আল্ট্রাম্যারাথনার মাহফুজ শাওনের সাক্ষাৎকার

২৫০ কিলোমিটার ৪৬ ঘণ্টার ভেতরে অতিক্রম করতে হবে

তপ্ত মরুভূমি আর দুর্গম পাহাড় জয়ের পর এবার আরও এক অতিমানবীয় লক্ষ্য স্থির করেছেন দেশের অন্যতম আল্ট্রা ম্যারাথনার এম মাহফুজুল হক, যিনি ক্রীড়াঙ্গনে ‘মাহফুজ শাওন’ নামে পরিচিত। মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর রাজ্যে অনুষ্ঠিতব্য ‘টিটি আল্ট্রা-২০২৬’ ইভেন্টে ৪৬ ঘণ্টার মধ্যে ২৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তিনি। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের প্রভাষক ও কোচ মাহফুজের এই সাহসী পথচলার ভিত তৈরি হয়েছে দেশ ও বিদেশের মাটিতে অর্জিত একের পর এক সাফল্যের মাধ্যমে। এই দৌড়বিদ এখন প্রস্তুত হচ্ছেন তার ক্যারিয়ারের দীর্ঘ এবং কঠিনতম দৌড়টির জন্য। দেশের চিরচেনা গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক আল্ট্রা ম্যারাথনের বৈশ্বিক মঞ্চে মাহফুজ শাওনের এই রূপান্তর এবং আগামী ২৫০ কিলোমিটারের অগ্নিপরীক্ষা নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

কাজী মাকতাবার পান্থ
কাজী মাকতাবার পান্থ

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ২১
মাহফুজ শাওন। সংগৃহীত ছবি

স্ট্রিম: ‘টিটি আল্ট্রা-২০২৬’ কবে এবং কোথায় অনুষ্ঠিত হবে?

মাহফুজ: এই ইভেন্টটি ২৪ এপ্রিল মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর রাজ্যে অনুষ্ঠিত হবে । এখানে আরও কয়েকটি ক্যাটাগরি রয়েছে যেমন ৫০ কিলোমিটার, ১০০ কিলোমিটার, ১০০ মাইল, ২০০ কিলোমিটার । সর্বোচ্চ দূরত্বটা হচ্ছে ২৫০ কিলোমিটার । আমি ২৫০ কিলোমিটার ক্যাটাগরির জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছি।

স্ট্রিম: এখানে সময়ের সীমাবদ্ধতা ছাড়াও কি আর কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?

মাহফুজ: হ্যাঁ, যদিও এই ২৫০ কিলোমিটার আমাকে ৪৬ ঘণ্টা সময়ের ভিতরে অতিক্রম করতে হবে যেখানে প্রায় ৩৯৭০ মিটারেরও বেশি এলিভেশন গেইন রয়েছে। এলিভেশন গেইন মানে হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে গিয়ে একজনকে যাত্রাপথের প্রতিটি চড়াই বা ওপরের দিকে ওঠার জন্য সর্বমোট কতটুকু উচ্চতা আরোহণ করতে হবে তার পরিমাপ। এই রেসে ৩৯৭০ মিটার ‘এলিভেশন গেইন’ মানে হলো পুরো ২৫০ কিমি দূরত্ব অতিক্রমের সময়ে আমাকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বমোট ৩৯৭০ মিটার ওপরের দিকে উঠতে হবে যা প্রায় মাউন্ট এভারেস্টের অর্ধেক উচ্চতার সমান।

স্ট্রিম: এলিভেশনের জন্য তো বেশ খানিকটা উঁচু-নিচু রাস্তা আপনাকে পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু ঢাকার রাস্তা তো এমন উঁচু-নিচু নয়। এই ক্ষেত্রে আপনার প্রিপারেশনটা কেমন?

