নিজ দোষে দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমবাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

দক্ষ কর্মী নিতে বাংলাদেশিদের জন্য ২০০৮ সালে শ্রমবাজারের দরজা খুলেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। বছর বছর কোটাও দেয়। তবে দক্ষতার নামে শুধু ভাষা শিক্ষাতেই জোর, ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে সেই কোটা কোনো বছরই পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। উল্টো সবশেষ ৩ বছরে কোটার অর্ধেক কর্মীও দেশটিতে যেতে পারেনি।

২০০৭ সালে দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর পথ খোলে। এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেমের (ইপিএস) মাধ্যমে এর পরের বছর থেকে এককভাবে দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি করছে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়োসেল)। এসব শ্রমিকরা মূলত দেশটির ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি, মৎস্য, নির্মাণ ও সার্ভিস সেন্টারে কাজ করেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়া চায় দক্ষ শ্রমিক। তবে ভাষা শেখা হলেই বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানো হয়। অনেকে ভাষাটিও ঠিকমতো শেখেন না। কোনো রকমে সনদ পান। এ ছাড়া বেশি টাকা আয়ের জন্য ঘন ঘন প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের প্রবণতা রয়েছে। সব মিলিয়ে চাহিদা সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকের ওপর আগ্রহ কমছে।

একাধিক ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্ট্রিমকে জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার চাকরিতে আকর্ষণীয় বেতন, উন্নত কর্মপরিবেশসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে এসএসসি পাস করেই দেশটিতে যাওয়া যায়। তবে সুবিধা বেশি থাকায় এখন উচ্চশিক্ষিতরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেক নারীও দেশটিতে যেতে চাচ্ছেন।

দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী কয়েকজন জানান, সেখানে শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন প্রায় ২ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করলে মাসে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় করা সম্ভব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকা ও খাওয়ার খরচ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দেয়।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি শ্রমিক দক্ষিণ কোরিয়ায় যান ২০২২ সালে, ৫ হাজার ৮৯১ জন। এর পরের বছর বাংলাদেশি শ্রমিকদের কোটা ছিল ১০ হাজারের বেশি। তবে অর্ধেক শ্রমিকও যেতে পারেননি। অথচ এই বছর ভাষা পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেন ৫৫ হাজার ৪০৩ জন।

মেহেরপুরের প্রজন্ম কোরিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টারের পরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, দেশের তুলনায় কোরিয়াতে অনেক বেশি আয় করা যায়। কাজের পরিবেশও ভালো। এ কারণে অনেক বেশি মানুষ ভাষা শিখছে। তবে দক্ষতা ঘাটতিতে ভিসা পাওয়ার আগেই অনেকের সনদের মেয়াদ হয়ে যাচ্ছে।

কোটা দেয়, হয় না পূরণ

সম্ভাবনাময় শ্রম বাজার হলেও গত ১৭ বছরে একবারও চাহিদার পুরো কর্মী পাঠাতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রযুক্তি বিষয়ে অদক্ষতা, কোম্পানি পরিবর্তনের প্রবণতা, খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা, কূটনীতিক প্রচেষ্টার অভাবসহ নানা কারণে কোরিয়ান কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি শ্রমিক না নিয়ে নেপাল, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কার দিকে ঝুঁকছে।

বোয়োসেলের হিসাব বলছে, ২০০৮ সালে প্রথমবার দক্ষিণ কোরিয়া যেতে ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করা ২০ হাজার ৪৫০ জনের মধ্যে পাস করেন ৮ হাজার ২৭৮ জন। তবে শেষ পর্যন্ত যেতে পারে ১ হাজার ৫৯৫ শ্রমিক। তবে চাহিদা ছিল এর চেয়ে বেশি। এরপর ২০০৯ সালে ৭৭০ জন, ২০১০ সালে ২৩৩৬ জন, ২০১১ সালে ১৬৮৫ জন ও ২০১২ সালে ১৪২৬ জন দেশটিতে যান।

