট করি, তা কেবল আমাদের অনুভূতির প্রকাশ নয়; তা একটি পণ্য, যা একটি মনোযোগ-অর্থনীতির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবেই অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত ফিড সামষ্টিক অবচেতনের প্রতিফলন হয়ে ওঠে, যেন হাজারো মানুষ একই স্বপ্ন দেখছে।

বাংলাদেশের মতো প্রেক্ষাপটে, যেখানে প্রতিনিয়ত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বিবর্তিত হচ্ছে, এই ডিজিটাল ড্রিমওয়ার্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। এখানে ব্যক্তিগত প্রকাশ প্রায়ই সামাজিক ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রতীকায়ন ও স্থানচ্যুতি আরও সূক্ষ্ম হয়। একটি রাজনৈতিক অবস্থান সরাসরি উচ্চারণের বদলে সাংস্কৃতিক রেফারেন্সে প্রকাশ পায়। একটি ব্যক্তিগত সংকট নান্দনিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া এখানে শুধু আত্মপ্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি টিকে থাকার সেই কৌশল যার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে সামাজিকভাবে টেকসই রাখার চেষ্টা করে।

এই অবস্থায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়: ব্যক্তির অভিজ্ঞতা এবং তার উপস্থাপনের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ কমে আসছে। আমরা কেবল অভিজ্ঞতা অর্জন করি না— আমরা একই সাথে সেটিকে নথিভুক্ত এবং উপস্থাপন করি। মিছিলে অংশ নেওয়া এবং সেই মুহূর্তটি ফ্রেম করা, দুটি আলাদা কাজ নয়, বরং একই অভিজ্ঞতার অংশ। আমরা এখন একই সাথে অংশগ্রহণকারী এবং পর্যবেক্ষক, অভিজ্ঞতা অর্জনকারী এবং সম্পাদক। এই দ্বৈততা আমাদের মানসিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করছে।

যদি একদম সরাসরি বলতাম?

এখন যদি আমরা কোনো ঘুরপথে না যাই, কোনো মিম বা ইঙ্গিত না দিই, একদম সরাসরি পোস্ট করি?

‘আজ খুব একা লাগছে এবং কারণটা বলতে পারছি না।’ ‘ক্যারিয়ার নিয়ে সত্যিই ভয়ে আছি।’ “কাউকে ভালোবাসি কিন্তু বলতে পারছি না।’

তাহলে কী হবে? হয়তো অস্বস্তি তৈরি হবে। হয়তো পোস্টটি এনগেজমেন্ট পাবে না, অ্যালগরিদম তাকে পেছনে ঠেলে দেবে। কারণ আমরা শিখে গেছি, কাঁচা সত্যের পারফরম্যান্স ভালো হয় না।

আমরা শুধু জীবন যাপন করি না। আমরা জীবনকে গ্রহণযোগ্য করে তুলি। এডিট করি, সাজাই, ফিল্টার দিই, ক্যাপশন লিখি, মুছে ফেলি, আবার পোস্ট করি। তারপর স্ক্রল করি।

আর এই প্রক্রিয়ার ঘুরপথে আমাদের সামষ্টিক স্বপ্নের নির্মাণ হতে থাকে— প্রতিদিন, প্রতিটি পোস্টে, প্রতিটি লাইকে।

সম্পর্কিত