মাহফুজ: ঢাকার রাস্তায় তো আমরা তেমন একটা এলিভেশন পাই না। এলিভেশনের জন্য অনেক এথলেটই বান্দরবানে কিংবা খাগড়াছড়িতে গিয়ে ক্যাম্প করে। আমি যেহেতু ঢাকায় কর্মরত রয়েছি ফলে কারণে ওইভাবে যেতে পারি না। এইটার বিকল্প হিসেবে আমি আমার বাসার ট্রেডমিলে ইনক্লাইন রেখে ট্রেনিং করি। ইনক্লাইনের মাত্রা দেখা যায় ১০-১২ এর ওপরে দিই, কোনো কোনো সময় ১৫-তে দিয়ে প্রায় ১০-১৫ মিনিট টানা দৌড়ানোর চেষ্টা করি। তবে এক্ষেত্রে আমি আমার দৌড়ের গতি খুব কম রাখি, যেন কাফ মাসল অ্যাডাপ্ট হয়। এ ছাড়া হাতিরঝিলের ব্রিজগুলো কাভার করার পাশাপাশি ৩০০ ফিটের রাস্তায় যে টানেলগুলো রয়েছে, সেখানকার আপহিলগুলোকেও আমার ট্রেনিং জোন হিসেবে ব্যবহার করি।

স্ট্রিম: মালয়েশিয়ার আবহাওয়াটা প্রচণ্ড গরম বা আর্দ্র থাকে। সেই আবহাওয়া মোকাবিলার ক্ষেত্রে আপনার ট্রেনিংটা কেমন হচ্ছে?

মাহফুজ: প্রচণ্ড গরম এবং হিউমিডিটির জন্যই এই ‘টিটি আল্ট্রা ম্যারাথন’ ইভেন্টটাকে ‘প্রবাবলি দ্য টাফেস্ট রোড আল্ট্রা ইন মালয়েশিয়া’ বলা হয়। রমজান মাস শেষ হলো কয়েকদিন আগে। আমি ঠিক ওই আবহাওয়াটা মোকাবিলার জন্য প্রথমত একটা কাজ করেছি—আমার বাসার এয়ারকন্ডিশনারটা আমি এখনও সার্ভিসিং করাই নাই এবং এটি আমি আপাতত চালু করব না। ইভেন্ট শেষ করে এসে তারপর চালু করব, যেন বর্তমানে আমি গরমটার সঙ্গে একটু অ্যাডাপ্ট হতে পারি। আমার রেসটা মালয়েশিয়াতে বেলা ২টায় শুরু হবে। এর জন্য আমি আমার অধিকাংশ রমজান মাসের ট্রেনিংগুলো বেলা ২টার পরে করতাম। একবারে তপ্ত রোদের নিচে দৌড়ানোর চেষ্টা করেছি রোজা রেখেই, যেন আমার শরীর একটু কম নিউট্রিশন থাকলেও সারভাইভ করতে পারে। আমি একটু কম হাইড্রেশন এবং কম নিউট্রিশন নিয়ে ট্রেনিং করে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। যদিও আমি রেসের সময়ে পরিমিত পরিমাণ নিউট্রিশন এবং হাইড্রেশন প্ল্যান ঠিক করে রেখেছি। সেখানে নতুন করে কোনো কিছুই টেস্ট করার সুযোগ নেই।

স্ট্রিম: জয়সালমিরে ২২০ কিমি ডেজার্ট আল্ট্রা ম্যারাথনে গিয়েছিলেন, সেখানে যে পদক পেয়েছেন সেটা কি আপনাকে কোনোভাবে মোটিভেট করে?

মাহফুজ: এটি আমাকে সব সময় মোটিভেশন দেয়। আমার জীবনের সেরা অ্যাচিভমেন্ট ওইটা। ওই ইভেন্টটা এবং ওই অ্যাচিভমেন্টটাই আমাকে সবসময় শক্তি জোগায় যে, ‘মাহফুজ সবই সম্ভব’।

স্ট্রিম: এ ছাড়া আপনাকে আর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মোটিভেট করে?

মাহফুজ: আমার রানিং কমিউনিটি ‘বিডি রানার্স’-এর মানুষগুলো আমাকে সব সময় মোটিভেট করে। এই কমিউনিটির মানুষগুলো কখনো কারও খারাপ সময়ে মজা করে না, বরং দেশ এবং দেশের বাইরের সকল ধরনের দৌড়ের ইভেন্টগুলো সম্পর্কে আমাদের মতো দৌড়বিদদের মোটিভেট করে।

আল্ট্রা ম্যারাথনার মাহফুজ শাওন। সংগৃহীত ছবি
আল্ট্রা ম্যারাথনার মাহফুজ শাওন। সংগৃহীত ছবি

স্ট্রিম: আল্ট্রা ম্যারাথনে দেশের মধ্যে আপনার অনুপ্রেরণা কে?