২০১৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিক কোটা চালু করে দক্ষিণ কোরিয়া। ওই বছর দেশটিতে যান ২১৪৬ জন। ২১০০ জনের কোটার বিপরীতে তারা গেলেও এর মধ্যে অনেকেই ছিলেন আগের বছরের। এরপর ২০১৪ সালে ১৭৩১ জন, ২০১৫ সালে ২২৬৮ জন, ২০১৬ সালে ২০৪৯, ২০১৭ সালে ১৭৮৬, ২০১৮ সালে ২৩৫৫ ও ২০১৯ সালে ১ হাজার ৬৪৫ শ্রমিক দক্ষিণ কোরিয়ায় যান। পরের দুই বছর করোনা মহামারির কারণে মাত্র ১৪১ (২০২০) ও ১১১ (২০২১) জন দেশটিতে যেতে পারেন।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি শ্রমিক দক্ষিণ কোরিয়ায় যান ২০২২ সালে, ৫ হাজার ৮৯১ জন। এর পরের বছর বাংলাদেশি শ্রমিকদের কোটা ছিল ১০ হাজারের বেশি। তবে অর্ধেক শ্রমিকও যেতে পারেননি। অথচ এই বছর ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেন ৫৫ হাজার ৪০৩ জন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এই ধারা বজায় থাকে। ২০২৪ সালে ১১ হাজার ৫০০ এবং ২০২৫ সালে ১০ হাজার ৩০০ জনের কোটার বিপরীতে যেতে দেশটিতে যান মাত্র ২৭৭৮ ও ১৭৭২ জন। সবমিলিয়ে প্রায় দেড় যুগে দেশটিতে গেছেন মাত্র ৩৭ হাজার ৬৮৯ কর্মী।

দক্ষতা বলতে শুধু ভাষা শেখায় জোর

চার বছরের চেষ্টায়ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যেতে পারেননি খুলনার একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করা আল মামুন। তিনি জানান, ২০২০ সালে ডিপ্লোমা শেষে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। করোনা মহামারির সময় ২০২১ সালে সেই চাকরি ছেড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ভাষা দক্ষতা কোর্সে ভর্তি হন। ২০২৩ সালে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণও হন। তবে ২০২৫ সালে সেই সনদের মেয়াদ শেষ হলেও ভিসা আর পাননি।

মামুন স্ট্রিমকে বলেন, দুই বছর ধরে ভিসার অপেক্ষা করেছি। কোনো চাকরিতেও যোগ দেইনি। কিন্তু সনদের মেয়াদ শেষ হলেও ভিসা পেলাম না।

বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, আমরা দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ১০৪টি জব সেক্টরে নিয়োগ দেওয়ার আবেদন করেছি। মৌসুমি কর্মী পাঠানোর জন্য দেশটির কোম্পানিগুলোকে ১ হাজার ২০০ ডলার করেও দিয়েছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়া যেতে আগ্রহীরা শুধু ভাষা পরীক্ষায় পাসের জন্যই প্রস্তুতি নেন। শেষপর্যন্ত সনদ পেলেও অনেকে আবার দেশটিতে যাওয়ার পর ঠিকভাবে কথা বলতে ও বুঝতে পারেন না। কোরিয়ার বিভিন্ন শহরের ভাষার আঞ্চলিকতাও একটা সমস্যা।

দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী আক্তারুজ্জামান আকাশ স্ট্রিমকে বলেন, ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়া এসেছি। প্রথমদিকে ভাষা বুঝতে না পারায় কাজ বুঝতে সমস্যা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশিদের বারবার কোম্পানি পরিবর্তনের প্রবণতাও আছে। এতে কোম্পানিগুলোতে আমাদের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।

কোম্পানি পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলে আকাশ বলেন, বাংলাদেশি কর্মীদের অনেকেই ওভারটাইম কাজ করতে চান। তবে অনেক কোম্পানিতে সেই সুযোগ থাকে না। এজন্য অন্য কোম্পানিতে চলে যান তারা। এর বাইরে কাজ কঠিন ও খাবারে সমস্যার কারণেও অনেকে কোম্পানি পরিবর্তন করেন।

প্রয়োজন বাড়তি তৎপরতা

দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মী পাঠাতে বোয়েসেলের পাশাপাশি সরকারের তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্লাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে যেসব পদ্ধতিতে বিদেশে কর্মী পাঠানো হয় তার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর ইপিএস সিস্টেম। এ পদ্ধতিতে মধ্যসত্ত্বভোগীদের কাছে যেতে হয় না। এ ছাড়া প্রতি বছর কোটা বাড়ানো যায়। তবে এজন্য বোয়েসেলের পাশাপাশি সরকারের তৎপরতা প্রয়োজন।

বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, আমরা দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ১০৪টি জব সেক্টরে নিয়োগ দেওয়ার আবেদন করেছি। মৌসুমি কর্মী পাঠানোর জন্য দেশটির কোম্পানিগুলোকে ১ হাজার ২০০ ডলার করেও দিয়েছি। এ ছাড়া কোটা পূরণে যাদের ভাষা সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছে তাদের নেওয়ার অনুরোধ করেছি। আমরা বসে নেই। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ফলাফল পক্ষে আসছে না।

সম্পর্কিত