মাহফুজ: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আল্ট্রা ম্যারাথনের ক্ষেত্রে আমার অনুপ্রেরণা সব সময় আফনান আহমেদ ভাই। তিনি বাংলাদেশ থেকে প্রথম কোনো একটি ইউটিএমবি ইভেন্টে অংশগ্রহণ করা দৌড়বিদ। এটি বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এবং কঠিন ট্রেইল রানিং বা আল্ট্রা-ম্যারাথন ইভেন্টগুলোর একটি।

ভাইয়াকে যখন ইউটিএমবিতে যেতে দেখেছিলাম তখন থেকেই আমি অনুপ্রাণিত হই যে আমিও কোনো একদিন আল্ট্রা দূরত্বের ইভেন্ট এ অংশগ্রহণ করবো ইনশা আল্লাহ।

স্ট্রিম: আপনি যে মালয়েশিয়ার টিটি আল্ট্রাতে যাবেন, সেই ক্ষেত্রে কি আপনি কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান থেকে স্পন্সরশিপ পেয়েছেন?

মাহফুজ: এক কথায় যদি উত্তর দিই—না, আমি আসলে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পাইনি এখনো। আমি চেষ্টা করেছি। আল্ট্রাম্যারাথনের ক্ষেত্রে আসলে পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপারটা বাংলাদেশে এখনো এতটা প্রচলিত না।

স্ট্রিম: স্পন্সরশিপ ছাড়া আর কোনো বিষয়কে কি আপনার জন্য চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে?

মাহফুজ: আমার কাছে স্পন্সরশিপ ছাড়াও একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো এবং সব সময়ই বোধহয় থাকবে, সেটা হচ্ছে ছুটি পাওয়া। কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি পাওয়ার ব্যাপারটা আমার জন্য বেশ জটিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো, তাই বাচ্চাদের নিয়ে আমার অনেক ধরনের রেসপন্সিবিলিটি থাকে। ছুটির ব্যাপারে আমি আমার প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ স্যারকে জানাই, স্যার বিষয়টি বিবেচনাপূর্বক আমার প্রতি সদয় হন এবং আমাকে ছুটি দিতে সম্মতি জানান। আমি অধ্যক্ষ স্যার, আমার প্রতিষ্ঠানের সব ভাইস প্রিন্সিপাল এবং আমার বিভাগীয় প্রধান ফারুক স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ।

স্ট্রিম: সময়সীমা তো বুঝলাম ৪৬ ঘণ্টা, কিন্তু আপনার নিজের কোনো টাইম গোল আছে?

মাহফুজ: আমি প্রথমে জানতাম যে ২৫০ কিলোমিটারের কাট অফ ৪৪ ঘণ্টা। পরে ২০২৬-এর রেজিস্টার্ড দৌড়বিদদের জন্য গত ১২ এপ্রিল অরগানাইজিং টিমের পক্ষ থেকে মেইলের মাধ্যমে একটি রানার্স গাইড শেয়ার করা হয়, যেখানে জানতে পারি যে ২৫০ কিলোমিটারের জন্য নির্ধারিত বর্তমান কাট অফ হলো ৪৬ ঘণ্টা।

আল্ট্রাম্যারাথনের ক্ষেত্রে অ্যাচিভমেন্টের জায়গাটাই হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারা। যেহেতু আমার মানসিক প্রস্তুতি ছিলো ৪৪ ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন করা একারণে ৪৪ ঘণ্টার মধ্যেই শেষ করতে পারাটাই আপাতত আমার টাইম গোল। এটা কিছুটা সেফ এপ্রোচ।

প্রথম ১০০ কিলোমিটার ১৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করার ইচ্ছা রয়েছে, দ্বিতীয় ১০০ কিলোমিটার ৩৬ থেকে ৩৭ ঘণ্টা এবং পুরো রেসটা ৪৪ থেকে ৪৬ ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই। যদি সম্ভব হয় তবে আমি চেষ্টা করবো প্রথম ১০০ কিলোমিটারের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় সেভ করার, যা আমাকে পরের ধাপের জন্য বাড়তি সময় দেবে। আমার মূল টার্গেট হলো সফলভাবে ফিনিশ করা।

বিষয়:

খেলা

সম্পর্কিত